সংবিধান সংশোধন আর সংবিধান সংস্কার এক বিষয় নয়। সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দুই তৃতীয়াংশ সদস্যদের সমর্থনে সংবিধান সংশোধন করা যাবে। কিন্তু মূলনীতি পরিবর্তন করা যাবে না। মূলনীতি পরিবর্তন করে সংবিধান সংস্কার করার জন্যই গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ গণভোটের মাধ্যমে অনুষ্ঠিত জনরায় সংসদ বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। সংসদে আলোচনা করে জনরায় পরিবর্তন করা যাবে না। আলোচনার নামে সময়ক্ষেপন না করে দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়ার পরামর্শ দিয়েছেন আইনজ্ঞরা। অন্যথায় ৯০দিন অতিবাহিত হলে সংস্কার পরিষদের শপথ নেয়ারও সুযোগ থাকবে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইতোমধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের কয়েকটি ধারা লঙ্ঘন হয়েছে। জুলাই সনদের ৮ নাম্বার ধারায় শপথের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সরকার দলীয় সংসদ সদস্যরা এ শপথ গ্রহণ করেননি। অপরদিকে নির্বাচনের ফলাফল ঘোষিত হওয়ার ত্রিশ পঞ্চিকা দিবসের মধ্যে সংসদ আহবান করার বিধান থাকলেও তা করা হয়নি। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ১০ নম্বর ধারাও লঙ্ঘন হয়েছে। অথচ একই আদেশে মাধ্যমে অনুষ্ঠিত গণভোটে হ্যাঁ জয়যুক্ত হলে পরিষদ আহ্বানের একশ’ আশি কার্য দিবসের মধ্যে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করার নির্দেশনা রয়েছে।

গত রোববার জাতীয় সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা জামায়াতের আমীর শফিকুর রহমান সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহবান করার জন্য উত্থাপন করেন। তিনি বলেন, অর্ডারে পরিষ্কার বলা আছে, যে পদ্ধতিতে সংসদের প্রথম অধিবেশন ডাকা হবে, একই পদ্ধতিতে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সভাও ডাকতে হবে। কিন্তু এখনো ডাকা হয়নি।

জবাবে সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী কোন কথা বলেননি। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জবাব দিয়েছেন। তিনি বিরোধী দলীয় নেতার এ প্রস্তাব বিধি অনুযায়ী নোটিশ দিলে আলোচনা হতে পারে। আর এ অধিবেশনে ১৩৩টি অধ্যাদেশ পাস করতে হবে, সময় কম, পরের অধিবেশন বাজেট অধিবেশন হবে। আর তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশটিকেই অসাংবিধানিক আদেশ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। আবার বলেছেন, তিনি জুলাই সনদ অক্ষরে অক্ষরে বাস্তবায়ন করবেন। কিন্তু সেটি সাংবিধানিকভাবে হতে হবে।

এসব বিষয়ে আইনজ্ঞরা বলছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ অবশ্যই সংবিধান অনুযায়ী হয়েছে। আর গণভোটের মাধ্যমে জনগণ রায় দিয়েছেন। এটি সংসদ বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। সরকার দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে সংবিধান সংশোধন করতে পারবে কিন্তু সংস্কার করতে পারবে না। কেননা সংবিধানের মূলনীতি পরিবর্তনের ক্ষমতা সংসদকে দেয়া হয়নি। সংবিধানের ৭খ তে এবিষয়ে নিষেধাজ্ঞা দেয়া আছে। এ ক্ষমতা দেয়া হয়েছে জনগণের গণভোটকে। আর এ গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন করার জন্য সংসদ সদস্যদেরকে ক্ষমতা দিয়েছেন।

