মহিব্বুল আরেফিন, আশরাফুল আলম কাজল, জুবায়ের হোসেন

সকল ধর্মের মানুষদের নিয়ে নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “রাজশাহীতে দুই ধরনের উন্নয়ন হয়েছে। কিছু অবকাঠামোগত উন্নয়ন- স্কুল-কলেজ, ইউনির্ভাসিটি, সামাজিক ও ব্যবসায়িক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ঘর-বাড়ি, রাসা-ঘাটের উন্নয়ন হয়েছে। আবার গত ৫৪ বছরে উন্নয়ন হয়েছে দুর্নীতি আর চাঁদাবাজির। উন্নয়ন হয়েছে মানুষের হক নষ্ট করার, ব্যাংক ডাকাতি করার, শেয়ার মার্কেট লুট করার, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পথে বসানোর, নিজেদের কপাল কিসমতের জন্য বাংলাদেশের টাকা বিদেশে পাচার করার। এই দুই ধরনের উন্নয়ন সারাদেশে হয়েছে, এখানেও হয়েছে। আমরা এক ধরনের উন্নয়ন চাই, দুই ধরনের উন্নয়ন চাই না। আমরা চাই জনগণের উন্নয়ন। আমার চাই সেই দেশ যেখানে শান্তিতে বসবাস করতে পারবো। আমরা সকল ধর্মের মানুষদের বুকে ধারণ করে বাংলাদেশ করতে চাই।”

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় রাজশাহী নগরীর ঐতিহাসিক মাদরাসা ময়দানে ১১ দলের নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথি বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রায় লক্ষ লোকের সমাবেশে রাজশাহীর এই সমাবেশ থেকে আমীরে জামায়াত দেশ ও জাতির চলমান সংকট, ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রব্যবস্থা, সুশাসন, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক অধিকার নিয়ে দিক নির্দেশনামূলক বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, ‘আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি জাতির বাঁক পরিবর্তন এবং জাতিকে সঠিক পথে উঠানোর নির্বাচন। আমরা আগামীতে একটা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।’

তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরা দুর্নীতি করবো না এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয়ও দেবো না। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী মহানগর জামায়াতের আমীর ও কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী ড. মাওলানা কেরামত আলী এবং যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন রাজশাহী মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দিন মন্ডল এবং জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি গোলাম মর্তুজা। এতে জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতুসহ ১১ দলীয় জোটের নেতারা বক্তব্য রাখেন। জনসভা ঘিরে কানায় কানায় পূর্ণ হয় মাদরাসা মাঠ। প্রায় ৬০ হাজার নারী কর্মীসহ দেড় লক্ষাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন। রাজশাহীর ৬টি আসনে ১১ দলীয় জোট মনোনীত এমপি প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা তুলে দেন জামায়াত আমীর।

ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেন, আমরা জাতিকে আর বিভক্ত করতে দেবো না। আমরা ঐক্যবদ্ধ জাতি নিয়ে এগিয়ে যেতে চাই। এজন্য আমাদের ১১ দলের স্লোগান হচ্ছে ঐক্যবদ্ধের বাংলাদেশ। আমাদের কথা সাফ আমরা আল্লাহর কাছে ও জনগণের কাছে ওয়াদাবদ্ধ, জনগণের রায়ের মাধ্যমে ভোটের মাধ্যমে যদি দেশ পরিচালনার সুযোগ দেন তবে ইনশাআল্লাহ আর কাউকে চাঁদাবাজী করতে দেবো না। ইনশাআল্লাহ এদেশে আর কারো দুর্নীতি করার সুযোগ থাকবে না। এই দেশে রাজার ছেলে রাজা হবে বংশানুক্রমিক পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি এই দেশে আর চলবে না। রাজনীতি হবে মেধা এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে, রাজনীতি হবে দেশপ্রেম প্রমাণের মাধ্যমে, এদেশে আধিপত্যের কোনো রাজনীতি আর চলবে না। প্রতিবেশীসহ সারা দুনিয়ার সাথে আমাদের চমৎকার সম্পর্ক থাকবে। সেই সম্পর্ক হবে সমতা এবং মর্যদার ভিত্তিতে। অমর্যাদাকর কোনো সম্পর্ক কোনো দেশের সাথে রাখতে চাই না। আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চাই। এ জন্য সোনার টুকরা সন্তানেরা সেদিন গুলিকে পরোয়া করেনি।

