ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা বিভাগে জামায়াতে ইসলামীর বড় ধরনের দাপট দেখা গেছে। খুলনার ৩৬টি আসনের মধ্যে রেকর্ড ২৫টিতে ১১ দলীয় নির্বাচনীয় ঐক্য সমর্থিত জামায়াত মনোনীত প্রার্থীরা জয় পাওয়ায় বিভাগটিতে কার্যত ভূমিধস বিজয় অর্জন করেছে। তবে জাতীয় নির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়া বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা এই বিভাগে জয় পেয়েছে মাত্র ১১টি আসনে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বেশিরভাগ আসনে বিএনপির সমন্বয়হীনতা ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল, অসহনীয় আচরণ, অপরাধ কর্মকান্ড, জাতীয় পার্টি (জাপা) ও আওয়ামী লীগের নিস্ক্রিয়তা, জামায়াত প্রার্থীদের সেবামূলক ও ক্লিন ইমেজ ভাবমূর্তি, তরুণ সমাজ ও নারীদের একচেটিয়া ভোটে বিএনপির পরাজয় হয়েছে। আবার ধর্মীয় হিসাব-নিকাশ, সেবামূলক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং নির্দিষ্ট ভোট ব্যাংকও ভূমিকা রেখেছে।

নির্বাচনী ফলাফলে দেখা যায়, খুলনা বিভাগের ১০ জেলার মধ্যে তিনটি জেলায় একচেটিয়া আধিপত্য প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে জামায়াত। এসব জেলায় সবগুলো আসনই তাদের দখলে গেছে। খুলনা বিভাগে মোট ১০টি জেলা এবং ৩৬টি সংসদীয় আসন। জেলা অনুযায়ী আসনসংখ্যা বাগেরহাটে ৪, চুয়াডাঙ্গায় ২, যশোর ৬, ঝিনাইদহে ৪, খুলনায় ৬, কুষ্টিয়ায় ৪, মাগুরায় ২, মেহেরপুরে ২, নড়াইলে ২, সাতক্ষীরায় ৪টি আসন।

ফলাফলে দেখা গেছে, উপকূলীয় ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে জামায়াতের প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামীণ ভোটব্যাংকে দলটির সংগঠনগত শক্তি ও স্থানীয় প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা বড় ভূমিকা রেখেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মত দিয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপি ১১টি আসনে জয় পেলেও বিভাগে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। খুলনা বিভাগ ঐতিহাসিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। কিন্তু এবারের নির্বাচনে জামায়াতের ২৫ আসন জয় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের রাজনীতিতে একটি বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিএনপির শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত খুলনা-২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে এবার ব্যতিক্রমী ফল হয়েছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে ধারাবাহিক সাফল্যের পর এবার জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর কাছে হেরেছেন বিএনপির প্রার্থী। এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো খুলনা নগরের কোনো আসনে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। খুলনার ছয়টি আসনের মধ্যে খুলনা-২ ও খুলনা-৬ আসনে জয় পায় জামায়াত। খুলনা-৬ আসনে জয় নিয়ে আগে থেকেই আলোচনা থাকলেও খুলনা-২ আসনের ফল নিয়ে রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়েছে। এ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জু। সংগঠক ও মাঠের নেতা হিসেবে তাঁর পরিচিতি ছিল। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন মহানগরী জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি এডভোকেট শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলাল। যিনি খুলনা সিটি করপোরেশনের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর। ভোটের আগে অনেক বিশ্লেষণেই মঞ্জুর জয়ের সম্ভাবনা দেখা হলেও শেষ পর্যন্ত তিনি অল্প ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হন। ইতিহাস বলছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক নির্বাচনে এ আসনে দীর্ঘদিন ধরেই শক্ত অবস্থানে ছিল বিএনপির। ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালে এখানে জয় পান সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী। ২০০১ সালে জয় পান বিএনপির প্রয়াত চেয়ারপাসন খালেদা জিয়া। ২০০৮ সালে জোটের ভরাডুবির মধ্যেও এ আসনে জয় পান নজরুল ইসলাম মঞ্জু। ১৯৯৬ সালের পর জামায়াত এ আসনে কখনো প্রার্থী দেয়নি। সেবার জামায়াতের আনসার উদ্দীন ৮ হাজার ৪২৬ ভোট পান। বিএনপির অন্তত ২০ জন স্থানীয় নেতা-কর্মী, সমর্থক ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভোট কম পড়া, দলীয় সমন্বয়ের ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিএনপির পরাজয়ের বড় কারণ।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলার সাধারণ সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলেন, এ আসনে তুলনামূলক কম ভোট পড়েছে, যা বিএনপির জন্য ক্ষতিকর হয়েছে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ভোটের সমন্বয়ও এখানে হয়নি।

