২০০৭ সালের ৭ মার্চ বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয়ে রয়েছে। এই দিনে বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে কথিত দুর্নীতির মামলায় আসামী হিসেবে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের মইনুল রোডের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং এরপর তিনি অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। কিছু বিবরণ প্রকাশ্যে আসলেও পুরো চিত্র এখনো অনেকের কাছে অজানা। ২০০৭ সালের ২৮ নভেম্বর আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তারেক রহমান তার ওপর চালানো নির্যাতনের মর্মান্তিক বিবরণ দেন। শারীরিক অবস্থার ভয়াবহতা তুলে ধরতে আদালতে চিকিৎসকদের দেওয়া মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয়, নির্যাতনের ফলে তার মেরুদণ্ডের ছয় ও সাত নম্বর হাড় ভেঙে গেছে এবং আরও কয়েকটি হাড় বেঁকে গেছে। সেই নির্যাতনের চিকিৎসা নিতে ২০০৮ সালে ইংল্যান্ডে যান তারেক রহমান। তখন থেকেই দীর্ঘ প্রায় ১৮ বছর নির্বাসিত জীবন কাটিয়ে বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছেন তিনি। তার আগমন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে চলছে নানান আলোচনা। অনেকেই বলছেন, তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের চলমান রাজনীতিতে নতুন গতির সঞ্চার হবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ‘জিয়া পরিবার’ একটি কেন্দ্রীয় স্থান দখল করে আছে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান ছিলেন একজন সামরিক কর্মকর্তা, যিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন এবং স্বাধীনতা-পরবর্তী দেশের গতিপথ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। এ পরিবেশে বেড়ে ওঠা তারেক রহমান ছোটবেলা থেকেই শাসনব্যবস্থা, নীতিনির্ধারণের জটিলতা এবং নেতৃত্বের চ্যালেঞ্জগুলোর সঙ্গে পরিচিত হয়েছেন। অস্থির সময়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক উদারীকরণ এবং জাতীয় ঐক্যের প্রচারে জিয়াউর রহমানের প্রচেষ্টার বৈশিষ্ট্য তারেক রহমানের মধ্যে এখন দেখা যায়। মা বেগম খালেদা জিয়া দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন এবং জাতীয় রাজনীতিতে বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব হিসাবে রয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তার কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং জটিল রাজনৈতিক গতিশীলতা যথাযথভাবে পরিচালনা করার ক্ষমতা তারেক রহমানকে বিএনপির ভেতরে সিনিয়র নেতৃত্বের পদে নিয়ে যায়। বন্দীদশা এবং রাজনৈতিক নির্বাসনের সময়কালসহ উল্লেখযোগ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হওয়া সত্ত্বেও তারেক রহমান দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব হিসাবে রয়ে গেছেন। প্রতিকূলতার মুখে তার ধৈর্যশীলতা দলীয় সদস্য এবং সমর্থকদের মধ্যে তার প্রতি আনুগত্যকে অনুপ্রাণিত এবং তার নেতৃত্বের অবস্থানকে আরও সুসংহত করেছে।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে দেশের রাজনীতিতে একটি ইতিবাচক ও তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হিসেবে দেখছেন রাজনীতি বিশ্লেষক ও রাজনৈতিক নেতারা। তাদের মতে, দীর্ঘ নির্বাসিত জীবন শেষে দেশে ফেরা শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয় বরং আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে এটি রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন মাত্রা যোগ করবে। দীর্ঘ ফেরারি জীবন শেষে তারেক রহমানের দেশে ফেরায় বিএনপির তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত নেতা-কর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উচ্ছ্বাস দেখা দিয়েছে। ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় আনন্দ মিছিল চলছে। নেতা-কর্মীরা মনে করছেন, তার প্রত্যাবর্তনে দল সাংগঠনিকভাবে আরও সুসংহত হবে এবং মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয়তা বাড়বে।

সূত্র মতে, দীর্ঘ সময় দেশের বাইরে থাকার কারণে তারেক রহমান সরাসরি রাজনীতির মাঠে উপস্থিত ছিলেন না। তবে দলীয় সিদ্ধান্ত ও কৌশলগত দিকনির্দেশনায় তার ভূমিকা ছিল। এখন দেশে ফিরে সরাসরি রাজনীতিতে যুক্ত হওয়ায় বিএনপির রাজনীতি আরও দৃশ্যমান ও গতিশীল হবে। একই সঙ্গে এটি রাজনৈতিক প্রতিযোগিতাকে আরও তীব্র ও কার্যকর করে তুলতে পারে, যা গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য ইতিবাচক। বিশেষ করে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্ধারিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে তারেক রহমানের আগমনকে অনেকেই ‘টাইমিংয়ের দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ’ মনে করছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের প্রস্তুতি, জোট রাজনীতি, প্রার্থী বাছাই এবং মাঠপর্যায়ের কৌশল নির্ধারণে তার সরাসরি উপস্থিতি বিএনপির জন্য বাড়তি সুবিধা তৈরি করতে পারে। এতে দলটি নির্বাচনী রাজনীতিতে আরও আত্মবিশ্বাসী ভূমিকা নিতে পারবে। রাজনীতিবিদদের মতে, তারেক রহমানের দেশে ফেরায় রাজনৈতিক সমঝোতা, সংলাপ এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতার সংস্কৃতি জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তারা মনে করেন, দেশের বড় রাজনৈতিক শক্তিগুলোর শীর্ষ নেতৃত্বের সক্রিয় অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করে।

তবে সমালোচকরা বলছেন, প্রত্যাবর্তনের পর তার রাজনৈতিক ভূমিকা ও কৌশলই নির্ধারণ করবে তার দেশে ফেরা কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তারা আশা প্রকাশ করেন, তারেক রহমান দেশের রাজনীতিতে সহনশীলতা, গণতন্ত্র ও সাংবিধানিক ধারাকে প্রাধান্য দিয়ে এগিয়ে যাবেন।

বিএনপির এই শীর্ষ নেতার দেশে আসায় অন্যান্য রাজনৈতিক নেতারা বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। তারা বলছেন, তারেক রহমানের আগমনে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চা আরও বৃদ্ধি পাবে। রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার তুলনামূলক প্রতিযোগিতা বাড়বে।

দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বিদেশি একটি গণমাধ্যমকে বলেছেন, একজন রাজনৈতিক সহকর্মী দীর্ঘ ১৮ বছর পর সরাসরি রাজনীতির মাঠে ফিরছেন, এটিকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ারও ইতিবাচক হিসেবে দেখেন তারেক রহমানের দেশে ফেরার ঘটনাটিকে। তবে তিনি মনে করেন, তারেক রহমান কীভাবে ভূমিকা রাখবেন, তা জাতীয় রাজনীতিতে তার অবস্থান নির্ধারণ করবে।

ইসলামী আন্দোলন

বাংলাদেশের আমির মুফতি সৈয়দ মুহাম্মাদ রেজাউল করীম (চরমোনাই পীর) বলেছেন, তারেক রহমানের আগমন দেশের রাজনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব রাখবে। কারণ দেশের রাজনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা বিরাজ করছিল। বিশেষ করে বিএনপির মতো বৃহৎ একটি দল সরাসরি নেতৃত্ব বঞ্চিত ছিল। তারেক রহমানের আগমনে সেই শূন্যতা পূরণ হবে বলে আশা করা যায়।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বললেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর দেশে ফিরেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। একজন বাংলাদেশি নাগরিক ও রাজনৈতিক নেতার নিজ ভূমিতে ফেরার অধিকার পুনরুদ্ধার হওয়া গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের একটি ইতিবাচক প্রতিফলন।

