মোহাম্মদ জাফর ইকবাল : দেশজুড়ে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের উৎসবমুখর নির্বাচনী প্রচারণা। প্রতীক বরাদ্দের পর থেকে প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ ঐতিহ্য ও কৌশল অনুযায়ী দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাদের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু করেছে। এর ফলে সারাদেশে নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণার আমেজ শুরু হলো। নির্বাচন কমিশনের বিধি অনুযায়ী প্রার্থীরা প্রচারণা করার সুযোগ পাবেন আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত। দীর্ঘ প্রচারণার এই সময়সীমা শেষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ এবং একই দিনে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে ঐতিহাসিক গণভোটও অনুষ্ঠিত হবে। একই দিনে সংসদ নির্বাচন এবং গণভোট অনুষ্ঠিত হওয়ায় এবারের নির্বাচনের গুরুত্ব ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা বাড়ানো হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।

সূত্রমতে, বর্তমানে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিনে রাজধানী ঢাকাকে বেছে নিয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার মিরপুর আদর্শ স্কুল মাঠে জনসভার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে দলটি দাঁড়ি পাল্লা প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করেছে। দলটির আমীর ডা. শফিকুর রহমানের নির্বাচনী এলাকা (ঢাকা-১৫) হওয়ায় এই জনসভা পরিণত হয় জনসমুদ্রে। সমাবেশে ১০-দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারাও অংশ নেন।

এদিকে বিএনপি তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য অনুযায়ী আধ্যাত্মিক নগরী হিসেবে পরিচিত সিলেট থেকেই শুরু করেছে তাদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। হযরত শাহজালাল রহ. এর মাজার জিয়ারতের পর গতকাল সকালে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভার মাধ্যমে প্রচারণা শুরু করে বিএনপি। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখন দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান। এছাড়া প্রথম দিনে তারেক রহমান মৌলভীবাজার, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে দলীয় সমাবেশে যোগ দেন। মধ্যরাত পর্যন্ত চলে এ প্রচারণা।

নতুন দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনএসপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামসহ শীর্ষ নেতারা সকাল সাড়ে ১০টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় তিন নেতার কবর ও শহীদ ওসমান হাদির কবর জিয়ারতের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করেছে। সিপিবি বেলা ১১টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে পুষ্পমাল্য অর্পণের মাধ্যমে তাদের প্রচারণারসূচনা করে। গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি গতকাল সকালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে নিজ বাবার কবর জিয়ারত করে ‘মাথাল’ মার্কার পক্ষে প্রচারণা শুরু করেছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় গতকাল থেকে মাইকিং, পথসভা, মিছিল এবং জনসভার মাধ্যমে প্রার্থীরা তাদের দলীয় ও ব্যক্তিগত ইশতেহার ভোটারদের কাছে তুলে ধরছেন। বুধবার রাত থেকেই নানা প্রতীক ও প্রার্থীর ছবিসংবলিত সাদাকালো পোস্টার, বিলবোর্ড, লিফলেটে ছেয়ে যায় গোটা দেশ। রাস্তার মোড়ে মোড়ে, আনাচে-কানাচে ঝুলতে থাকে প্রার্থীর ছবি সংবলিত পোস্টার। বদলে যায় চিরচেনা শহর, গ্রাম, পাড়া-মহল্লার চেহারা। প্রার্থীর পক্ষে মিছিল নামে রাস্তায়। স্লোগানে স্লোগানে প্রকম্পিত হতে থাকে চারদিক। মোড়ে মোড়ে দেখা যায় বিভিন্ন প্রতীক। ভোটার ও সমর্থকরা মহাউৎসবে নেমে পড়েন প্রচারণায়। তৃণমূল পর্যায়ের ভোটারদের আকৃষ্ট করতে প্রার্থীরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন। ডিজিটাল মাধ্যমেও (ফেসবুক, ইউটিউব) প্রচারণা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে।

এদিকে প্রচারণার প্রথম দিনেই প্রার্থীদের মধ্যে শুরু হয়েছে কথার লড়াই। বিশেষ করে প্রার্থীদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে নির্বাচনী মাঠ উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। প্রার্থীরা একদিকে যেমন নিজেদের ইশতেহার ঘোষণা করছেন অণ্যদিকে সমালোচনাও অব্যাহত রেখেছেন। ব্যক্তিগত আক্রমণও কেউকেউ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। অনেকেই অভিযোগ করেন, নেতাকর্মীদের বাড়িতে গিয়ে হুমকি-ধামকি দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনী মাঠে সবার জন্য সমান সুযোগ (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) নিশ্চিত হচ্ছে না। তবে সব কিছু ছাপিয়ে সরগরম পরিস্থিতি দেখা গেল সারাদেশে।

সূত্র মতে, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা কড়া নজরদারি রাখছে। বিভিন্ন দেশ থেকে বিদেশি পর্যবেক্ষক দল ইতিমধ্যেই বাংলাদেশে আসতে শুরু করেছে। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র‌্যাব, পুলিশ এবং বিজিবি মোতায়েন করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন থেকে বারবার ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে, একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন উপহার দেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং প্রচার ও মিডিয়া সেলের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আগামী নির্বাচনে সুন্দর, নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মানে যারা কাজ করছে তাদের জনগণ ভোট দিবে। দেশবাসী আর চাঁদাবাজদের ক্ষমতায় দেখতে চায় না। গণভোট ‘হ্যাঁ’ ভোটের মাধ্যমে বিজয়ী হবে। আমরা সন্ত্রাসমুক্ত নির্বাচন আশা করি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক আসিফ বিন আলী বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে নতুন রাজনৈতিক সহিংসতা তৈরি হলে যে অস্থিতিশীলতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে তাতে বাংলাদেশ ব্যর্থ রাষ্ট্রের দিকে চলে যাওয়ার ঝুঁকিই তৈরি হবে। তবে সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, নিরাপত্তার ব্যাপারে অন্তর্বর্তী সরকার এখনো আস্থা অর্জন করতে পারেনি।

বিশ্লেষকরা বলছেন, গত তিনটা বিতর্কিত নির্বাচনের পর প্রায় গোটা দেশ এখন নির্বাচনের জ্বরে ভুগছে। পুরোনো প্রজন্ম ভোটের স্মৃতিতে কাতর। নতুন প্রজন্ম অধীর অপেক্ষায় জীবনের প্রথম ভোটের জন্য। প্রবাসীরা প্রথমবারের মতো ভোট প্রদানের সুযোগ পেয়েছেন, তারাও ভোট দেওয়া শুরু করে দিয়েছেন। দেশের প্রতিটি এলাকায় এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে প্রচারণা ঢেউ, প্রতীকের স্লোগানে মুখরিত চারপাশ।

নির্বাচন বিশ্লেষক ও সাবেক ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব জেসমিন টুলী মনে করেন, ইসির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণ নিয়ন্ত্রণে রাখা। তিনি বলেন, ইসির এখন রাজনৈতিক দলগুলোর আচরণের ওপর নিবিড় নজর রাখা সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। ভোটারের প্রতি আস্থা ধরে রাখা এবং রাজনৈতিক দল যেন নির্বাচনের পরিবেশ নষ্ট না করে, সেই তদারকি জরুরি।

প্রার্থীদের আচরণবিধি প্রতিপালনে বাধ্য রাখতে নির্বাচন কমিশন কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসি সদস্য মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার। তিনি বলেন, যেকোনো প্রার্থী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে শুধু শোকজ নয়, অভিযোগ গুরুতর হলে এবং তা প্রমাণ হলে প্রার্থিতা বাতিল করা হবে।