# মোট ব্যয় : ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা

# ঘাটতি ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা

মিয়া হোসেন

বিশাল ঘাটতি রেখেই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট। আজ বুধবার থেকে এ বাজেট কার্যকর হবে। নির্দিষ্টকরণ আইন ২০২৬ পাসের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগসমূহের অনুকূলে বরাদ্দ দিয়ে মঞ্জুরী দাবি পাস করা হয়। তিন সপ্তাহের আলোচনা, সমালোচনা ও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর পর কণ্ঠভোটে গতকাল মঙ্গলবার বাজেটটি পাস হয়।

গত ১১ জুন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপন করেন। এরপর সংসদ সদস্যরা টানা তিন সপ্তাহ বাজেটের ওপর আলোচনা করেন। বিরোধী দলের সদস্যরা করনীতি, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য, সামাজিক নিরাপত্তা ও বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ নিয়ে সমালোচনা করেন। যৌক্তিক আলোচনার পর গত সোমবার অর্থবিলে মোট ৬৮টি সংশোধনী আনা হয়েছে। এতে করে কালো টাকা সাদা করার বিধান প্রত্যাহার, করমুক্ত আয়সীমা বৃদ্ধিসহ গুরুত্বপূর্ণ বেশকিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। বাজেটে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের অনুকূলে ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতের বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সদস্যরা ১৩৪২টি ছাঁটাই প্রস্তাব প্রদান করেন। তার মধ্যে কিছু সংখ্যক ছাঁটাই প্রস্তাব আলোচনা করে তা না মঞ্জুর করা হয়। পরে সময় বাচাঁনোর জন্য বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ছাঁটাই প্রস্তুাবগুলো প্রত্যাহার করে নিলে মঞ্জুরিগুলো দ্রুত পাস করা হয়।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কন্ঠভোটে মঞ্জুরী দাবি ও নির্দিষ্টকরণ বিল পাস হয়। নিদিষ্টকরণ বিলে ২০২৬-২৭ অর্থ বছরের জন্য ব্যয় নির্বাহে রাষ্ট্রপতিকে ১৫ লাখ ১৫ হাজার ৪৩৯ কোটি ৮ লাখ ৩৮ হাজার টাকার অনধিক পরিমাণ অর্থ সংযুক্ত তহবিল হইতে বরাদ্দ দেয়া হয়। তার মধ্যে সংসদে কণ্ঠভোটে গৃহিত হয় ৮ লাখ ৩০ হাজার ৪১৪ কোটি ১ লাখ ৩৮ হাজার টাকা, বাকী ৬ লাখ ৮৫ হাজার ২৫ কোটি ৭ লাখ টাকা সংযুক্ত তহবিলের উপর দায় হিসেবে রাখা হয়েছে। নির্দিষ্টকরণ বিল উত্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। অন্যান্য মঞ্জুরী দাবিগুলো উত্থাপন করেন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীরা। আর বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা ছাঁটাই প্রস্তাবের উপর আলোচনা করেন।

বাজেটের আকার

২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে। গত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেটের আকার ছিল ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা। এই হিসাবে এবার বাজেটে যোগ হচ্ছে ১ লাখ ৪৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় যা ১৮ দশমিক ৭৩ শতাংশ বেশি, ইতিহাসের রেকর্ড বৃদ্ধি। এর মধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) ৩ লাখ ৯ হাজার কোটি টাকা। বাজেটে রাজস্ব খাত থেকে মোট ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা আয় ধরা হয়েছে। এর মধ্যে এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর থেকে ২৫ হাজার কোটি টাকা, এনটিআর খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা আয়ের লক্ষ্য ঠিক করা হয়েছে।

বাজেটে ঘাটতি রয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি অর্থায়নে সরকারকে বরাবরের মতো আগামীতেও বৈদেশিক ঋণ ও অভ্যন্তরীণ খাতের ওপর নির্ভর করতে হবে। বাজেট ঘাটতি জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এখানে বিদেশি উৎস থেকে ৪৬ শতাংশ অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হয়েছে; যা জিডিপির ১ দশমিক ৭ শতাংশ। বাজেট ঘাটতির ৫৪ শতাংশ অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।

