ইসির নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে জনমনে প্রশ্ন

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরদিনই তড়িঘড়ি করে সরকারি ফলাফলের গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। অথচ বেশকিছু আসনে ফলাফল জালিয়াতির অভিযোগ আসলে তা সুরাহা না করেই গেজেট জারি করা হয়েছে। এমন কী ভোটের তিন দিন পরও অনলাইনে ফলাফল প্রকাশ করেনি নির্বাচন কমিশন। গতকাল রোববার শুধুমাত্র দলভিত্তিক প্রাপ্ত ভোটের হার জানানো হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ৪৯.৯৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামী তাদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) পেয়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ ভোট।

সূত্রমতে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলার জন্য নির্বাচন কমিশন স্মার্ট ইলেকশন ব্যবস্থাপনা তৈরী করেছে। ভোট সংক্রান্ত যাবতীয় তথ্য জনগণকে জানানোর জন্য অনলাইনে সিষ্টেম তৈরী করা হয়েছে। সেই সাথে একটি অ্যাপও করা হয়েছে। এই স্মার্ট সিষ্টেমে ভোটের দিন পর্যন্ত যাবতীয় তথ্য পাওয়া যেত। কিন্তু যখন ফলাফল ঘোষণা শুরু হলো তখনই ইসির মধ্যে এক ধরনের তথ্য লুকোচুরি শুরু হয়ে যায়। ফলাফল প্রকাশে নানা ধরনের জালিয়াতি ও কারচুপির অভিযোগ আসতে থাকলেও ইসি এ নিয়ে কোন প্রকার ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। সিস্টেমে কেন্দ্রভিত্তিক রেজাল্ট শিট পিডিএফ আকারে দেয়ার অপশন থাকলেও ভোট গ্রহণের তিন দিন পরও নির্বাচন কমিশন ফলাফল প্রকাশ করেনি। কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল প্রকাশ করা হলে দেশের যে কোন নাগরিক তা হিসাব করে তার নিজের আসনের ফলাফল বের করতে পারে। সেই সাথে স্বচ্ছতাও বজায় থাকে। কোথাও হিসাবে গড়মিল থাকলে তা ধরা পড়ে। কিন্তু ফলাফল জালিয়াতির কারণে বেশকিছু রেজাল্ট শিটে ঘষামাজা থাকার কারণে অনলাইলনে রেজাল্ট শিট দেয়া হচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা ধারণা করছেন। ইসির এ ধরনের কর্মকান্ডের কারণে জনমনে নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। প্রত্যেক নির্বাচনের দিন বিকেলে ভোট গ্রহণের পর প্রাপ্ত ভোটের হার জানানো হতো। এবারই ভোটের দিন প্রাপ্ত ভোটের হার ইসি ভোটের দিন জানাতে পারেনি। আর ভোটের প্রতিবেদন তৈরীর আগেই তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। মনে হয়েছে, দেরী করলে হয়ত ঘোষিত ফলাফল পরিবর্তন হয়ে যেতে পারে। যেমনটি করা হয়েছিল আওয়ামী লীগের আমলের সর্বশেষ ২০২৪ইং সালের নির্বাচনে। ভোটের পরদিনই তড়িঘড়ি করে গেজেট প্রকাশ হয়েছিল।

এদিকে ফলাফলের গেজেট প্রকাশের পর গতকাল রোববার নির্বাচন কমিশন দলভিত্তিক প্রাপ্ত ভোটের হার নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু তাতেও প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। আর অনলাইনে ফলাফল না দেয়ায় সাধারণ নাগরিকদের কেন্দ্র ভিত্তিক ফলাফল জানার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। অপরদিকে অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হওয়া ৩২টি আসনের ফলাফল জালিয়াতি তদন্ত করে ফলাফল পুর্নগণনার জন্য দাবি জানিয়েছে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্য। এ দাবিতে তারা আন্দোলনেও যাচ্ছে। এ বিষয়ে নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আদালত নির্দেশ দিলে ভোট পুর্নগণনা করা হবে।

