ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য সংগ্রহে নেমেছে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতিবিরোধী একমাত্র সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন-দুদক। ইতোমধ্যে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) দুদক থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানিয়ে সকল ধরনের সহযোগিতা চাওয়া হয়েছে। ইসি ছাড়াও দুদক বিভিন্ন উৎস থেকে মনোনয়ন পত্রের সাথে দেয়া প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য সংগ্রহ করছে। এই তথ্য সংগ্রহ শেষে দুদক একাধিক কমিটি গঠন করে প্রাপ্ত তথ্যের যাচাই বাছাই শেষে আইনি পদক্ষেপ নেবে। দুদকের একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে এ খবর জানা গেছে।

জানতে চাইলে দুদকের উপপরিচালক আখতারুল ইসলাম দৈনিক সংগ্রামকে বলেন, প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য সংগ্রহের প্রাথমিক কাজটি করছে দুদক। আপাতত বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে আসা হলফনামার তথ্যগুলো সংগ্রহের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগ কাজ করছে। এরপর ইসির কাছ থেকে পাওয়া সকল প্রার্থীদের হলফনামার তথ্য সংগ্রহ করে যাচাই বাছাই করবে। এজন্য অনুসন্ধান বিভাগ থেকে একাধিক কমিটি গঠন করে দেয়া হবে। কমিটিগুলোর অনুসন্ধানের ভিত্তিতেই দুদক পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনে পদক্ষেপ গ্রহণ করবে বলে আখতারুল জানান।

ইসি সূত্র জানায়, আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়নপত্র বাছাইয়ে রোববার পর্যন্ত মোট বৈধ প্রার্থী দাঁড়াল ২২৫৩ জন। সংসদ নির্বাচনের তফসিল অনুযায়ী, আপিল শুনানি শেষে আজ ২০ জানুয়ারি মঙ্গলবার পর্যন্ত প্রার্থিতা প্রত্যাহারের সময় রয়েছে। এরপর চূড়ান্ত হবে কতজন প্রার্থী ভোটে থাকবে। ২১ জানুয়ারি প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীরা প্রতীক পাবেন। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোট হবে। একই দিন গণভোটও হবে। মনোনয়নপত্র দাখিলের শেষ সময় ছিল ২৯ ডিসেম্বর, নির্ধারিত সময়ে এবার ৩০০ সংসদীয় আসনে আড়াই হাজার মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি বাছাইয়ে ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিলের পর বৈধ প্রার্থী ছিলেন ১৮৪২ জন। রিটার্নিং অফিসারদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ৫ জানুয়রি থেকে আপিল আবেদন গ্রহণ শুরু হয়, ৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৬৪৫ জন আপিল করেছেন। ১০ জানুয়ারি থেকে আপিল শুনানি শুরু হয়ে একটানা ১৮ জানুয়ারি রোববার পর্যন্ত চলে।

দুদক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেনও একাধিকবার প্রার্থীদের হলফনামা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে বলে জানিয়েছেন। সর্বশেষ গত ১১ জানুয়ারি রোববার দুর্নীতি নিয়ে কাজ করা সাংবাদিকদের সংগঠন র‌্যাকের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে দুদক চেয়ারম্যান হলফনামা যাচাই প্রসঙ্গে বলেন, অল্প সময়ের মধ্যে সম্পদ বিবরণী সূক্ষ্মভাবে অনুসন্ধান করা কঠিন। হলফনামা নিয়ে অনুসন্ধানে সাংবাদিকদের সহযোগিতা চেয়ে তিনি বলেন, আপনারা যদি কোনো হলফনামায় কোনো ব্যক্তির সম্পদের বিষয়ে সন্দিহান হন, অনুগ্রহ করে সেই তথ্য সবার আগে আমাদের হাতে দিন। আপনারাও তো অনুসন্ধানকারী। অনুসন্ধান করে আমাদের অনুসন্ধানকে সহায়তা করুন। আবদুল মোমেন বলেন, আমরা চাই না, হলফনামায় প্রদর্শিত হয়নি, এমন সম্পদের মালিক কেউ আগামী দিনে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসুক।

এর আগে গত ৫ জানুয়ারি সোমবার দুদকের প্রধান কার্যালয়ে রিপোর্টার্স অ্যাগেইন্টস করাপশনের (র‌্যাক) নবনির্বাচিত কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় সভায় দুদক চেয়ারম্যান বলেন, জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন তাদের হলফনামায় সম্পদের বিবরণ রয়েছে। ইতোমধ্যে ওয়েবসাইটেও পাওয়া যাচ্ছে। ইসিকে অনুরোধ জানিয়েছি কারো সম্পদের তথ্যে সন্দেহজনক তথ্য যদি থাকে, সেটা বের করে আমাদের অবগত করতে। আমরাও হলফনামা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবো। পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বের করার চেষ্টা করবো। দরকার হলে দুদকের অনন্য কর্মকা- কমিয়ে এ কাজটি করার চেষ্টা করবো। এ সময় তিনি দুদক আর ইসির মধ্যে সমন্বয়ের বিষয়টি উল্লেখ করে দুদক চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় যে সম্পদ বিবরণী জমা দিয়েছিলেন, বাস্তবে পাওয়া সম্পদের সঙ্গে তার বিস্তর ব্যবধান ছিল দাবি করে বলেন, সে সময় যদি দুর্নীতি দমন কমিশন এবং নির্বাচন কমিশন সঠিকভাবে কাজ করত, তাহলে সেই সময়ই তার এই প্রার্থিতা বাতিল হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সেটি বাতিল হয়নি।

দুদক সূত্র জানায়, প্রার্থীদের হলফনামায় দেয়া সকল তথ্য যাচাই বাছাই শুরু করা হবে শিগগিরই। বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্যের পর ইসির কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের মিল খোঁজা হবে। প্রয়োজনে, প্রার্থীদের সম্পদ বিবরনী যাচাইয়ের জন্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এর কাছে সহায়তা চাওয়া হবে। এছাড়া, বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের সিআইবি (সেন্ট্রাল ইনফরমেশন ব্যুরো) প্রতিবেদনসহ প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হবে। সকল তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে তা যাচাই বাছাই শেষে গঠিত কমিটিগুলোর দেয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দুদক আইনে ব্যবস্থা নেবে। এছাড়া, হলফনামায় দেয়া মিথ্যা তথ্যসহ তথ্যের গড়মিলকারীর বিরুদ্ধে ইসিকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ জানাবে দুদক।