স্থানীয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জামায়াত মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালায়। ঘরে ঘরে যোগাযোগ, নারী ভোটারদের কেন্দ্রে আনা এবং দলীয় কোন্দল না থাকাÑএসব বিষয় তাঁদের পক্ষে কাজ করেছে। অন্যদিকে বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি অংশের মতে, দলীয় অভ্যন্তরীণ বিভাজন, কর্মীদের নিস্ক্রিয়তা, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস এবং মাঠপর্যায়ে দুর্বল প্রচারণা পরাজয়ের কারণ হয়েছে। বিশেষ করে ভোটারদের ঘরে ঘরে পৌঁছাতে না পারা এবং নারী ভোটারদের সক্রিয়ভাবে কেন্দ্রে আনতে না পারা বড় দুর্বলতা ছিল। ভোটের দুই দিন আগে খুলনা মহানগর বিএনপির বর্তমান কমিটির এক নেতা বলেন, ‘আমরা ধানের শীষে ভোট চাচ্ছি। তবে প্রার্থী ও তাঁর নিজের লোকদের কাছে সেভাবে মূল্যায়ন পাচ্ছি না। তিনি প্রার্থীকেন্দ্রিক রাজনীতি সাজিয়েছেন। ভেতরের ক্ষত আসলে পুরোটা উপশম হয়নি।’

খুলনা মহানগর বিএনপির সভাপতি শফিকুল আলম বলেন, ‘এখনো বুঝে উঠতে পারছি না এবার কেন হারলাম, হিসাব মিলছে না। আরও বিশ্লেষণ করার দরকার আছে।’