জনসভায় রাষ্ট্র পরিচালনায় জামায়াতের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও অঙ্গীকার তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে দেশের প্রতিটি শিশুর শিক্ষার ব্যয়ভার রাষ্ট্র বহন করবে। প্রাথমিক থেকে স্নাতকোত্তর (মাস্টার্স) পর্যন্ত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পড়াশোনার সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। শিক্ষাই হবে জাতি গঠনের প্রধান হাতিয়ার। তরুণ প্রজন্মের কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতা বেকার ভাতা চায়নি, তারা চেয়েছে কাজের অধিকার।’ যুবসমাজকে আশ্বস্ত করে তিনি জানান, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে তরুণদের সঠিক শিক্ষা ও পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানব সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এরপর তাদের হাতে তুলে দেয়া হবে যোগ্য ও সম্মানজনক কর্মসংস্থানের সুযোগ।

তিনি বলেন, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় আনুগত্য নয়, বরং যোগ্যতা ও দেশপ্রেমই হবে একমাত্র মাপকাঠি। একই সঙ্গে তিনি সবার ধর্মীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার সংরক্ষণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। পর্যটন শিল্পের প্রসঙ্গ টেনে জামায়াত আমীর বলেন, অবহেলা ও দুর্নীতির কারণে দেশের পর্যটন খাত আজ ধ্বংসের মুখে। ক্ষমতায় গেলে রাজশাহীর প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্রে রূপান্তর করা হবে, যা জাতীয় অর্থনীতিতে নতুন গতি আনবে এবং হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করবে।

