১৯৭১ সালের স্বাধীনতার মূল চেতনা—সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে যে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম হয়েছে, তা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায় । এই আন্দোলনে ১৫শত -এরও বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন এবং ১৪ হাজারেরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন । এই বিপুল আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত ‘দ্বিতীয় স্বাধীনতা’ রক্ষা করতে অন্তর্বর্তী সরকার ৯টি প্রধান খাতে সংস্কার কার্যক্রম শুরু করেছে, যার ব্যাপ্তি সরকারি প্রশাসন থেকে শুরু করে বিচার বিভাগ ও মানবাধিকার পর্যন্ত বিস্তৃত ।

১. সুশাসন জননিরাপত্তা: জবাবদিহিতার নতুন ফ্রেমওয়ার্ক

অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে ‘গভর্নেন্স পারফরম্যান্স মনিটরিং সিস্টেম’ (GPMS) চালু করেছে । এটি একটি আইসিটি-ভিত্তিক মনিটরিং ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে সরকারি দপ্তরগুলোর কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে । এছাড়া, স্বৈরশাসনের প্রতীক মুছে ফেলতে বিগত সরকারের পরিবারের নামে থাকা ৮০৮টি প্রতিষ্ঠানের নাম পরিবর্তন করা হয়েছে ।

প্রশাসনিক সংস্কার:

  • সরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০ থেকে বাড়িয়ে ৩২ বছর করা হয়েছে ।
  • বিসিএস পরীক্ষার আবেদন ফি ৭০০ টাকা থেকে কমিয়ে ২০০ টাকা করা হয়েছে ।
  • নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা আনতে মৌখিক পরীক্ষার নম্বর ২০০ থেকে কমিয়ে ১০০ করা হয়েছে ।

২. বিচার বিভাগ মানবাধিকার: স্বৈরতন্ত্রের স্থায়ী বিলোপ

বিগত ৫৪ বছরে যা সম্ভব হয়নি, তা করেছে এই অন্তর্বর্তী সরকার। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের প্রভাবমুক্ত রাখতে ‘সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫’ জারি করা হয়েছে 。 এটি বিচার বিভাগকে আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন প্রদান করবে ।

মানবাধিকার সুরক্ষা:

  • বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম বিরোধী সনদে (ICPPED) স্বাক্ষর করেছে ।
  • ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ’ জারি করে কমিশনকে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী করা হয়েছে ।
  • ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) সংশোধন করে বিনা পরোয়ানায় গ্রেপ্তার ও রিমান্ডের ক্ষেত্রে কঠোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়েছে ।

৩. নিরাপদ বাংলাদেশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়

জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ বাহিনীকে ঢেলে সাজানোর প্রক্রিয়া চলছে। একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ ‘পুলিশ কমিশন’ গঠনের লক্ষে ‘পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ২০২৫’ প্রণয়ন করা হয়েছে । এছাড়া, পাসপোর্ট ইস্যু করার ক্ষেত্রে পুলিশ ভেরিফিকেশন শিথিল করে নাগরিকদের ভোগান্তি কমানো হয়েছে । মাদক বিরোধী অভিযানে নিরাপত্তার জন্য ৫২৯ জন সাব-ইন্সপেক্টর থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের অস্ত্র ব্যবহারের অনুমতি দেওয়া হয়েছে ।

৪. অর্থনীতি জনকল্যাণ: বৈষম্যমুক্ত সমাজ

জুলাই বিপ্লবের চেতনা ধারণ করে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে বরাদ্দ বাড়িয়েছে। চলতি অর্থ বছরে ১,২৬,৭৩১ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা জাতীয় বাজেটের ১৬ শতাংশেরও বেশি । এছাড়া, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে এবং কৃষি উৎপাদন বাড়াতে বিভিন্ন কৌশল গ্রহণ করা হয়েছে 。

৫. ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে ‘স্মার্ট’ ও স্বচ্ছ ভূমি ব্যবস্থাপনা

ভূমি ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতি রোধে সরকার পাঁচটি বিশেষ সফটওয়্যার চালু করেছে । এখন থেকে মিউটেশন ও ভূমি উন্নয়ন কর ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন হবে 。 সারা দেশে ডিজিটাল জরিপ চালানোর জন্য দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে ।

৬. সংস্কৃতি সামাজিক জাগরণ: জুলাই স্মৃতি সংরক্ষণ

বিগত সরকারের ‘পারিবারিক ইতিহাস’ প্রচারের বিপরীতে জুলাই বিপ্লবের স্মৃতি ধরে রাখতে ‘জুলাই গ্রাফিতি’ ভিত্তিক কাভার ডিজাইন ও প্রকাশনা শুরু হয়েছে 。 শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০২৬ সালে বিশেষ অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে, যা নারীদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করবে 。

ব্যালট সংস্কারের চূড়ান্ত পরীক্ষা

অন্তর্বর্তী সরকারের এই সংস্কারগুলো মূলত ২০২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য একটি সমতল ও স্বচ্ছ মাঠ তৈরির প্রয়াস 。 জনগণের প্রত্যাশা, এই সংস্কারগুলো কেবল নথিপত্রে সীমাবদ্ধ থাকবে না। রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে এই সংস্কারের প্রতিফলন এবং নির্বাচনের মাধ্যমে একটি টেকসই গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠাই এখন সময়ের দাবি।

জুলাই বিপ্লবের শহীদদের রক্তে ভেজা এই মাটির ওপর দাঁড়িয়ে যে ‘নতুন বাংলাদেশ’-এর ইমারত গড়া হচ্ছে, তার মূল চাবিকাঠি হলো প্রতিটি নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদার সুরক্ষা। এই লক্ষ্য অর্জনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতিটি পদক্ষেপ এখন দেশ ও বিদেশের পর্যবেক্ষকদের মূল আলোচনার বিষয়।