সরকারি চাকরিজীবীদের সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ। পেনশনভোগীর সংখ্যা ৯ লাখ। প্রায় ১০ বছর পর এসব সরকারি চাকরিজীবীেেদর বেতন ১০০ থেকে ১৪৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়াতে সুপারিশ করেছে জাতীয় বেতন কমিশন। প্রথম থেকে ২০তম গ্রেড, সবস্তরেই বাড়ছে বেতন। বাড়বে পেনশন ও বৈশাখী ভাতায় সুবিধা। এ জন্য বছরে সরকারের আরও ব্যয় হবে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এই ব্যয় নির্বাহ করা নিয়েই দুশ্চিন্তা। নেই অভ্যন্তরীণ আয়ে সুখবর । তাহলে কোন উৎস থেকে আসবে বাড়তি এ টাকা, সেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সূত্র বলছে, ১৯৭৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত মোট বেতন কমিশন হয়েছে ৮টি। এসব কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজস্ব আয় ও ব্যয়ের ভারসাম্য বজায় রাখতে পূর্ণাঙ্গ সুপারিশ বাস্তবায়ন করা যায়নি।
সূত্র জানায়, পে-স্কেল তথা সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির প্রস্তাবিত কাঠামো বাস্তবায়নের দায়িত্ব পড়বে নির্বাচিত সরকারের কাঁধে। এ চ্যালেঞ্জ হবে নতুন সরকারের জন্য ভয়াবহ কঠিন, হবে তাদের গলার কাঁটা! নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, বেতন-ভাতা ও পেনশন বাবদ বাড়তি ব্যয় ধরা হয়েছে বছরে ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা, যার মধ্যে বেতন-ভাতায় ৮০ হাজার কোটি ও পেনশনে ২৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। দেশের আর্থিক সক্ষমতায় এই বিশাল অঙ্কের টাকা জোগান দেওয়া সম্ভব কি না, তা নিয়ে তৈরি হয়েছে সংশয়।
সূত্র জানায়, নতুন বেতন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি থেকে আংশিক এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরের শুরু থেকে পুরোপুরি কার্যকর করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সর্বনি¤œ বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা, যা দ্বিগুণেরও বেশি বাড়ানোর সুপারিশ রয়েছে। সর্বোচ্চ ধাপে বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার টাকার বেশি করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সর্বোচ্চ ও সর্বনি¤œ বেতনের অনুপাত ১:৮ রাখার সুপারিশ রয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে বেতন ও ভাতা খাতে অতিরিক্ত ২২ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, যা আংশিক বাস্তবায়নের প্রস্তুতির অংশ বলে জানা গেছে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য প্রস্তাবিত নতুন বেতন ও ভাতা কাঠামো বাস্তবায়নে যে অতিরিক্ত ব্যয় হবে, তার দায় পরবর্তী সরকারকেই নিতে হবে বলে সচিবালয়ে সাংবাদিকদেও জানিয়েছেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, অর্থের সংস্থানের উপায় সরকারকেই বের করতে হবে এবং ভবিষ্যতের নির্বাচিত সরকার চাইলে এই বেতন কাঠামো বাস্তবায়ন নাও করতে পারে।
তিনি বলেন,পে স্কেল বাস্তবায়নে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন। এসব বিষয় পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার বাস্তবায়ন করবে। এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে বাস্তবায়ন পদ্ধতি ঠিক করা হবে।দেশের আর্থিক সামর্থ্য, মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বিবেচনায় রেখেই পে কমিশন সুপারিশ প্রণয়ন করেছে। প্রস্তাবিত কাঠামোতে নিচের দিকের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পাবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
