বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, একমাত্র বিএনপির দেশ পরিচালনার অভিজ্ঞতা রয়েছে। আগামী দিনে সরকার গঠন করলে প্রথম দায়িত্ব হবে দেশ পুনর্গঠন করা। এ জন্য দল মত শ্রেণি পেশা নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে পুনর্গঠনের কাজ করা হবে। বিএনপির পক্ষে সম্ভব দেশকে সঠিক পথে পরিচালনা করা দাবি করে তিনি বলেন, যে কোন পরিস্থিতিতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে হবে। আর দুর্নীতির করাল গ্রাস থেকে দেশকে বের করে আনতে হবে। তিনি শ্লোগানের সুরে বলেন- দেশ পুনর্গঠনে একটি দল বিএনপি, একটি প্রতীক ধানের শীষ। নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল ভোটারকে ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ধানের শীষে ভোট দেয়ার আহ্বান জানান তিনি। গতকাল সোমবার খুলনা মহানগরী খালিশপুর শিল্পাঞ্চলের প্রভাতী স্কুল মাঠে বিএনপি আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ সব কথা বলেন। বেলা ১১ টায় খুলনা মহানগর বিএনপির সভ্পাতি এডভোকেট এস এম শফিকুল আলম মনার সভাপতিত্বে সভার কার্যক্রম শুরু হয়। পৌণে ১টায় বক্তব্য শুরু করে ২৭ মিনিটের বক্তৃতায় তারেক রহমান প্রতিপক্ষের তৎপরতায় নানা শঙ্কা ও বিএনপির আগামীর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন। সভা থেকে খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা জেলার ১৪ টি আসনে ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থীদের হাত তুলে পরিচয় করিয়ে দেন তিনি।
নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য রাখেন বিএনপির ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক ও খুলনা-৩ আসনের প্রার্থী রকিবুল ইসলাম বকুল, বিএনপির সাবেক বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও খুলনা-২ আসনে প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু, বিএনপির তথ্য বিষয়ক সম্পাদক ও খুলনা-৪ আসনে প্রার্থী আজিজুল বারী হেলাল, বিএনপি মহানগর শাখার সাবেক আহবায়ক ও খুলনা-৫ আসনে প্রার্থী আলী আসগার লবি, সাতক্ষীরা-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী হাবিবুল ইসলাম হাবিব, কৃষিবীদ শামীমুর রহমান শামীম, যুবদল সভাপতি আব্দুল মোনায়েম মুন্না, বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক জয়ন্ত কুমার কুন্ডু, সাবেক এমপি নেওয়াজ হালিমা আরলি, কেসিসির সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনিরুজ্জামান মনি, খুলনা জেলা বিএনপির আহবায়ক মনিরুজ্জামান মন্টু, জেলা বিএনপির সাবেক আহবায়ক ও খুলনা-১ আসনে প্রার্থী আমির এজাজ খান, জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব ও খুলনা-৬ আসনে প্রার্থী এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী, সাতক্ষীরা-৩ আসনের প্রার্থী কাজী আলাউদ্দিন, সাতক্ষীরা-২ আসনের প্রার্থী আব্দুর রউফ ও সাতক্ষীরা-৪ আসনের প্রার্থী ডা. মো. মনিরুজ্জামান, বাগেরহাটের চার প্রার্থী যথাক্রমে লায়ন ফরিদুল ইসলাম, সোমনাথ দে, ব্যারিস্টার জাকির হোসেন ও কোপিল কৃষ্ণ মন্ডল। খুলনা মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক শফিকুল আলম তুহিনের সঞ্চালনায় জনসভার শুরুতে পবিত্র কুরআন তেলাওয়াত করেন মাওলানা কারী আবু নাঈম এবং গীতা পাঠ করেন কোপিল কৃষ্ণ মন্ডল।
নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে অভিযোগ করে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, একটি দল যারা সকল বিষয়ে মিথ্যা কথা বলে তারাই এই ষড়যন্ত্র করছে। মানুষ তাদের মিথ্যা ধরে ফেলেছে বলে তারা ছলচাতুরি করছে। এক যুগ ভোট দিতে না পারার কথা স্মরণ করিয়ে তিনি বলেন, কেউ যাতে সে অধিকার কেড়ে নিতে না পারে সেজন্য সজাগ ও ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। নির্বাচন সামনে রেখে একটি রাজনৈতিক দলের নারীবিদ্বেষী বক্তব্যের তীব্র সমালোচনা করে তারেক রহমান বলেন, একটি দল প্রকাশ্যে নারীর নেতৃত্বে বিশ্বাস করে না বলে ঘোষণা দিয়েছে। সম্প্রতি ওই দলের এক নেতা কর্মসংস্থানে নিয়োজিত মা-বোনদের উদ্দেশে এমন কুরুচিপূর্ণ শব্দ ব্যবহার করেছেন, যা বলতেও লজ্জা লাগে। এটি শুধু নারীদের নয়, পুরো দেশের জন্যই কলঙ্ক।