নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, সরকারের হাতে এখনও ৭ দিন সময় আছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, ভোট কেন্দ্রের আশেপাশে অবস্থান নেওয়া সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজদের গ্রেফতার এবং কালো টাকার দৌরাত্ব্য বন্ধ করতে হবে। এই দায়িত্ব সরকার, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং তফসিল ঘোষণার পর থেকে নির্বাচন কমিশনের। এ বিষয়ে সরকার নির্লিপ্ত থাকলে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের সুযোগ হাতছাড়া হবে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-৫ আসন (ডুমরিয়া-ফুলতলা) থেকে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের সংসদ সদস্য প্রার্থী মিয়া গোলাম পরওয়ার গতকাল বৃহস্পতিবার খুলনা প্রেসক্লাবে নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করতে গিয়ে এ শঙ্কার কথা জানান। বেলা সাড়ে ১১টায় প্রেসক্লাবের আলহাজ লিয়াকত আলী মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত এ জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে নিজস্ব নির্বাচনী অঙ্গীকারের কথাও ব্যক্ত করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের শুরুতেই মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচন কমিশন ও অর্ন্তবর্তীকালীন সরকার প্রধানের পক্ষ থেকে অবাধ, সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর নির্বাচনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তব পরিস্থিতি সেই আশ্বাসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তার ভাষায়, “নির্বাচনের এখনও এক সপ্তাহ বাকি, অথচ এখনই প্রার্থী, কর্মী ও ভোটারদের ওপর হামলা হচ্ছে। এভাবে পরিস্থিতি চলতে থাকলে জনগণ নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে যেতে পারবে না।” নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতনের একাধিক অভিযোগ তুলে ধরে বলেন, দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালাতে গেলে নারী কর্মীদের বোরকা ও মুখের কাপড় টেনে খুলে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বক্তব্য ভাইরাল হয়েছে, যেখানে একজন রাজনৈতিক নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন, দাঁড়িপাল্লার পক্ষে ভোট চাইতে গেলে নারীদের পোশাক খুলে নিতে হবে। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “এটা শুধু রাজনৈতিক সহিংসতা নয়, এটি নারীর মর্যাদার ওপর সরাসরি আঘাত। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই এ ধরনের হুমকি দেয়, তারা ক্ষমতায় গেলে কী করবে সেটা ভেবেই আমরা আতঙ্কিত।”

সংখ্যালঘু ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার অভিযোগ, খুলনা-৫ আসনের বিভিন্ন এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোটারদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে ভোট দিলে ‘ভয়াবহ পরিণতির’ হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কোথাও কোথাও মিটিং করতে গেলে তাদের জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, দাঁড়িপাল্লার সভায় গেলে খবর আছে। অন্যদিকে কিছু এলাকায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সাবেক জনপ্রতিনিধিদের জোরপূর্বক বাড়ি থেকে তুলে এনে নির্দিষ্ট প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে। “এটা ভোট নয়, জোর করে রাজনৈতিক অবস্থান চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা,” বলেন তিনি।

নিজের নির্বাচনী এলাকায় প্রচারণা বাধাগ্রস্ত হওয়ার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ফুলতলা ও ডুমুরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় তার নির্ধারিত সভা-সমাবেশে পরিকল্পিতভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। একাধিক স্থানে চেয়ার-টেবিল ভেঙে সভা ভণ্ডুল করা হয়। একটি এলাকায় গণসংযোগ শেষে নির্ধারিত সভাস্থলে পৌঁছানোর আগেই প্রতিপক্ষের লোকজন গিয়ে চেয়ার সরিয়ে নেয় এবং সভা করতে বাধা দেয়। বিষয়টি থানাকে জানানো হলেও পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও কাউকে আটক বা আইনি ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনের বড় অংশজুড়ে ছিল কালো টাকা ও ভোট কেনার অভিযোগ। মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, খুলনা-৫ আসনে সংগঠিতভাবে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অর্থ ঢালছে একটি পক্ষ। উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডভিত্তিক কোটা নির্ধারণ করে বাড়ি বাড়ি টাকা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, কালো টাকার দাপটে রাজনীতি কলুষিত হচ্ছে এবং প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়বে।

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি প্রসঙ্গে জামায়াত প্রার্থী বলেন, প্রত্যেক থানার কাছে সন্ত্রাসী ও অপরাধীদের তালিকা থাকা সত্ত্বেও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার কিংবা পরিচিত সহিংসদের গ্রেপ্তারে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। তিনি দাবি করেন, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মধ্যে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও আন্তরিকতার অভাব রয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে সাইবার হামলার একটি বিস্তারিত অভিযোগও তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। তার দাবি, জামায়াতে ইসলামীর আমীরের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট এবং পরবর্তীতে তার নিজের টুইটার অ্যাকাউন্ট হ্যাক করা হয়েছে। তিনি জানান, তদন্তে একটি সরকারি দপ্তরের একজন কর্মকর্তার ই-মেইল থেকে ভারতীয় উৎসের ভাইরাস ব্যবহার করে এই হ্যাকিং করা হয়েছে বলে তাদের সাইবার টিম শনাক্ত করেছে। এ ঘটনায় সাইবার আইনে মামলা করা হয়েছে এবং ডিবি পুলিশ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ল্যাপটপসহ আটক করেছে বলেও তিনি দাবি করেন। তিনি আরও অভিযোগ করেন, ওই কর্মকর্তাকে ছাড়িয়ে নিতে উচ্চপর্যায়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়েছিল, তবে শেষ পর্যন্ত পুলিশ তাকে মুক্তি দিতে পারেনি।

