আজ শুক্রবার ৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ৪৯তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী। ১৯৭৭ সালের এই দিনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ থেকে পথচলা শুরু করে একে একে ৪৮ টি বছর পিছনে ফেলে এ সংগঠন রচনা করেছে এক গৌরবময় ইতিহাস। একটি গঠনমূলক গতিশীল গণতান্ত্রিক সংগঠন হিসেবে, একটি একক ও অনন্য অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে, মানুষ তৈরীর কারখানা হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির মানুষের হৃদয়ে করে নিয়েছে তার স্থায়ী আসন।

১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকচক্রের হাত থেকে দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা হয় স্বাধীন বাংলাদেশ। শাসকগোষ্ঠীর অত্যাচার নিপীড়নে জর্জরিত এদেশের মানুষ স্বপ্ন দেখতে শুরু করে স্বাধীনতার পর। কিন্তু স্বাধীনতা পরবর্তী চরম আর্থ-সামাজিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, বিশৃঙ্খলা, জাতি গঠনে রাজনৈতিক নেতৃত্বের চরম ব্যর্থতা আপামর জনসাধারণের সেই সুখ-স্বপ্ন বেশীদিন স্থায়ী হয়নি। দেশের সামগ্রিক অরাজক অবস্থা সাধারণ মানুষের মাঝে চরম হতাশার সৃষ্টি করে। ’৭১ থেকে ৭৫ এর সাড়ে তিন বছর সময়কালে সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে চেপে বসে একদলীয় বাকশালী সরকার। মানুষ হারায় বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা। দুর্ভিক্ষে প্রাণ যায় লক্ষ লক্ষ মানুষের। ক্যু, সামরিক শাসন ও গণতান্ত্রিক উত্তরণের বিভিন্ন ধাপ গড়িয়ে দেশটি এক অদ্ভূত অবস্থানে চলে যায়। ফলে এদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বিদ্যমান ছাত্র সংগঠনগুলো ছাত্রদের মুক্তির দিশারী হওয়ার পরিবর্তে পরিণত হয়েছিল দুর্নীতি, সন্ত্রাস, মেধা-মূল্যবোধ-আদর্শহীন দলীয় লেজুড়বৃত্তির আখড়া হিসেবে।

এরই প্রেক্ষাপটে এ দেশের সাধারণ মানুষের মাঝে আশা তৈরীর দুর্বার স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে আসেন কিছু চিন্তাশীল, সাহসী ও স্বাপ্নিক তরুণ। আল্লাহর উপর ভরসা করে ১৯৭৭ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপিঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মস্জিদ থেকে যাত্রা শুরু করে একটি ক্ষুদ্র ছাত্র সংগঠন। কালের বিবর্তনে আজ সে সংগঠন বিশাল মহীরুহে পরিণত হয়েছে, যার ছায়াতলে আশ্রয় নিয়েছে দেশের লক্ষ লক্ষ মেধাবী ও মুক্তিকামী ছাত্র-তরুণ। আলোকবর্তিকা হাতে অগ্রসরমান যে কাফেলাটি অতি দ্রুতই মেধাবী তরুণ-ছাত্রদের হৃদয়ের স্পন্দনে পরিণত হয়, তার নাম “বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির”। শুরু হল সুমধুর সঙ্গীতের শপথদীপ্ত অনুরণন-“পদ্মা মেঘনা যমুনার তীরে আমরা শিবির গড়েছি-শপথের সঙ্গীন হাতে নিয়ে সকলে নবীজির রাস্তা ধরেছি..”

প্রতিভা বিকাশে ছাত্রশিবির: প্রতিভা বিকাশের জন্য ছাত্রশিবির বছরব্যাপী কেন্দ্র থেকে শুরু করে উপশাখা পর্যন্ত আয়োজন করে বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রতিযোগিতার। যেমন- কুইজ প্রতিযোগিতা, মেধা যাচাই, ক্যারিয়ার গাইডলাইন কনফারেন্স, কম্পিউটার মেলা, বিজ্ঞান মেলা, সাধারণ জ্ঞানের আসর, বিতর্ক ও আবৃত্তি প্রতিযোগিতা, ক্রিকেট ও ফুটবল প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। এসবের মাধ্যমে গড়ে তোলার চেষ্টা করে দেশের আগামী দিনের নেতৃত্ব। ইসলামী ছাত্রশিবির একমাত্র ছাত্র সংঠন যার রয়েছে নিয়মিত প্রকাশনা। কেন্দ্র থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রকাশনা ছাড়াও শাখা পর্যায় থেকে নিয়মিত প্রকাশিত হয় বিভিন্ন প্রকাশনা। যা একদিকে ছাত্র সমাজের চরিত্র গঠনে রাখছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, অপর দিকে প্রতিভাবান লেখকদের গড়ে ওঠার প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যাপক ভূমিকা রাখছে।

