বাংলাদেশ থেকে গত দুই বছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি বেড়েছে। তবু দেশে কাঁচা চামড়ার দাম বাড়েনি। চাহিদা থাকলেও মৌসুমি ও ছোট ব্যবসায়ীরা সরকার নির্ধারিত দাম পাচ্ছেন না। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন গরিব ও এতিমরা। কেননা কুরবানির চামড়া বিক্রির টাকা মূলত তাদেরই হক। মূল্য কম থাকায় তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এর পেছনে আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের সিন্ডিকেট রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সরকার এ বিষয়ে কাজ করছে। চামড়া খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে জুলাই মাসে পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা প্রকাশ করা হবে।

সূত্রমতে, কুরবানির গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম গত বছরের চেয়ে এবার ২ টাকা বাড়িয়েছিল সরকার। ঢাকায় লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়। সেই হিসেবে ঢাকায় মাঝারি আকারের একটি লবণযুক্ত চামড়ার দাম হওয়ার কথা প্রায় ১,৩০০ থেকে ১,৮৫০ টাকা। ঢাকার বাইরে গরুর চামড়া: প্রতি বর্গফুট ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। ছাগল ও ভেড়ার চামড়া: খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়া ২২ থেকে ২৫ টাকা (সারাদেশে অভিন্ন)।

কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্রে দেখা গেছে, সরকারিভাবে দাম বাড়ানো হলেও মাঠপর্যায়ে বা কাঁচা চামড়ার বাজারে এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। কুরবানিদাতা ও মৌসুমি ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন যে, তাঁরা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে চামড়া বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। ঢাকায় মাঝারি আকারের কাঁচা গরুর চামড়া ৫০০ থেকে ৬৫০ টাকা এবং বড় আকারের চামড়া ৭০০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, যা সরকারি হিসাবের প্রায় অর্ধেক।

ছাগলের চামড়ার অবহেলা: ছাগল ও ভেড়ার চামড়া নিয়ে বরাবরের মতোই চরম উদাসীনতা দেখা গেছে। মাঠপর্যায়ে এগুলো মাত্র ৫ থেকে ১০ টাকায় বিক্রি হয়েছে, অনেক জায়গায় কেউ ফ্রিতেও নিতে চায়নি। দাম না পেয়ে এবং লবণ ও শ্রমিকের খরচ তুলতে না পেরে দেশের বিভিন্ন স্থানে চামড়া রাস্তায় ফেলে দেওয়া বা মাটিতে পুঁতে ফেলার খবর পাওয়া গেছে। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের দাবি, আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা সিন্ডিকেট করে দাম কমিয়েছেন।

চামড়ার মৌসুমি ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের দাবি, সরকার দাম বাড়ালেও তারা ট্যানারির মালিকদের কাছে বাড়তি দামে চামড়া বিক্রির আশ্বাস পাননি। ট্যানারির মালিকেরা গত বছরের তুলনায় দাম কমিয়েছেন। এ কারণে তাঁরাও কমে কিনেছেন। যদিও ট্যানারির মালিকদের দাবি, গত বছরের তুলনায় এবার দাম, বরং প্রতিটি ৫০-৬০ টাকা বেড়েছে।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার পবিত্র ঈদুল আযহার দিন দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত রাজধানীর মোহাম্মদপুর টাউন হল, ধানমন্ডি, সায়েন্স ল্যাব এবং লালবাগের পোস্তা এলাকায় ছোট আকারের গরুর কাঁচা চামড়া প্রতিটি কেনাবেচা হয়েছে ২৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। মাঝারি আকারের গরুর কাঁচা চামড়া ৫০০-৬৫০ টাকা এবং বড় আকারের গরুর কাঁচা চামড়া ৭০০-৮০০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছে। গত বছর মাঝারি আকারের চামড়ার দাম ছিল ৭০০-৮০০ টাকা। অন্যদিকে ছাগলের চামড়া প্রতিটি বিক্রি হয়েছে ৫ থেকে ১০ টাকায়। গত কয়েক বছরও ছাগলের চামড়ার এমন দাম ছিল।

সর্বশেষ ২০১৩ সালে কুরবানির পশুর চামড়ার দাম বেশি ছিল। সেবার গরুর চামড়ার দাম ছিল বর্গফুট প্রতি ৮৫-৯০ টাকা। এর পর থেকে বিভিন্ন কারণে চামড়ার দাম ধারাবাহিকভাবে কমতে থাকে। ২০১৯ সালে কুরবানির পশুর চামড়ার দামে বড় ধস নামে। ন্যূনতম দাম না পেয়ে দেশের অনেক এলাকায় চামড়া সড়কে ফেলে ও মাটিতে পুঁতে ফেলার ঘটনা ঘটে। তাতে প্রায় ২৪২ কোটি টাকার চামড়ার নষ্ট হয়। পরের বছর বর্গফুটপ্রতি দাম কমে ৩৫-৪০ টাকায় দাঁড়ায়। এরপর গত পাঁচ বছর সরকার নির্ধারিত দাম অল্প অল্প করে বাড়লেও কোনোবারই সেই দামে কুরবানির চামড়া বিক্রি হয়নি।