৫৯টি দাবি মঞ্জুরির বিপরীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং স্বতন্ত্র সদস্যসহ মোট ৪৩ জন সংসদ সদস্য ৩৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ওপর ছাঁটাই প্রস্তাব উত্থাপন করে আলোচনায় অংশ নেন।

ছাঁটাই প্রস্তাবের আওতায় থাকা ৩৬টি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন সচিবালয়, অর্থ বিভাগ, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ, পরিকল্পনা বিভাগ, আইএমইডি, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয়, কৃষি মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, ভূমি মন্ত্রণালয়, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, রেলপথ মন্ত্রণালয়, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন।

বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের অনুরোধে স্পিকার গিলোটিন পদ্ধতি প্রয়োগ করে অবশিষ্ট মঞ্জুরি দাবিগুলো বিস্তারিত আলোচনা ছাড়াই একযোগে কণ্ঠভোটে অনুমোদনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।

নির্দিষ্টকরণ বিল পাসের সময় বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র সদস্যরা সংসদে উপস্থিত ছিলেন এবং বিলটি গৃহীত হওয়ার বিষয়ে কোনো আপত্তি জানাননি।

সময় বাঁচাতে সংসদে সব ছাঁটাই প্রস্তাব প্রত্যাহার করল বিরোধী দল

জাতীয় সংসদে বাজেটের দাবির ওপর দেওয়া সব ছাঁটাই প্রস্তাব প্রত্যাহার করে নিয়েছে বিরোধী দল। প্রস্তাবগুলো গৃহীত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা না থাকায় এবং সংসদের মূল্যবান সময় বাঁচাতেই এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান।

গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনার সময় এ কথা বলেন বিরোধীদলীয় নেতা। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম।

অধিবেশন চলাকালে স্পিকারের অনুমতি নিয়ে দাঁড়িয়ে ছাঁটাই প্রস্তাবের ওপর আলোচনা প্রত্যাহারের এই প্রস্তাব দেন বিরোধীদলীয় নেতা। পরে তার এই প্রস্তাব সংসদে মঞ্জুর হয়।

প্রস্তাব প্রত্যাহারের কারণ তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন ছাঁটাই প্রস্তাব দেওয়া হলেও সেগুলো গ্রহণের কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। তাই সংসদের মূল্যবান সময় বাঁচাতে তারা সব ছাঁটাই প্রস্তাব একসঙ্গে প্রত্যাহার করে নিতে প্রস্তুত।

স্পিকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে তিনি বলেন, আমরা বিরোধী দলের পক্ষ থেকে মূলত প্রস্তাবগুলো দিয়েছি। কিন্তু কোনোটিই গৃহীত হতে দেখিনি। রেওয়াজের প্রতি সম্মান রেখেই বলছি, যেহেতু এই আলোচনা ও প্রস্তাব গ্রহণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই, সেহেতু মূল্যবান সময় বাঁচানোর সুযোগ থাকলে আমরা আমাদের দেওয়া সব ছাঁটাই প্রস্তাব প্যাকেজ আকারে প্রত্যাহার করে নিতে চাই। এতে সরকারি দলের কাজও সহজ হবে।

বিরোধীদলীয় নেতার এই বক্তব্যের জবাবে স্পিকার বলেন, ট্রেজারি বেঞ্চ এরই মধ্যে বিষয়টি গ্রহণ করেছে।

পরবর্তী কার্যক্রম সম্পর্কে স্পিকার জানান, এখন থেকে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রীরা শুধু নিজ নিজ মন্ত্রণালয়ের দাবি উত্থাপন করবেন এবং এরপর ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো সরাসরি ভোটে দেওয়া হবে।

মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলোর জন্য বরাদ্দগুলো হলো: রাষ্ট্রপতির কার্যালয়: ৩৪ কোটি ৪৮ লাখ টাকা, জাতীয় সংসদ: ২৯০ কোটি ৬০ লাখ টাকা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়: ৩,৮৪৫ কোটি ৬৭ লাখ টাকা, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ: ১০৫ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট: ২৯১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়: ৪,৪০০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়: ৫,০৬৬ কোটি ৬৯ লাখ টাকা, বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন: ১৩৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা, অর্থ বিভাগ: ৮,৩০,৫৫১ কোটি ৯৫ লাখ ৭৪ হাজার টাকা, বাংলাদেশের মহা হিসাব-নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়: ৩৭৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা, অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগ: ৪,৬৫৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ: ৩,৫৬৬ কোটি ২৩ লাখ টাকা, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ: ৬৯,২৪৮ কোটি ৯০ লাখ ৬২ হাজার টাকা, পরিকল্পনা বিভাগ: ৩৬,২৫১ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ: ২৩১ কোটি টাকা, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ: ৬৭২ কোটি ১৫ লাখ টাকা, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়: ৩২৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: ১,৮৪৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়: ৪২,৪৯৭ কোটি ৪৫ লাখ ৩৯ হাজার টাকা, সশস্ত্রবাহিনী বিভাগ: ৪৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা, আইন ও বিচার বিভাগ: ২,১৮৭ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়: ৩১,০৯৮ কোটি ৮৮ লাখ ১৫ হাজার টাকা, লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ: ৪৯ কোটি ৪২ লাখ টাকা, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়: ৪৬,৭৩৭ কোটি ৯২ লাখ টাকা, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ: ৫৭,৩০১ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়: ১৮,১১৫ কোটি ৩ লাখ টাকা, স্বাস্থ্য সেবা বিভাগ: ৪৯,৩৮৬ কোটি ৮৯ লাখ টাকা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ: ২,০৪৯ কোটি ২ লাখ টাকা, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়: ৩০,৪৪২ কোটি ৬৬ লাখ টাকা, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় ৫,১৯৬ কোটি ১৩ লাখ ৫৭ হাজার টাকা, শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: ৪৬৬ কোটি ৮৪ লাখ টাকা, গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়: ৫,০৭৮ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়: ১,১৮৯ কোটি ৫৯ লাখ টাকা, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়: ৮২৫ কোটি ৭৫ লাখ টাকা, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়: ২,৯৫৫ কোটি ৪২ লাখ টাকা, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়: ২,৫৮৬ কোটি ৬ লাখ টাকা, স্থানীয় সরকার বিভাগ: ৪০,২৪৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগ: ১,১০৫ কোটি ৬৪ লাখ টাকা, শিল্প মন্ত্রণালয়: ১,৬৯১ কোটি ৯০ লাখ টাকা, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়: ৮৭৯ কোটি ৯২ লাখ টাকা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়: ৫১১ কোটি ৯৮ লাখ টাকা, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ: ২,৩৮৯ কোটি ২ লাখ টাকা, কৃষি মন্ত্রণালয়: ২৮,৮৮১ কোটি ৩৯ লাখ টাকা, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়: ২,৭২৭ কোটি ৫১ লাখ ৭১ হাজার টাকা, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়: ২,২৪০ কোটি ১২ লাখ টাকা, ভূমি মন্ত্রণালয়: ২,৪৩৯ কোটি ৪৬ লাখ ৮৩ হাজার টাকা, পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়: ১০,৫৩২ কোটি ৮০ লাখ টাকা, খাদ্য মন্ত্রণালয়: ৩২,৪১৪ কোটি ৫৮ লাখ ৪৮ হাজার টাকা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়: ১০,৩৪৯ কোটি ৫৮ লাখ ৭ হাজার টাকা, পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ: ৩৬,৯১৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা, রেলপথ মন্ত্রণালয়: ৯৯৪০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা, নৌ পরিবহন ৯,০৮০ কোটি ৩৮ লাখ টাকা, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়: ১,৮৮৪ কোটি ১১ লাখ টাকা, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ: ২,১৪১ কোটি ২২ লাখ টাকা, পার্বত্য চট্টগ্রাম বিষয়ক মন্ত্রণালয়: ১,৪৫৭ কোটি ৮২ হাজার টাকা, বিদ্যুৎ বিভাগ: ১৪,৯৯৬ কোটি ২ লাখ টাকা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়: ৭,৫১৫ কোটি ৪৬ লাখ টাকা, দুর্নীতি দমন কমিশন: ১৯৬ কোটি ৫৮ লাখ টাকা, সেতু বিভাগ: ২,৯০৮ কোটি ৪৩ লাখ টাকা, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা বিভাগ: ১৮,৪৫৭ কোটি টাকা, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ বিভাগ: ১৩,৪৬৫ কোটি ৮৩ লাখ টাকা।

