বড় ধরনের কোনো অঘটন ছাড়াই উৎসবমুখর ও মোটামুটি শান্তিপূর্ণ পরিবেশে শেষ হয়েছে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্ববহ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্যে আয়োজিত গণভোট। আজ বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) সকাল সাড়ে ৭টা থেকে শুরু হয়ে বিরতিহীনভাবে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত ভোটগ্রহণ চলে। এখন দেশজুড়ে চলছে বহুল প্রতীক্ষিত ফলাফল ঘোষণার প্রস্তুতি।

সারাদেশের ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২৯৯টিতে আজ ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হয়। ৪২ হাজার ৯৫৮টি ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের সরব উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর আকস্মিক ইন্তেকালের কারণে শেরপুর-৩ আসনের নির্বাচন স্থগিত ঘোষণা করেছে কমিশন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই নির্বাচনকে বাংলাদেশের গণতন্ত্রে উত্তরণের প্রথম ও প্রধান ধাপ হিসেবে অভিহিত করছেন। দীর্ঘ দেড় যুগ পর দেশের মানুষ কোনো প্রকার ভয়ভীতি ছাড়াই স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করার সুযোগ পেলেন। আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশের যোগ্য কাণ্ডারি বেছে নিতে আজ ব্যালটের মাধ্যমে নিজেদের রায় দিয়েছেন ভোটাররা। সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি আজ অনুষ্ঠিত হয়েছে রাষ্ট্রীয় সংস্কার সংক্রান্ত ‘জুলাই সনদ’ বা সংবিধান সংস্কারের ওপর জাতীয় গণভোট। জাতির ভবিষ্যৎ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ভোটাররা ‘হ্যাঁ’ কিংবা ‘না’ বাক্সে তাদের মূল্যবান রায় প্রদান করেছেন।

এবারের নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপিসহ মোট ৫১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করেছে। মূলত এই দুই দলই প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী শাসন, গুম ও জুলাই গণহত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকায় দলটি এবারের নির্বাচনে সম্পূর্ণ অনুপস্থিত ছিল।

১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচনকে ঘিরে সারাদেশে এক ধরনের ‘ঈদের আমেজ’ পরিলক্ষিত হয়েছে। সরকার ও নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ১১ ও ১২ ফেব্রুয়ারি সাধারণ ছুটি ঘোষণা করায় সাপ্তাহিক ছুটির সাথে মিলিয়ে চারদিনের দীর্ঘ অবসর পান ভোটাররা। ফলে রাজধানীর বাস টার্মিনাল, লঞ্চঘাট ও রেলস্টেশনগুলোতে গ্রামে গিয়ে ভোট দেওয়ার জন্য মানুষের উপচে পড়া ভিড় দেখা গেছে। বিশেষ করে প্রায় ৪ কোটি তরুণ ভোটার, যারা দীর্ঘ ১৫ বছরে প্রথমবার ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছেন, তাদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করা গেছে।

নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ রাখতে নির্বাচন কমিশন নজিরবিহীন নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এক লাখ সেনাসদস্যসহ মোট ৯ লাখ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল। এছাড়া ডিজিটাল প্রচারণার পাশাপাশি প্রযুক্তির ব্যবহারে বিশেষ নজর দেওয়া হয়েছে। প্রায় এক হাজার ড্রোন এবং ২৫ হাজার ৭০০ ‘বডি ওর্ন ক্যামেরা’র মাধ্যমে ভোটকেন্দ্রগুলোতে কড়া নজরদারি করা হয়েছে। নির্বাচনি প্রচারণায় ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের মতো সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহার ছিল চোখে পড়ার মতো।

এবারের নির্বাচনে ভোটাররা দুটি ভিন্ন রঙের ব্যালট পেপার ব্যবহার করেছেন; সংসদ নির্বাচনের জন্য সাদা এবং গণভোটের জন্য গোলাপি ব্যালট। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এবার মোট ভোটার ১২ কোটি ৭৭ লাখ ১১ হাজার ৮৯৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৬ কোটি ৪৮ লাখ ২৫ হাজার ১৫১ জন এবং নারী ভোটার ৬ কোটি ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৫২৪ জন। এছাড়া হিজড়া ভোটার হিসেবে তালিকায় নাম লিখিয়েছেন ১ হাজার ১২০ জন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত তিনটি বিতর্কিত ও প্রহসনের নির্বাচনের পর আজকের এই অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি ‘ঐতিহাসিক মোড়’ হিসেবে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।