রাজশাহী মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি ইমাজ উদ্দীন মন্ডলের সঞ্চালনায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, জামায়াতের নায়েবে আমীর ও রাজশাহী-১ (তানোর-গোদাগাড়ী) আসনের সংসদ প্রার্থী অধ্যাপক মুজিবুর রহমান। আমীরে জামায়াত মানবিক, বৈষম্যহীন, ন্যায় এবং ইনসাফের ভিত্তিতে বাংলাদেশ গড়ে তোলার অঙ্গীকার করে বলেন, যে বাংলাদেশে আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা-নারী-পুরুষ সকলেই নিরাপত্তা এবং মর্যাদার সাথে বসবাস করবেন। যার যার যোগ্যতা অনুযায়ী পেশাগত দ্বায়িত্ব পালন করবেন। এখানে ধর্মের ভিত্তিতে কারো পেশাগত মর্যদা বৃদ্ধি পাবে না। মর্যাদা পাবে যোগ্যতা এবং দক্ষতার ভিত্তিতে। এই দুইটা জিনিস যার মধ্যে পাওয়া যাবে কাজ অটোমেটিক্যালি তার হাতে চলে যাবে। তিনি আরো বলেন, প্রত্যেকটি বিভাগীয় নগরী প্রত্যেকটি জেলা কেন্দ্রে মেডিকেল কলেজ কায়েম করবো এবং বিশেষায়িত হাসপাতাল গড়ে তুলবো। আর যে সমস্ত জায়গায় শ্রমঘন জায়গা সে সব স্থানে শ্রমজীবিদের জন্য আলাদা বিশেষায়িত হাসপাতাল হবে। তারা যাতে সেবা নিতে গিয়ে কোনো ধরণের সমস্যায় না পড়েন। আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন ও গণভোটকে সামনে রেখে তিনি জনগণকে বিভেদ ভুলে ইনসাফ ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান। দুর্নীতিমুক্ত ও শোষণহীন বাংলাদেশ গড়তে ‘হ্যাঁ’ জয়যুক্ত করার মধ্য দিয়েই জনগণের মুক্তি নিশ্চিত হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে পুরানা রাজনীতিকে লাল কার্ড, নতুন বাংলাদেশ। যে রাজনীতি মানুষ খুন করে, যে রাজনীতি আয়না ঘর তৈরি করে, দেশপ্রেমিক নেতাদের খুন করে, আমার দেশের সমস্ত সম্পদ লুট করে, যে রাজনীতি ব্যবসায়ে রূপান্তর হয় সেই রাজনীতিকে আগামী ১২ তারিখ ইনশাল্লাহ্ লাল কার্ড। প্রথম ভোট ‘হ্যাঁ’ ভোট আর দ্বিতীয় ভোট নিয়ে বলেন আমীরে জামায়াত বলেন, যার অতীতেও খাসলত খারাপ ছিল এখনো যারা লোভ সামলাতে পারেনি সেই বিড়ালের হাতে মাছ পাহারা দেয়ার দ্বায়িত্ব দিবেন কি না প্রশ্ন রেখে বলেন, এরা রাষ্ট্রের-জনগণের মান, জাত এবং ইজ্জতের নিরাপত্তা এরা দিবে? এখনই দিচ্ছে না তখন দিবে? দিবে না। আফসোস, তারাও মজলুম ছিলেন কিন্তু কেনো যে এখন বদলে গেলেন বুঝতে পারলাম না এবং বিভিন্ন জায়গার দখলদারিত্ব নিতে গিয়ে নিজেদের ২৩৪ জনকে শেষ করেছেন। এরপরে আমাদের এখন গালি দেয়া শুরু হয়েছে। যাদের মানুষ মারা গেল, চাঁদাবাজি করেনা, যারা কাউকে কষ্ট দেয়না, যারা দুর্নীতি করে না, মামলা বাণিজ্য করে না, বিভিন্ন ধর্মের মানুষদের হয়রানি করে না তাদের এখন বলা হচ্ছে জালেম। এদের বলবো চোখ মেলে দেখেন জনগণ আপনাদের কীভাবে দেখে। যুবক-নারীদেরে উত্থান দেখে তাদের মাথা গরম হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাথা গরম করবেন না। তরুণরা ৫টি বিশ্ব বিদ্যালয়ে লাল কার্ড দেখিয়ে দিয়েছে। আগামী ১২ তারিখও হবে ফ্যসিবাদের বিরুদ্ধে লাল কার্ড। রাজশাহীর সমস্যা তুলে ধরে বলেন, এখানে একটি বহু পুরানা মেডিকেল কলেজ আছে। তার একটি ডেন্টাল ইউনিট করা হয়েছে কিন্তু ডেন্টাল কলেজ স্থাপন করা দরকার। এর উদ্যোগ নেয়া হলেও এটা ঘুমিয়ে পড়েছে। আমরা দেশ সেবার সুযোগ পেলে খুঁজে খুঁজে বের করবো সেবা দেয়ার জন্য কোথায় কি দেয়া দরকার। শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সোয়া তিন বছর শিল্প মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তখন বন্ধ, মৃতপ্রায় মিল-কারখানা, সুগার মিলসহ একটা একটা করে তালা খুলতে শুরু করেছিলেন। এক বছরের মাথায় সেই প্রতিষ্ঠানগুলোকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন। চুরি বন্ধ হবার কারণে এটা সম্ভব হয়েছিল। ইনশাআল্লাহ যদি আপনাদের রায়ের প্রতিফলন ঘটে ১৩ তারিখ থেকে বলা লাগবে না। তিনি বলেন, আমরা কারো চোখ রাঙানির পরোয়া করবো না। দেশের সম্পদ দেশের মানুষের জন্য ব্যবহারের সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে। তখন দেশের চাহিদা সব জায়গাতে পূরণ করা যাবে। এসময় তিনি রাজশাহীর ছয়টি আসনের প্রার্থীদের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন। সমাবেশ শেষে ‘জনসেবক’ এ্যাপ্সের উদ্বোধন করেন জুলাই আন্দোলনে শহীদ আঞ্জুম ও শহীদ আলী রায়হানের পিতাসহ ৬টি আসনের প্রার্থীগণ। উল্লেখ্য, মাদরাসা মাঠের নির্বাচনী সমাবেশে রাজশাহী মহানগর ও জেলার ৭টি উপজেলার নেতাকর্মী যোগ দেন।

