*আগামী নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অতীতে যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো ফল করবে- ওয়াশিংটন পোস্ট

* রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার বাস্তব সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে আছে জামায়াতে ইসলামী-আল জাজিরা

* অন্তর্ভুক্তিমূলক অবস্থানে ভর করে ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল আশা করছে জামায়াতের সমর্থকরা-রয়টার্স

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে ঘিরে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস মিলছে। প্রথমবারের মতো কোনো নির্বাচনী জোটের প্রধান শক্তি হিসেবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনার মুখে দাঁড়িয়ে আছে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামি দল জামায়াতে ইসলামী। রয়টার্স বলছে ১০ দলীয় নির্বাচনী জোটের ফলে অন্তর্ভুক্তিমূলক’ অবস্থানে ভর করে ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল আশা করছে জামায়াত সমর্থকরা। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলটি তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক সুযোগের সামনে অবস্থান করছে বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা, ওয়াশিংটন পোস্ট, বিবিসি, রয়টার্স। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দলটির দৃশ্যমান কার্যক্রম বেড়েছে বহুগুণ। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমানভাবে সক্রিয় দলটি। বিভিন্ন দেশের আমন্ত্রণে বিদেশ সফর করছেন দলটির নেতারা। বাংলাদেশে থাকা বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও যোগাযোগ বাড়িয়েছেন জামায়াতের সঙ্গে। গত বছরের ৪ সেপ্টেম্বর চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ২৫ টি দেশ ও তিন সংস্থার রাষ্ট্রদূত, প্রতিনিধি ও কূটনীতিকরা জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সাক্ষাৎ ও বৈঠক করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর এখন পর্যন্ত অন্তত ৫০ দেশের রাষ্ট্রদূত, প্রতিনিধি ও কূটনীতিকদের সঙ্গে বৈঠক করেন জামায়াতের নেতারা। এদিকে সাংগঠনিক শক্তির দিক থেকেও জামায়াত এখন সুসংগঠিত অবস্থানে রয়েছে। তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য পেয়েছে। দলটির দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে তাদের প্রায় ২ কোটি সমর্থক এবং আড়াই লাখ নিবন্ধিত সদস্য রয়েছে।

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আপাতত ফ্রন্টরানার হিসেবে থাকা বিএনপির প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছে জামায়াতে ইসলামী। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও কয়েকটি ইসলামি দলের সমন্বয়ে গঠিত একটি নতুন নির্বাচনী জোটের মাধ্যমে দলটি নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো জামায়াতের উত্থানকে আরও স্পষ্ট করেছে। গত ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের এক জরিপে বিএনপির জনসমর্থন ৩৩ শতাংশ এবং জামায়াতের ২৯ শতাংশ বলে উঠে আসে। এরপর চলতি মাসে প্রকাশিত দেশীয় কয়েকটি সংস্থার যৌথ জরিপে ব্যবধান আরও কমে গিয়ে বিএনপির সমর্থন ৩৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জামায়াতের সমর্থন ৩৩ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াত যদি এবারের নির্বাচনে জয়ী হতে পারে, তবে তা হবে দলটির জন্য এক নাটকীয় রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন। কারণ গত দেড় দশক ধরে দলটি কঠোর দমন-পীড়নের মুখে ছিল। এই সময়ে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় দলটির শীর্ষ নেতাদের কেউ ফাঁসির দণ্ড পেয়েছেন, কেউ দীর্ঘ কারাদণ্ড ভোগ করেছেন।

বিশ্লেষকদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন শুধু একটি ভোটাভুটি নয়; এটি হতে যাচ্ছে জামায়াতে ইসলামীর জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা ও রাজনৈতিক বৈধতা অর্জনের এক কঠিন পরীক্ষা। এই নির্বাচনই নির্ধারণ করবে দীর্ঘদিন বিতর্কের কেন্দ্রে থাকা দলটি তাদের সাংগঠনিক শক্তিকে আদৌ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় রূপ দিতে পারে কি না।

এছাড়াও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র বন্ধুত্ব করতে চায়। বাংলাদেশের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে এক চাঞ্চল্যকর প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্ট। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ ও কোণঠাসা থাকা ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে সম্পর্ক বাড়াতে এবং দলটিকে ‘বন্ধু’ হিসেবে পেতে আগ্রহী ঢাকার মার্কিন কূটনীতিকরা। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াশিংটন পোস্টের হাতে আসা কিছু অডিও রেকর্ডিংয়ের বরাত দিয়ে এই তথ্য জানানো হয়েছে। দেশটির এক কূটনীতিক এক নারী সাংবাদিকের সঙ্গে আলাপকালে এ কথা জানিয়েছেন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১ ডিসেম্বর ২০২৫ নারী সাংবাদিকদের সঙ্গে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে ঢাকার একজন মার্কিন কূটনীতিক মন্তব্য করেন যে, বাংলাদেশ বর্তমানে অনেকটা ‘ইসলামপন্থী ধারায়’ মোড় নিয়েছে। ওই কূটনীতিক পূর্বাভাস দেন যে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামী অতীতে যেকোনো সময়ের চেয়ে ভালো ফল করবে।

রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানায়, এক দশকেরও বেশি নির্বাচনী রাজনীতির বাইরে থাকা বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থি দল জামায়াতে ইসলামী এবার খোলস পাল্টে নিজেকে নতুনভাবে উপস্থাপন করছে। আসন্ন সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে দলটি নতুন সমর্থকও টানছে। মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টের অভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা ও তাঁর সরকার ক্ষমতাচ্যুত হয়। এরপর জামায়াত নিজের রাজনীতির নতুন রূপ দেখানোর চেষ্টা করছে। পলাতক মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত আসামি ও জুলাই গণহত্যাকারী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হওয়ায় জামায়াত তথাকথিত ‘দুর্নীতিবিরোধী’ ভাবমূর্তি ও ‘কল্যাণমূলক কার্যক্রমের’ পাশাপাশি কিছু বিশ্লেষকের ভাষায় ‘তুলনামূলক অন্তর্ভুক্তিমূলক’ অবস্থানে ভর করে ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল আশা করছে।

বিবিসি জানায়, বাংলাদেশে বরাবরই কোনো একজন শীর্ষ নেতাকে সামনে রেখে রাজনৈতিক দল বা জোটকে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে দেখা গেলেও জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে গঠিত ১০ দলীয় জোটে এবার সেভাবে কাউকে সামনে রাখা হয়নি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়েছে এবং দলগুলো ব্যস্ত সময় পার করছে। এই নির্বাচনে প্রার্থী প্রায় দুই হাজার। তবে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে দুটি বড় রাজনৈতিক পক্ষের মধ্যে। একদিকে আছে বিএনপি এবং দলটি যাদের সঙ্গে আসন সমঝোতা করেছে তারা। অন্যদিকে জামায়াত ও ও তার সঙ্গে সমঝোতায় আসা দলগুলো। বিএনপির জোটের নেতৃত্বেও আছেন তারেক রহমান। বিপরীতে জামায়াতসহ ১০ দলের যে জোট হয়েছে, সেখানে একক কোনো নেতৃত্ব নেই। বরং জোটটি চলছে যৌথ নেতৃত্বে। এছাড়া এই জোট নির্বাচনে জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন কিংবা নির্বাচনে বিরোধী দলে বসলে বিরোধী দলীয় নেতা কে হবেন, সেটাও নির্ধারিত হয়নি।

যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউটের (আইআরআই) ডিসেম্বরের জরিপে জামায়াতকে অন্যতম ‘পছন্দের’ দল হিসেবে দেখানো হয়েছে। ওই জরিপে বলা হয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে জামায়াত ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে। রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা প্রতিক্রিয়াশীল নই, কল্যাণমূলক রাজনীতি শুরু করেছি।’ তিনি দলের মেডিকেল ক্যাম্প, বন্যা ত্রাণ কার্যক্রম এবং গণঅভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথা উল্লেখ করেন।

ঢাকার ব্যস্ত বাজারে ভ্যানগাড়িতে ডাবের পানি বিক্রি করছিলেন ৪০ বছর বয়সী মোহাম্মদ জালাল। তিনি রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘এবার আমরা নতুন কিছু চাই, আর নতুন বিকল্প হলো জামায়াত। তাদের ভাবমূর্তি পরিষ্কার, তারা দেশের জন্য কাজ করে।’

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নির্বাচন গবেষক অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক বলেন, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে নিপীড়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে মানুষের ক্ষোভ জামায়াতকে সুবিধা দিয়েছে। বিগত সাড়ে ১৫ বছরে গুম খুন জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়েছে জামায়াত-ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেটের পলিটিকাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. মোঃ সাহাবুল হক বলেন, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামিক রাজনৈতিক দল। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে দলটি ব্যাপক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। প্রথম সারির একাধিক নেতাকে বিতর্কিত যুদ্ধাপরাধ ইস্যুতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ফাঁসি দেওয়া হয়। এ ছাড়া অসংখ্য নেতাকর্মী গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার হয়েছে। এসব ঘটনার ফলে সাধারণ মানুষের একটি বড় অংশের কাছ থেকে জামায়াত সহানুভূতি অর্জন করেছে। ২০২৪ সালের ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনে জামায়াতের সক্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা তাদেরকে আবারও রাজনৈতিকভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। বর্তমান বাস্তবতায় আওয়ামী লীগ রাজনীতির মাঠে অনুপস্থিত এবং জাতীয় পার্টি অনেকটাই নিষ্ক্রিয় থাকায়, আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে জামায়াত একটি শক্তিশালী প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন জরিপে জামায়াতের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধির ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে এবং আগামী নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে এমন আভাসও মিলছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমগুলোতেও জামায়াতকে ঘিরে আগ্রহ লক্ষণীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। গত মঙ্গলবার বিশ্বের প্রায় ৪০ দেশের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদের সামনে নতুন বাংলাদেশ গড়ার পলিসি সামিট দিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। যা দেশে বিদেশে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে জামায়তকে। এই বিষয়ে জামায়াতের মুখপাত্র এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জামায়াত কখনো ধর্মের নামে সহিংসতা বা অসহিষ্ণুতাকে সমর্থন করেনি।

গত বছরের শুরুতেই প্রার্থী বাছাই শুরু করে জামায়াত। ভোটারদের মনোভাব বুঝতে আন্তর্জাতিক সংস্থাকেও নিয়োগ দেয় জামায়াত। গত সপ্তাহে দলটি ১৭৯ আসনে প্রার্থী দেওয়ার কথা জানায়। এর মধ্যে ৭৪টি আসন এনসিপি ও অন্যান্য মিত্রদের দেওয়া হয়েছে।

জামায়াতের অন্যতম প্রার্থী গুম হওয়া আয়নাঘর থেকে বেঁচে ফিরে আসা ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম (আরমান) বলেন, ‘এপ্রিলে জামায়াত আমার সঙ্গে যোগাযোগ করে। তারা আমাকে তথ্য দেখায়, যেখানে বলা হয় যে মানুষ পুরনো দলগুলোর ওপর বিরক্ত এবং পরিবর্তন চায়।