এ বিষয়ে আদেশের ৭ ধারায় বলা হয়েছে, (১) গণভোটে উপস্থাপিত প্রশ্নের উত্তরে প্রদত্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে (হ্যাঁ) সূচক হইলে,-(ক) এই আদেশ জারির অব্যবহিত পর অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় সংসদের সাধারণ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হইবে, যাহা সংবিধান সংস্কার বিষয়ে সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করিতে পারিবে; (খ) উক্ত নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ একইসাথে জাতীয় সংসদের সদস্য হিসাবে এবং এই আদেশ অনুসারে সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসাবে দায়িত্ব পালন করিবেন; (গ) পরিষদ উহার প্রথম অধিবেশন শুরুর তারিখ হইতে ১৮০ (একশত আশি) কার্য দিবসের মধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটের ফলাফল অনুসারে সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন করিবে এবং তাহা সম্পন্ন করিবার পর পরিষদের কার্যক্রম সমাপ্ত হইবে। (২) পরিষদের কার্যধারায় অংশগ্রহণের সময় নির্বাচিত প্রতিনিধিগণ পরিষদ সদস্য হিসাবে অভিহিত হইবেন। (৩) এই আদেশের উদ্দেশ্য পূরণকল্পে, পরিষদ ইহার অধিবেশন আহ্বান ও মুলতবি, সংবিধান সংস্কার বিষয়ক প্রস্তাব উত্থাপনের পদ্ধতি, উক্ত প্রস্তাব বিবেচনা ও গ্রহণ এবং অন্য সকল বিষয়ে কার্যপ্রণালী নির্ধারণ করিবে।

এ বিষয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার এ এসএম শাহরিয়ার কবির দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, দুটি ভোট হয়েছে। ভোটের পর দু’টি শপথ নিতে হবে। ৯০ দিনের মধ্যে শপথ না নিলে সংসদ সদস্য পদ থাকে না। আর তখন সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যও হতে পারবে না। গণভোটের মাধ্যমে জনগণ সার্বভৌম ক্ষমতার প্রয়োগ করেছে। এটা সংসদকে বাস্তবায়ন করতে হবে। এটি নিয়ে সংসদে আলোচনার প্রয়োজন নেই।

তিনি বলেন, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার ত্রিশ দিনের মধ্যে সংবিধান পরিষদের সংস্কার অধিবেশন আহবান করতে হবে। কিন্তু তারা তা করেননি। শপথ নেয়ার কথা শপথ নেননি। এখন সংসদে এ বিষয়ে আলোচনার কথা বলছেন। মূলত আলোচনার মাধ্যমে সময় ক্ষেপণ করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছেন না।

তিনি আরো বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ছাড়া সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংবিধান সংস্কার করা যাবে না। কেননা সংবিধানের ৭খ তে মূলনীতি সংশোধনের ক্ষমতা সংসদকে দেয়া হয়নি। এটি একমাত্র গণভোটের মাধ্যমেই সম্ভব। আর এ কারণেই গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করে সংবিধান সংস্কার করতে হবে। আর এ কাজটি করতে হবে সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে।

এদিকে সরকার যদি গণভোটের মাধ্যমে প্রদত্ত জনরায় বাস্তবায়ন না করে তাহলে বিরোধী দল রাজপথে আন্দোলনে যেতে পারে। এমনটি আভাস পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন নিয়ে সৃষ্ট সংকটের সমাধান জাতীয় সংসদের ভেতরে হোক, এমনটা চায় বিরোধী দল। তবে সংসদের ভেতরে এর সমাধান না হলে রাজপথে নামবো।

এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেন, ‘বিএনপি একসময় গণভোটের পক্ষে প্রচার চালালেও এখন দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে সেটিকে অবজ্ঞা করার চেষ্টা করছে।’

নাহিদ বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানই বর্তমান সংস্কার প্রক্রিয়া, অন্তর্বর্তী সরকার এবং এই নির্বাচনের মূল ভিত্তি ও বৈধতা। সব বিষয় শুধু সংবিধানের ব্যাখ্যা দিয়ে বোঝানো সম্ভব নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন।