রেজাউল করিম রাসেল কুমিল্লা অফিস : আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের অন্যতম প্রাচীন জেলা কুমিল্লায় বইছে নির্বাচনী হাওয়া। ১৭টি উপজেলা, ১৮টি থানা, ৮টি পৌরসভা ও ১টি সিটি কর্পোরেশন নিয়ে এ জেলা গঠিত। ২০০১ সাল পর্যন্ত এ জেলায় সংসদীয় আসন ১২টি থাকলেও ২০০৮ সালে একটি কমিয়ে জেলার সংসদীয় আসন করা হয় ১১টি।
১১টি আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪৯ লাখ ৩১ হাজার ৫শত ৬৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার সংখ্যা ২৫ লাখ ৩৬ হাজার ৬শত ৪৮ জন। মহিলা ভোটার সংখ্যা ২৩ লাখ ৯৪ হাজার ৮শত ৩৩ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার সংখ্যা ৩৩জন।
কুমিল্লা জেলা মূলত জাতীয়তাবাদী ও ইসলামপন্থি অধ্যুষিত। রাজনৈতিকভাবে ‘কুমিল্লা উত্তর’ ও ‘কুমিল্লা দক্ষিণ’ জেলায় বিভক্ত । এর মধ্যে কুমিল্লা উত্তর জেলায় ৫টি ও দক্ষিণ জেলায় ৬টি আসন রয়েছে। এসব আসন একসময় বিএনপির দখলে ছিল। একটি আসনে জামায়াতে ইসলামীর আধিপত্য ছিলো।
তবে ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০২৪ সাল পর্যন্ত তিনটি একতরফা নির্বাচনে জেলার সবগুলো আসন আওয়ামী লীগ দখলে নেয়। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর পাল্টে যায় এ জেলার রাজনৈতিক দৃশ্যপট। জেলার প্রায় সবগুলো আসন এলাকায় ঘুরে দাঁড়িয়েছে বিএনপি।তবে পাঁচই আগস্ট আওয়ামী লীগের পতনের পর থেকে কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন স্থানে হাট-বাজার, বালু মহ ল, কলকারখানা, ঝুট ব্যবসা, পদপদবি, কমিটি গঠন, দখল, চাঁদাবাজি,মাদক ব্যবসা এবং এলাকায় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে দলের মধ্যে দ্বন্দ্ব ও বিভিন্ন জায়গায় বেপরোয়া হয়ে উঠেছে বিএনপি নেতাকর্মীরা।রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব খাটিয়ে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় এবং কমিটি গঠনের নামে নিজ দলের নেতাকর্মীদের থেকে অর্থ আদায়সহ নানা অনিয়ম দুর্নীতির কারণে দিন দিন তাদের জনপ্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছে। বিএনপি দু-একটি আসন বাদে সব আসনেই অভ্যন্তরীণ দ্বন্ধ চরম আকার ধারণ করেছে।এসব কারণে কুমিল্লায় ১১টি আসনে এবার ভরাডুবি হতে পারে দলটির।
এবার কুমিল্লার ১১টি আসনে চমক দেখাতে চায় জামায়াতে ইসলামী। অতীতের যে কোন সময়ের তুলনায় মজবুত ও শক্ত অবস্থানে কুমিল্লায় জামায়াতে ইসলামী। বিশেষ করে ডাকসু ও জাকসু নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পরই সাধারণ মানুষ জামায়াতের উপর আস্থা বেড়ে গেছে। জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়ে গেছে। তৃণমূল পর্যায়ে মানুষ জামায়াতের নেতৃত্ব দেখতে চায়।যেখানে দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী সেখানেই জনতার গণজোয়ার। ইতোমধ্যে ১১টি আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে জামায়াতে ইসলামী। প্রতিদিন কাকডাকা ভোর থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত গণসংযোগ,উঠান বৈঠক, মতবিনিময়, পথসভা,বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড ও সামাজিক কার্যক্রমে ব্যস্ত সময় পার করছে জামায়াত মনোনীত প্রার্থীরা। এর পাশাপাশি আগামী জাতীয় নির্বাচনে সংসদের উভয় কক্ষে পিআর পদ্ধতি চালু । অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) নিশ্চিত করা। ফ্যাসিস্ট সরকারের সব জুলুম-নির্যাতন, গণহত্যা ও দুর্নীতির বিচার দৃশ্যমান করা এবং স্বৈরাচারের দোসর জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা বিষয় জনমত গঠন করার লক্ষ্যে গণসচেতনতামূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে দলটি।
সদ্য নতুন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)’র নির্বাচন নিয়ে তোড়জোড় চোখে পড়েনি। তবে কুমিল্লা – ৪ দেবিদ্বারে অন্যতম কেন্দ্রীয় নেতা হাসনাত আবদুল্লাহ নিয়মিত এলাকায় নির্বাচনী উঠান বৈঠক, সভা-সমাবেশ এবং নানা উন্নয়ন কাজে অংশ নিচ্ছেন।
কুমিল্লা ৩ মুরাদনগরে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বিরতী দিয়ে এলাকায় আসলেও সেখানে বিএনপির সাথে তার রয়েছে সাপে নেউলে সম্পর্ক।
