জোবায়ের আলী, গাইবান্ধা : নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার সাথে সাথেই গাইবান্ধার পাঁচটি আসনের নির্বাচনী প্রচারণা জোরে সোরে চলছে। এই নির্বাচনী প্রচারণায় জামায়াতে ইসলামী এগিয়ে আছেন। পাশাপাশি বিএনপিও তাদের কার্যক্রম চালাচ্ছেন। তবে তাদের মধ্যে গ্রুপিং থাকায় প্রচারণায় কিছুটা ভাটা পড়েছে। অন্যান্য দলের সে রকম কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বরাবরই গাইবান্ধার এই পাঁচটি আসনে গত ১৫ বছরে ফ্যাসিস্ট সরকার ভোট ছাড়াই নির্বাচিত হয়েছিল। তার আগে এরশাদের আমলে এই পাঁচটি আসন জাতীয় পার্টির দখলে ছিল, কিন্তু ২৪ জুলাই পটপরিবর্তন হওয়ায় পর চিত্র সম্পন্ন পাল্টে গেছে। ইতোমধ্যেই জামায়াতে ইসলামী যেভাবে পাঁচটি আসনে তাদের প্রার্থী দিয়ে মাঠ সরগরম করেছেন এবং বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা-পরিচালনা চালাচ্ছেন তাতে জামায়াতে ইসলামী সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে। তাদের মনোনীত প্রার্থীরাও ভোটারদের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছেন। সভা-সমাবেশ, উঠানবৈঠক, সামাজিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের মাধ্যমে ভোটারদের কাছে নিজের উপস্থিতি শক্তিশালী করছেন।

গাইবান্ধা ১ সুন্দরগঞ্জ আসনটি অনেক আগ থেকেই জামায়াতের ঘাঁটি, এই আসনে দ্বিমুখী লড়াই হবে। তবে জাতীয় পার্টি অংশগ্রহণ করলে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ত্রিমুখী ও জটিল হবে। তবে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী ডা. জিয়াউর রহমান একেবারে নতুন ও অপরিচিত মুখ, অনেকে তাকে চেনেন না। সে দিক থেকে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী জননেতা অধ্যাপক মাজেদুর রহমান সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন।

জামায়াত প্রার্থী অধ্যাপক মাজেদুর রহমান মাজেদ বলেন, ‘গাইবান্ধা-১ আসনটি জামায়াতে ইসলামীর আসন। এ আসনে বিপুল ভোটে আমি বিজয়ী হব।’

গাইবান্ধা-২ (সদর) : এ আসনে নির্বাচনী হাওয়া বইতে শুরু করেছে জোরেশোরে। জেলা সদর হওয়ায় এই আসনটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জামায়াত প্রার্থী দলের জেলা শাখার আমীর ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল করিম সরকার বলেন, ‘আমি ইউপি ও উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান থাকাকালে অনেক উন্নয়ন করেছি। বিগত সরকারের আমলে বিনা দোষে ২৬ মাস কারাভোগ করেছি। এতে আমার ও দলের প্রতি মানুষের আস্থা বেড়েছে। আগামী নির্বাচনে বিপুল ভোটে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী। কেননা মানুষ আর কোন চাঁদাবাজ, মাস্তান, দখলবাজি কে পছন্দ করেন না। সে দিক থেকে জামায়াতের প্রতি মানুষের আগ্রহ আস্থা দিন দিন বাড়ছে। অপরদিকে ৮টি ইসলামী শক্তির ঐক্য হওয়ায় এখানে জামায়াতের একমাত্র মনোনীত প্রার্থী জননেতা আব্দুল করিমের বিজয়ের সম্ভাবনাই বেশি বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ আসনে অন কোন দলের সেরকম তৎপরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিএনপি এই আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীক তুলে দিয়েছেন বিশিষ্ট শ্রমিক নেতা ও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির গ্রাম সরকার বিষয়ক সম্পাদক আনিসুজ্জামান খান বাবুর হাতে। ভোটারদের মতামত, এ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে দ্বিমুখী। অর্থাৎ বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে জোর প্রতিযোগিতা হবে।

জেলা সদরের আসনটি বিএনপি ও জামায়াত দুই দলের কাছেই গুরুত্ব পাচ্ছে। এ কারণে প্রভাবশালী নেতাদের প্রার্থী করেছে দুই দলই।

বিএনপি প্রার্থী আনিসুজ্জামান খান বলেন, ‘গত তিনটি নির্বাচনে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এ কারণে এবার গণসংযোগের সময় প্রচুর সাড়া পাচ্ছি। ঐক্যবদ্ধভাবে নেতাকর্মীরা ধানের শীষের পক্ষে কাজ করছেন।’

গাইবান্ধা-৩ (পলাশবাড়ী-সাদুল্লাপুর) : দুটি উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসন। জেলা বিএনপির সভাপতি অধ্যাপক ডা. সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিককে দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে। তবে এ আসনে তাদের মধ্যে গ্রুপিং দলীয় কোন্দলের প্রভাব রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে যে ত্যাগী নেতাদেরকে এখানে কোন গুরুত্ব দেয়া হয় না। অপরদিকে জামায়াতের প্রার্থী দলের জেলা শাখার কর্মপরিষদ সদস্য ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম। ইতিমধ্যেই গোটা এলাকায় বিভিন্ন ধরনের প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দুটি উপজেলায় চষে বেড়াচ্ছেন এবং ভোটারদের সমর্থনে এগিয়ে আছেন।