অর্থ বিভাগের সাবেক সিনিয়র সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, আর্থিক সক্ষমতা অনুযায়ী বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ পুরোপুরি বা আংশিক বাস্তবায়ন হতে পারে। অতীতেও ধাপে ধাপে বেতন বাড়ানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরি বললেন, অন্তর্বর্তী সরকার তো একটা ভাতা দিয়েছিল। সেই ভাতাটাই তো থাকতে পারতো। আরও ভাতা দরকার হলে ১০ শতাংশ বাড়িয়ে দিতে পারতো। নির্বাচন যেহেতু হচ্ছে, নির্বাচিত সরকার এসে তারাই পে কমিশনটা করতে পারতো। এখন তো নির্বাচিত সরকার আসবেন, ফেব্রুয়ারি মাসে ক্ষমতাগ্রহণ করবেন। পহেলা জুলাই থেকে নতুন বেতনকাঠামো পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন করার ঘোষণা ইতোমধ্যে এই সরকার দিয়ে রেখেছে। তখন তো এর ব্যত্যয় ঘটালে বিশৃঙ্খলা পরিস্থিতি তৈরি হবে। বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রাজস্ব বিভাগের ওপরই নির্ভর করে সরকার। কিন্তু অভ্যন্তরীণ আয়ে তেমন গতি নেই। পূরণ হচ্ছে না রাজস্ব লক্ষ্য। তাহলে ব্যয় নির্বাহ হবে কীভাবে?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. নাসির উদ্দিন আহমেদ বলেন, ফেজিং আউট করতে হবে, কয়েক বছর ধরে অল্প অল্প করে বাস্তবায়ন করা সম্ভব। এই রাজস্ব আহরণ দিয়ে হবে না। রাজস্ব আহরণের গতি আরও বাড়াতে হবে। সে কারণে সংস্কারের কথা আসছে এনবিআরের এবং করনীতি ও করপ্রশাসন, এই দুইটাকে আলাদ করতে হবে কার্যকরভাবে। বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে চাকরিজীবীেেদর দক্ষতা ও যোগ্যতা নিরুপণ জরুরি। কিন্তু তা কী হচ্ছে?
সূত্র মতে, চলতি অর্থবছরের মোট বাজেট ৭ লাখ ৯২ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) বরাদ্দ ২ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। অবশিষ্ট সাড়ে ৪ লাখ কোটি টাকা সরকারের পরিচালন ব্যয়, যার মধ্যে রয়েছে বেতন-ভাতা, পূর্বের ঋণ ও সঞ্চয়পত্রের সুদ-কিস্তি। ফলে বেতন-ভাতা ও পেনশনই এখন সরকারের প্রধান ব্যয়।
সূত্র বলছে, নতুন বেতন কাঠামোর জন্য বাড়তি ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকার উৎস কী হতে পারে? উত্তর অনিশ্চিত হলেও সম্ভাব্য উপায় হচ্ছে দুটি-নতুন ঋণ নেওয়া অথবা ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধি করা। এছাড়া আরও দুটি বিপজ্জনক পথ থাকতে পারে-উন্নয়ন কর্মকান্ড স্থগিত করা কিংবা অতিরিক্ত টাকা ছাপানো। টাকা ছাপানো সহজ সমাধান মনে হলেও এতে ভয়াবহ মুদ্রাস্ফীতি সৃষ্টি হতে পারে, যা দেশের অর্থনীতিকে ভেনেজুয়েলা বা জিম্বাবুয়ের দিকে ঠেলে দিতে পারে। আভ্যন্তরীণ ঋণ করেও এই ব্যয় মেটানো সম্ভব নয়, কারণ ব্যাংকিং খাত ইতিমধ্যে সংকটে।
তাই শেষ ও একমাত্র বিকল্প হিসেবে ভ্যাট-ট্যাক্স বৃদ্ধির পথ বেছে নিতে হতে পারে, যার বোঝা সাধারণ মানুষের কাঁধে চাপবে। ১৫ লাখ সরকারি কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধি পেলে বাজারে টাকার জোগান বেড়ে যাবে, যা মুদ্রাস্ফীতি বাড়াবে। অথচ বেসরকারি চাকরিজীবী ও ব্যবসায়ীদের আয় একই থাকবে। ফলে তাদের ওপর দাম ও কর-দুই ধরনের চাপ তৈরি হবে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, কর্মচারীদের জীবনমান ও ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক। তবে একই সঙ্গে তাদের সেবার মান ও জবাবদিহিতাও নিশ্চিত হওয়া দরকার। এটি তো আর একবারে বাস্তবায়ন করা যাবে না, তাই কীভাবে এটি বাস্তবায়ন করা হবে তার একটি সময়সীমা সরকারকে দিতে হবে। পাশাপাশি রাজস্ব আহরণের সঙ্গেও যেহেতু সরকারি কর্মচারীরাই জড়িত থাকেন, তাই কীভাবে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি ফাঁকি রোধ করা যায় সেটির নিশ্চয়তাও দিতে হবে।