জেলার এসব আসনে হেভিওয়েট ও নবীন-প্রবীণ প্রার্থী মিলিয়ে এবার বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি,এবি পার্টি, গণঅধিকার পরিষদ ও ইসলামি দলগুলোর মনোনয়নপ্রত্যাশীর সংখ্যা অর্ধশতাধিক। ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষ্যে তারা সামাজিক ও রাজনৈতিকসহ নানা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নেমেছেন, যাচ্ছেন জনগণের দ্বারে দ্বারে।
কুমিল্লা-১ (দাউদকান্দি-মেঘনা)
দেশের অর্থনীতির লাইফলাইনখ্যাত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কঘেঁষা আসনটি স্বাধীনতা উত্তর নির্বাচনগুলোয় বিএনপি ছাড়া কোনো দলই প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি।দাউদকান্দি ও মেঘনা ২টি উপজেলা নিয়ে এই আসনটি গঠিত । দাউদকান্দি উপজেলা ১টি পৌরসভা ১৫ টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত।মেঘনা উপজেলা ৮টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত।এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৩৩ হাজার ৯৩৫ ভোট।এর মধ্য দাউদকান্দি উপজেলায় ৩ লাখ ২১ হাজার ১৬ ভোট, এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৬৩৭৪১ ভোট, মহিলা ১৫৭২৭৫ ভোট। মেঘনা উপজেলায়, ১ লাখ ১২ হাজার ৯১৯ ভোট, এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ৫৮৫৬৬ মহিলা ৫৪৩৫ ভোট। এই আসনে মোট পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২২ হাজার ৩শত ৭ ভোট এবং মহিলা ভোটার ২ লাখ ১১ হাজার ৬২৮ জন। ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নেতৃত্বে আসনটি বিএনপির দখলে ছিল। মাঝে দেড় দশক দখলে রাখে আওয়ামী লীগ। গত বছরের ৫ আগস্টের পর এ আসনের হিসাব-নিকাশও হচ্ছে ভিন্নভাবে। এ আসনে বিএনপির এই কেন্দ্রীয় নেতার বিপরীতে জামায়াতে ইসলামীর একক প্রার্থী দিয়েছে। এই আসনে দলটি কুমিল্লা উত্তর জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য ও দাউদকান্দি উপজেলা আমীর এবং সাবেক ইসলামী ছাত্রশিবির কুমিল্লা জেলা উত্তর ও দক্ষিণ সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান বাহলুলকে প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা দেওয়ায় তিনি মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন। নানা কর্মসূচির মাধ্যমে জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করছেন। এরই মধ্যে এবার জামায়াত, ইসলামী সমমনা দলগুলো নিয়ে আসনটিতে জোটগতভাবে নির্বাচন করলে বিজয়ী হতে পারে। তবে ইসলামী আন্দোলনের কুমিল্লা জেলা পশ্চিমের সাবেক সভাপতি মাওলানা বশির আহমেদকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। তিনিও বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে ভোটারদের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
কুমিল্লা-২ (হোমনা-তিতাস)
হোমনা ও তিতাস ২টি উপজেলা নিয়ে কুমিল্লা -২। হোমনা ১টি পৌরসভা ও ৯টি ইউনিয়ন পরিষদ নিয়ে গঠিত। তিতাস উপজেলা ৯টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এই ২ উপজেলায় মোট ভোটার ৩ লাখ ৭১ হাজার ১শত ৬৩ জন, এর মধ্য পুরুষ ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭৫২ জন, মহিলা ১ লাখ ৭৭ হাজার ৪শত ১০ জন ও ১জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার।
হোমনা উজেলায় মোট ভোটার ১ লাখ ৯৫ হাজার ৮ শত ৯৮ জন, ১ জন তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার। তিতাস উপজেলায় ১ লাখ ৭৫ হাজার ২শত ৬৫ জন। এই আসনে মহিলা ভোটার সংখ্যা বেশি।
জানা যায়, আসনটি একসময় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য এম কে আনোয়ারের শক্ত ঘাঁটি ছিল। তার মৃত্যুর পর ২০১৮ সালে এখানে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফকে প্রার্থী করেছিল বিএনপি। তিনি এবারও এখানে প্রার্থী হওয়ার ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে। পাশাপাশি এখানে দলের টিকিট বাগাতে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক (কুমিল্লা সাংগঠনিক বিভাগ) অধ্যক্ষ মো. সেলিম ভুঁইয়া এবং দলটির চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার সাবেক এপিএস ইঞ্জিনিয়ার আবদুল মতিন খান।
এ আসনটি আয়ত্তে নিতে তৎপর জামায়াতে ইসলামী। এখানে দলটি তাদের প্রার্থী ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সদস্য ও ঢাকা মহানগরী উত্তরের সহকারী সেক্রেটারি এবং হোমনা-মেঘনা উন্নয়ন ফোরামের চেয়ারম্যান নাজিম উদ্দিন মোল্লাকে। আগেই মনোনয়ন চূড়ান্ত হওয়ায় প্রচারে এগিয়ে আছেন তিনি। ইতিমধ্যে কেন্দ্র কমিটি, উঠান বৈঠক, বিভিন্ন সামাজিক কার্যক্রমে ব্যাপক তৎপর জামায়াতে ইসলামী। এই আসনে বিজয় নিশ্চিত করতে মরিয়া হয়ে মাঠ চষে বেড়িয়েছেন জামায়াত কর্মীরা। এদিকে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল আলমও মাঠে কাজ করছেন।
কুমিল্লা-৩ (মুরাদনগর)
কুমিল্লার সবচেয়ে বড় উপজেলা মুরাদনগর ২২টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত এই উপজেলা। উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৯৫ হাজার ১ শত ২ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ৫৫ হাজার ৩শত ৪২ জন পুরুষ, মহিলা ২ লাখ ৩৯ হাজার ৭শত ৫৬ জন ও ৪ জন হিজড়া ভোটার রয়েছে। এই আসনটি বিএনপির কেন্দ্রীয় বিএনপি ভাইস-চেয়ারম্যানসাবেক মন্ত্রী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেইন কায়কোবাদ এ এলাকায় ৫ বারের সংসদ সদস্য। তিনি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজনীতির মাঠে টিকতে না পেরে স্বেচ্ছায় নির্বাসনে চলে যান। দিনবদলের পর ফিরে এসে নানা সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবিক কর্মসূচি নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন।
আসন্ন নির্বাচনে তিনি এখানে বিএনপির একক প্রার্থী বলে বেশ প্রচারনা রয়েছে। তবে এবার এ আসনটি নিয়ে বিভিন্ন গুঞ্জনও রয়েছে। শোনা যাচ্ছে, এবার এখানে এনসিপির প্রার্থী হতে পারেন বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের সমন্বয়ক আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া । এ বিষয়ে তার বাবা একবার প্রকাশ্যে ঘোষণাও দিয়েছিলেন। তবে আসিফ মাহমুদ এখনো অর্ন্তর্বতী সরকারের উপদেষ্টার (স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়, যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়) পদে থাকায় বাস্তবে কী ঘটবে তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না। তবে বিষয়টি নিয়ে ইতোমধ্যে বিএনপি ও এনসিপির মধ্যে টানাপোড়েন চলছে। মাঝেমধ্যেই পাল্টাপাল্টি নানা অভিযোগও পাওয়া যাচ্ছে। এনসিপি এখানে বেশ সাড়া জাগিয়েছে। এছাড়া আসনটি বিএনপির ঘাঁটি হলেও জামায়াতে ইসলামী ও বেশ তৎপর। দলটির কুমিল্লা উত্তর জেলা কর্মপরিষদ সদস্য ইউসুফ হাকিম সোহেল এলাকায় পরিচিত মুখ। ২০০৯ সালে তিনি মুরাদনগর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন। এবার তিনি এই আসনে জামায়াত মনোনিত সংসদ সদস্য প্রার্থী। ঘোষনার পর থেকে কেন্দ্র ভিত্তিক গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতিমধ্যে তিনি এলাকায় তরুণ ভোটার মাঝে স্থান করে নিয়েছেন। এই আসনে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপি প্রার্থী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ এবং জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী ইউসুফ হাকিম সোহেল-এর মধ্যে বলে ভোটারদের মধ্যে আলোচনা হচ্ছে।
কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার)
কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়ক বুকে আগলে রেখেছে দেবীদ্বার উপজেলা। ১টি পৌরসভা ও ১৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত দেবীদ্ধার উপজেলা। মোট ভোটার ৪ লাখ ৬ হাজার ১শত ১০ জন। এর মধ্যে ২ লাখ ১২ হাজার ৩শত ২৬ জন পুরুষ। মহিলা ভোটার ১ লাখ ৯৩ হাজার ৭শত ৮১ জন ও ৩জন হিজড়া ভোটার রয়েছে।
এ আসনে জামায়াত তাদের একক প্রার্থী হিসেবে দলটির উত্তর জেলা সেক্রেটারি ও সাবেক উপজেলা ভাইস-চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম শহীদের নাম ঘোষণা দিয়েছে। তিনি এলাকায় নানা কর্মসূচি পালনসহ প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছেন। এ আসনে এখনো অন্য কোনো দলের তেমন তৎপরতা দেখা যায়নি। এই আসনে চমক দেখাতে চায় জামায়াত। উপজেলায় জামায়াতে ইসলামী কার্যক্রম অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ। দলের সবকটি অঙ্গ সংগঠন এবং শাখা-প্রশাখা অত্যন্ত সুদৃঢ়। এলাকায় আলোচনা চলছে তবে কি জামায়াত এবার চমক দেখাবে? উপজেলা জামায়াতে আমীর অধ্যাপক শহিদুল ইসলাম বলেন, আমরা মানুষের কাছে আমাদের আদর্শ তুলে ধরছি। নির্বাচনে দলীয় প্রার্থীকে বিজয়ী করতে আমাদের সব অঙ্গ সংগঠন মাঠে কাজ করছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আমাদের টার্গেট দেবিদ্বার থেকে সাইফুল ইসলাম সহিদকে বিজয়ী করা। মানুষ চাঁদাবাজ এবং ফ্যাসিবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। এতে আমাদের ভোট ব্যাংকের তারল্য বাড়ছে। আশা করি আগামী নির্বাচনে আমরা চমক দেখাতে পারব।
যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় আসনটির গুরুত্ব রয়েছে সব মহলে। যুগ যুগ ধরে এলাকাটি বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ধানের শীষের প্রতি রয়েছে ব্যাপক জনসমর্থন। তবে এবার দলটির আন্তঃকোন্দল এর কারণে পড়তে পারে নেতিবাচক প্রভাব। এখানে মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন সাবেক এমপি মঞ্জুরুল আহসান মুন্সি ও তার ছেলে কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ব্যারিস্টার রিজভিউল আহসান মুন্সি, কুমিল্লা উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য সচিব এএফএম তারেক মুন্সি।
আলোচনায় উঠে এসেছেন এনসিপি দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ। জানা গেছে, দলটির মনোনয়নে তিনি এ আসনে প্রার্থী হতে পারেন বলে প্রচারণা রয়েছে। তার প্রার্থীতার বিষয়টি নিশ্চিত হলে এখানে বিএনপির ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এখানে বিএনপির আন্তঃকোন্দল মেটাতে না পারলে দলটির একাংশ হাসনাতের পক্ষে কাজ করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
কুমিল্লা-৫ (বুড়িচং-ব্রাহ্মণপাড়া)
জেলার বুড়িচং ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নিয়ে গঠিত এ আসনটিতে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭০ হাজর ৯৯৩ জন। এর মধ্য পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৪৩ হাজার ৮৫০ জন। মহিলা ২ লাখ ২৭ হাজার ১৪৩ জন। বুড়িচং উপজেলা মোট ভোটার ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯১৩ জন। বি-পাড়া মোট ভোটার ১ লাখ ৯৮ হাজার ৮০ জন।
জামায়াতে ইসলামী ড. মোবারক হোসেনকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে। তিনি জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় মজলিশ শূরা সদস্য ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি। এলাকায় তিনি প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন। প্রার্থী ঘোষণার পর থেকে বিভিন্ন সামাজিক কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি। ইতিমধ্যে দুইটি উপজেলার বিভিন্ন কেন্দ্র কমিটি গঠিত হয়েছে। কেন্দ্রভিত্তিক গ্রামে পাড়া মহল্লায় কাজ করে যাচ্ছে জামায়াত কর্মীরা। এই আসনে বুড়িচং উপজেলা নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী ভাইস-চেয়ারম্যান হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন এড.সাইফুল ইসলাম এবং বি-পাড়া উপজেলায় ভাইস-চেয়ারম্যান হিসাবে নির্বাচিত হয়েছেন মাওলানা মিজানুর রহমান আতিকী।দুটি উপজেলায় জামায়াতের কার্যক্রম মজবুত। বিএনপির আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এ আসনে বিপুল ভোটে জামায়াত প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । তরুণ প্রজন্মের কাছে ড. মোবারক একটি জনপ্রিয় নাম।
এই আসনে স্বাধীনতার পর শুধু ২০০১ সালে এখানে বিএনপি জয়লাভ করেছিল। এ ছাড়া প্রতিবার মনোনয়ন বিতর্কে ডুবেছেন দলটির প্রার্থীরা। আসন্ন নির্বাচনে এ আসনে বুড়িচং উপজেলা বিএনপির সভাপতি এটিএম মিজানুর রহমান, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব ও ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি হাজী জসিম উদ্দিন, অর্ন্তর্বতী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের আইনজীবী ব্যারিস্টার আবদুল্লাহ আল মামুন, কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি এএসএম আলাউদ্দিন ভূইয়াঁ প্রার্থী। বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে সম্ভাব্য প্রার্থীদের অংশগ্রহণ ও প্রার্থীতা জানান দেওয়ার রীতিমতো প্রতিযোগিতা চলছে। এতে নির্বাচনের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে আসন এলাকায়।
এদিকে এ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কোনো প্রার্থীর প্রচারণা এখনো দেখা যায়নি। তবে সতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে আওয়ামী লীগ নেতা ব্যারিস্টার সোহরাব ও এবি পার্টির কেন্দ্রীয় নেতা এড জোবায়ের প্রার্থী হবে বলে জানা গেছে। এ আসনে এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদের তৎপরতা লক্ষ্য করা যায়নি।
কুমিল্লা-৬ (আদর্শ সদর, সিটি করপোরেশন ও ক্যান্টনমেন্ট এলাকা এবং সদর দক্ষিণ উপজেলায় নিয়ে গঠিত)
কুমিল্লা সদর ও সদর দক্ষিণ উপজেলায় মোট ভোটার ৬ লাখ ৩১ হাজার ৮ শত ৮৬ জন।
এর মধ্যে সদর উপজেলায় ২ লাখ ৪০ হাজার ৮শ ৬ জন। কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশন এলাকায় ২ লাখ ৫২ হাজার ৩শত ১৮ জন। কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় ৪ হাজার ৭৭ জন, সদর দক্ষিণ উপজেলায় ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬শত ৮৫ জন।
জেলার কেন্দ্রস্থল ও গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে বিএনপি শক্ত অবস্থানে রয়েছে। বিষয়টি মাথায় রেখেই প্রভাব বিস্তারের চেষ্টায় আছে জামায়াতসহ অন্য ইসলামি দল।
এই আসনে সাবেক নৌ পরিবহন মন্ত্রী মরহুম কর্নেল আকবর হোসেনের মৃত্যুর পর কুমিল্লা -৬ আসনে বিএনপি আর বিজয়ী হতে পারেনি। এ আসনে বিএনপির অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চরম আকার ধারণ করেছে।
বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা হাজী আমিনুর উর রশিদ ইয়াছিন, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের সাবেক মেয়র মনিরুল হক সাক্কু ও বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মনিরুল হক চৌধুরীর দ্বন্দ্ব চলছে প্রকাশ্যে। তাদের এই দ্বন্দ্ব নিরসন করে কোনভাবেই সকল পক্ষকে এক সাথে করে মনোনয়ন দেয়া বিএনপির পক্ষে সম্ভব হবে না মনে করে বিএনপি নেতাকর্মীরা। এদিকে বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপি চেয়ারর্পাসনের উপদেষ্টা হাজী আমিনুর রশীদ ইয়াছিনকে, চ্যালঞ্জে ছুড়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে মাঠে নেমেছে সাবেক সিটি মেয়র মনিরুল হক সাক্কু।
অন্যদিকে সর্বশক্তি দিয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াতে ইসলামী। মহানগরী জামায়াতের আমীর কাজী দ্বীন মোহাম্মদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে দলটি।
ক্লিন ইমেজ, সৎ ও গ্রহণযোগ্য প্রার্থী হিসেবে জামায়াতের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী কুমিল্লা -৬ আসনের ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে সকল শ্রেণী পেশার মানুষের কাছে জনপ্রিয় মানুষ হিসাবে ইতোমধ্যে স্থান করে নিয়েছেন।
সিটি এলাকা থেকে শুরু করে ইউনিয়ন, ওয়ার্ড এমনকি গ্রাম পর্যায়ে নেতাকর্মীরা গণসংযোগ উঠান বৈঠকে সরাসরি গণসংযোগ করছেন তিনি। এরই মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা কমিটি গঠন করা সম্পন্ন করেছে। এ আসন থেকে অতীতে জামায়াত প্রার্থী হয়ে সংসদে যাননি। জামায়াত মনোনীত প্রার্থীকে সংসদে পাঠাতে ব্যাপকহারে জনসংযোগ করছেন জামায়াত কর্মীরা।প্রতিদিন কাক ডাকা ভোর থেকে রাত পর্যন্ত চলে নির্বাচনী সভা সমাবেশ। চালাচ্ছে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কার্যক্রম।বিভিন্ন এলাকা ঘুরে মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন তারা। কুমিল্লা নগরীর অধিকাংশই স্কুল কলেজ মাদ্রাসা হসপিটাল সামাজিক প্রতিষ্ঠান জামায়াত নেতৃবৃন্দ দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের মাঝে গ্রহণযোগ্যতা বেশি। তবে পূর্ব থেকেই এ অঞ্চলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের আধিপত্য বেশি হওয়ায় আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে বিএনপি নেতাদের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে কৌশলে জামায়াতের বিজয়ই অনেকটা নিশ্চিত বলছেন সংশ্লিষ্টরা। এ আসনে অন্য কোনো দলের তৎপরতা এখনো তেমন লক্ষ্য করা যায়নি।
কুমিল্লা-৭ (চান্দিনা)
চান্দিনা উপজেলা ১টি পৌরসভা ও ১৩টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এই উপজেলা মোট ভোটার সংখ্যা ৩লক্ষ ২৫ হাজার ৪শত ৮৪ জন। এরমধ্য পুরুষ ১ লাখ ৬৬ হাজার ৯শত। মহিলা ১ লাখ ৫৮ হাজার ৫শত ৭৮ জন। ৬ জন হিজড়া ভোটার।
এ আসনটি লিবারেল ডেমোক্রেসি পার্টি (এলডিপি)। দলটির মহাসচিব সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা ড. রেদোয়ান আহমেদ এ আসনের চারবারের সংসদ সদস্য। তিনি দলটির প্রার্থী হিসেবে এলাকায় ব্যাপক গণসংযোগ করছেন। তিনি বিএনপির সম্ভাব্য জোট থেকে এবার মনোনয়ন পাবেন বলে এলাকায় প্রচারণা রয়েছে। তবে এখানে উপজেলা বিএনপির সভাপতি আতিকুল আলম শাওন দলীয় মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।
অপরদিকে জামায়াতে ইসলামী ইতোমধ্যে দলীয় প্রার্থী হিসেবে উপজেলা জামায়াতে নায়েবে আমীর মাওলানা মোশাররফ হোসেনের নাম ঘোষণা করেছে। প্রার্থী ঘোষণার পরপরই প্রতিটি পাড়ায় মহল্লায় নির্বাচনী গণসংযোগ করছেন। ব্যক্তিগতভাবে তিনি একজন মাদ্রাসার শিক্ষক। এলাকার সর্ব মহলে স্বজ্জন ব্যক্তি।ইতিমধ্যে তিনি চান্দিনা উপজেলার দল-মত নির্বিশেষে একজন সুপরিচিত ব্যক্তি হিসেবে প্রকাশ পেয়েছে। উপজেলার সর্বত্র গণসংযোগ, সমাবেশ করছেন।
এ ছাড়া ইসলামী আন্দোলনের হয়ে মাঠে সরব আছেন মুফতি এহতেশামুল হক কাসেমী। তবে এই আসনে বিএনপি এবং এলডিপির গ্রুপিং বিজয়ী হতে পারে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী মাওলানা মোশাররফ হোসাইন।
কুমিল্লা-৮ (বরুড়া)
বরুড়া উপজেলাটি কৃষিভিত্তিক অর্থনীতিতে কুমিল্লা ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। কচু ও লতি চাষের জন্য বরুড়া উপজেলা পরিচিত। উপজেলাটি ১টি পৌরসভা ১৫টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৭৭ হাজার ১শত ৬০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৯৩ হাজার ৯শত ১৩ জন। মহিলা ভোটার ১ লাখ ৮৩ হাজার ২৪২ জন। হিজড়া ভোটার ৫ জন।
এই আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী ঘোষণা করেছে জামায়াতে ইসলামী। কুমিল্লা ইবনে তাইমিয়া স্কুল এন্ড কলেজ অধ্যক্ষ ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা জামায়াতের কর্মপরিষদ সদস্য অধ্যাপক মু. শফিকুল আলম হেলাল। প্রার্থিতা ঘোষণার পরপরই প্রার্থীতা জানান দিতে পুরো উপজেলা পোষ্টার ব্যানার মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার-প্রচারনা করছেন, নির্বাচনী দায়িত্বশীল সমাবেশ, উঠান বৈঠক, কেন্দ্র ভিত্তিক বৈঠক, বাড়ি বাড়ি গিয়ে দাঁড়ি পাল্লা প্রতিকের পক্ষে ভোট চেয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন তিনি।প্রতিটি ওয়ার্ড গ্রামে গ্রামে একাধিকবার গণসংযোগ ও মতবিনিময় সভা করেছেন।পুরো বরুড়া উপজেলা অধ্যাপক শফিকুল আলম হেলাল পক্ষে গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছে। প্রার্থীতা ঘোষণার পর উপজেলায় জামায়াতে ইসলামী কার্যক্রম অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সমৃদ্ধ হয়েছে। দলের সবকটি অঙ্গ সংগঠন এবং শাখা-প্রশাখা অত্যন্ত সুদৃঢ়।
এ আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির কর্মসংস্থানবিষয়ক সম্পাদক ও কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি সাবেক এমপি জাকারিয়া তাহের সুমন। কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি মুরতাজুল করিম বাদরু এ আসনে মনোনয়ন চাইবেন বলে জানা গেছে।
ইতোমধ্যে জাকারিয়া তাহের সুমনের পক্ষে ইউনিয়ন ভিত্তিক প্রচার প্রচারণা চালাচ্ছে দলীয় নেতাকর্মীরা। অনেকটা একক প্রার্থী বলে এলাকায় প্রচারণা রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা শরিফুল ইসলাম জানান, প্রায় ৪৪ বছরের এই উপজেলাটি জেলার অন্যসব উপজেলা থেকে অবকাঠামগতভাবে অনেকটা একটা পিছিয়ে আছে। এ যাবত কালে যারা এমপি হয়েছেন তারা নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন। বরুড়াবাসী নিয়ে তাদের তেমন কোন পরিকল্পনা ছিল না। বিগত দিনে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। রাস্তা ঘাট এতোটাই অনুন্নত যে পায়ে হেঁটে বাড়ি পর্যন্ত যেতে পারে না মানুষ। আগামীর বরুড়া গড়তে শফিকুল আলম হেলাল বিকল্প আমরা দেখছি না।
নজরুল ইসলাম নামে এক শিক্ষক বলেন, বরুড়া উপজেলাবাসী আজ গর্বিত দীর্ঘদিন পর আমরা হেলাল স্যারের মত একজন শিক্ষাবিদ পেয়েছি। যার সৎ দক্ষ নেতৃত্বে বরুড়া হবে একটি মডেল উপজেলা।
এ আসনে এনসিপির ছাত্র সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি আবু বাকের মজুমদার প্রার্থী হতে পারেন বলে জানা গেছে। তবে নির্বাচনি মাঠে এনসিপি বা অন্য কোনো দলের প্রচার-প্রচারনা এখনো লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। এছাড়া এ আসনে কেন্দ্রীয় ওলামা পার্টির সভাপতি মাওলানা ইরফান-বিন তোরাব আলী, জাকের পার্টির বরুড়া উপজেলা সভাপতি মুফতি মাওলানা শরীফ উদ্দিন, বাংলাদেশ ইসলামী যুবসেনা কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মাওলানা মাসুদ আলম পাটোয়ারী, খেলাফত আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মাওলানা আবুল ফারাহ মুহাম্মদ আবদুল আজিজ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন বলে এলাকায় প্রচারণা রয়েছে। তবে তাদেরকে এখনো সভা-সমাবেশ বা গণসংযোগে দেখা যায়নি। সবমিলিয়ে এখানে বিএনপি-জামায়াতের গণসংযোগ ও প্রচার-প্রচারনা বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
আলেম উলামা অধ্যুষিত হওয়ায় এবং অনেক ভোটার ধর্মপ্রাণ হওয়ায় বড় ভোট ব্যাংক রয়েছে এসব ইসলামী দলের। যার ফলে নির্বাচনে ফলাফল হওয়ার ক্ষেত্রে এসব ভোট যার পাল্লায় যাবে তারই জয়ী সম্ভবনা বেশি থাকে।ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর নির্বাচনী ঐক্য বা সমঝোতা হলে এই আসনে জামায়াত মনোনীত প্রার্থী বিপুল ভোটে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ)
লাকসাম-মনোহরগঞ্জ ২টি উপজেলা নিয়ে গঠিত কুমিল্লা-৯ নির্বাচনী আসন। লাকসাম উপজেলা ১টি পৌরসভা ও ৮টি ইউনিয়ন এবং মনোহরগঞ্জ উপজেলা ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৭৩ হাজার ৭৫ জন। এর মধ্যে লাকসাম উপজেলা ২ লাখ ৪৫ হাজার ৩শত ৪৮ জন। মনোহরগঞ্জ মোট ভোটার সংখ্যা ২ লাখ ২৭ হাজার ৭শত ২৭ জন।
জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী হিসেবে ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী কেন্দ্রীয় মজলিশ শূরা সদস্য ও দক্ষিণ জেলা জামায়াতের সেক্রেটারী সাবেক লাকসাম উপজেলা পরিষদের নির্বাচিত ভাইস-চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ একেএম সরওয়ার উদ্দিন ছিদ্দিকী।ইতোমধ্যে লাকসাম-মনোহরগঞ্জ উপজেলার প্রতিটি ভোট কেন্দ্র কমিটি, উঠান বৈঠক, নির্বাচনি দায়িত্বশীল সমাবেশসহ ব্যাপক প্রচার প্রচারণা চালিয়েছেন। এছাড়া তিনি লাকসামে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতালসহ জনগণের কল্যাণে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করেছেন। মানবিক মানুষ হিসাবে তার যথেষ্ট সুনাম ও খ্যাতি রয়েছে।
জেলার এ আসনটিতে বিএনপির একাধিক নেতা মনোনয়নপ্রত্যাশী। এদের মধ্যে আলোচনায় দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির শিল্প বিষয়ক সম্পাদক এবং লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি আবুল কালাম। এছাড়া সাবেক এমপি মরহুম কর্নেল (অব.) এম আনোয়ার উল-আজিমের মেয়ে সামিরা হোসেন দোলা, নেক্সাস গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক শ্রমবিষয়ক সম্পাদক ড. রশিদ আহমদ হোসাইনী, সাবেক এমপি অ্যাডভোকেট এটিএম আলমগীরের ভাই সাবেক জনপ্রশাসন সচিব ড. একেএম জাহাঙ্গীর।
এছাড়া ইসলামিক ফ্রন্টের প্রার্থী মীর মো. আবু বাকার, ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী সেলিম মাহমুদ,।তবে তাদের কোন প্রচার প্রচারনা নেই।
এই আসনে বিএনপির আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারনে কারণে এ আসনে বিপুল ভোটে জামায়াত প্রার্থী নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
কুমিল্লা -১০ (সদর দক্ষিণ, লালমাই ও নাঙ্গলকোট)