কুরবানির চামড়া বিক্রির টাকা গরিবদের হক। আর এ কারণেই এতিমখানা মাদরাসাগুলো চামড়া সংগ্রহ করে বিক্রি করে থাকে। কিন্তু দাম কম পাওয়ায় তারা বেশ কয়েক বছর ধরে আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।

মোহাম্মদপুরের একটি মাদ্রাসা থেকে ২০টি চামড়া কেনা জাকির হোসেন জয় জানান, তিনি প্রতিটি চামড়ায় মাত্র ৫০ থেকে ১০০ টাকা লাভ করতে পেরেছেন। তিনি বলেন, "আমি বড় গরুর চামড়া ৭০০ টাকা পিস দরে বিক্রি করেছি।"

অথচ সরকার নির্ধারিত একেকটি বড় চামড়ার দাম আসে ১৩০০ টাকার বেশি। গরীব ও এতিমদের টাকার লোকসানের পেছনে তৈরীকৃত সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে পোস্তা এলাকায় কাঁচা চামড়ার আড়তদারদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ) সভাপতি মো. টিপু সুলতান গণমাধ্যমে দাবি করেছেন, সরকারের বেঁধে দেওয়া দামের মধ্যেই বেশির ভাগ বেচাকেনা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমরা তো চোখের দেখায় কাঁচা চামড়া কিনি। এ জন্য দামে ৫০ টাকা কমবেশি হতে পারে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, কাঁচা চামড়া সংগ্রহকারীদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে যাতে গুণগত মান নষ্ট হওয়ার আগেই দ্রুত সেগুলো বিক্রি করে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, কুরবানির পশুর চামড়া জবাইয়ের পর সন্ধ্যা থেকেই পচতে শুরু করে। দ্রুত ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে, যা চামড়ার মান ও দাম উভয়ই কমিয়ে দেয়।

চট্টগ্রামে চামড়ার বাজারে পতন

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানায় : চট্টগ্রামে কুরবানির পশুর চামড়ার বাজারে এবারও ন্যায্য দাম না পাওয়ার অভিযোগ উঠেছে। মৌসুমি ব্যবসায়ী ও কুরবানিদাতাদের দাবি, সাইজ অনুযায়ী দাম বাড়ার কথা থাকলেও বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি। বরং আড়তদাররা একেবারে কম দামে চামড়া কিনে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ তাদের। এতে ক্ষতির মুখে পড়ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা, পাশাপাশি কুরবানির চামড়া বিক্রির অর্থ যাদের প্রাপ্য-গরিব, অসহায়, এতিম ও মাদ্রাসাগুলো-তারাও ন্যায্য অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

চট্টগ্রামের আতুরার ডিপো এলাকাকে কেন্দ্র করে চামড়ার মৌসুমি বাজারে এবারও একই চিত্র দেখা গেছে। গ্রামাঞ্চল থেকে সংগ্রহ করা চামড়া শহরে এনে বিক্রি করতে গিয়ে প্রত্যাশিত দাম না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। তাদের অভিযোগ, পরিবহন ও শ্রমিক খরচ বহন করার পরও আড়তে এসে ন্যূনতম দামও মিলছে না।

মৌসুমি ব্যবসায়ী মো. জয়নাল বলেন, “গ্রাম থেকে বড় চামড়া ৩৫০ টাকা দিয়ে কিনেছি। গাড়ি ভাড়া ও শ্রমিক খরচ আলাদা। এখানে এসে আড়তদার বলছে ১৫০-২০০ টাকার বেশি হবে না। তাহলে আমরা লাভ করবো কীভাবে?” তার মতে, বাজারে দামের যে অবস্থা তৈরি হয়েছে, তাতে মৌসুমি ব্যবসায়ীরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ছেন এবং অনেকেই পুঁজি হারানোর আশঙ্কায় আছেন।

অন্যদিকে আড়তদারদের দাবি, চামড়া কেনার পর তা প্রক্রিয়াজাত করতে গিয়ে বড় অঙ্কের খরচ হয়। কাঁচা চামড়া সংগ্রহের পর তা পরিষ্কার করা, লবণ দেওয়া এবং সংরক্ষণের কাজ অত্যন্ত ব্যয়বহুল। কাঁচা চামড়া আড়ত থেকে কারখানা পর্যন্ত পৌঁছাতে প্রতিটি চামড়ায় গড়ে প্রায় ৪৫০ টাকা খরচ পড়ে বলে জানিয়েছেন কাঁচা চামড়ার আড়তদার সমিতির সভাপতি মো. মুসলিম উদ্দিন।