বিএনপির সৈয়দ মইনুল হাসান সাদিক বলেন, ‘চিকিৎসক হওয়ার সুবাদে দুই উপজেলায় আমার প্রচুর জনপ্রিয়তা আছে। এ ছাড়া দলীয় নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধভাবে আমার পক্ষে কাজ করছেন। বিজয়ের ব্যাপারে আমি দৃঢ়ভাবে আশাবাদী।’

এ আসনে এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক (উত্তরাঞ্চল) নাজমুল হাসানের নাম শোনা যাচ্ছে।

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মাওলানা মোহাম্মদ আওলাদ হোসাইন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা শাহ আলম ফয়জী, গণঅধিকার পরিষদের মো. সুরুজ্জামানও নির্বাচন করতে মাঠে আছেন। তবে শেষ পর্যন্ত জাতীয় পার্টি নির্বাচন করতে পারবে কিনা, সেটি এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

গাইবান্ধা-৪ (গোবিন্দগঞ্জ) : এখানে বিএনপির মরহুম সংসদ সদস্য আবদুল মোত্তালিব আকন্দের ছেলে শামীম কাওছার লিংকনকে দলীয় প্রার্থী করা হয়েছে। তবে তার প্রার্থিতা বাতিল করার দাবিতে লাগাতার আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে বিএনপির একটি গ্রুপ। তা ছাড়া গহণ যোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে তার। সেই দিক থেকে জামায়াতের প্রার্থী সাবেক জেলা আমীর ডা. আব্দুল রহিম সরকার বেশ সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন। তিনি বর্তমানে বেশ সক্রিয় আছেন। ব্যাপক প্রচার চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।

এই আসনে প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন দলের প্রার্থী নির্বাচনী এলাকার একটি পৌরসভা ও উপজেলার ১৭ ইউনিয়নের বিভিন্ন ওয়ার্ডে সভা সমাবেশে অংশ নিচ্ছেন। তবে একটি গ্রুপ বিএনপির প্রার্থী পরিবর্তনের জন্য মাঠে সরব রয়েছে।

জামায়াত প্রার্থী জেলা জামায়াতের সাবেক আমীর ও কেন্দ্রীয় টিম সদস্য ডা. মো. আবদুর রহিম সরকার বলেন, ‘এর আগেও আমি চার দলীয় জোটের প্রার্থী ছিলাম, অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিলাম। আশাবাদী এ বারের নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ী হব।’

এ ছাড়া প্রচারে আছেন ইসলামী আন্দোলনের মুফতি সৈয়দ তৌহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মাওলানা সাইফুল ইসলাম। তবে জাতীয় পার্টির কাউকে এখনো সক্রিয় হতে দেখা যায়নি।

গাইবান্ধা-৫ (ফুলছড়ি-সাঘাটা) : এই আসনে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জামায়াতের ও বিএনপির নেতাকর্মীরা কোণঠাসা হয়ে ছিলেন। এরপরও আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির সক্রিয় ভূমিকা ছিল। তবে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এই আসনে বিএনপি বিভিন্ন গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়েছে। সরকার পরিবর্তনের পর নিজেদের মধ্যে কোন্দল ও কাদা ছোড়াছুড়িতে জড়িত হয়ে পড়েছে দলটির নেতাকর্মীরা।

এ আসনে জেলা বিএনপির সহসভাপতি ব্যবসায়ী ফারুক আলম সরকার দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। যদিও স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ঘোষণা দিয়েছেন জেলা বিএনপির বহিষ্কৃত সহসভাপতি নাহিদুজ্জামান নিশাদ।

বিএনপির প্রার্থী ফারুক আলম বলেন, ‘নাহিদুজ্জামানের সঙ্গে দলের কোনো সম্পর্ক নেই। তার প্রার্থিতা আমার নির্বাচনে কোনো প্রভাব ফেলবে না।’

তবে নাহিদুজ্জামান নিশাদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমি দলীয় প্রার্থী হওয়ার আশায় প্রচার চালাচ্ছি। যদিও এ আসনে প্রাথমিকভাবে দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। জনপ্রিয়তা ও সাধারণ মানুষের চাওয়াকে বিবেচনা করে দল আমাকে দলীয় প্রার্থী করার বিষয়ে একবার চূড়ান্ত বিবেচনায় নেবে বলে আমি আশাবাদী।’

এ আসনে প্রচার চালাচ্ছেন জামায়াত প্রার্থী দলের জেলা শাখার নায়েবে আমীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল ওয়ারেছ। তিনি বলেন, আমরা ফ্যাসিস্ট আমলে সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত। জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে, আসন্ন নির্বাচনে আমি এ আসনে এমপি হব।’

এনসিপির মাহমুদ মোত্তাকিম মণ্ডল, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মোহাম্মদ আজিজুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মুফতি ইউসুফ কাসেমী প্রার্থী হতে পারেন। তবে জাপার প্রার্থিতা নিয়ে দলটি দোটানায় রয়েছে। এ আসনে জামায়াতের মনোনীত প্রার্থী আব্দুল ওয়ারেছ ২টি উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে দিনরাত গণসংযোগ সহ বিভিন্ন মুখী প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি বলেন, বিগত সরকারের কুকীর্তির কারণে মানুষ আর কোন চাঁদাবাজি মাস্তানি দখলদারিকে পছন্দ করে না। তারা দেশপ্রেমিক জনগণের পক্ষে দেশের পক্ষে এলাকার উন্নয়নের স্বার্থে ইসলামী জ্ঞান সম্পন্ন নেতাকে বেছে নিতে চায় সে দিক থেকে বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল ওয়ারেছ এগিয়ে আছেন।