জাতীয় পার্টি (জাপা), কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দল এবং জাতীয় পার্টির একাধিক অংশের নেতৃত্বে গঠিত জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের (এনডিএফ) প্রার্থীদের মনোনয়ন বাতিলের দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) স্মারকলিপি দিয়েছে চব্বিশের গণ-অভ্যূত্থানের স্পিরিট ধারণ করা জোট ‘জুলাই ঐক্য’।
মঙ্গলবার দুপুরে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে গিয়ে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) বরাবর স্মারকলিপি জমা দেয় জুলাই ঐক্যের ৫ সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ স্মারকলিপিটি গ্রহণ করেন।
স্মারকলিপি প্রদানের আগে আগারগাঁও মেট্রেরেল স্টেশন এরিয়া থেকে মিছিল নিয়ে ইলেকশন কমিশন অভিমুখে পদ যাত্রা করে জুলাই ঐক্যের সংগঠক ও সদস্যরা। এ সময় পুলিশ বাধা দিলে ৫ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল নির্বাচন কমিশনে প্রবেশ করেন। পাচঁ সদস্যের প্রতিনিধি দলে ছিলেন, জুলাই ঐক্যের সংগঠক- প্লাবন তারিক, মুসাদ্দেক আলি ইবনে মুহাম্মদ, ইসরাফিল ফরাজী, মুন্সি বুরহান মাহমুদ ও ওলিউল্লাহ।
স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে ১৪০০-এর অধিক ছাত্রজনতাকে নির্মূলের উদ্দেশ্যে যে গণহত্যা চালিয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের সরকার। ৩৬ জুলাই (৫ আগস্ট ২০২৪) বাংলাদেশ যে ফ্যাসিবাদ থেকে মুক্তি পেয়েছিল তার আকাঙ্ক্ষা ছিল একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ— ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ। গণ-অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবারের সদস্যরা এখনও বিচারের জন্য রাস্তায়। কিন্তু আমরা দেখছি, এই গণহত্যার সঙ্গে জড়িত রাজনীতি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের স্বতন্ত্র প্রার্থী, ডামি প্রার্থী ও জাতীয় পার্টিসহ এনডিএফ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে ২৪৪ আসনে প্রার্থী দিয়েছে গোলাম মোহাম্মদ (জি. এম.) কাদেরের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি (জাপা)। এই জি. এম. কাদেরের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদ কায়েমে সহযোগিতা করা হয়। গত ১৬ বছর জাতীয় পার্টিসহ আওয়ামী লীগের সহযোগীরা বাংলাদেশে যত গুম, খুন, গণহত্যা ঘটিয়েছে, প্রকাশ্যে তার পক্ষে সহযোগিতা করেছে ১৪ দল। ভারতীয় প্রেসক্রিপশনে বাংলাদেশবিরোধী সব ধরনের কাজে লিপ্ত ছিল ১৪ দল। চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের স্পিরিট ধারণকারী জোট ‘জুলাই ঐক্য’র দাবি— অবিলম্বে গণহত্যাকারীদের মনোনয়ন বাতিল করতে হবে।
স্মারকলিপিতে আরও বলা হয়, একই সঙ্গে আমরা দেখতে পাচ্ছি, প্রশাসনের মধ্যে এখনও স্বৈরাচারের দোসররা অবস্থান করছে। যারা ২০১৮ সালের রাতের ভোটের কারিগর, ২০২৪ সালের ডামি নাটকীয় নির্বাচনের অংশ— তাদেরই একটি অংশ ২০২৬ সালের নির্বাচনের দায়িত্বে। জুলাই ঐক্য মনে করে, এই প্রশাসন দিয়ে নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাঠ নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। যে সব ম্যাজিস্ট্রেটদের নির্দেশে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে গুলি চালানো হয়, সে সব ম্যাজিস্ট্রেটগণ এখন বিভিন্ন উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার দায়িত্বে। জুলাই ঐক্য মনে করে, যারা নির্বিচারে মানুষ হত্যা করেছে তাদের মাধ্যমে নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়। অবিলম্বে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করছি।
নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিতের দাবি করে স্মারকলিপিতে বলা হয়েছে, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল থেকে আশঙ্কা করা হচ্ছে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’-এর মাধ্যমে কোনো একটি দলকে ক্ষমতায় আনতে চায় রাষ্ট্র। এ বিষয়টি গুরুত্বসহকারে দেখে সব রাজনৈতিক দলের যেন নির্বাচন কমিশনের ওপর বিশ্বাস থাকে— সেই আস্থা দ্রুত সময়ের মধ্যে তৈরি করার দাবি জানাচ্ছি। ২০০৫ সালে বিপুল সংখ্যক নির্বাচন কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল। পরে তাদের অনেকেই চাকরিচ্যুত হয়েছিল অযোগ্যতার কারণে। সেই কর্মকর্তাদের অনেকে আবার ফিরে এসেছে। তাদের অনেকেই মাঠপর্যায়ের দায়িত্বে আছে। সে সময় যে সব কর্মকর্তারা নিয়োগ পেয়েছিলেন তারাই সারাদেশের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা। মনোনয়নপত্র যাচাই–বাছাইয়ের সময় আমরা দেখেছি জেলা প্রশাসকদের ওপর এক কর্মকর্তা ছড়ি ঘুরিয়েছে, যে কারণে অনেক প্রার্থীর মনোনয়ন বিনা কারণে বাতিল হয়েছে। পরে তাদের অনেকেই আবার প্রার্থিতা ফিরেও পেয়েছে। সেই কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
নির্বাচনে সব স্তরে নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে স্মারকলিপিতে আরো উল্লেখ করা হয়, নির্বাচনের নিরাপত্তায় বডি-ওর্ন ক্যামেরা না থাকলে নির্বাচনের দিন কোনো প্রকার অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হলে তার দায়ভার নির্বাচন কমিশনকেই নিতে হবে। । তফসিল ঘোষণার পর একের পর রাস্তায় লাশ পড়ছে। শরিফ ওসমান হাদীর মতো প্রার্থীকে খুন করা হয়েছে। খুনিকে গ্রেপ্তারে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকার দৃশ্যমান কার্যক্রম লক্ষ্য করা যায়নি। দ্রুত সময়ের মধ্যে অবৈধ অস্ত্র (দেশি অস্ত্রসহ) উদ্ধারে নির্বাচন কমিশনকে আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।
নির্বাচন কমিশনকে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হতে পারে এমন আশঙ্কা করে স্মারকলিপিতে বলা হয়, বিভিন্ন স্থানে ফ্যাসিবাদের সহযোগী ও গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে সাধারণ ছাত্রজনতা ও শহীদ–আহত পরিবারের সদস্যরা। এক্ষেত্রে নির্বাচনের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিনষ্ট হতে পারে। ‘নাসির ও মনির কমিশনের’ মডেলের নির্বাচন— আমরা জুলাইয়ের শক্তি, রাস্তা থেকে একবিন্দুও পেছাবো না। তাই উপরে উল্লিখিত বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে জুলাই ঐক্যের দাবির প্রেক্ষিতে আপনি দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলেই আমরা বিশ্বাস করি। একই সঙ্গে নতুন বাংলাদেশ গড়ার এই লড়াইয়ে আপনার সহযোগিতা কাম্য।