কুমিল্লা-১০ আসনটি জেলার লালমাই ও নাঙ্গলকোট- ২টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ২৯ হাজার ৮শত ৬০ জন। এর মধ্যে লাঙ্গলকোট উপেলায মোট ভোটার, ৩ লাখ ৫৭ হাজার ৬৫ জন, লালমাই উপজেলায় ১ লাখ ৭২ হাজার ৭শত ৯৫ জন। জামায়াতে ইসলামী একক প্রার্থী হিসাবে ঘোষণা করেছে কেন্দ্রীয় মজলিশ শূরা সদস্য ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি মাওলানা ইয়াসিন আরাফাত। ইতোমধ্যে তিনি ব্যাপক প্রচারণা চালাচ্ছেন। নানা কর্মসূচি নিয়ে যাচ্ছেন মানুষের দ্বারে দ্বারে। তরুণ এই প্রার্থী প্রচারে এগিয়ে থাকায় মানুষের আস্তা অর্জন করতে পারছেন বলে স্থানীয়রা মনে করছেন। এ আসনে এনসিপির কেন্দ্রীয় নেতা জয়নাল আবেদীন শিশির প্রার্থী হতে পারেন বলে এলাকায় প্রচারণা রয়েছেএই আসনে বিএনপির আভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে এবং ইসলামী দলগুলোকে নিয়ে বৃহত্তর নির্বাচনী ঐক্য হলে এই আসনে বিপুল ভোটে জামায়াত প্রার্থী নির্বাচিত হবে। এ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হলেন, সাবেক এমপি আবদুল গফুর ভুঁইয়া ও দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য মোবাশ্বের আলম ভুঁইয়া ।
কুমিল্লা-১১ (চৌদ্দগ্রাম)
কথিত আছে, চৌদ্দগ্রামের মাটি, জামায়াতের ঘাঁটি। এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৪লাখ ১৬, হাজার ৭শত ৯৬ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ১৩, হাজার ৬শত ৮৩ জন, মহিলা ভোটার ২ লাখ ৩১ হাজার ৯ জন। তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার ৪ জন।
ভিআইপি আসন হিসেবে পরিচিত। আসন্ন নির্বাচনে এ আসনে হেভিওয়েট প্রার্থী জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী দলের নায়েবে আমীর ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের। এর আগে তিনি বিএনপির নেতৃত্বাধীন চার দলীয় জোট সরকারের আমলে বিপুল ভোটে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। চৌদ্দগ্রাম বিভিন্ন শ্রেণী পেশার ধর্ম বর্ণ সকল মানুষের কাছে একটি নাম ডা. তাহের। স্বাধীনতার পরে চৌদ্দগ্রামে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন করেছেন তিনি। তাছাড়া চৌদ্দগ্রামে নির্বাচনের জন্য অপেক্ষা কিংবা এমপি না হয়ে ও জনগণের দুর্ভোগ লাঘবের জন্য
স্থানীয় উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিয়ে ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ কোটি টাকার রাস্তা প্রশস্তকরণ, সংস্কার ও মেরামতসহ নানা প্রকল্প সরকারের কাছে দাখিল করেছেন। বিশাল উন্নয়ন পরিকল্পনায় উপজেলার অধিকাংশ সড়কই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, চৌদ্দগ্রামের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নতুন ভবন নির্মাণ এবং বহু প্রতিষ্ঠানের এমপিও ভুক্তির জন্যও উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি।
তাছাড়া তিনি বৃহত্তর কুমিল্লার মানুষের স্বাস্থ্য সেবায় কুমিল্লা মেডিকেল সেন্টার ও সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন।
এদিকে আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে চৌদ্দগ্রামের প্রতিটি কেন্দ্র ভিত্তিক নির্বাচনী সমাবেশ, নির্বাচনী দায়িত্বশীল সমাবেশ, পাড়াভিত্তিক কমিটি, বাড়িভিত্তিক কমিটি, বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে মত বিনিময় ও মহিলা সমাবেশ করছেন তিনি। আগামী নির্বাচনে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে চৌদ্দগ্রামে এক উৎসব মুখর পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে।
অপরদিকে চৌদ্দগ্রাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি কামরুল হুদা দলটির সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এলাকায় সভা-সমাবেশ ও প্রচার-প্রচারণা অব্যাহত রেখেছেন। ইতোমধ্যে নানারকম বক্তব্য দিয়ে আলোচনায় আছেন তিনি। এছাড়া কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি কাজী নাসিমুল হক, চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. গোলাম কাদের চৌধুরী নোবেল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এএনএম নিয়াজ মাখদুম মাসুম বিল্লাহ মনোনয়ন চাইতে পারেন বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে, তবে তাদের পক্ষে এলাকায় প্রচার-প্রচারণা এখনো লক্ষ্য করা যায়নি।