রাজশাহী ব্যুরো : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “আমরা নিজেরা দুর্নীতি করবো না এবং কোনো দুর্নীতিবাজকে প্রশ্রয়ও দেবো না। সকলের জন্য ন্যায়বিচার হবে, এখানে কেউ রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। জুলাই সনদ এবং সংস্কারের সমস্ত প্রস্তাব মেনে নিয়ে তা বাস্তবায়নের ওয়াদা করতে হবে। এই তিন শর্তে যারা একমত হয়েছে তারা আমরা ১১ দলে একত্রিত হয়েছি। আমাদের ১১ দলে কোনো প্রার্থীর মাঝে কোনো ব্যাংক ডাকাত নাই। চাঁদাবাজ, ঋণখেলাপি, মামলাবাজ, নারী নির্যাতনকারী, মানুষের অধিকার হরণকারী নেই। আমরা বেছে বেছে গুণে গুণে চেষ্টা করেছি। আমরা আগামীতে একটা নতুন বাংলাদেশ গড়তে চাই।”

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজশাহীর গোদাগাড়ীর মহিষালবাড়ি মহিলা ডিগ্রি কলেজ মাঠে জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের পক্ষে এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আগামী ১২ তারিখের নির্বাচন কোনো সাধারণ নির্বাচন নয়। এটি জাতির বাঁক পরিবর্তন এবং জাতিকে সঠিক পথে উঠানোর নির্বাচন। বহু রক্তের বিনিময়ে আমরা এই নির্বাচন পেয়েছি। যারা বুক চিতিয়ে লড়াই করে চব্বিশ এনে দিয়েছিল আমাদেরকে, তাদের অনেকে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছেন। তাই আমরা ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়েছি। আমরা সমাজের সর্বক্ষেত্রে ন্যায় বিচার চাই। এই বাংলাদেশ হবে নতুন বাংলাদেশ।”

আমীরে জামায়াত জনসভায় রাজশাহী-১ (গোদাগাড়ী-তানোর) আসনের জামায়াতের প্রার্থী দলের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমানের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন। জনসভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক আব্দুল খালেক। এতে গোদাগাড়ী-তানোরের নেতাকর্মীরা অংশ নেন। এই জনসভায় নারী কর্মীদের জন্যও বসার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

আশরাফুল আলম সিদ্দিকী কাজল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ সংবাদদাতা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, আজকে এখানে জনস্রোত নেমেছে, আপনারা হয়তো ভাবছেন শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জে এ জনস্রোত। আল্লাহর শুকরিয়া তিস্তা পাড় থেকে শুরু করে সমুদ্রের পাড়, জাফলং থেকে সুন্দরবন, টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া সকল জায়গা আজ মুক্তির পক্ষে, ন্যায়ের পক্ষে, ইনসাফ ও মানবিক বাংলাদেশের পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। এ চাঁপাইনবাবগঞ্জ তার গর্বিত অংশীদার। কেন মানুষের এ গণজোয়ার। মানুষ বিগত ৫৪ বছরের শাসন হোক অপশাসন হোক, তা দেখেছে, ওইটা দেখতে দেখতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের জনগণ এবার পরিবর্তন দেখতে চাই।

গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর ১২টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের নবাবগঞ্জ সরকারি কলেজ মাঠে জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, কেউ আর বন্দোবস্তের রাজনীতি দেখতে চাই না। জুলাই যোদ্ধারা সেদিন রাস্তায় নেমে বলেছিল, আমরা সর্বক্ষেত্রে ন্যায় বিচার চাই। তার মানে হলো ন্যায় বিচার নাই। সেই ন্যায় বিচার আমরা প্রতিষ্ঠা করতে চাই ইনশাআল্লাহ। রাজার জন্য যে বিচার, সকলের জন্য সেই একই বিচার। একজন সাধারণ মানুষের অপরাধ করলে শাস্তি হবে যেটা, দেশের প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী একই অপরাধ করলে তাদেরকেও ছাড় দিয়ে কথা বলা হবে না। সেই বিচার আমরা বাংলাদেশে কায়েম করতে চাই। এই বিচার মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান, সাঁওতাল ও নৃগোষ্ঠি সকলের জন্য। এ বাংলার জমিনে যারা বসবাস করে বিচার তাদের সমান কায়েম করা হবে। ওই বিচার যখন কায়েম করা হবে, তখন আর বাংলাদেশে কাউকে চাঁদাবাজি করতে দেওয়া হবে না। চাঁদাবাজির রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে, চাঁদাবাজদের ধরে নিয়ে কাজে নিয়োগ দেওয়া হবে। তারা তখন দেশ গড়ার কাজে অংশগ্রহণ করবে ইনশাআল্লাহ।

তিনি আরও বলেন, মহানন্দা ও পদ্মা নদী মরুভূমি ও কঙ্কাল। আমরা নদীগুলোকে জীবন্ত করে তুলবো ইনশাআল্লাহ। নদীমাতৃক যোগাযোগ ব্যবস্থা ও নদীকে সম্পদে পরিণত করা হবে। পদ্মাতে যেখানে ব্যারেজ দিলে পানি পাওয়া যাবে সেখানে ব্যারেজ নির্মাণ করা হবে।

তিনি বলেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ উর্বর জেলা, আমের রাজধানী। আমের রাজধানীতে আম সংরক্ষণ করার মত কোন হিমাগার বা সংরক্ষানাগার নাই। পুরো উত্তরবঙ্গকে কৃষি শিল্পের রাজধানীতে পরিণত করবো। যেখানে বিশ্ববিদ্যালয় দরকার, সেখানে বিশ্ববিদ্যালয় হবে। যেখানে পরীক্ষাগার ও গবেষণাগার দরকার সেখানে তা গড়ে তোলা হবে। আম ও লিচুর প্রসেসিং করে সারাবছর খাওয়ানোর ব্যবস্থ্া করা হবে। ২য় রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে ইনশাআল্লাহ। এইভাবে বাংলাদেশে ও বিশ্বে চাঁপাইনবাবগঞ্জকে পৌঁছে দিতে চাই। আপনারা তৈরি আছেন তো, ইনশাআল্লাহ ১২ তারিখ ২ টি ভোট দেব। ১টি ভোট দিয়ে পুরাতন ব্যবস্থাপনাকে লাল কার্ড দেখাব নতুন ব্যবস্থাপনাকে স্বাগতম জানাবো। আরেকটি ভোট হচ্ছে হ্যাঁ ভোট, যা দিয়ে নতুন করে বাংলাদেশ সাজাতে চায়।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমীর মাওলানা আবুজার গিফারীর সভাপতিত্বে জনসভায় অন্যদের মধ্যে ঊক্তব্য রাখেন, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম, চাকসুর ভিপি ইব্রাহিম হোসেন রনি, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা)-এর সহ-সভাপতি ও দলীয় মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, রাজশাহী অঞ্চলের সহকারী জোন পরিচালক অধ্যাপক মোঃ রফিকুল ইসলাম, সাবেক এমিপি অধ্যাপক মোহা. লতিফুর রহমান, জেলা সেক্রেটারি আবু বক্কর, চাঁপাইনবাবগঞ্জ পৌরসভার সাবেক মেয়র মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম প্রমুখ। জনসভায় আরও বক্তব্য রাখেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ (সদর) আসনের প্রার্থী জননেতা নূরুল ইসলাম বুলবুল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ-১ (শিবগঞ্জ) আসনের প্রার্থী ড. মাওলানা কেরামত আলী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ (ভোলাহাট, গোমস্তাপুর ও নাচোল) আসনের প্রার্থী ড. মিজানুর রহমান। বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষের উপস্থিতিতে জনসমুদ্রে পরিণত হয়।