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি। এর মধ্যে অন্তত ১০ কোটি নারী। এই বিশাল নারীসমাজকে পেছনে রেখে যত বড় পরিকল্পনাই করা হোক না কেন, দেশকে সামনে নেওয়া সম্ভব নয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া নারীদের ক্ষমতায়নের লক্ষ্যে স্কুল থেকে ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বিনা মূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করেছিলেন, যাতে তারা শিক্ষিত হয়ে নিজেদের পায়ে দাঁড়াতে পারে। তিনি বলেন, বাংলাদেশের লক্ষাধিক নারী পোশাকশিল্পে কাজ করে দেশের অর্থনীতি সচল রেখেছেন। নিম্ন-মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের নারীরা দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে সংসার চালাতে স্বামীর পাশাপাশি কাজ করছেন। অথচ তাদেরই আজ অপমান করা হচ্ছে।
তারেক রহমান বলেন, যারা ইসলাম কায়েমের কথা বলে, তারা ভুলে যাচ্ছেন নবী করিম (সা.)-এর সহধর্মিণী হযরত বিবি খাদিজা (রা.) ছিলেন একজন সফল ব্যবসায়ী। তাহলে নারীদের কর্মজীবনকে অপমান করার এখতিয়ার কারও নেই।
তারেক রহমান বলেন, আগামী ১২ তারিখের সাধারণ নির্বাচন উপলক্ষে আজ বিএনপি ও ধানের শীষের এই জনসভা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। বিগত ১৫/১৬ বছরে বিএনপি বহু আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছে। এই সময়ে দলের অসংখ্য নেতাকর্মী গুম, খুন ও হত্যার শিকার হয়েছেন। হাজার হাজার, লাখো নেতাকর্মী বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মীরা গায়েবি মামলা, নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার হয়েছেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের মানুষ টানা ১৬ বছর তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেনি। শুধু জাতীয় নির্বাচন নয়, এমনকি স্থানীয় নির্বাচনেও জনগণ তাদের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিনিধি নির্বাচন করতে পারেনি। এই দীর্ঘ সময়ে মানুষ তাদের মনের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে পারেননি। কেউ কথা বলার চেষ্টা করলে তাকে রাতের আঁধারে তুলে নেওয়া হয়েছে, গুম করা হয়েছে কিংবা খুন করা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে দলমত নির্বিশেষে দেশের মানুষ রাজপথে নেমে স্বৈরাচারকে বিদায় করেছে। আজ সময় এসেছে অধিকার আদায়ের। আগামী ১২ তারিখে ইনশাল্লাহ বাংলাদেশের মানুষ সেই অধিকার প্রয়োগ করবে, যা থেকে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে তাদের বঞ্চিত করে রাখা হয়েছিল।
বিএনপি সরকার গঠন করলে প্রতিটি পরিবারে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তারেক রহমান বলেন, এই কার্ডের মাধ্যমে নারীদের ধীরে ধীরে স্বাবলম্বী করে তোলা হবে, যাতে তারা কারো মুখাপেক্ষী হয়ে না থাকে। খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাট অঞ্চলের উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এক সময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ মৃতপ্রায়। বিএনপি সরকার গঠন করলে এই অঞ্চলকে আবার জীবন্ত শিল্পনগরীতে রূপান্তর করা হবে, নারী-পুরুষ উভয়ের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা হবে। তরুণ সমাজের জন্য আইটি পার্ক ও আধুনিক সুযোগ-সুবিধা গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, কৃষকদের জন্য কৃষি কার্ড চালু করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে ঋণ, সার, বীজ ও কীটনাশক সহজে পাওয়া যাবে। পাশাপাশি বর্তমানে যেসব কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ রয়েছে, তা সুদসহ মওকুফ করা হবে। তিনি বলেন, দেশের নারী সমাজকে স্বাবলম্বী করা, বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিক্ষার সঠিক পরিবেশ ও উন্নত চিকিৎসা ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল জনগণের প্রত্যাশিত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।