শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদিন বাংলাদেশেও ইনসাফের বিজয় হবে মন্তব্য করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ২০২৪-পরবর্তী বাস্তবতায় শিবির কার্যত বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের অভিভাবকের দায়িত্ব পেয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চরিত্র গঠন, নৈতিক শিক্ষা, আধুনিক জ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করতে ছাত্রশিবিরকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ছাত্রসমাজের কাঁধে শহীদদের রক্তের ঋণ এবং ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশার বোঝা রয়েছে। এই বোঝা বহনের শক্তি আল্লাহ তোমাদের দান করুন।
গতকাল শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সদস্য সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব মন্তব্য করেন। সম্মেলনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেলসহ বিশেষ অতিথিরা বক্তব্য রাখেন।
যুবকদের বেকারভাতা না দিয়ে প্রত্যেকের হাতে কাজ তুলে দিতে চান জানিয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, অনেকে সংখ্যা গুণে বলছেন, আমি এত কোটি, এত লাখ যুবককে কর্মসংস্থান দেবো। বাকিদের কী হবে ? বলছেন, বাকিদের ভাতা দেবেন। আমরা আমাদের যুবকরা কারও কাছ থেকে বেকারভাতা গ্রহণ করুক, দেখতে চাই না, শুনতেও চাই না। প্রতিটি যুবকের হাতকে দেশ গড়ার হাতে পরিণত করতে চাই। প্রত্যেকটি হাতে কাজ তুলে দিতে চাই। বেকারভাতা নয়, বেকারভাতার পরিবর্তে এরাই এ দেশে সব ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধন করবে। সেই বিপ্লবের বাণী তাদের মুখে পৌঁছে দিতে চাই, শক্তি তাদের বুকে তুলে দিতে চাই আর তাদের হাতে কাজ তুলে দিতে চাই। তোমরা তৈরি হও, ইনশাআল্লাহ, তোমরা পারবা। আমরা তোমাদের সঙ্গে আছি।
জামায়াত আমীর বলেন, এমন একটি শিক্ষাব্যবস্থা তোমাদের জন্য আয়োজন করতে চাই, যে শিক্ষাব্যবস্থা তোমাদের মানুষের মতো মানুষ হতে সাহায্য করবে। যে শিক্ষাব্যবস্থা তোমাদের শিক্ষার চরম উৎকর্ষে পৌঁছে দেবে এবং এ শিক্ষা নিয়ে, উন্নত চরিত্র নিয়ে, দক্ষ কারিগর হয়ে তোমরা সমাজগঠনে আত্মনিয়োগ করবে। আর একজন যুবক-যুবতিও বেকার থাকবে না। বিভিন্ন ছাত্রসংসদে ছাত্রশিবিরের জয়ের বিষয়টি স্মরণ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, তোমাদের কাঁধে ১৮ কোটি মানুষের বোঝা। আল্লাহ তা’য়ালা এ বোঝা তোমাদের জন্য হালকা করে দিন। এ বোঝা বহন করার শক্তি তোমাদের দান করুন। তোমাদের এ বিজয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইঙ্গিত দিচ্ছে, আগামী দিনে ইনসাফের বিজয় হবে বাংলাদেশে ইনশাআল্লাহ। ছাত্রসমাজ তোমাদের ভোট দিয়েছে, তোমাদের ইনসাফের প্রতীক হিসেবে তারা দেখতে চায়। অন্য কোনো কারণ নেই। ইনসাফ কায়েম করার বিষয়ে জামায়াতে ইসলামী ‘ডেসপারেট’ বলেও জানান দলের এই শীর্ষ নেতা। তিনি বলেন, আজ বাংলাদেশে ইনসাফের বড় অভাব! আর সেই ইনসাফের ভিত্তি হচ্ছে আল্লাহর কুরআন। নবী (সা.)-এর সুন্নাহ। কুরআন-সুন্নাহ বাদ দিয়ে দুনিয়ার কোথাও ইনসাফ কায়েম হয়নি, হওয়ারও সম্ভাবনা নেই। এ ব্যাপারে আমরা খুবই ডেসপারেট। তিনি আরও বলেন, আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী মানুষের জীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি দুর্নীতিমুক্ত, বৈষম্যমুক্ত ইনসাফভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ গড়তে চাই।
প্রধান অতিথির বক্তব্যের শুরুতেই ডা. শফিকুর রহমান দেশ ও দ্বীনের জন্য শাহাদাতবরণকারী সকল শহীদের মহান আল্লাহর দরবারে মর্যাদাবান শহীদ হিসেবে কবুলিয়াত কামনা করেন। তিনি বলেন, “আজকের বাংলাদেশ পেতে আমাদেরকে ১৯৪৭ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রনেতা আব্দুল মালেক থেকে শুরু করে সর্বশেষ বিপ্লবী শরিফ উসমান হাদিÑঅনেকেই এই দেশের জন্য জীবন দিয়েছেন। তিনি আরও বলেন, “গত ৫৪ বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ছাত্রদের হাতে কলমের বদলে অস্ত্র তুলে দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষাঙ্গনগুলো মিনি ক্যান্টনমেন্টে পরিণত হয়েছিল। ছাত্রদের