নির্বাচনে আসন সমঝোতা হওয়ার পর হাসিমুখে শরিকদের জায়গা করে দিচ্ছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। তারা তাদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিচ্ছেন এবং সেই আসনে নেতাকর্মীদের আগের মতোই কাজ করার আহ্বান জানাচ্ছেন। দীর্ঘদিন নির্বাচনী মাঠে কাজ করে নিজেদের মাঠ তৈরি করেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা। কিন্তু শেষ সময়ে এসে নিজেদের নির্বাচন থেকে সরিয়ে নিয়ে শরিকদের পক্ষে কাজ করার ঘোষণাকে বিরল এবং প্রসংশাযোগ্য বলে স্বীকৃতি দিচ্ছে মানুষ।
রোববার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাথে শরিকদের আসনভিত্তিক সমঝোতার কথা জানানো হয়। এর মধ্যে যাদের যেসব আসনে সমঝোতা হয়েছে; সেইসব আসন থেকে নিজ থেকেই প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিচ্ছেন জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা।
ঢাকা-১৩ আসনে শুরু থেকেই প্রার্থী হিসেবে কাজ করছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন। নানা সামাজিক কাজের আঞ্জাম দিয়ে মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন তিনি। এই আসনের অলিগলি চসে বেড়িয়েছেন তিনি। কিন্তু শেষ মুহুর্তে শরিকদের সাথে সমঝোতা হওয়ায় তিনি সরে দাঁড়ান। শেষ সময়ে এসে শরিক দল বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হককে শুভকামনা জানান। জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতা করে নির্বাচন করায় আসনটিতে মাওলানা মামুনুল হককে চূড়ান্ত প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। গতকাল সোমবার জানায়াতের নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইন তার ফেসবুক আইডিতে এক পোস্টে লেখেন, ঢাকা-১৩ সংসদীয় আসনে মাওলানা মামুনুল হকের জন্য আন্তরিক শুভকামনা। তিনি লেখেন, আলহামদুলিল্লাহ। সংগঠনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে দায়িত্ব পালনের পর আজ একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের অধ্যায় শেষ হলো। কেন্দ্রের নির্দেশনা অনুযায়ী ঢাকা-১৩ সংসদীয় আসনে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তুলতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলে মোহাম্মদপুর, আদাবর ও শেরেবাংলা নগর এলাকায় জামায়াতে ইসলামী ও দাঁড়িপাল্লার পক্ষে জনগণের ইতিবাচক সাড়া ও সমর্থন তৈরি হয়েছে, যা সাম্প্রতিক জরিপেও প্রতিফলিত হয়েছে- আলহামদুলিল্লাহ। ঢাকা-১৩ আসনের জনগণের উদ্দেশে তিনি বলেন, এই আসনের সম্মানিত জনগণ এবং আমার সঙ্গে কাজ করা সব ভাই-বোনের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। দায়িত্ব পালনের সময় কারও মনে কষ্ট দিয়ে থাকলে বিনীতভাবে ক্ষমাপ্রার্থনা করছি। আমরা সংগঠনের সিদ্ধান্তের প্রতি অবিচল থেকে ইনসাফ, ন্যায় ও মানবিক বাংলাদেশ গঠনে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে যাবো ইনশাআল্লাহ।
ঢাকা-৮ আসনে নির্বাচনের জন্য আগেই প্রার্থী ঘোষণা করেছিলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ওই আসনে মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দিন পাটওয়ারীকে প্রার্থী ঘোষণা করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। এদিকে জামায়াত-এনসিপি জোট হওয়ায় এ আসন থেকে প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নিয়েছেন জামায়াত নেতা ড. মো. হেলাল উদ্দীন।
সোমবার নিজের ফেসবুকে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়টি স্পষ্ট করেন হেলাল উদ্দীন। ওই পোস্টটি পরে নিজের ওয়ালে শেয়ার দিয়েছেন নাসিরুদ্দিন। সেখানে ক্যাপশন লিখেছেন, ‘ধন্যবাদ’। তিনি লিখেছেন, দেশ গঠনের বৃহত্তর স্বার্থে ও জুলাই বিপ্লবের অংশীজনদের ঐক্যের জন্য কেন্দ্রীয় সংগঠনের সিদ্ধান্তের প্রতি আন্তরিক সমর্থন জানাচ্ছি। ঢাকা- ৮ আসনে জনাব নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারির জন্য মন থেকে শুভকামনা রইলো। তিনি আরও লিখেছেন, ঢাকা-৮ আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আমাকে প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হয়েছিল প্রায় আট মাস আগে। সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত মেনে তখন থেকে কাজে নেমে পড়েছিলাম। ঢাকার এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে মনোনয়ন দেওয়ায় প্রথম দিকে মনে কিছুটা ভয় থাকলেও আত্মবিশ্বাসও ছিল। আমার সাংগঠনিক সহকর্মীরা আমাকে সাহস যুগিয়েছেন এবং সর্বোচ্চটুকু উজাড় করে সহায়তা করেছেন। ভাইদের পাশাপাশি বোনরাও রাতদিন খেটেছেন। বাসায় বাসায় গিয়ে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছেন। এর ফলে অল্প কয়দিনেই ঢাকা-৮ আসনে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে একটা গণজোয়ার তৈরি হয়েছে।