জনপ্রিয় ইসলামী আলোচক মিজানুর রহমান আজহারীও তাকে স্বাগত জানিয়েছেন। নিজের ফেসবুক পেজে তিনি লিখেছেন, সুদীর্ঘ ১৮ বছর পর তারেক রহমান স্বপরিবারে দেশে ফিরেছেন। প্রিয় জন্মভূমিতে আপনাকে সুস্বাগতম। দেশের কল্যাণে নিবেদিত হোক আপনার এই প্রত্যাবর্তন।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ১৭ বছর নির্বাসনে থাকার পর দেশে ফিরেছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার এই প্রত্যাবর্তনে সমর্থকরা নতুন করে চাঙ্গা হবে বলে আশা করছে দল।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর দেশের নতুন প্রেক্ষাপটে দেশ পুনর্গঠন ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। অনেকেই আশা করেছিল, হাসিনার পতনের পর তারেক রহমান দ্রুতই দেশে ফিরবেন। বিএনপির পক্ষ থেকে বরাবরই বলা হয়েছে, তিনি শিগগিরই দেশে ফিরবেন। তার এই ফেরা নিয়ে জনগণের অপেক্ষা যেন শেষ হচ্ছিল না। গত ২৩ নভেম্বর তার মা বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া অত্যন্ত সংকটজনক অবস্থায় রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হলে সকলেই ধরে নিয়েছিল, এবার হয়ত তিনি দেরি না করে দেশে ফিরবেন। এ নিয়ে যখন নানা আলাপ-আলোচনা চলছিল, তখন তিনি তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে দেয়া পোস্টের এক অংশে লিখেছিলেন, দেশে ফেরার বিষয়টি তার একক সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে না। অন্তর্বর্তী সরকার সাথে সাথে তার পোস্টের প্রতিক্রিয়ায় বলেছে, দেশে ফিরতে তারেক রহমানের কোনো বাধা নেই এবং তার সর্বোচ্চ নিরাপত্তা দেয়ার পদক্ষেপ নেয়া হবে। অবশেষে তারেক রহমান দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

তারেক রহমানের দেশে ফেরার বিষয়ে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, তার এই প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছে। গতকাল শুক্রবার বাদ জুমা রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ২০০৬ সালের পর দীর্ঘ সময় নির্বাসিত থাকার পর তারেক রহমান বৃহস্পতিবার দেশে ফিরেছেন। তার এই প্রত্যাবর্তন ছিল রাজকীয় ও অভূতপূর্ব। দেশের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাকে সংবর্ধনা জানিয়েছেন এবং আনন্দ উচ্ছ্বাসে অংশ নিয়েছেন। জনগণ তাদের প্রিয় নেতাকে ফিরে পেয়েছেন।

বিএনপির মহাসচিব বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খুব কম নেতার পক্ষেই এমন স্বতঃস্ফূর্ত জনসমর্থন ও গণঅভ্যর্থনা পাওয়া সম্ভব হয়েছে। তরুণ ও সম্ভাবনাময় নেতৃত্ব হিসেবে তারেক রহমানকে আজ দেশের মানুষ শুধু নয়, বিশ্ব গণমাধ্যমও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দেখছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক আকাশে এখন সুবাতাস বইতে শুরু করেছে উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল আরও বলেন, তারেক রহমানের দেশে ফেরা শুধু একটি ব্যক্তিগত প্রত্যাবর্তন নয়, এটি দেশের রাজনীতিতে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এর মাধ্যমে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও জনগণের প্রত্যাশা বাস্তবায়নের পথ আরও সুগম হবে।

তারেক রহমান দেশে ফেরায় বাংলাদেশের বিদ্যমান রাজনৈতিক শূন্যতা অনেকটাই পূরণ হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম। তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে সত্যিকার অর্থেই কিছু রাজনৈতিক শূন্যতা রয়েছে, আর তারেক রহমানের আগমনে সেই শূন্যতা পূরণ হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থিয়েটার অ্যান্ড পারফরম্যান্স স্টাডিজ বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভূদৃশ্য সর্বদা কারিশম্যাটিক নেতাদের মাধ্যমে গঠিত হয়েছে, যাদের উত্তরাধিকার জাতির গতিপথকে প্রভাবিত করে চলেছে। সমসাময়িক ব্যক্তিত্বদের মধ্যে তারেক রহমান গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসাবে দাঁড়িয়ে আছেন, ঐক্যের প্রতীক এবং দেশের ভবিষ্যতের জন্য আশার আলো হিসাবে সমাদৃত। তার বক্তৃতা এবং নীতি প্রস্তাবগুলো প্রায়ই ন্যায়বিচার, সার্বভৌমত্ব এবং জাতীয় মর্যাদার বিষয়গুলোকে তুলে ধরে, যা স্থিতাবস্থায় হতাশ একটি প্রজন্মের জন্য আশার মহাবিন্দু হয়ে উঠেছে।