জীবন, ভবিষ্যৎ ও মেয়েদের নিরাপত্তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। সেই অন্ধকার অধ্যায় বিদায় নিতে শুরু করেছে, তবে কালো ছায়া এখনো পুরোপুরি কাটেনি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেন আর কখনো অস্ত্র, মাদক কিংবা নারীদের নিয়ে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা না হয়Ñএই পরিবেশ নিশ্চিত করার প্রধান দায়িত্ব এখন ছাত্রশিবিরের ওপর। মা-বোনেরা যেন শান্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে লেখাপড়া করতে পারে এবং প্রতিটি ছাত্র যেন তার মেধা বিকাশে মনোযোগী হতে পারেÑছাত্রশিবিরকে সে পরিবেশ গড়ে তুলতে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
তিনি বলেন, “বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির এখন আর শুধু একটি সাধারণ ছাত্রসংগঠন নয়; ২০২৪-পরবর্তী বাস্তবতায় এটি কার্যত বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের অভিভাবকের দায়িত্ব পেয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে চরিত্র গঠন, নৈতিক শিক্ষা, আধুনিক জ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্রে পরিণত করতে ছাত্রশিবিরকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে। তিনি আরও বলেন, ছাত্রসমাজের কাঁধে শহীদদের রক্তের ঋণ এবং ১৮ কোটি মানুষের প্রত্যাশার বোঝা রয়েছে। এই বোঝা বহনের শক্তি আল্লাহ তোমাদের দান করুন। ইনশাআল্লাহ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদিন বাংলাদেশেও ইনসাফের বিজয় হবে।
ফেসবুক স্ট্যাটাস : এদিন সন্ধ্যায় শিবিরের নবনির্বাচিত শীর্ষ দুই নেতাকে নিয়ে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। জামায়াত আমীর তার পোস্টে বলেন, ‘আলহামদুলিল্লাহ, প্রাণের কাফেলা বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের ২০২৬ সেশনের জন্য কেন্দ্রীয় সভাপতি নির্বাচিত ও সেক্রেটারি জেনারেল মনোনিত হয়েছে স্নেহের নূরুল ইসলাম ও সিবগাতুল্লাহ। মহান আল্লাহ তায়ালা তাদের দুজনকে হেফাজত করুন, রহমত ও বরকতে আবৃত করে রাখুন। তাদের ইলম, আমল, হিকমত ও নেতৃত্বে বারাকাহ দান করুন। সংগঠনের আমানত যথাযথভাবে রক্ষা করার তাওফিক দিন। সত্য ও ন্যায়ের পথে দৃঢ় রাখুন এবং সব কল্যাণকর কাজে কবুলিয়াত দান করুন।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিদায়ি কেন্দ্রীয় সভাপতি স্নেহের জাহিদুল ইসলামকে আল্লাহ তায়ালা কবুল করুন এবং সামনের দিনগুলোকে তার জন্য আরও সহজ, সুন্দর ও মসৃণ করে দিন। আমিন।
জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ইসলামী ছাত্রশিবিরের আদর্শিক আন্দোলনকে যুক্তি ও নৈতিকতা দিয়ে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে একটি মহল পরিকল্পিত অপপ্রচারে নেমেছে। তিনি বলেন, রাজনৈতিক ইতিহাসের মহাসত্য হলোÑজাতি কখনো মিথ্যাচারকে বিশ্বাস করে না; সত্য শেষ পর্যন্ত উদ্ভাসিত হয়। ইসলামী ছাত্রশিবিরকে দুঃসাহসী, নির্ভীক ও বিজয়ী শক্তি হিসেবে আখ্যায়িত করে গোলাম পরওয়ার বলেন, বহু আত্মত্যাগ ও শাহাদাতের রক্তের বিনিময়ে আন্দোলন আজ এই পর্যায়ে এসেছে। একটি কালো অধ্যায় পেছনে ফেলে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে সামনে এগোনোর সময়ে নতুন করে ষড়যন্ত্র ও বিভ্রান্তির চেষ্টা চলছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, ছাত্রশিবিরের আদর্শবাদী আন্দোলনকে যখন যুক্তি ও আদর্শ দিয়ে পরাজিত করা যায়নি, তখনই মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও নানা প্রযুক্তি ব্যবহার করে জাতিকে বিভ্রান্ত করার পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। স্বাধীনতাবিরোধী, সন্ত্রাসী বা গুপ্ত সংগঠনÑএ ধরনের তকমা দিয়ে সত্য চাপা দেওয়ার চেষ্টা হলেও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়েছে। তিনি আরও বলেন, চারটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সহ সাধারণ মানুষ এসব অপপ্রচার প্রত্যাখ্যান করে প্রমাণ করেছেÑশিক্ষার্থীরা অসত্যে বিভ্রান্ত হয়নি। নতুন বাংলাদেশ গড়ার অভিযাত্রায় ইসলামী ছাত্রশিবিরের পাশে গোটা জাতি থাকবে বলেও তিনি দাবি করেন।