নওগাঁ সংবাদদাতা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘আমার এক্স আইডি (সাবেক টুইটার) হ্যাক করে গত কয়েক দিন ধরে আমার ওপর মিসাইল নিক্ষেপ করা হচ্ছে। যারা দেশকে গোলাম করে রাখতে চায়, পরিবারতন্ত্র কায়েম করতে চায়, তারাই আইডি হ্যাক করে মিথ্যাচার করছে। ইতিমধ্যে আমাদের সাইবার টিম বিষয়টি শনাক্ত করেছে এবং আটকও করা হয়েছে।’ গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা ১১টার দিকে নওগাঁ শহরের এটিম মাঠে জেলা জামায়াতে ইসলামী আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। জামায়াতে ইসলামীর আমীর বলেন, ‘এই দেশ আমাদের সবার। কোনো পরিস্থিতিতেই সংখ্যালঘু বা ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ভয়ের সংস্কৃতিতে থাকতে দেওয়া হবে না। আমরা সেই ভয় ভেঙে দিতে চাই।’ সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, ‘সাবেক ফ্যাসিস্ট সরকার আপনাদের পাশে সাঁওতালপল্লিতে (গাইবান্দার সাহেবগঞ্জ) কী করেছে আপনারা কি দেখেন নাই? তারা কি আমাদের ভাই-বোন না? তারা কি এ দেশের নাগরিক না? আমরা তাদের কথা দিচ্ছি, আমরা সবাইকে বুকে ধারণ করে সামনে আগাব। আমরা সকলের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করব।’ ঘরে ও কর্মস্থলে নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের অঙ্গীকার ব্যক্ত করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘মায়েদের জন্য ঘরে, চলাচলে, কর্মস্থলে সব জায়গায় মর্যাদা আর নিরাপত্তা এই দুইটা জিনিস নিশ্চিত করা হবে। কোনো জালিম সাহস করবে না নারী জাতির কারও দিকে চোখ তুলে তাকানোর। সেই পরিবেশ তৈরি করা হবে। এই অবস্থা দেখে অনেকে বেসামাল। এখনি যদি মাথা গরম করেন, চৈত্র মাসে কী করবেন। মাথা ঠান্ডা রাখেন। মানুষ কী ভাবছে, কান পেতে শোনেন। দেশ বাঁচলে আপনিও বাঁচবেন। এই ভোটটা আগামীতে হবে ইনশা আল্লাহ ইনসাফের প্রতীক।’ জামায়াত আমীর বলেন, ‘নারীদের হুমকি-ধমকি আর গায়ে হাত দেওয়া বন্ধ করেন। এগুলো যদি বন্ধ না রাখেন, তাহলে মনে করিয়ে দিতে চাই, জুলাইয়ের ১৫ তারিখে মেয়েদের গায়ে হাত দেওয়ার জন্য যেভাবে যুবক ভাইয়েরা গর্জে উঠেছিল, সেভাবে তারা আবার বিস্ফোরিত হবে, গর্জে উঠবে। মায়ের অপমান সহ্য করবে না।’ শফিকুর রহমান বলেন, শুধু রাজার ছেলে রাজা নয়, বংশ পরম্পরায় নেতা নয়; বরং আজকে যিনি কঠোর পরিশ্রম করে রিকশা চালান, নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তাঁর ছেলেরও যে মেধা আছে, সেই মেধাকে বিকশিত করে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী যেন বের হয়ে আসে। এভাবেই জমিদারি প্রথার রাজনীতি ভেঙে চুরমার হয়ে যাবে।

নওগাঁ জেলা জামায়াতের আমীর ও নওগাঁ-৪ আসনের জামায়াতের প্রার্থী আব্দুর রাকিবের সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য দেন নওগাঁ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি ও নওগাঁ-৫ আসনের জামায়াতের প্রার্থী আ স ম সায়েম, নওগাঁ-১ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মাহবুবুল আলম, নওগাঁ-২ আসনের জামায়াতের প্রার্থী এনামুল হক, নওগাঁ-৩ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মাহফুজুর রহমান, নওগাঁ-৬ আসনের জামায়াতের প্রার্থী খবিরুল ইসলাম, ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির প্রমুখ।

