নির্বাচনে বড় রকমের অনিয়ম হয়েছে অভিযোগ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এসব অনিয়মের যথাসময়ে প্রতিকার চাই। নয়তো এজন্য নির্বাচন কমিশন এর জন্য দায়ী থাকবে। এসময় তিনি নাসির উদ্দিন পাটোয়ারি এবং আল্লামা মামুনুল হকের আসনসহ বিভিন্ন স্থানে আইনের ব্যত্যয়ের বিষয়টি সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন।
শুক্রবার দলের নির্বাহী কমিটির বৈঠক শেষে ১১ দলের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন জামায়াতের আমীর। এসময় জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হকসহ ১১ দলের শীর্ষ নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল ও নির্বাচন পরবর্তী অবস্থা পর্যালোচনা সহ ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন উপস্থিত জাতীয় নেতৃবৃন্দ।
এছাড়াও বৈঠকে নির্বাচনে আপত্তির বিষয়গুলোর মধ্যে, ভোট কারচুপি, নির্বাচনী এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশে বাধা ও বের করে দেয়াসহ বিভিন্ন অনিয়ম নিয়ে আলোচনা হয়। সারা দেশে ১১ দলীয় নেতাকর্মী ও ভোটারদের ওপর হামলা ও বাড়িতে আগুন দেয়ার মতো ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমের বিষয়ে আলোচনা ও নিন্দা জানানো হয় এবং এসব বন্ধের দাবি জানানো হয়। আর তা না হলে কঠোর সিদ্ধান্ত নেয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হন নেতারা।
বিভিন্ন জায়গায় রেজাল্ট শিটে ঘষামাজা করা, কারচুপি করে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের বিজয়ী করা, কিছু আসনে দ্বৈত নীতি গ্রহণ, সেন্টার দখল, ঢাকা-১৩, খুলনা-৫ আসনসহ যেসব স্থানে অন্যায় করা হয়েছে সেসব আসনে প্রতিকার চাওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে বৈঠকে। সুনির্দিষ্ট সময়ে প্রতিকার না পেলে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়া হবে। দেশে শান্তিশৃঙ্খলা ও ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশর পক্ষে থাকবে ১১ দলীয় ঐক্য। ফ্যাসিবাদের বিষয়ে আপসহীন থাকবে ১১ দলীয় ঐক্য।
বৈঠকে আরও আলোচনা হয় যে, দেশে পুরানো ধারার কালো অধ্যায়ের রাজনীতি আর নয় নতুন ধারার সুস্থ রাজনীতির পক্ষে থাকবে ১১ দলীয় জোট। নির্বাচনের আগের প্রতিশ্রুতি অব্যাহত থাকবে। নারীদের অধিকার ও নিরাপত্তার জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়া হবে এবং কোনো ছাড় দেয়া হবে না। কোনো দল নয় আপামর জনগণের পক্ষে অবস্থান নেয়া হবে। সকল অপকর্ম দ্রুতই বন্ধের দাবিসহ তীব্র নিন্দা জানানো হয়। একই সঙ্গে এসবের প্রতিকার দাবি করা হয়।
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের আরপিওতে যেটির সুযোগ নেই এমন ঋণখেলাপি অবস্থায় নির্বাচিত ঘোষণা করা প্রার্থীদের ফলাফল স্থগিত রাখার দাবি জানানো হয় নির্বাচন কমিশনের প্রতি। আরপিওর লঙ্ঘন ১১ দলীয় ঐক্য মানবে না। গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে যে রায় এসেছে তা বাস্তবায়ন করতে হবে।
এতে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও নব-নির্বাচিত এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, নব-নির্বাচিত এমপি ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের, সাবেক এমপি মাওলানা আ.ন.