প্রত্যাশা ব্যক্ত করে জামায়াত নেতা হেলাল উদ্দীন লিখেছেন, এই গণজোয়ার তৈরিতে ভূমিকা রাখা আমার দ্বীনি ভাইরা আশাকরি প্রার্থী পরিবর্তনের এই সিদ্ধান্তে মন খারাপ করবেন না। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে সংগঠনের সিদ্ধান্তকে মেনে নেওয়ার অনুরোধ করছি। আমরা শুধু এই সিদ্ধান্ত মেনেই নেব না, জোটের প্রার্থীকেই আমাদের প্রার্থী হিসেবে ধরে নিয়ে আগের মতই কাজ করে যাব ইনশাআল্লাহ।
এই আসনের প্রার্থী ছিলেন শহীদ ওসমান হাদী। তাকে স্মরণ করে ডা. হেলাল লিখেছেন, ঢাকা-৮ আসনটি আরেক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই আসনেরই প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন শহীদ ওসমান বিন হাদী। আমি নিজে একজন জুলাই যোদ্ধা, সেই অবস্থান থেকে শহীদ হাদীর মতই জুলাইয়ের আরেকজন সম্মুখ সারির যোদ্ধা নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারিকে এই আসন দেওয়ায় তাকে স্বাগত জানাই। আমি তার সাফল্য ও মঙ্গল কামনা করছি এবং দোয়া করছি। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সকল প্রচেষ্টা তার সন্তুষ্টি এবং দ্বীন বিজয়ের জন্য কবুল করুন। আমিন।
ঢাকা -১১ আসন (রামপুরা-বাড্ডা-ভাটারা-হাতিরঝিল আংশিক) থেকে নির্বাচন করবেন জাতীয় নাগরিক পার্টিার আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এখানে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ছিলেন ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাবেক সভাপতি ও শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিজেকে নির্বাচন থেকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন। তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাসে বলেন,
সংগঠনের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির শুরু থেকে প্রায় ১১ মাস ধরে তিনি ঢাকা-১১ আসনে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার চেষ্টা করেছেন। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে জনগণের পাশে থাকার চেষ্টা করেছেন বলেও তিনি জানান। ধারাবাহিক প্রচেষ্টার ফলে এই আসনে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের নির্বাচনী প্রতীকের প্রতি বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সমর্থন তৈরি হয়েছে, যা সাম্প্রতিক জরিপেও প্রতিফলিত হয়েছে।
তিনি ঢাকা-১১ এলাকার (রামপুরা, বাড্ডা, ভাটারা ও হাতিরঝিলের অংশবিশেষ) সাধারণ মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, অল্প সময়ে তারা তাকে আপন করে নিয়েছেন। পাশাপাশি তার সঙ্গে কাজ করা সহযাত্রীদের ত্যাগ ও পরিশ্রমের কথাও স্মরণ করেন। পোস্টার লাগানো, দীর্ঘ সময় হাঁটাহাঁটি ও সাংগঠনিক কাজের জন্য তিনি সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
একইভাবে নারায়ণগঞ্জ মহানগরীর আমীর ও শিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি আব্দুল জব্বার এনসিপির প্রার্থীর প্রতি সমর্থন জানিয়ে প্রার্থীতা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছেন। পঞ্চগড়ে এনসিপির শীর্ষ নেতা সারজিস আলমের আসনেও একই ঘটনা ঘটে। সেখানেও জামায়াতের প্রার্থীর প্রার্থীতা সরিয়ে নেন। এমনিভাবে ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন জেলায় শরিকদের জায়গা করে দিয়ে নিজেদের নির্বাচন থেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘটনাকে নজিরবিহীন বলছেন রাজনীতিবিদরা। সেইসাথে দলের সিদ্ধান্ত এমন ভাবে ধারণ ও পালন করায় প্রসংশায় ভাসছেন তারা।
প্রসঙ্গত, জুলাইযোদ্ধাদের দল এনসিপি এবং বীর বিক্রম কর্নেল অলির দল এলডিপিসহ ইসলামী দলসমুহকে নিয়ে গড়ে ওঠা ১০ দলীয় জোট গঠন হওয়ার পর দেশের রাজনীতির চিত্র বদলে গেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। জুলাই যোদ্ধা এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে নিয়ে ইসলামীদলগুলোর ঐক্যবদ্ধ নির্বাচন ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়কে মানুষ সাধুবাদ জানাবে এবং আগামী নির্বাচনের বৈতরণি পার হতে সহজ করবে বলেই মনে করেন নির্বাচনবোদ্ধারা। গত কয়েক মাসের মাঠ পর্যালোচনা সেই চিত্র প্রকাশ পাচ্ছে বলেই ধারণা বিশ্লেষকদের।