সংশোধনীতে যা যা আছে

প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা তারেক রহমানের প্রস্তাবে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে চার লাখ করা হয়েছে। পাশাপাশি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি মেডিকেল কলেজ, বেসরকারি ডেন্টাল কলেজ, বেসরকারি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং শুধু তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে শিক্ষাদানে নিয়োজিত বেসরকারি কলেজের আয়ের ওপর করহার ৫ শতাংশ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কর ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৫ শতাংশ করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। সংশোধনী তালিকায় সেই প্রস্তাব যুক্ত হয়।

কোম্পানি করহার

কোম্পানি করহারের কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। যেসব পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানির পরিশোধিত মূলধনের অন্তত ১০ শতাংশ শেয়ার আইপিও, ডাইরেক্ট লিস্টিং, রাইট ইস্যু বা আরপিওর মাধ্যমে হস্তান্তরিত হয়েছে, তাদের করহার ২২ দশমিক ৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। তবে সব লেনদেন ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে হলে করহার হবে ২০ শতাংশ।

পরিশোধিত মূলধনের ১০ শতাংশের কম শেয়ার বাজারে হস্তান্তরিত হয়েছে এমন পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানির করহার ২৫ শতাংশ; সব লেনদেন ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে হলে তা হবে ২২ দশমিক ৫ শতাংশ। অন্যান্য কোম্পানির করহার ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ; সব লেনদেন ব্যাংক ট্রান্সফারের মাধ্যমে হলে তা হবে ২৫ শতাংশ।

ব্যাংক, বীমা ও ফাইন্যান্স কোম্পানির ক্ষেত্রে পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানির করহার ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পাবলিকলি ট্রেডেড নয় এমন কোম্পানির করহার ৪০ শতাংশ রাখা হয়েছে।

তামাকজাত পণ্য প্রস্তুতকারক কোম্পানির করহার ৪৫ শতাংশ এবং মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানির করহার ৪৫ শতাংশ রাখা হয়েছে। তবে মোবাইল ফোন অপারেটর কোম্পানি পাবলিকলি ট্রেডেড হলে করহার হবে ৪০ শতাংশ।

মূল্য সংযোজন কর ও সম্পূরক শুল্ক আইনের সংশোধনীতে নিবন্ধিত বা তালিকাভুক্ত ব্যক্তিকে প্রতি তিন কর মেয়াদ শেষে ১৫ দিনের মধ্যে দাখিলপত্র বা রিটার্ন জমা দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে।

সরকারি, আধা-সরকারি বা স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা, ব্যাংক, বীমা এবং শূন্য রিটার্ন দাখিলকারী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তিন কর মেয়াদ শেষে ২০ দিনের মধ্যে রিটার্ন জমা দিতে পারবে।

কোনো ব্যক্তি চাইলে প্রতি কর মেয়াদে স্বেচ্ছায় রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। জনস্বার্থে এনবিআর সুদ ও জরিমানা ছাড়া রিটার্ন দাখিলের সময়সীমা বাড়াতে পারবে।

বিআইএন, অগ্রিম কর ও স্বর্ণ ব্যবসা

ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের চলতি হিসাব বা এসটিডি হিসাব খোলা ও পরিচালনা, ব্যাংক বা এনবিএফআই থেকে ঋণ নেওয়া, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মার্চেন্ট অ্যাকাউন্ট খোলা, বাণিজ্য সংগঠনের সদস্যপদ নেওয়া বা নবায়ন, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নেওয়া এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নামে যানবাহন নিবন্ধনের ক্ষেত্রে বিআইএন বা তালিকাভুক্তির প্রমাণক বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