মিয়া গোলাম পরওয়ার জানান, খুলনা-৫ আসনে মোট ১৫০টি ভোটকেন্দ্রের মধ্যে ৫২টি কেন্দ্রকে তারা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। এসব কেন্দ্রে ভোটারদের ভয় দেখানো, কেন্দ্র দখল, ব্যালট ছিনতাই ও আগাম ব্যালট সরানোর আশঙ্কা রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোর তালিকা প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মনিটরিং সংস্থার কাছে লিখিতভাবে দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার সদস্য ও জেলা আমীর মাওলানা এমরান হোসাইন, সেক্রেটারি মুন্সি মিজানুর রহমান, সহকারি সেক্রেটারি মুন্সি মইনুল ইসলাম, সহকারি সেক্রেটারি অধ্যাপক মিয়া গোলাম কুদ্দুস, সহকারি সেক্রেটারি প্রিন্সিপ্যাল গাউসুল আযম হাদী, জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সহ সভাপতি এডভোকেট্ আবুল খায়ের, আইনজীবী সমিতির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক এডভোকেট শেখ জাকিরুল ইসলাম প্রমুখ।

বটিয়াঘাটা বাজার চত্বরে বিশাল নির্বাচনী জনসভা

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, নির্বাচনের আগে বিভিন্ন কার্ড দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে আচরণবিধি লংঘন করা হচ্ছে। তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরে যারা দেশ শাসন করেছে তাদের কোন কার্ডের প্রলোভনে আর জনগণ পড়বে না, বরং এবার তাদের সবাইকে লাল কার্ড

দেখাতে হবে। জনগণ এখন রাজনৈতিক পরিবর্তন চায়। মানুষ লাঙ্গল, নৌকা ও ধানের শীষে ভোট দিয়েছে, এবার দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে দেশ বদলাতে চায়। তার মতে, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, অর্থপাচার ও দমন-পীড়নের রাজনীতির বিরুদ্ধে জনগণ ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। তিনি গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে জেলার বটিয়াঘাটা উপজেলার বটিয়াঘাটা বাজার চত্বরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী বটিয়াঘাটা উপজেলা শাখা আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় এসব কথা বলেন। বটিয়াঘাটা উপজেলা জামায়াত আমীর মাওলানা শেখ মোহাম্মদ আবু ইউসুফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় প্রধান বক্তা ছিলেন খুলনা-১ আসনের জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী। অন্যান্যের মধ্যে বক্তৃতা করেন, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য মাষ্টার শফিকুল আলম, খুলনা জেলা আমীর মাওলানা এমরান হুসাইন, সেক্রেটারি মুন্সী মিজানুর রহমান, সহকারী সেক্রেটারি মুন্সী মঈনুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের খুলনা জেলা সহ-সভাপতি অধ্যাপক মুফতি মাওলানা আব্দুল কাউয়ুম জমাদ্দার, কেলাফত মজলিসের জেলা সহ-সভাপতি এডভোকেট মুফতি ফিরোজুল ইসলাম, হরিণটানা থানা আমীর মো. আব্দুল গফুর, হাফেজ মাওলানা আশরাফ আলী, শ্রমিক নেতা মাহবুবুল আলম মিলন, মু. আর আমিন গোলদার, মলয় মন্ডল, এনসিপি নেতা নজরুল ইসলাম, মুফতি সালীমুল্লাহ, এডভোকেট প্রশান্ত কুমার বিশ্বাস, মো. জসিম, মো. আব্দুল হাই বিশ্বাস, এডভোকেট মনিরুল ইসলাম, অধ্যাপক ওয়াহিদুজ্জামান, মাওলানা হুমায়ুন কবীর, সেলিম বাহার, শাফায়েত হোসেন লিখন, মো. গালিব উদ্দিন, হাফেজ ক্বারী খালিদ বিন কাশেম প্রমুখ। প্রধান অতিথির বক্তৃতায় অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে মেধাবী ছাত্ররাই পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে। তারা দেখিয়ে দিয়েছে- অপপ্রচার আর টিকবে না। তিনি বলেন, তরুণদের এই পরিবর্তনের আকাক্সক্ষাই আগামী দিনের বাংলাদেশ গড়বে। ১১ দলীয় ঐক্যের প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ইসলামী চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও জুলাই আন্দোলনের চেতনা- এই তিনটি চেতনাকে একত্র করে আমরা একটি মানবিক, ইনসাফপূর্ণ বাংলাদেশ গড়তে চাই। বিএনপিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর আওয়ামী লীগ ছিল না, কিন্তু চাঁদাবাজি, দখল ও মানুষ হত্যা থেমে যায়নি। বাজারে, ঘাটে, হাটে যাদেও চাঁদাবাজি হয়েছে- মানুষ জানে কারা করেছে। সংখ্যালঘু ইস্যুতে অপপ্রচারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “হিন্দুদের ভয় দেখানো হচ্ছে- দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে শাখা-সিঁদুর থাকবে না, বোরকা পরতে হবে। এসব নির্লজ্য মিথ্যা। তিনি দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, হিন্দু হয়েও কৃষ্ণনন্দী যদি এমপি হন, তিনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করবেন। এজন্য তিনি খুলনা-১ আসনের জামায়াত মনোনীত ও ১১ দল সমর্থিত প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দীকে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিয়ে বিজয়ী করার আহবান জানান। নারী কর্মীদের ওপর হামলার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ভোট চাইতে গিয়ে আমাদের মায়েদের বোরকা টেনে খুলে দেওয়া হচ্ছে, এমনকি পেটে লাথি মারা হচ্ছে। যারা ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই মায়ের কাপড় খুলতে চায়, তারা ক্ষমতায় গেলে পুরো জাতিকেই বিবস্ত্র করতে চাইবে।