প্রয়োজনীয় নাগরিক আনুষ্ঠানিকতা শেষে দলের রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন তারেক রহমান। দেশে ফেরার চতুর্থ দিনে অফিসিয়াল কার্যক্রম শুরু করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান। গত তিনদিন তিনি নাগরিক ও ব্যক্তিগত কিছু কাজ সেরেছেন। গতকাল রোববার গুলশানে চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ের অফিসে বসেছেন তারেক রহমান। এই কার্যালয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের এটিই প্রথম আগমন। অফিসে বসেই আলোচনা করেছেন নির্বাচন নিয়ে। নিয়েছেন কিছু সিদ্ধান্তও। আগামী নির্বাচন ঘিরে চষে বেড়াবেন দেশের বিভিন্ন এলাকা।
গতকাল রোববার দুপুর ১টা ৪০ মিনিটে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের গাড়ি গুলশানে চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ে প্রবেশ করে। তিনি গুলশান এভিনিউ‘র বাসা থেকে এই অফিসে আসেন। কার্যালয়ে এসে পৌঁছালে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, মির্জা আব্বাস, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ সিনিয়র নেতারা ফুল দিয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্য্যানকে অভ্যর্থনা জানান। এ সময়ে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা মাহাদী আমিন, চেয়ারপার্সনের কার্যালয়ের কর্মকর্তাগণসহ বগুড়া জেলার নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। তারেক রহমান শুভেচ্ছা বিনিময়পর্ব শেষ করে দোতলায় নিজের চেম্বারে গিয়ে বসেন।
গত ২৫ ডিসেম্বর লন্ডন থেকে প্রায় ১৮ বছর পর দেশে ফিরেন তারেক রহমান। ২০০৮ সালের ১১ সেপ্টেম্বর উন্নত চিকিৎসার জন্য সুপ্রিম কোর্টের জামিন নিয়ে সপরিবারে লন্ডন যান। সরকারের নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশে ফিরতে পারেননি তিনি এবং তার স্ত্রী জুবাইদা রহমান ও কন্যা জাইমা রহমান। দেশে ফেরার পর রাজধানীর পূর্বাচলে বিএনপির পক্ষ থেকে আয়োজিত গণসংবর্ধনা অনুষ্ঠানে অংশ নেন তারেক রহমান। এরপর তিনি বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পাশাপাশি সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে মহান মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। এ ছাড়া তিনি জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শহীদ শরিফ ওসমান হাদীর কবর জিয়ারত করেন। দেশে ফেরার পর প্রয়োজনীয় নাগরিক আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবে তারেক রহমান জাতীয় পরিচয়পত্র সংক্রান্ত কাজও সম্পন্ন করেছেন।
উজ্জীবিত নেতাকর্মীরা : বিএনপি চেয়ারপার্সনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে প্রথমবারের মতো উপস্থিত হয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তার আগমনেই উজ্জীবিত হয়েছেন নেতাকর্মীরা। কার্যালয়ে পৌঁছে দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে সাংগঠনিক ও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন তারেক রহমান।
ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন জানান, আসার পর এই দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান প্রথম অফিস করলেন। নির্বাচন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে সহযোগিতা করার জন্য সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমীর খসরু বলেন, দলীয় কার্যালয়ে তারেক রহমানকে পেয়ে নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হয়েছে। নির্বাচন ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তিনি যাত্রা করবেন। দেশের মানুষ যে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখছেন তারেক রহমানের আগমনে তা পূরণ হবে। গয়েশ্বর চন্দ্র মন্তব্য করেন, তারেক রহমানের আগমন দলের মনোবল অনেক উঁচুতে নিয়ে গেছে। দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী যোগ করেন, তারেক রহমানের গুলশান কার্যালয়ে আগমন দলকে নতুন উদ্দীপনা দেবে।
রয়েছে চ্যালেঞ্জ : দেশে ফেরার পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ সবখানেই আলোচনায় আছেন তারেক রহমান। দীর্ঘদিন ধরে বিএনপি আন্দোলন, নির্বাচনী কৌশল ও নেতৃত্বের প্রশ্নে এক ধরনের স্থবিরতা ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে গেছে। খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও সীমিত রাজনৈতিক সক্রিয়তা, শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের অনুপস্থিতি, সব মিলিয়ে বিএনপির নেতৃত্ব কাঠামো অনেকটাই ভার্চ্যুয়াল হয়ে উঠেছিল। এই প্রেক্ষাপটে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন দলীয় কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রত্যাশা ও উদ্দীপনা তৈরি করেছে। অনেকের চোখে এটি দলকে সাংগঠনিকভাবে চাঙা করার সুযোগ, আবার কারও কাছে এটি নতুন চ্যালেঞ্জের সূচনা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নিয়ে উত্তেজনা বা আশাবাদের চেয়ে বেশি প্রয়োজন সংযত বিশ্লেষণ। এটি সুযোগও হতে পারে, আবার চ্যালেঞ্জও। আবেগের বাইরে এসে গণতান্ত্রিক সংস্কার, রাজনৈতিক সহনশীলতা ও জনআকাক্সক্ষার আলোকে এগুতে হবে। নইলে প্রত্যাবর্তনের খবর থাকবে, কিন্তু রাজনীতির হিসাব বদলাবে না।
দুই আসন থেকে লড়বেন : এদিকে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বগুড়া-৬ এবং ঢাকা-১৭ আসন এই দুইটি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ একথা জানান। তিনি বলেন, আমাদের দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দুইটি আসন থেকে নির্বাচনে প্রতিদ্বদ্বিতা করবেন। এটা দলীয় সিদ্ধান্ত। একটি বগুড়া-৬ আসন এবং আরেকটি ঢাকা-১৭ আসন। এছাড়া বিএনপি চেয়ারম্যান খালেদা জিয়া তিনটি আসনে যথাক্রমে বগুড়া-৭, ফেনী-১ এবং দিনাজপুর-৩ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত : বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও তার মেয়ে ব্যারিস্টার জাইমা রহমান ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। দলটির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী, নির্বাচন কমিশনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার হিসেবে তারেক রহমানের নাম অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
এদিকে রোববার নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখা থেকেও এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। এর আগে ২৭ ডিসেম্বর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ে যান তারেক রহমান ও জাইমা। সেখানে ভোটার হিসেবে নিবন্ধন ও জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন তারা। বিএনপি মিডিয়া সেল জানায়, শনিবার আঙুলের ছাপ, চোখের মণির (আইরিশ) প্রতিচ্ছবি ও বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার পর তারেক রহমানের এনআইডি পেতে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টা লাগবে বলে জানিয়েছেন জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের মহাপরিচালক এস এম হুমায়ুন কবীর। তার আগেই ভোটার হলেন তারেক রহমান ও জাইমা।
খালেদা জিয়ার জন্য দোয়া চেয়েছেন তারেক রহমান : রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার অবস্থা অত্যন্ত জটিল। তিনি সংকটময় মুহূর্ত পার করছেন বলে জানিয়েছেন তার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের সদস্য ও বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। শনিবার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে এক ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান তিনি।
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যের সবশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে জাহিদ হোসেন বলেন, ওনার (খালেদা জিয়া) অবস্থার উন্নতি হয়েছে, এ কথা বলা যাবে না। ওনার অবস্থা অত্যন্ত জটিল এবং উনি একটা সংকটময় মুহূর্ত পার করছেন। তিনি বলেন, সত্যিকার অর্থে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ২৩ নভেম্বর এখানে (এভারকেয়ার হাসপাতাল) ভর্তি হয়েছেন। ভর্তি হওয়ার পরবর্তীতে উনার (খালেদা জিয়া) শারীরিক অবস্থার বেশ অবনতি হয়েছিল। স্বাস্থ্যের ক্রমাগত অবনতির কারণেই তাকে কেবিন থেকে সিসিইউ এবং সেখানে থেকে পরবর্তীতে আইসিইউতে নেওয়া হয়।
খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় গঠিত মেডিকেল বোর্ডের এই সদস্য বলেন, দেশী-বিদেশী চিকিৎসকেরা বিএনপি চেয়ারপার্সনকে চিকিৎসা দিচ্ছেন। তার পুত্রবধূ ডা. জুবাইদা রহমান তাতে যুক্ত রয়েছেন।
শনিবার দিনগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে কোনো ধরনের পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে এ ব্রিফ করা হয়।
এদিকে শনিবার দিনভর নানা কর্মসূচি শেষে আবারও মা খালেদা জিয়াকে দেখতে যান তারেক রহমান। দুই ঘণ্টার বেশি সময় সেখানে অবস্থান করে রাত ১১টা ৫৮মিনিটে তিনি হাসপাতাল ছাড়েন। এর আগে গত বৃহস্পতিবার স্বদেশের জমিনে পা দিয়েই মা-কে দেখতে হাসপাতালে গিয়েছিলেন তিনি।
গত ২৩ নভেম্বর থেকে খালেদা জিয়া রাজধানীর এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অধ্যাপক শাহাবুদ্দিন তালুকদারের নেতৃত্বে দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ডের অধীনে তার চিকিৎসা কার্যক্রম চলছে।
বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার নানা শারীরিক জটিলতার মধ্যে ডায়াবেটিস, কিডনি, হৃদযন্ত্র ও ফুসফুসের সমস্যা ওঠানামা করছে। নিয়মিত চিকিৎসার অংশ হিসেবে তার কিছু শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা নিয়মিত করা হচ্ছে।
এদিকে খালেদা জিয়ার সংকটময় মুহূর্তে দেশবাসীর কাছে মায়ের জন্য দোয়া চেয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার মধ্যরাতে খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ও স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. এজেডএম জাহিদ হোসেনের বরাত দিয়ে বিএনপির ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এ সংক্রান্ত একটি পোস্ট করা হয়।
এতে তিনি জানান, বেগম খালেদা জিয়া নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। দেশবাসীর কাছে মায়ের জন্য দোয়া চেয়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি নেতাকর্মীসহ দেশবাসীর কাছে মায়ের জন্য বিশেষভাবে দোয়া চেয়েছেন।