আমদানিকৃত সেবাকে করযোগ্য সরবরাহ হিসেবে বিবেচনা করে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আরোপের বিধান রাখা হয়েছে। এ ভ্যাট পরিশোধের দায় থাকবে সেবা গ্রহীতার ওপর। ব্যাংক বা অনুমোদিত বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনকারী প্রতিষ্ঠান সেবা আমদানির মূল্য পরিশোধের সময় ভ্যাট সরকারি কোষাগারে জমা দেবে।

খুচরা বিক্রেতার কাছে পণ্য বিক্রি বা সরবরাহের সময় উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, সরবরাহকারী, পরিবেশক বা আড়তদারকে ০ দশমিক ২ শতাংশ হারে উৎসে অগ্রিম আয়কর সংগ্রহ করতে হবে। কর সংগ্রহ না করলে অনাদায়ী করের সমপরিমাণ অর্থ সংশ্লিষ্ট উৎপাদনকারী, আমদানিকারক, সরবরাহকারী, পরিবেশক বা আড়তদারকে পরিশোধ করতে হবে।

স্বর্ণ, রৌপ্য, স্বর্ণালংকার, রৌপ্যালংকার, রতœ-হীরা বা প্লাটিনাম ক্রয়-বিক্রয় ব্যবসায় নিয়োজিত ব্যক্তির ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্যের ওপর ০ দশমিক ৫ শতাংশ উৎসে কর কর্তনের বিধান রাখা হয়েছে।

স্বর্ণ বা স্বর্ণালংকারে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা, রৌপ্য বা রৌপ্যালংকারে প্রতি ভরিতে ১০০ টাকা, প্লাটিনাম বা প্লাটিনামের অলংকারে প্রতি ভরিতে ২ হাজার ৫০০ টাকা এবং ডায়মন্ড বা ডায়মন্ডের অলংকারে প্রতি গ্রামে ২ হাজার ৫০০ টাকা ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে।

দ্রুত রিটার্নে প্রণোদনা, দেরিতে অতিরিক্ত কর

স্বাভাবিক ব্যক্তি ও হিন্দু অবিভক্ত পরিবার করদাতা ১ জুলাই থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা ২৫ হাজার টাকা, যেটি কম, সেই পরিমাণ কর প্রণোদনা পাবেন। ১ অক্টোবর থেকে ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে কোনো প্রণোদনা বা অতিরিক্ত কর থাকবে না।

১ জানুয়ারি থেকে ৩১ মার্চের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে পরিশোধযোগ্য করের ২ শতাংশ অথবা ৩ হাজার টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত কর দিতে হবে। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন দাখিলে পরিশোধযোগ্য করের ৫ শতাংশ অথবা ৫ হাজার টাকা, যেটি বেশি, সেই পরিমাণ অতিরিক্ত কর প্রযোজ্য হবে।

যারা আগে কখনও রিটার্ন দেননি, তারা সংশ্লিষ্ট করবর্ষের জন্য প্রযোজ্য হারে আয়কর দিয়ে আয়বর্ষ শেষের পরবর্তী ৩০ জুনের মধ্যে রিটার্ন দাখিল করতে পারবেন। বিদেশে অবস্থানরত স্বাভাবিক ব্যক্তি করদাতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশে ফেরার ৯০ দিনের মধ্যে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ রাখা হয়েছে।

ফ্রিল্যান্সিং, এসএমই ও তামাকপণ্যে নতুন বিধান

কর অব্যাহতির তফসিলে ফ্রিল্যান্সিং ও কনটেন্ট ক্রিয়েশন যুক্ত করা হয়েছে। নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তি মালিকানাধীন ক্ষুদ্র বা মাঝারি শিল্পের ক্ষেত্রে বাৎসরিক টার্নওভার ৭০ লাখ টাকা পর্যন্ত এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় কর অব্যাহতির বিধান রাখা হয়েছে। তবে শিল্পটি এসএমই ফাউন্ডেশনে নিবন্ধিত হতে হবে।