নাটোর সংবাদদাতা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, এবারের নির্বাচনে জনগনের ভোটে আল্লাহ জামায়াতে ইসলামীকে ক্ষমতায় নিলে সকলের জন্য ইনসাফ ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে। কারো দুর্নীতি মেনে নেয়া হবে না। একজন সাধারণ নাগরিক দুর্নীতি করলে লুটপাট করলে যেমন বিচারের আওতায় আনা হবে তেমনি প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতি দুর্নীতি করলে লুটপাট করলেও বিচারের আওতায় আনা হবে। তিনি বলেন, ছাত্ররা কোটার দাবীতে আন্দোলনে নেমেছিল। এক দিনে আবু সাঈদসহ ছয়জনকে হত্যা করা হয় এক পর্যায়ে আন্দোলন সরকারের পতন আন্দোলনে রুপ নেয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সেই আন্দোলনে বিরোধীরা ছাত্রীদের নির্যাতন করতেও বাদ দেয়নি। যার ফলে দেশের মানুষ আন্দোলনে অংশ নেয় হাজারো ছাত্র-জনতার লাশ ও রক্ত জাতিকে উপহার দিয়ে ৫ আগস্ট সেই সরকারের পতন হয়। সরকার পতনের পর আরেক দল রাতারাতি চাঁদাবাজীর সকল দপ্তর নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। দেশের মানুষ আর আগের মতো সন্ত্রাস চাঁদাবাজী লুটপাট দেখতে চায় না। দেশের মানুষ সন্ত্রাস চাঁদাবাজী লুটপাটে জড়িতদের আগামী ১২ তারিখে লালকার্ড দেখাবে। দেশের মানুষ এখন মুক্ত ভাবে কথা বলতে পারে। সভা সমাবেশে মা বোনেরা আসছে তাদের মতামত তুলে ধরছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টায় নাটোর নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা সরকারি কলেজ মাঠে জেলা ১১দলীয় জোট আয়োজিত নির্বাচনী বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এসব কথা বলেন।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে মদিনার আদলে দেশ গঠন করে জাতিকে উপহার দেয়া হবে। রাত দিন যেকোন সময় কোন নারী পথে বের হলে তাকে অসম্মানিত হতে হবে না। কেউ নারীকে অসম্মান করতে চেস্টা করলে তা কঠোর ভাবে দমন করা হবে।

নাটোর জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যাপক ড. মীর নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. সাদেকুর রহমানের সঞ্চালনায় গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলের ১১দলীয় জোট আয়োজিত নির্বাচনী বিশাল জনসভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম, জাগপা সভাপতি রাশেদ প্রধান, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিপি ইব্রাহীম হোসেন রনি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিএস এস এম ফরহাদ, নাটোর জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক মোঃ ইউনুস আলী, অধ্যক্ষ দেলোয়ার হোসেন খান, সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা আব্দুল হাকিম ও আতিকুল ইসলাম রাসেল, এনসিপির আহবায়ক আব্দুল মান্নাফ. এবং জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি জাহিদ হাসান প্রমুখ। বক্তব্য শেষে ডা. শফিকুর রহমান নাটোর-১ আসনের জামায়াতের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদ, নাটোর-২ আসনের জামায়াতের প্রার্থী জেলা নায়েবে আমীর অধ্যাপক মোঃ ইউনুস আলী, নাটোর-৪ আসনের জামায়াতের প্রার্থী মাওলানা আব্দুল হাকিম ও নাটোর-৩ আসনের জোট মনোনীত প্রার্থী এনসিপির জেলা সদস্য সচিব এস এম জার্জিস কাদির বাবুকে পরিচয় করিয়ে তাদের হাতে দলীয় পতীক তুলে দেন।