নান্দাইল (ময়মনসিংহ) সংবাদদাতা : ময়মনসিংহ-৯ (নান্দাইল) আসনে বইছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হাওয়া। আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এই নির্বাচনকে ঘিরে পাল্টে গেছে স্থানীয় রাজনীতির চিরচেনা মেরুকরণ। এই আসনের নির্বাচনী লড়াইয়ে এখন মূল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিএনপি ও একই পরিবারের দুই প্রার্থী। তাঁরা সম্পর্কে তাঁরা চাচী ও ভাতিজা। আর এই পারিবারিক লড়াইয়ের সুযোগে এবং আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে নিজেদের জয়ের পথ প্রশস্ত করতে মরিয়া হয়ে মাঠে নেমেছে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী। তবে নির্বাচনী মাঠে জনগণের নিকট ধানের শীষ, হাঁস ও ফুলকপি বেশ সরব রয়েছে।
নান্দাইলে ২নং মোয়াজ্জেমপুর ইউনিয়নের ‘বাহাদুরপুর হাউজ’ এবার বিভক্ত হয়ে পড়েছে। অথচ একই বাড়ি থেকে ভোর হলেই পরপর বের হয় চাচী-ভাতিজা, আবার রাতে প্রচারণা শেষে ওই বাড়িতে ফিরে যান তাঁরা। জানাগেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ও সিন্ডিকেটের নির্বাচিত সদস্য, ১৯৯১ সনে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচিত প্রয়াত সংসদ সদস্য আনোয়ারুল হোসেন খান চৌধুরীর পুত্র ইয়াসের খান চৌধুরী ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন। অন্যদিকে তাঁর চাচী, বর্ষীয়ান প্রবীণ রাজনীতিবিদ এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সদস্য ও চারবারের সাবেক সংসদ সদস্য মরহুম বীর মুক্তিযোদ্ধা খুররম খান চৌধুরীর স্ত্রী হাসিনা খান চৌধুরী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ‘হাঁস’ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনী মাঠে নেমেছেন। ভাতিজার বিরুদ্ধে চাচীর এই অবস্থান নির্বাচনী উত্তাপকে ভিন্ন মাত্রা দিয়েছে। স্থানীয় সূত্রমতে, বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত নেতা ও সমর্থকরা ‘হাঁস’ প্রতীকের পেছনে একাট্টা হওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ধানের শীষের প্রার্থী। তবে ভোটের মাঠে প্রচারণায় কেউ কারও কম নয়। চলছে জনতার নিকট পাল্টাপাল্টি অভিযোগ ও ভোট প্রার্থনা। কিন্তু গত ৫ই আগস্টের পটপরিবর্তনের পর এই নির্বাচনে আইনী জটিলতায় অংশ নিতে পারছে না ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগ। ফলে নান্দাইলে দলটির লক্ষাধিক ভোটার এখন ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে দাঁড়িয়েছেন।
নৌকার কোনো প্রার্থী না থাকায় এই বিশাল ভোটব্যাংক কোন দিকে যাবে, তা নিয়ে চলছে চুলচেরা বিশ্লেষণ। বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা এই ভোটারদের কাছে টানার চেষ্টা করলেও অধিকাংশ আওয়ামী সমর্থক ভোটার এখন পর্যন্ত নীরবতা পালন করছেন। এই নীরব ভোটই শেষ পর্যন্ত জয়ের পাল্লা কার দিকে হেলে দেবে, তা নিয়ে সংশয় কাটছে না। তবে আওয়ামীলীগের শীর্ষ নেতাকর্মী ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা তাঁরা এ নির্বাচনে সামনা-সামনি না এলেও গোপনে গোপনে প্রার্থীদের সাথে আলোচনা করছেন। এদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং চাচী-ভাতিজার ভোট ভাগাভাগির সমীকরণকে কাজে লাগিয়ে জয়ের স্বপ্ন দেখছে জামায়াত জোটের প্রার্থী ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির (বিডিপি) চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম চাঁন। তাঁর প্রতীক ‘ফুলকপি’। জামায়াত ও বিডিপি’র নেতাকর্মীরা মাঠে সক্রিয় প্রচার চালিয়ে নিজস্ব একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। ভোটারদের একটি অংশের মতে, বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর রেষারেষিতে ‘ফুলকপি’র প্রার্থী একটি বড় চমক দেখাতে পারেন। এছাড়া হেভিওয়েট প্রার্থীদের পাশাপাশি ভোটের মাঠে সক্রিয় রয়েছেন জাতীয় পার্টির হাসমত মাহমুদ তারিক (লাঙ্গল), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মুফতি সাইদুর রহমান (হাতপাখা) এবং গণফোরামের কেন্দ্রীয় নেতা লতিফুল বারী হামিম (উদীয়মান সূর্য)। নান্দাইল আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৬৪১ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৯৮ হাজার ৬৯২ এবং নারী ১ লাখ ৮৫ হাজার ৯৪২ জন। ৩য় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৭ জন। ১২১টি ভোটকেন্দ্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করেছে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন। তবে মোট ভোটারের শতকরা কতো ভাগ ভোট কাস্টিং হবে তা নিয়ে রয়েছে জনমনে নানান প্রশ্ন। কেউ কেউ বলছেন এবার কার্স্টিং হতে পারে সর্বনিম্ন দেড় লাখ বা সর্বোচ্চ পনে দুই লাখ ভোট। কিন্তু তা নির্ভর করে প্রার্থীদের জনমতের উপর ভিত্তি করে। ভোটাররা বলছেন, তাঁরা কোনো দল দেখে নয়, বরং সৎ ও যোগ্য প্রার্থীকেই ভোট দিতে চান। তবে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবি সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। ভোটের দিন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে নান্দাইলের আকাশে-বাতাসে এখন একটাই প্রশ্ন, শেষ পর্যন্ত কে হাসবেন শেষ হাসি? চাচী না ভাতিজা, নাকি দুই পক্ষকে পাশ কাটিয়ে ‘ফুলকপি’র জয় হবে? এরই উত্তর মিলবে আগামী ১২ই ফেব্রুয়ারি। ততক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে সকলকে।