গোষ্ঠী বীমা পলিসি থেকে কর্মচারীর প্রাপ্ত অর্থ বা সুবিধাকে কর অব্যাহতির আওতায় আনা হয়েছে। সেন্টার ফর যাকাত ম্যানেজমেন্টে দানকৃত আয়কে কর রেয়াতযোগ্য দানের তালিকায় যুক্ত করা হয়েছে।

তামাকজাত পণ্যের নতুন শ্রেণি হিসেবে নিকোটিন পাউচ ও হিটেড টোব্যাকোর জন্য করহার নির্ধারণ করা হয়েছে। নিকোটিন পাউচের ক্ষেত্রে প্রতি ১০ গ্রামের খুচরা মূল্য ৫০০ টাকা ধরে করহার ৩৫ শতাংশ এবং হিটেড টোব্যাকোর ক্ষেত্রে ৬৭ শতাংশ হারের বিধান রাখা হয়েছে।

বাংলাদেশে প্রস্তুত বিলাতি মদের ক্ষেত্রে প্রতি লিটার প্রুফে ৫০০ টাকা এবং অপ্রক্রিয়াজাত তামাকের ক্ষেত্রে প্রতি কেজিতে ৫০ টাকা নির্দিষ্ট ভ্যাট নির্ধারণ করা হয়েছে।

কাস্টমস ও কম্পিউটার যন্ত্রাংশ

কাস্টমস আইন সংশোধনে ওয়্যারহাউসে রাখা পণ্যের মালিককে যথাযথ কর্মকর্তাকে সার্বিক সহযোগিতা করার বিধান রাখা হয়েছে। কর্মকর্তা ওয়্যারহাউস বা প্রতিষ্ঠানের প্রাঙ্গণে প্রবেশে অসহযোগিতার মুখে পড়লে প্রয়োজনে তালা ভেঙে বা অন্য যে কোনো উপায়ে প্রবেশ করতে পারবেন।

কাস্টমস তফসিলে পারসোনাল ডেস্কটপ কম্পিউটার এবং প্রসেসিং ইউনিটের জন্য পৃথক এইচএস কোড রাখা হয়েছে। পারসোনাল ডেস্কটপ কম্পিউটার ও প্রসেসিং ইউনিটের ক্ষেত্রে শূন্য শতাংশ এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ শুল্কহার রাখা হয়েছে।

বাজেটে ৩১৬ এমপির ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট আলোচনা

জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাজেট অনুমোদন এবং দুটি বিল পাসের পর স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীর বিক্রম অধিবেশন আগামী ৭ জুলাই বিকেল ৩টা পর্যন্ত সংসদের অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করেছেন। গত ৭ জুন শুরু হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট (দ্বিতীয়) অধিবেশনে বাজেটের ওপর দীর্ঘ আলোচনা, সম্পূরক বাজেট এবং অর্থ বিলসহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম সম্পন্ন হয়।

৩১৬ এমপির অংশগ্রহণ

বাজেটের সাধারণ আলোচনায় মোট ২৯১ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। এ আলোচনা চলে মোট ৪৫ ঘণ্টা ৫১ মিনিট। এর মধ্যে সরকারি দলের ২০০ জন সদস্য ৩২ ঘণ্টা ৩ মিনিট এবং বিরোধী দলের ৯১ জন সদস্য ১৩ ঘণ্টা ৪৮ মিনিট বক্তব্য দেন।

অন্যদিকে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের আলোচনায় অংশ নেন ২৫ জন সংসদ সদস্য। এ আলোচনা চলে ৩ ঘণ্টা ৩ মিনিট। এর মধ্যে সরকারি দলের ১৮ জন সদস্য ২ ঘণ্টা ১৪ মিনিট এবং বিরোধী দলের ৭ জন সদস্য ৪৯ মিনিট বক্তব্য রাখেন।

বাজেটের সাধারণ আলোচনা ও সম্পূরক বাজেটের আলোচনা মিলিয়ে মোট ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিট সংসদে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। এ দুই আলোচনায় সর্বমোট ৩১৬ জন সংসদ সদস্য অংশগ্রহণ করেন।