ম শামসুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ, মাওলানা আবদুল হালিম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও নব-নির্বাচিত এমপি নাহিদ ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হক, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহ-সভাপতি জনাব রাশেদ প্রধান, জাতীয় নাগরিক পার্টির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান জনাব আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা ইউসুফ আশরাফ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াযী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আবদুল মাজেদ আতহারী, খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব অধ্যাপক আব্দুল জলিল, আমার বাংলাদেশ পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আলতাফ হোসাইন, জাতীয় নাগরিক পার্টির জাতীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব মুনিরা শারমীন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব মাওলানা তোফাজ্জল হোসাইন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার, বাংলাদেশ লেবার পার্টির মহাসচিব মিরাজুল ইসলাম ও খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব ড. মোস্তাফিজুর রহমান ফয়সাল।
বৈঠক শেষে আমীরে জামায়াত ১১ দলীয় ঐক্যের নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে ব্রিফ করেন।
জামায়াতের আমীর বলেন, আমরা সবাই প্রিয় বাংলাদেশের নাগরিক। দীর্ঘদিন নির্বাচনের অধিকার থেকে বঞ্চিত জনগন। বৃহস্পতিবার স্বাচ্ছেন্দে ভোট দিতে চেয়েছিলেন। আমরা বলেছিলাম আমরা সুস্থধারার রাজনীতির পক্ষে এবং আমরা চাচ্ছি ইতিবাচক ধারার রাজনীতি করবো। আমরা এও বলেছিলাম আমাদের বেশ কিছু পর্যক্ষেণ আছে।
তিনি বলেন, নির্বাচন মানে হার জিতের ব্যাপার থাকবে। সেটা যদি স্বাভাবিকভাবে হয় তাহলে কারো আপত্তি থাকে না সবাই সাধারণভাবে মেনে নেয়। কিন্তু যদি সেখানে বড় রকমের অনিয়ম হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন তৈরি করে। আমরা আমাদের পক্ষ থেকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশের পরও আপনারা লক্ষ্য করেছেন, আজকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ১১ দলের কর্মী এজেন্ট ভোটারদের বাড়িতে বাড়িতে হামলা হচ্ছে। আগুণ ধরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। এটাতো ফ্যাসিবাদী তৎপরতা। যে ফ্যাসিবাদের ধ্বংসস্তুপের ওপর দাড়িয়ে আমরা। এটা জাতির জন্য দুর্ভাগ্যের। এর সম্পূর্ণ দায় তাদের নিতে হবে। যারা এর সাথে জড়িত। আমরা চাইলেও যদি তারা ইতিবাচক রাজনীতি না চান তাহলে আমরা ইতিবাচক রাজনীতি করবো না। এবারের নির্বাচনে আমাদের যথেষ্ট অবজারবেশন এবং আপত্তি আছে। দেশের শান্তি রক্ষা হবে তাদের দায়িত্ব হবে যারা সরকার গঠন করবে। কিন্তু এগুলো কিসের আলামত ? এখন এগুলো বন্ধ করতে হবে। তা না হলে আমরা বাধ্য হবে যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে। আমরা নিরীহ দেশবাসী যে কোন পরিবর্তনের পক্ষে ভোট হ্যা বলেছেন। ভোট দিয়েছেন, সহযোগিতা সমর্থন দিয়েছেন তাদের সাথে আমরা ছিলাম। আজ থেকে আরও শক্তভাবে আমরা আপনাদের সাথে আছি।
তিনি উল্লেখ করেন বেশ কিছু জায়গায় হঠাৎ করে ফলাফল বন্ধ। কষ্ট করে তাকে ছাড় দিয়ে তাকে ছাড় দিয়ে নির্বাচিত ঘোষণা দেওয়া হয়েছে এটা অবাস্তব। আমাদের কাছে ডকুমেন্ট আছে। রেজাল্ট সিটে ঘষামাজা করা হয়েছে। কিছু কিছু আসনে দ্বৈত নীতি অবলম্বন করা হয়েছে। নাসির উদ্দিন পাটোয়ারির আসনে সেন্টার দখল করে একজন নেতার আপনজনের নেতৃত্বে যা হয়েছে তার সাক্ষী বিশ্ববাসী। এবং দেশবাসী। আমরা জেনেছি মিডিয়ার কারণে। বাংলাদেশ খেলাফত মজসিলেসের আমীর আল্লামা মামুনুল হকের আসনে। নাসির উদ্দিন পাটোয়ারির আসনে যে কারণে অন্য একজনের ব্যালট গ্রহণ করা হয়েছে একই কারণে মামুনুল হকের পক্ষে সেটা গ্রহণ করা হয়নি।