অপসংস্কৃতির করাল গ্রাস থেকে যুব সমাজকে রক্ষা এবং সুস্থ সংস্কৃতির বিকাশের লক্ষ্যে দেশব্যাপী শিবিরের রয়েছে অসংখ্য সাংস্কৃতিকগোষ্ঠী যারা নিয়মিত প্রশিক্ষণ, ওয়ার্কশপ, প্রযোজনার মাধ্যমে শিল্পী তৈরী করে যাচ্ছে প্রতি বছর।

বাংলাদেশের শিক্ষিত, আধুনিক তরণদের মাঝে ইসলামী আচার-আচরণ, মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি চর্চার ব্যাপারে শিবিরের প্রভাব অনেক। বিভিন্ন সময়ে প্রকাশ করেছে স্টিকার, ঈদকার্ড, ক্লাস রুটিন, নব বর্ষের ডায়েরী, ক্যালেন্ডার ইত্যাদি। এছাড়াও রয়েছে সায়েন্স সিরিজসহ বিভিন্ন একাডেমিক প্রকাশনা।

জনগণের পাশে ছাত্রশিবির: বিপুল জনসংখ্যা অধ্যুষিত বাংলাদেশ হাজারও সমস্যায় জর্জরিত। দেশের এসব সমস্যায় শিবির পালন করে আসছে গঠনমূলক ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ছাত্রশিবির দেশের বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশবাসীর পাশে দাড়িয়েছে সাহসী সৈনিকের মত। সাধ্যমত ত্রাণ সামগ্রী সংগ্রহ করে দুর্যোগ কবলিত মানুষের মাঝে বিতরণ, শীত বস্ত্র বিতরণ, বিনামূল্যে ওষুধ-চিকিৎসা প্রদান ইত্যাদি কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে এ দেশের জনসাধারণের মনের মাঝে স্থান করে নিতে সক্ষম হয়েছে।

ছাত্র সংগঠন হিসেবে ছাত্রশিবির এসব দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়েছে ক্ষতিগ্রস্ত ছাত্র-ছাত্রীদের। তাদের বিনামূল্যে বই, খাতা, কলমসহ নগদ অর্থ প্রদান করে তাদের শিক্ষা জীবনকে অব্যাহত রাখা ছিল শিবিরের অন্যতম প্রধান কর্মসূচি। শিবিরের নিয়মিত কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে স্বেচ্ছায় রক্তদান ও বৃক্ষরোপণ কমর্সূচির মত সামাজিক আন্দোলন। যা জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি সুন্দর ও নির্মল সমাজ বিনির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

১৯৮৮, ১৯৯১, ১৯৯৮, ২০০০, ২০০১ এর প্রলয়ংকরী বন্যার পর শিবিরের ত্রাণবিতরণ কর্মসূচী সবাইকে অভিভূত করেছে। ২০০৭ এ সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত দক্ষিণাঞ্চলের জনপদে শিবির কেবল ত্রাণবিতরণ করেনি বরং জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উদ্ধার করেছে আটকে পড়া দুর্গত মানুষদের। একই ভাবে ২০০৯ এ পটুয়াখালী, সাতক্ষীরা ও খুলনা এলাকার আইলা আক্রান্ত মানুষদের পাশে দাঁড়ায় শিবির। করোনা মহামারি আক্রান্ত মানুষের জন্য জীবনবাজি রেখে সহতায়তার হাত বাড়িয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির। ২০২২ সালে দুই দফা ভয়াবহ বন্যায়ও জনগনের পাশে দাঁড়িয়েছে ইসলামী ছাত্রশিবির।

জাতীয় ইস্যুতে ছাত্রশিবির: দেশের সকল রাজনৈতিক ক্রান্তিকালে ছাত্রশিবিরের ভূমিকা সবসময়ই গঠনমূলক। স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়ায় ছাত্রশিবিরের ভূমিকা ছিল অগ্রণী ও বলিষ্ঠ। নব্বই’র দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক যে বিশাল ছাত্র জমায়েত ও আন্দোলন গড়ে ওঠে, তার অন্যতম সংগঠক ছাত্রশিবির। স্বৈরশাসকের হাতে বহু নেতাকর্মী নিহত ও নির্যাতিত হলেও ছাত্রশিবির কঠোর রাজনৈতিক কর্মসূচি থেকে পিছপা হয়নি। শিবিরের বিশাল সমাবেশ ও মিছিল ছাত্র-জনতার প্রাণে নতুন আশা ও প্রেরণা সঞ্চার করেছিল। তাছাড়া ৯০’র দশকে গণআদালতের তান্ডবের প্রতিবাদে শিবিরের লড়াকু ভূমিকা ঐতিহাসিক। গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে রাজপথে ছাত্রশিবির সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৯৬-এর নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসীন সরকারের বহুমাত্রিক নির্যাতন-নিপীড়নের বিরুদ্ধে দেশের অন্যান্য ছাত্রসংগঠনের সমন্বয়ে “সর্বদলীয় ছাত্রঐক্য” গঠন করে স্বৈরাচারী-ফ্যাসিবাদি কর্মকান্ডের প্রতিবাদ অব্যাহত রাখে। পাবর্ত্য চট্টগ্রামকে তথাকথিত শান্তিচুক্তির নামে মূল ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন করার বিরুদ্ধে গণসচেতনতা সৃষ্টি করে। ২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোটের পক্ষে জনমত গঠনের মাধ্যমে স্বেচ্ছাচারী সরকারের পরাজয়ে প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করে। ২০১৩ সালে রাজবন্দী মুক্তি আন্দোলন, ধর্ম অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছাত্রশিবির অগ্রণী ভূমিকা পালন করছে।

