অন্তবর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, বাক স্বাধীনতা সবার আছে, শুধু সরকারের বাক স্বাধীনতা নেই। বিচার বিভাগের সবকিছু উচ্চ আদালতের কাছে দেওয়া হয়েছে। ৫৪ বছরের ইতিহাসে এটি একটি অসাধারণ সংস্কার। মানবাধিকার আইন করেছি, যা দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ভালো। আমাদের লিগ্যাল এইডের মাধ্যমে আগের চেয়ে ১০ গুণ বেশি মানুষ কোনো সমস্যা ছাড়াই উপকৃত হচ্ছে।
শনিবার (১০ জানুয়ারি) সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস) “রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা” শীর্ষক একটি নীতি সংলাপ এর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। আলোচনাটি সিরডাপ (সেন্টার অন ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট ফর এশিয়া অ্যান্ড দ্য প্যাসিফিক) মিলনায়তন, ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়।
তিনি বলেন, ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টে ৯০% উন্নতি হয়েছে। ভারতীয় আধিপত্য থেকে বাংলাদেশ অনেকটাই মুক্তি পেয়েছে। ২০ হাজারেরও বেশি মানুষের মামলা নিষ্পত্তি করা হয়েছে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সাইবার বুলিং আমার বিরুদ্ধে হয়েছে জুলাই বিপ্লবের পর। সময় ছাড়া, সব কিছু সংস্কার করা সম্ভব নয়। জামিন করে বিচারক হওয়া, সমস্যা হচ্ছে বিচারকদের এবং প্রধান বিচারপতির। তাই এটি আইন উপদেষ্টার দোষ নয়। ভিউ ভালো এবং মনিটাইজেশন হচ্ছে, এই কারণে গুজব ছড়াচ্ছে, রাজনৈতিক এজেন্ডা রয়েছে। যখন কেউ কোনো সুবিধা চায়, দেওয়ার আগেই সমালোচনা করে দিচ্ছে। রাজনৈতিক দল, মিডিয়া, আপনারা কি নিজেদের সংস্কার করেছেন? আমাদের সৎ, বিবেকবান, পরমতসহিষ্ণু হতে হবে। আমাদের আত্মসমালোচনা করতে হবে। তাহলেই আমরা আমাদের দেশকে আগামী ৫-১০ বছরে অনেক এগিয়ে নিয়ে যেতে পারব।
আলোচনায় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী এবং মানবাধিকারকর্মীরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানে জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে রাজনৈতিক আলোচনায় মানবাধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতার প্রতিফলন কতটা রয়েছে, সে বিষয়ে আলোকপাত করা হয়।
অনুষ্ঠানে আলোচকদের মধ্যে ছিলেন অন্তবর্তীকালীন সরকারের আইন উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (বিএলএসএটি) এর নির্বাহী পরিচালক ব্যারিস্টার সারা হোসেন, সিনিয়র সাংবাদিক মোঃ মুকতাদির রশিদ রোমিও, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) এর সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এর অ্যাডভোকেট মো. গোলাম মোস্তফা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলনের এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দিদার ভূইয়া, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এর কেন্দ্রীয় প্রচার ও দাওয়াহ সম্পাদক শেখ ফজলুল করিম মারুফ, এবি পার্টি এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নাসরিন সুলতানা মিলি, সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ এর নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী, গণ অধিকার পরিষদ এর সিনিয়র ভাইস-প্রেসিডেন্ট ফারুক হাসান, সিনিয়র সাংবাদিক আবু সাঈদ খান, কাপেং ফাউন্ডেশন নির্বাহী পরিচালক পল্লব চাকমা, অ্যাডভোকেট ও বিএনপি নেতা ব্যারিস্টার শিহাব উদ্দিন খান, সেন্টার ফর গভর্নেন্স স্টাডিজ এর সভাপতি জিল্লুর রহমান, সিপিবি’র প্রেসিডিয়াম মেম্বার রাগিব আহসান মুন্না, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও রাজনীতিবিদ মোশাররফ আহমেদ ঠাকুর প্রমুখ।
ড. ইফতেখারুজ্জামান, নির্বাহী পরিচালক, ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) বলেন, মানবাধিকার আপেক্ষিক নয়, মানবাধিকার সর্বজনীন। রাজনৈতিক দলগুলোকে আয়নারের সামনে দাঁড়াতে হবে এবং তাদের নিজেদের প্রশ্ন করতে হবে—আমরা কি করছি? রাজনৈতিক দলগুলোকে ইশতেহারে আদিবাসীদের অধিকার থাকতে হবে। আমাদের দেশের মূলনীতি গুলো পরিচর্যা করতে পারে, তাহলেই দেশের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।গণভোটে হ্যাঁ বা না বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোকে স্পষ্টভাবে বলতে হবে।
ব্যারিস্টার সারা হোসেন বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারা সংশোধন হলেও কিন্তু তার প্রয়োগ ঠিকঠাক হচ্ছে না। আমাদের এটা খেয়াল রাখতে হবে প্রতিটি রাজনৈতিক দলের শুভাকাঙ্ক্ষীরা কি অবস্থানে আছে, তারা মত প্রকাশ মানবাধিকার পক্ষে দাঁড়াচ্ছে কি না। আপনারা ঐতিহ্য নিয়ে কথা বলুন। মানুষকে সচেতন হতে হবে। আমাদেরকে অন্তর্ভুক্তি হতে হবে।
অধ্যাপক ড. আবদুল লতিফ মাসুম বলেন, গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার একে অপরের সাথে গভীরভাবে যুক্ত। রাজনৈতিক দলগুলো যখন ক্ষমতায় আসে, তখন আইন-শৃঙ্খলা, বুরোক্রেসি এবং বিচার ব্যবস্থা তাদের নিজস্ব দলের পক্ষে কাজে লাগানোর জন্য যা করার, তা করা হয়। এই বিষয়গুলো উচিত নয়।
শেখ ফজলুল করিম মারুফ বলেন, অধিকার একটি আপেক্ষিক বিষয়। রাষ্ট্রের সবাইকে মতপ্রকাশ করতে দিতে হবে। মতপ্রকাশ করতে না দিলে ন্যায়বিচার হবে না। অন্যের মতকে আঘাত করা যাবে না। ২০২৪ সালের পর অনেক পরিবর্তন হয়েছে। মব এখন রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে। সরকার এখানে নরম।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ-এর সভাপতি জিল্লুর রহমান।