যশোরের ছয়টি আসনের মধ্যে পাঁচটিতে বিজয় হয়েছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। একটিতে বিএনপি জয়লাভ করলেও জামায়াতের প্রার্থীর সঙ্গে ভোটের ব্যবধান সামান্য। বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ-বিএনপি আধিক্য দেখালেও এবার জামায়াতের ভূমিধস বিজয়ে হতবাক রাজনৈতিক বোদ্ধারা। ফলাফল ঘোষণার পর চায়ের দোকান কিংবা আড্ডায় চলছে দল দুটির প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ের নানা বিশ্লেষণ। তবে স্থানীয় ভোটার ও নেতৃবৃন্দরা বলছেন, মনোনয়ন যথাযথ না হওয়ায় পাশাপাশি মনোনয়নবঞ্চিতদের বিভেদে বিএনপির এই ভরাডুবির কারণ। যশোর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক দেলোয়ার হোসেন খোকন বলেন, ‘যশোরের মতো জায়গায় জয় পরাজয়ের পরিসংখ্যানটা আমাদের জন্য উদ্বেগের। বিষয়টি কষ্টকরও বটে। পরাজয় নিয়ে নানা কারণ খুঁজে বের করছি আমরা। কিছু কিছু নেতা মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে মাঠে না থাকার অভিযোগ আছে। আবার মাঠে না থাকার প্রভাবও পড়েছে। প্রমাণ পেলে তাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ যশোর-১(শার্শা) আসনে প্রাথমিক মনোনয়ন পেয়েছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক দফতর সম্পাদক মফিকুল হাসান তৃপ্তি। তৃপ্তি মনোনয়ন পাওয়ায় তৃণমূলের গণজোয়ার সৃষ্টি হয়। পরবর্তীতে তৃপ্তিকে বাদ দিয়ে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটনকে। এরপর ক্ষোভে নিস্ক্রিয় হয়ে যান তৃপ্তির অনুসারীরা। মাঠে সেভাবে কাজ করতে দেখা যায়নি সাবেক সভাপতি খায়রুজ্জামান মধু ও বর্তমান সভাপতি হাসান জহিরের অনুসারীদের। নেতাকর্মীরা বলছেন, আসনটিতে অভিজ্ঞ ও পরিচিত প্রার্থী জামায়াতের মাওলানা আজিজুর রহমান। তার বিপরীতে বিএনপির প্রার্থী একেবারেই তরুণ নুরুজ্জামান লিটন। দলীয় নেতাকর্মী ছাড়া সাধারণ ভোটারদের কাছে তেমন একটা পরিচিত নন। এ জন্য হেরেছেন। ভোটাররা বলছেন, শার্শার রাজনীতিতে তৃপ্তি, হাসান জহির, কিংবা মধুর মতো অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের মনোনয়ন না দেওয়াতে আসনটিতে ধরাশায়ী হয়েছে বিএনপি। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী উপজেলায় রাজনীতিক পটপরিবর্তনের পর আসনটিতে যে পরিমাণ দখল, সীমান্ত চোরাচালান, রাজনীতিক প্রতিহিংসার ঘটনা ঘটেছে; তার বেশিরভাগে বিএনপির প্রার্থীর অনুসারীরা জড়িত। এ কারণে ভোটাররা বিএনপিকে ভোট দেয়নি। প্রার্থী বদল করে শার্শার মতো ধরাশায়ী হয়েছে যশোর-৬ কেশবপুর আসনটিও। প্রথমে মনোনয়ন পান ছাত্রদলের সাবেক কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ। তাকে বাদ দিয়ে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয় উপজেলা সভাপতি আবুল হোসেন আজাদকে। নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটাররা বলছেন, শ্রাবণ দলীয় প্রধান তারেক রহমানের আস্থাভাজন। সে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পরে তৃণমূলের নেতাকর্মীরা উজ্জীবিত হন। পরে আজাদ চূড়ান্ত মনোনয়ন পেলে বিএনপির বড় একটি অংশ নাখোশ হয়। কারণ আজাদ টানা ২৫ বছর উপজেলা বিএনপির নেতৃত্ব থাকলেও নির্যাতিতদের পাশে ছিলেন না। তার অনুসারীরা রাজনীতিক পটপরিবর্তনের পর লুটপাট ও নির্যাতন করেছেন। দীর্ঘ নেতৃত্বে থাকলেও জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্যতা ছিল কম। অন্যদিকে জামায়াতের প্রার্থী মোক্তার আলী মাঠে কাজ করে তার দলকে সুসংগঠিত করেছেন। ভোটাররা তাদের প্রতিফলন ঘটিয়েছে ফলের মাঠে। যশোর-৫ দলীয় মনোনয়ন পান উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ ইকবাল। পরবর্তীকে তাকে বাদ দিয়ে মনোনয়ন দেওয়া হয় জমিয়তে উলামায়ের কেন্দ্রীয় নেতা রশিদ আহম্মাদকে। দলের বড় একটি অংশ নেতাকর্মীদের নিয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হন শহীদ ইকবাল। বিএনপির মধ্যে দুটি গ্রুপে বিভক্ত হলে এর ফায়দা নেন জামায়াতের প্রার্থী এডভোকেট গাজী এনামুল হক। এ ছাড়া তিনি নিজ দল ছাড়াও হিন্দু অধ্যুষিত এলাকার ভোট টানতে পারায় আসনটিতে জয় বঞ্চিত হতে হয়নি। খুলনা বিভাগে বিএনপির একমাত্র নারী প্রার্থী ছিলেন যশোর-২ আসনে সাবিরা সুলতানা। এখানে মনোনয়ন চেয়েছিলেন হাফ ডজন নেতা। সাবিরার মনোনয়ন বাতিল চেয়ে বিক্ষোভ, দলীয় হাইকমান্ডের কাছে স্মারকলিপি দেন মনোনয়নবঞ্চিতরা। ফলে দলীয় প্রার্থী ও বঞ্চিতদের মধ্যে গ্রুপিং প্রকট হয়ে ওঠে। এমনকি প্রচারণা শুরু করলেও বঞ্চিতরা পাশে ছিলেন না সাবিরার। দলীয় গ্রুপিং ও মনোনয়ন বঞ্চিতদের অসহযোগিতায় আসনটি পরাজয় হয়েছে বলে মনে করছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। সাবিরা সুলতানা বলেন, ‘প্রথম থেকেই জেলা ও উপজেলা বিএনপির নেতৃত্ব পর্যায়ের কারও সহযোগিতা পাইনি। দলীয় গ্রুপিংয়ের সঙ্গে ভোটের মাঠে জামায়াতের প্রার্থীর টাকার ছড়াছড়িতে আমার পরাজয় হয়।’ যশোর-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী ছিলেন কৃষকদলের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক টি এস আইয়ুব। ঋণখেলাপিতে তার মনোনয়ন বাতিল হলে কপাল খুলে অভয়নগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মতিয়ার ফারাজীর। ফারাজী মনোনয়ন পেলে ভোটের মাঠে নিস্ক্রিয় হয়ে যান টি এস আইয়ুবের অনুসারীরা। রাজনীতিক পটপরিবর্তনের পর বিএনপি নেতাদের নানা অপকর্মে ভোটাররাও মুখ ফিরিয়ে নেন। যার প্রভাব পড়েছে। বিএনপির ‘দুর্গখ্যাত’ ঝিনাইদহের চারটি সংসদীয় আসনের তিনটিতেই জয় পেয়েছে জামায়াতে ইসলামী। সেখানেও বিএনপি নেতাকর্মীদের এমন অভিযোগ আছে। একই অবস্থা ও অভিজ্ঞতার কথা জানালেন সাতক্ষীরার চারটিতে, বাগেরহাটের তিনটিতে, কুষ্টিয়ায় তিনটিতে, মেহেরপুরের দুটিতে, চুয়াডাঙ্গার দুটিতে, নড়াইলের একটিতে জামায়াতের কাছে হেরে যাওয়া বিএনপি প্রার্থীদের অনুসারীরা।