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, একদেশে কি দুই আইন চলবে ? নির্বাচন কমিশন কি একে একেক জায়গাতে একেক আইনের প্রয়োগ করবে ? একই বিষয়ে ? বিশাল প্রশ্নের ব্যাপার। আমাদের সেক্রেটারি জেনারেলসহ বেশ কিছু আসনে এরকম ব্যাপার আছে। তাদের প্রতি অন্যায় আচরণ করা হয়েছে। তাদের অধিকার জোর করে কেড়ে নেওয়া হয়েছে। আমাদের সিদ্ধান্ত ুতারা প্রতিকার চাইবেন। সুনির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যদি আমরা প্রতিকার পাই তাহলে এক কথা। যদি না পাই তাহলে বাধ্য হবো আমাদের পথ ধরতে। আমরা আশা করবো নির্বাচন কমিশরেন শুভ বুদ্ধির উদয় হবে এবং তারা ন্যায় ইনসাফ করবেন। না করলে দায় তাদের নিতে হবে। আমরা এখনো বলবো- আমরা দেশকে ভালবাসি। দেশের ঐক্য চাই। আমাদের স্লোগান ছিল ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। ঐক্যবদ্ধ থাকতে হলে পরস্পরকে ভালবাসতে হবে। এখানে কেউ রাজা নয় বাকীরা প্রজা নয়। এখানে কেউ মালিক নন বাকীরা অধিনস্ত নয়। এখানে সবাই একই সংবিধানে সমান অধিকার তারা ভোগ করবেন। অতীতে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই হয়েছে। আমরা আশা করেছিলাম-- যে কালো অধ্যায়ের অবসান হউক। যদি কালো অধ্যায় ফিরে আসে তাহলে আমরা লড়ে যাবো। ছাড় দিবো না। ফ্যাসিবাদে গণতন্ত্রের বিকাশ ঘটে না।
তিনি বলেন, সারা বিশ্ব থেকে পর্যবেক্ষকরা এসেছেন। তারা ঘুরেছেন দেখেছেন। আমরা চাই দেশে পুরানা ধারার সেই রাজনীতি ফিরে না আসুক।
কালো অধ্যায়ের রাজনীতি আর না হউক। নতুন ধারার সুস্থ রাজনীতি চালু হউক। এখানে নতুন ধারারা রাজনীতি চালু করতে হবে। দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে।

নাহিদ ইসলাম বলেন, এখন যে প্ল্যানের কথা আমরা শুনেছি, সেই প্ল্যানের একটি বাস্তবায়ন বা স্বরূপ আমরা এই নির্বাচনে দেখতে পাচ্ছি। এই ধরনের ফলাফল কারচুপি করে যারা পুরনো আমলে আওয়ামী লীগ যেভাবে নির্বাচন করেছে, সেই ধরনের প্রচেষ্টা আমরা যাদের ভেতরে দেখতে পাচ্ছি তারা কিভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করবে?
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের পরদিনই প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর হামলা, সারাদেশে বাড়িঘরে হামলা ও আগুন লাগানোর ঘটনা ঘটেছে। তাদের কাছে কি এই দেশের দায়িত্ব দেওয়া যায়? আমরা দল হিসেবে ঐক্যবদ্ধ হয়েছি। জামায়াত আমীর বলেছেন স্পষ্টভাবে, রাজপথে নামার প্রয়োজন হলে আমরা সেই প্রস্তুতি নিচ্ছি। কারণ এই দেশের মানুষ, যারা ১১ দলের পক্ষে নির্বাচনে কাজ করেছে নেতাকর্মী ও সমর্থক তাদের হেফাজত করা, তাদের রক্ষা করার দায়িত্ব আমাদের।
এনসিপি নেতা বলেন, আমরা জনগণকে অভিবাদন জানাই, যে জনগণ এত প্রতিকূলতার মধ্যেও ১১ দলের পক্ষে ভোট দিয়েছে। নির্বাচনে সুস্পষ্টভাবে দুটি পক্ষ ছিল একটি সংস্কারের পক্ষ, পরিবর্তনের পক্ষ; যারা সংস্কার চায়, গণতন্ত্র চায়, চাঁদাবাজি বন্ধ চায়, সরকারব্যবস্থাকে গঠনমূলকভাবে পুনর্গঠন চায়। আরেকটি পক্ষ, যারা পুরনো বন্দোবস্তে জাতীয় সরকার করতে চায়, পূর্বের সংবিধানকেই চেয়েছে। একই জনগণ ভোট দিয়েছে, কিন্তু ভোট কারচুপি করা হয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, শেষ মুহূর্তে দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও প্রার্থীকে হারিয়ে দিয়ে ক্ষমতা নিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। আমরা নির্বাচন কমিশনে সুস্পষ্টভাবে এই অভিযোগ জানাব। প্রার্থীরা জানাবেন। নির্বাচন কমিশন সেখানে কী ভূমিকা পালন করছে, তাদের অবস্থান কী— তার ওপর নির্ভর করবে আমাদের নির্বাচনের বিষয়ে চূড়ান্ত অবস্থান।
নিজের আসনেও ভোট কারচুপি হয়েছে জানিয়ে বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিসের আমীর আল্লামা মামুনুল হক, জুলাই চেতনাকে অবমাননা কোনোভাবেই মেনে নেব না, কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া হবে না।