তিনি বলেন, “আমরা যে দামে চামড়া কিনি, তার সঙ্গে প্রসেসিং খরচ যোগ করলে লাভ তো দূরের কথা, অনেক সময় ক্ষতি হয়। তাই মৌসুমি ব্যবসায়ীরা যে দামে চামড়া কেনে, সেই দামে আমাদের পক্ষে কেনা সম্ভব নয়।” তার মতে, আন্তর্জাতিক বাজার, চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা ও উৎপাদন খরচের চাপের কারণে স্থানীয় বাজারে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।

চট্টগ্রামের পুরনো চামড়া ব্যবসায়ীরা বলছেন, প্রতি বছর ঈদুল আযহার সময় হাজার হাজার মৌসুমি ব্যবসায়ী আশায় বুক বেঁধে বাজারে নামেন। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি অনেক সময় তাদের প্রত্যাশার সঙ্গে মেলে না। দাম কমে যাওয়ার কারণে অনেকেই বড় ধরনের লোকসান নিয়ে বাড়ি ফেরেন। এতে শুধু ব্যবসায়ীরাই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, বরং কুরবানির চামড়ার মাধ্যমে গরিব-দুঃখী মানুষের জন্য যে সামাজিক অর্থনৈতিক সহায়তার একটি ধারা তৈরি হয়েছিল, সেটিও বাধাগ্রস্ত হয়।

কুষ্টিয়ায় কুরবানির পশুর চামড়ার বাজারে ধস

কুষ্টিয়া সংবাদদাতা জানায় : কুষ্টিয়ায় কুরবানির পশুর চামড়ার বাজারে এবার দেখা দিয়েছে চরম মন্দাভাব। চামড়ার দাম কমে যাওয়ায় যেমন সাধারণ বিক্রেতারা ক্ষতির মুখে পড়েছেন, তেমনি ব্যবসায়ীরাও বড় ধরনের আর্থিক লোকসানের আশঙ্কা করছেন।

ব্যবসায়ীদের দাবি, ল্যাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত পশুর চামড়া নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ট্যানারিগুলোর কঠোর অবস্থানের কারণে বাজারে স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।

অন্যদিকে জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, কিছু আড়তদার ল্যাম্পি রোগকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে কম দামে চামড়া কিনছেন।

জানা গেছে, চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেকেই চামড়া ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি না করে মাদরাসায় দান করেছেন। কেউ কেউ আবার চামড়া মাটিচাপাও দিয়েছেন।

কুষ্টিয়ার বৃহত্তম চামড়া মোকাম আড়ুয়াপাড়া ও বাবর আলী গেট এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, ঈদের দিন দুপুরের পর থেকে চামড়া কেনাবেচা শুরু হয়। বড় আকারের কিছু গরুর চামড়া এক হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হলেও অধিকাংশ চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে বিক্রি হয়েছে। ল্যাম্পি রোগে আক্রান্ত বলে ধারণা করা চামড়ার দাম নেমে এসেছে ১০০ থেকে ২০০ টাকায়।

চামড়া ব্যবসায়ী ও এসএম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী শামসুল ইসলাম বলেন, “এবার কুষ্টিয়ায় চামড়ার আমদানি অনেক কম। বাজারে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা রয়েছে। প্রায় ৭০ শতাংশ গরুর চামড়ায় ল্যাম্পি রোগের ক্ষতের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে। এসব চামড়া কিনলে পরে ট্যানারি গ্রহণ না-ও করতে পারে।”

তিনি বলেন, “বড় আকারের ভালো চামড়া সর্বোচ্চ এক হাজার টাকা পর্যন্ত কেনা হয়েছে। মাঝারি চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু ল্যাম্পি আক্রান্ত চামড়ার দাম ১০০ থেকে ২০০ টাকার বেশি ওঠেনি।”

মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার হচ্ছেন বলে জানান তিনি। গ্রামের মানুষদের কাছ থেকে চামড়া কিনে আড়তে এসে অনেকেই কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন।

কুষ্টিয়া সদর উপজেলা বড় আইলচারা জামিয়া ইসলামিয়া বালক বালিকা মাদ্রাসার মোহতামীম মুফতি আব্দুল হামিদ জানান, তারা বিভিন্ন বাড়ি থেকে বিনামূল্যে গরু ও ছাগলের চামড়া সংগ্রহ করেছেন। পরে গরুর চামড়া ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং ছাগলের চামড়া ৫০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করেছেন।

এদিকে কুষ্টিয়া বিসিকের ভারপ্রাপ্ত উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) আশানুজ্জামান বলেন, “চামড়া সংরক্ষণের জন্য জেলায় পর্যাপ্ত লবণের মজুত রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী ইতোমধ্যে লবণ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।”

জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এবার কুষ্টিয়ায় প্রায় দুই লাখ পশু কুরবানি হওয়ার সম্ভাবনা ছিল। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, কুরবানির প্রকৃত সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় কম হতে পারে। তাদের মতে, পশুর সংখ্যা বেশি হলে চামড়ার আমদানিতেও তার প্রতিফলন দেখা যেত।