নুরুল আমিন মিন্টু, চট্টগ্রাম ব্যুরো : চট্টগ্রামে আবারও সক্রিয় হয়ে উঠছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ। গত কয়েক মাস ধরে বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন এলাকায় তাদের মিছিল, শোডাউন ও অবস্থান কর্মসূচির খবর পাওয়া গেলেও সম্প্রতি এসব কর্মকাণ্ডের মাত্রা বেড়েছে বলে দাবি করছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। সর্বশেষ সোমবার নগরীর জিইসি মোড় এবং আনোয়ারা উপজেলার চাতুরী চৌমুহনী এলাকায় পৃথকভাবে মিছিল করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এ নিয়ে চলতি মাসে চট্টগ্রামের বিভিন্ন স্থানে একাধিক মিছিলের ঘটনা সামনে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় রাজনীতিতে ক্ষমতাসীন বিএনপি, বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে চলমান উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ও রাজনৈতিক অবস্থানকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করছে নিষিদ্ধ সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভাজন ও ব্যস্ততার কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজর এড়িয়ে সংগঠনটি মাঠে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
স্থানীয় সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওচিত্র পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, গত কয়েক সপ্তাহে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন এলাকায় অন্তত কয়েক দফা মিছিল করেছে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা। এর মধ্যে নগরীর জিইসি মোড়, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, আগ্রাবাদ, চকবাজার, আনোয়ারা, পটিয়া, হাটহাজারী, বাঁশখালী এবং রাউজান এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে মিছিল বা শোডাউনের খবর পাওয়া গেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত এক মাসে চট্টগ্রাম মহানগর ও জেলার বিভিন্ন স্থানে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি মিছিল বা ঝটিকা শোডাউনের তথ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও স্থানীয় সূত্রে পাওয়া গেছে। যদিও এসব কর্মসূচির বেশিরভাগই ছিল স্বল্প সময়ের এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। মিছিলকারীরা সাধারণত আকস্মিকভাবে সড়কে নেমে স্লোগান দিয়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করে।
সোমবার সকালে নগরীর ব্যস্ততম জিইসি মোড়ে কয়েক ডজন নেতাকর্মীকে মিছিল করতে দেখা যায়। একই দিনে আনোয়ারার চাতুরী চৌমুহনী এলাকাতেও ছাত্রলীগের ব্যানারে একটি মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এসব মিছিলে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের পক্ষে বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দেশে রাজনৈতিক মেরুকরণ যত বাড়ছে, নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর জন্য তত বেশি সুযোগ তৈরি হচ্ছে নিজেদের পুনর্গঠনের। বর্তমানে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মধ্যে নানা ইস্যুতে মতবিরোধ ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা দৃশ্যমান। এসব পরিস্থিতিতে জনদৃষ্টির আড়ালে থেকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সাংগঠনিক যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের চেষ্টা করতে পারে।
একাধিক রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, চট্টগ্রাম ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের অন্যতম শক্তিশালী ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ফলে সংগঠনটির অনেক নেতাকর্মী এখনো এলাকায় অবস্থান করছেন এবং অনুকূল পরিস্থিতি পেলেই প্রকাশ্যে আসার চেষ্টা করছেন।
নগরবাসীর একটি বড় অংশ এসব মিছিল নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের আশঙ্কা, নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রকাশ্য কার্যক্রম ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সহিংসতার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও গুরুত্বপূর্ণ জনসমাগমস্থলে এ ধরনের কর্মসূচি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
জিইসি মোড় এলাকার কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, হঠাৎ মিছিল বের হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। অনেক সময় যান চলাচলেও বিঘ্ন ঘটে। তারা রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানান।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, যেকোনো ধরনের নাশকতামূলক কর্মকাণ্ড বা আইনবহির্ভূত রাজনৈতিক তৎপরতা প্রতিরোধে তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ও ছবির ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শনাক্ত করার কাজও চলমান রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রশাসনের একটি সূত্র জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রমের বিষয়ে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে নগরীর গুরুত্বপূর্ণ মোড়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সংলগ্ন এলাকা এবং জেলার বিভিন্ন উপজেলায় নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিষিদ্ধ ঘোষিত কোনো সংগঠনের ধারাবাহিক মিছিল কেবল আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়, এটি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সম্পর্কিত। যদি এসব কর্মকাণ্ড দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে বৃহত্তর রাজনৈতিক সংঘাতের ক্ষেত্র তৈরি হতে পারে।
তারা মনে করেন, রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক হলেও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সংঘাত ও বিভাজনের সুযোগ নিয়ে কোনো নিষিদ্ধ সংগঠন যেন পুনরায় সাংগঠনিক শক্তি সঞ্চয় করতে না পারে, সে বিষয়ে সরকার, রাজনৈতিক দল এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
চট্টগ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ধারাবাহিক মিছিল ও শোডাউন রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক অস্থিরতার এই সময়ে সংগঠনটির মাঠে সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা কতদূর গড়ায় এবং প্রশাসন কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকেই এখন নজর সংশ্লিষ্ট সবার।
সিএমপি (উত্তর) বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) আমিরুল ইসলাম বলেন, “জিইসি এলাকায় ছাত্রলীগের পক্ষ থেকে একটি ঝটিকা মিছিল হয়েছে। যেহেতু নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সকল রাজনৈতিক কার্যক্রমের ওপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে, তাই মিছিলে অংশগ্রহণকারী প্রত্যেককে আইডেন্টিফাই করা হচ্ছে। একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ ও অন্যান্য তথ্য বিশ্লেষণ করে তাদের শনাক্তের কাজ চলছে। শনাক্ত হওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অন্যদিকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (গণমাধ্যম) মো. রাসেল বলেন, “সংশ্লিষ্ট থানার ওসির সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, মিছিলটি কিছু সময় আগে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বর্তমানে এলাকায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। তবে এখন যদি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নামে কোনো মিছিল বা রাজনৈতিক কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে অবশ্যই আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”