দেশের প্রশাসন ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের দিকে ঝুঁকে পড়ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের। তিনি বলেন, এ ধারা অব্যাহত থাকলে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিয়ে জনগণের মধ্যে সংশয় ও হতাশা তৈরি হবে। একইসঙ্গে নির্বাচনী মাঠে সমতার নীতি ভঙ্গ হলে দায় এড়াতে পারবে না নির্বাচন কমিশন। গতকাল রোববার রাতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মাদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক শেষে রাত ৮টায় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে এসব কথা বলেন ডা. তাহের।
এর আগে রোববার সন্ধ্যা সোয়া ৬টার পর প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করতে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় যান বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। জামায়াত আমীরের নেতৃত্বে দলটির চার সদস্যের প্রতিনিধিদল যমুনায় প্রবেশ করে। প্রতিনিধি দলে অন্যদের মধ্যে ছিলেন দলের নায়েবে আমীর ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের, সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, এবং সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান।
ডা.তাহের বলেন, সারা দেশে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের আচরণে বিএনপির প্রতি পক্ষপাতের বিষয়টি এখন দৃশ্যমান। বিশেষ করে মাঠপর্যায়ে দায়িত্বে থাকা এসপি ও ডিসিদের যারা একইসঙ্গে রিটার্নিং অফিসারের দায়িত্ব পালন করছেন আচরণে নিরপেক্ষতার ঘাটতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ ধরনের কর্মকর্তাদের একটি তালিকা তারা ইতোমধ্যে করেছেন বলেও জানান তিনি। তবে আপাতত বিষয়টি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে এবং এখনো লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়নি। ডা. তাহের অভিযোগ করেন, গত দুই-তিন সপ্তাহ ধরে একটি দলের শীর্ষ নেতাকে ঘিরে সরকারের অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও প্রটোকল দেওয়ার প্রবণতা নির্বাচনী মাঠে সমতার নীতির সরাসরি লঙ্ঘন।
তিনি বলেন, কারো নিরাপত্তা বা প্রটোকলে আমাদের আপত্তি নেই। কিন্তু একটি প্রধান রাজনৈতিক দল হিসেবে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীরের প্রতিও একই ধরনের আচরণ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় এটি পক্ষপাতমূলক আচরণ হিসেবে বিবেচিত হবে। জামায়াতের নায়েবে আমীর বলেন, নির্বাচন কমিশন যদি এ ধরনের বৈষম্যের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে জাতি একে পক্ষপাতমূলক অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করবে এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড পুরোপুরি ভেঙে পড়বে।
ডা. তাহের জানান, এসব বিষয় তারা সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন এবং প্রয়োজনে নির্বাচন কমিশন যথাযথ ভূমিকা না নিলে প্রধান উপদেষ্টার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তিনি বলেন, জামায়াতে ইসলামী দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে প্রধান উপদেষ্টা ব্যক্তিগতভাবে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন চান। তবে তার আশপাশে থাকা কিছু উপদেষ্টা তাকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছেন বলে অভিযোগ তুলে বিষয়টি গুরুত্বসহকারে বিবেচনার আহ্বান জানান জামায়াতের নায়েবে আমীর।
এদিকে, দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন ডা. তাহের। তিনি জানান, প্রধান উপদেষ্টা তাদের আশ্বস্ত করেছেন যে মন্ত্রিপরিষদ পর্যায়ে প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং এজন্য প্রয়োজনীয় অর্থও বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
জামায়াতের নায়েবে আমীর বলেন, যদি সত্যিই প্রতিটি কেন্দ্রে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়, তাহলে এটিকে একটি উল্লেখযোগ্য ও ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে আমরা দেখব। এ কারণে প্রধান উপদেষ্টাকে আগাম ধন্যবাদ জানানো হয়েছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
এদিকে প্রশাসনিক বৈষম্য নিয়েও কড়া সমালোচনা করেন ডা. তাহের। তিনি বলেন, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক নেতার জাতীয় পরিচয়পত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে তৈরি হয়ে গেলেও সাধারণ নাগরিকদের মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয়, যা নাগরিক অধিকার ও প্রশাসনিক ন্যায়ের পরিপন্থী। নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তিনি স্পষ্ট করে বলেন, জামায়াত বা জোটের পক্ষ থেকে প্রশাসনের কাছে কোনো অতিরিক্ত নিরাপত্তা চাওয়া হয়নি। আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করি। নির্বাচনী পরিবেশ এবং জনমনে তৈরি হওয়া ধারণার কারণে নিরাপত্তার বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। ডা. তাহের আরও বলেন, ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে তারা প্রতিটি নাগরিকের জন্য সমান সুযোগ, সমান নিরাপত্তা এবং প্রশাসনের সমান আচরণ নিশ্চিত করবেন।
এক প্রশ্নের জবাবে ডা. তাহের বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমীর মুফতি ফয়জুল করীমের আসনে প্রার্থী দেবে না বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। এবিষয়ে তিনি আরও বলেন, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের আমীর মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিম নির্বাচন করবেন না। সেজন্য তাদের দলের নায়েবে আমির মুফতি ফয়জুল হকের প্রতি সম্মান জানিয়ে তার আসনে আমাদের প্রার্থী প্রত্যাহার করে নেব। কারণ ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আমাদের নির্বাচনী ঐক্য করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তারা থাকতে পারেননি তাদের সফলতা কামনা করছি।
ডা. তাহের আরও জানান, বর্তমানে জোটের সঙ্গে যুক্ত হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে আরও অন্তত ১৫টি রাজনৈতিক দল। তবে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার সময়সীমা শেষ হয়ে যাওয়ায় কারিগরি কারণে তাদের কোনো আসন দেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে আসন না পেলেও অনেক দল এই রাজনৈতিক ঐক্যের সঙ্গে থাকতে আগ্রহী।
সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের সাক্ষাৎ :
এদিকে এদিন ডা. শফিকুর রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত সিঙ্গাপুর হাইকমিশনের মান্যবর চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মি. মিচেল লি রাজধানীর বসুন্ধরাস্থ কার্যালয়ে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। বৈঠকে বাংলাদেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, শিল্প ও বাণিজ্য, আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন, রাষ্ট্রীয় সংস্কারসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পারস্পরিক মতবিনিময় করা হয়। মান্যবর চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স মি. মিচেল লি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ইতিবাচক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ ও সিঙ্গাপুরের মধ্যকার দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় হবে বলে তারা আশাবাদ ব্যক্ত করেন।