আসন্ন নির্বাচন ও জুলাই বিপ্লব পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার 'রিফর্ম বুক ২০২৬' (Reform Book 2026) প্রকাশ করেছে। সেই বই থেকে সংগৃহীত গুরুত্বপূর্ণ তথ্যগুলো নিচে উপস্থাপন করা হলো।

অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার অভিযাত্রার পরিসংখ্যান অর্জন (২০২৪-২০২৬)

১. বিপ্লব পরবর্তী উত্তরণ সরকার গঠন: ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের পর ৮ই আগস্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে । এই বিপ্লবে ৮০০-এরও বেশি মানুষ শহীদ এবং ১৪,০০০-এরও বেশি মানুষ আহত হয়েছেন ।

২. আইনি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ব্যাপ্তি:

সরকার গত ১৮ মাসে ব্যাপক সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে:

  • আইন প্রণয়ন: প্রায় ১৩০টি নতুন ও সংশোধিত আইন পাস করা হয়েছে।
  • নির্বাহী সিদ্ধান্ত: ৬০০-এরও বেশি নির্বাহী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে, যার ৮৪ শতাংশই ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে।
  • সংস্কার কমিশন: রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষে ১১টি স্বতন্ত্র সংস্কার কমিশন গঠন করা হয়েছে ।

৩. অর্থনৈতিক বৈশ্বিক সম্পর্ক উন্নয়ন:

  • জাপানের সাথে চুক্তি: জাপানের সাথে অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তির (EPA) মাধ্যমে ৭,৪০০টি বাংলাদেশি পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।
  • যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বাণিজ্য: দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে আমদানিকৃত পণ্যের শুল্ক ৩৭% থেকে ২০%-এ নামিয়ে আনা হয়েছে।
  • চীন ভারতের সাথে সম্পর্ক: চীনের সাথে ঋণের মেয়াদ বৃদ্ধি এবং ভারতের সাথে পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষা করা হয়েছে।

৪. দুর্নীতি প্রতিরোধ ব্যাংক খাত সংস্কার:

  • সম্পদ জব্দ: বিগত সরকারের সুবিধাভোগী শত শত রাজনীতিবিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে এবং কয়েক বিলিয়ন ডলারের সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
  • ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা: ৫টি দুর্দশাগ্রস্ত ব্যাংক (যেমন—ফার্স্ট সিকিউরিটি, গ্লোবাল ইসলামী ইত্যাদি) পুনর্গঠন করে ‘সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক’ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে ।
  • স্বচ্ছতা: ৪২টি মন্ত্রণালয়ে ই-প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং পরিসংখ্যান ব্যুরোকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন প্রদান করা হয়েছে ।

৫. বিচার বিভাগ গণমাধ্যমের স্বাধীনতা:

  • বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ: সব আদালতকে সুপ্রিম কোর্টের অধীনে এনে নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপ বন্ধ করা হয়েছে ।
  • গণমাধ্যমের স্বাধীনতা: সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং বন্ধ ঘোষিত মিডিয়া আউটলেটগুলো পুনরায় চালুর অনুমতি দেওয়া হয়েছে।

৬. আইন-শৃঙ্খলা মানবাধিকার:

  • শাস্তিমূলক ব্যবস্থা: শৃঙ্খলার খাতিরে প্রায় ১,২০০ পুলিশ কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
  • র‍্যাব পুনর্গঠন: র‍্যাব-এর নাম পরিবর্তন করে ‘স্পেশাল ইন্টারভেনশন ফোর্স’ করা হয়েছে এবং এর কার্যপ্রণালীতে আমূল পরিবর্তন আনা হয়েছে।
  • গুম বিরোধী সনদ: বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুম বিরোধী সনদে স্বাক্ষর করেছে ।

৭. সামাজিক সাংবিধানিক সুরক্ষা:

  • জুলাই চার্টার: সাত মাসের আলোচনার পর ‘জুলাই চার্টার’ চূড়ান্ত করা হয়েছে, যা সংবিধান সংস্কারের ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে এবং বর্তমানে গণভোটের অপেক্ষায় রয়েছে ।
  • স্মৃতি সংরক্ষণ: গণভবন চত্বরে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ প্রতিষ্ঠার কাজ চলমান রয়েছে ।

এই সংস্কারগুলো কেবল নথিপত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি ‘নতুন বাংলাদেশ’ গড়ার লক্ষ্যে নেওয়া বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ। রিফর্ম বুক অনুযায়ী, ১৬ বছরের ধ্বংসাবশেষ ১৮ মাসে সম্পূর্ণ মেরামত করা অসম্ভব হলেও, বাংলাদেশ আজ স্বৈরতন্ত্রের পথ ছেড়ে একটি গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের দিকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে যাচ্ছে।