ট্রানজিট ইস্যু, টিপাইমুখ বাঁধ, সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও নির্বিচারে গুলী করে অপহরণ-ধর্ষণ-হত্যা, পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে সেনা প্রত্যাহার, পিলখানায় দেশপ্রেমিক সেনা অফিসার হত্যা, চলমান তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাসহ বিভিন্ন জাতীয় ইস্যুতে সভা, সমাবেশ, মানববন্ধনের আয়োজন করে।

২০২৪-এর ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে ইসলামী ছাত্রশিবির। ৫ আগস্ট পরবর্তী বাংলাদেশে ইতিবাচক ছাত্র রাজনীতির ধারায় নতুন নতুন উপাদান সংযোজন করে ইসলামী ছাত্রশিবির। শিবিরের গঠনমূলক ও শিক্ষার্থীবান্ধব ভূমিকার কারণে দেশে ছাত্র সংসদগুলোর নির্বাচনে ছাত্র-ছাত্রীরা ছাত্রশিবিরকেই বেছে নেয়। একে একে ডাকসু, জাকসু, জকসু, রাকসু, চাকসু নির্বাচনে অভূতপূর্ব ফলাফল করে ছাত্রশিবিরের প্যানেল।

জুলুম নির্যাতন: শিবির তার যাত্রা শুরু করার সাথে সাথে ইসলামবিরোধী মহল, কায়েমী স্বার্থবাদী গোষ্ঠরীা তাদের শত্রুতা শুরু করে। ইসলামী ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধাচরণ, শিবির নেতা-কর্মীদের ব্যাপারে অপপ্রচার ছড়ানো, শিবিরের কর্মসূচীর ওপর হামলা, শিবিরকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা, শিবির কর্মীদেরকে ব্যক্তিগত ও দলীয়ভাবে আঘাতে জর্জরিত করা, গোপন ও প্রকাশ্যে হামলা করে শিবির কর্মীদের হত্যা করাÑÑ এসবই হয়ে দাঁড়িয়েছে একটি গোষ্ঠীর একমাত্র কাজ। এ পর্যন্ত বিভিন্ন সংগঠনের হামলায় শিবিরের ২৩৪ জন তাজা তরুণ কর্মী শাহাদাত বরণ করেছে। ওরা জানে না কী তাদের অপরাধ? কেন ওদের হত্যা করা হয়েছে। তেমনিভাবে আহত, পঙ্গু হয়ে কষ্টকর জীবন যাপন করছে শিবিরের শত শত কর্মী। চোখ, হাত, পা হারানো এসব ছাত্রদের সকরুণ জিজ্ঞাসা- “কেন আমাদের এমন হলো”? কেউই তার উত্তর দেয় না, অথচ সবাই এর উত্তর জানে। “তাদের একমাত্র অপরাধ (!) তারা মহা পরাক্রমশালী স্বপ্রশংসিত আল্লাহর ওপর ঈমান পোষণ করেছে” ওরা জীবন দিয়ে শাহাদাতে হক্বের স্বাক্ষ্য রেখেছে, ওরা পঙ্গুত্ব বরণ করেছে কিন্তু বাতিলের সাথে আপোষ করেনি, ওরা লড়তে লড়তে জীবনের দাম খুঁজে পেয়েছে। আর এভাবে মৃত্যুর মাঝে জীবনের সন্ধান করে ফেরাই বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের এক অনন্য ঐতিহ্য।

আজকের কর্মসূচি

৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে ‘স্বাগত র‌্যালি’ অনুষ্ঠিত হবে।

আজ ৬ ফেব্রুয়ারি সকাল ৯টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শাহবাগ এই র‌্যালি অনুষ্ঠিত হবে। এ ছাড়া ৪৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে 'ইয়ুথ আইডিয়া কনটেস্ট ২০২৬ ও সাংস্কৃতিক সন্ধ্যা' অনুষ্ঠিত হবে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠিত কনটেস্টের উদ্বোধনী সেশন সকাল ৮:৪৫টা ও সমাপনী সেশন হবে বিকাল ৪:৪৫টায়।