গতকাল রোববার নির্বাচন কমিশনের তৈরি দলভিত্তিক প্রাপ্ত ভোটের হার সংক্রান্ত চূড়ান্ত প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, এবারের ভোটে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে ৪৯.৯৭ শতাংশ ভোট পেয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা জামায়াতে ইসলামী তাদের দাঁড়িপাল্লা প্রতীকে পেয়েছে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট, তৃতীয় অবস্থানে আছে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র-তরুণদের নেতৃত্বাধীন দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। তারা পেয়েছে ৩ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ ভোট। এ ছাড়া গত তিন সংসদে বিরোধী দলে থাকা জাতীয় পার্টি (জাপা) লাঙ্গল প্রতীকে পেয়েছে শূন্য দশমিক ৮৯ শতাংশ ভোট। স্বতন্ত্র প্রার্থীরা সম্মিলিতভাবে ৫.৭৯ শতাংশ ভোট পেয়েছেন।

অন্যান্য দলের প্রাপ্ত ভোটের চিত্র

এবারের নির্বাচনে ৫০টি রাজনৈতিক দল অংশ নিয়েছিল। ইসির প্রতিবেদনে অন্যান্য রাজনৈতিক দলের প্রাপ্ত ভোটেরও একটি বিস্তারিত চিত্র উঠে এসেছে। এতে দেখা যায়, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ২.৭০ শতাংশ ও বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ২.০৯ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

এছাড়া উল্লেখযোগ্য দলগুলোর মধ্যে খেলাফত মজলিস ০.৭৬ শতাংশ, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ০.৪৭ শতাংশ, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ০.৩৫ শতাংশ, গণঅধিকার পরিষদ ০.৩৩ শতাংশ এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি) ০.২৮ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

তালিকায় থাকা অন্যান্য দলগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ০.১৭ শতাংশ, গণফোরাম ০.০১ শতাংশ, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) ০.১৪ শতাংশ, গণসংহতি আন্দোলন ০.১৪ শতাংশ, ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ ০.০৮ শতাংশ, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) ০.০৫ শতাংশ, জনতার দল ০.০৫ শতাংশ, জাতীয় পার্টি (জেপি) ০.০৪ শতাংশ, বাংলাদেশ নিজামে ইসলাম পার্টি ০.০৪ শতাংশ, বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টি (বিএসপি) ০.০৪ শতাংশ এবং বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ০.০৪ শতাংশ ভোট পেয়েছে।

এছাড়া ইনসানিয়াত বিপ্লব বাংলাদেশ (০.০৩%), জাকের পার্টি (০.০২%), জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি (০.০২%), বাংলাদেশ জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জাসদ (০.০২%), বাংলাদেশ রিপাবলিকান পার্টি-বিআরপি (০.০২%) এবং বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-মার্কসবাদী (০.০২%) ভোট পেয়েছে।

নগণ্য ভোট পাওয়া দলগুলোর মধ্যে আমজনতার দল, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), নাগরিক ঐক্য, বাংলাদেশ কংগ্রেস, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশ মাইনরিটি জনতা পার্টি, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, বাংলাদেশ সাংস্কৃতিক মুক্তি জোট এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি প্রত্যেকেই ০.০১ শতাংশ করে ভোট পেয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ইসলামিক ঐক্য, গণতন্ত্রী পার্টি, গণফ্রন্ট, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), জাতীয় গণতান্ত্রিক আন্দোলন (এনডিএম), বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি ও বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্ট (বিএনএফ) কোনো ভোট পায়নি (০ শতাংশ)। এছাড়া বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএনএল এবং বাংলাদেশ সমঅধিকার পার্টিও (বিইপি) কোনো ভোট পায়নি বলে ইসির তথ্যে উল্লেখ করা হয়েছে।