নজরুল গবেষক শফি চাকলাদার বলেছিলেন, আমরা যখন অধিকার আদায়ে রাস্তায় থাকি, আন্দোলনে থাকি কিংবা দীর্ঘদিন অধিকার থেকে বঞ্চিত থাকি, গর্জে উঠার সময় হয় তখন আমাদের কাছে কবি নজরুল প্রাসঙ্গিক। আর যখন আমরা এসব সমস্যাগুলো উৎরে যাই আমাদের বাসস্থান যখন গুলশান বনানীতে হয়ে যায়; তখন আর নজরুল আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক থাকে না। ভোগ বিলাসে থাকার জন্য অন্য কেউ প্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। আজ ২৫ মে, ১১ই জৈষ্ঠ সোমবার। বিদ্রোহী কবি, প্রেমের কবি, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। বাংলাদেশের জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী এবার বেশ জমকালো আয়োজনে পালন করছে সরকার। ময়মনসিংহের ত্রিশালে কবির জন্মজয়ন্তির অনুষ্ঠান উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কবির স্মৃতি বিজড়িত স্থানগুলোতে গুরুত্বের সাথে বিশেষ অনুষ্ঠান পালন করছে স্থানীয় প্রশাসন ও সাহিত্যপ্রেমীরা।
এমন এক সময় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবার্ষিকী আমাদের মাঝে এলো যখন, অধিকার আদায়ে মানুষকে মৌলিক অধিকার আদায়ে রাস্তায় আন্দোলন করতে হয়। অধিকার আদায়ের জন্য, ন্যায় বিচার পাওয়ার জন্য শক্তিশালী কারো আনুকল্য পাওয়া দরকার হয়। নয়তো বিচারের বাণি নিভৃতে কাঁদে। জুলাই আন্দোলনের স্পিডকে ধারণ না করে পেশি শক্তি ব্যবহার করে ক্ষমতায় টিকে যাওয়ার কৌশল অবলম্বন করা হয়।
সমসাময়িক কালে বিদ্রোহী কাজী নজরুল ইসলাম মানেই বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ভোরের উদয়। তিনি পরাধীন, পর্যুদস্ত, পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে আবির্ভাব হয়েছিলেন আলোকবর্তিকার মতো। তিনিই কবিতায় এনেছেন যুদ্ধের গর্জন, কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন রাষ্ট্রীয় ও আত্মিক স্বাধীনতার বজ্রনিনাদ। তিনি ছিলেন নারী অধিকার, মেহনতি মানুষের কল্যাণ আর অসাম্প্রদায়িক বিশ্বমানবতার এক অনন্য ফেরিওয়ালা। এই মহাকবি বাংলাদেশের আবহমান কালের সংস্কৃতির চিরযৌবনের প্রতীক হয়ে আমাদের হৃদয়ে জাগরুক হয়ে আছেন। বাংলা সাহিত্যের এক নতুন রুচির বিপ্লব। এজন্যই কবি নজরুলের জীবন এবং কর্ম বর্তমান সময়ে প্রাসঙ্গিক। বিপ্লব বিদ্রোহ কিংবা রণ-সঙ্গীত, ইসলামী তাহজীব তমদ্দুন কিংবা ইসলামী মূল্যবোধের গান, অথবা ভজন-কীর্তন কিংবা শ্যামা সংগীত, প্রেম প্রকৃতি কিংবা মানবিক মূল্যবোধ, কৈশোরের আনন্দ কিংবা যৌবনের উম্মাদনা, প্রতিটি ক্ষেত্রেই নজরুল আমাদের শুদ্ধ প্রকাশ।
জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকীতে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। পোস্টে তিনি বলেছেন, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের প্রাসঙ্গিকতা ও প্রয়োজন কখনো ফুরানোর নয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান লেখেন, বাংলাদেশের জনগণের পরম প্রিয়জন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকীতে তার চির-অম্লান স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। তাঁকে স্মরণ করছি অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে। কামনা করি তাঁর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত।
তিনি বলেন, আমাদের জাতীয় ইতিহাসের অবিস্মরণীয় নাম কাজী নজরুল ইসলাম। পরাধীন, পর্যুদস্ত, পরাভূত জাতির ভাগ্যাকাশে তাঁর আবির্ভাব ছিল আলোকবর্তিকার মতো। দিকনির্দেশক বাতিঘরের মতো। মুমূর্ষু জাতিকে জাগিয়ে দিয়ে সামগ্রিকভাবে সচেতন করার জন্য, স্বয়ংসম্পূর্ণ করার জন্য যে সর্বপ্লাবী প্রতিভার তখন দরকার হয়ে পড়েছিল, জাতীয় কবি ছিলেন সেই প্রার্থিত ও বহুল কাক্সিক্ষত প্রতিভা। তিনি আরও বলেন, কাজী নজরুল ইসলামের পুরো জীবনটাই যেন ছিল এক যুদ্ধ ঘোষণা। একটা অনন্যসাধারণ বিদ্রোহ। এই বিদ্রোহ ঔপনিবেশিক শাসন, পরাধীনতা, জুলুম, নির্যাতন, শোষণ, অসাম্য, বৈষম্য, কুসংস্কার, ধর্মীয় গোঁড়ামি, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে; তথা সকল অন্যায়, অবিচার ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে। মানুষ, মানবতা, স্বাধীনতা, শোষণমুক্ত সমাজ ও নারীমুক্তির জন্য তাঁর চেয়ে বেশি শিল্পসফল শব্দ আর কেউ রচনা করেননি। তিনিই আমাদের প্রথম কবি, সাংবাদিক, রাজনীতিক যিনি ঔপনিবেশিক পরাধীনতার বিরুদ্ধে উপমহাদেশের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র- নির্বিশেষে মানুষের প্রতি তাঁর যে দরদ ও দীপ্ত অঙ্গীকার তা তুলনাহীন।
এদিকে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম-এর ১২৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে কুমিল্লায় শুরু হয়েছে চারদিনব্যাপী বর্ণাঢ্য আয়োজন। জেলা প্রশাসন ও সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সহযোগিতায় আয়োজিত এসব কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী এবং সংস্কৃতিপ্রেমীরা। শনিবার বিকেলে কবি নজরুল ইনস্টিটিউট কেন্দ্র কুমিল্লা থেকে একটি বর্ণাঢ্য র্যালি বের করা হয়। র্যালিটি নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে গিয়ে শেষ হয়। পরে সেখানে ‘চেতনায় নজরুল’ শীর্ষক কবির মুরালে পুষ্পস্তবক অর্পণ করা হয়। কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে ২২ মে শুক্রবার কবি নজরুল ইনস্টিটিউট কেন্দ্র কুমিল্লায় শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে নজরুল সংগীত, আবৃত্তি, রচনা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। বিভিন্নস্থানে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আবৃত্তি ও রচনা প্রতিযোগিতাসহ নানা কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে অনুষ্ঠিত হবে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক পরিবেশনা। পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও আবৃত্তি, রচনা প্রতিযোগিতা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।