মাদারীপুর-১ (শিবচর) আসনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারণায় অংশ নিতে দেখা গেছে বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের অন্তত ২০ জন নেতা-কর্মীকে। এসময় তাদের মুখে 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু' স্লোগান শোনা গেছে, যা স্থানীয় রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় শিবচর পৌরসভার খান বাড়িতে আয়োজিত এক উঠান বৈঠকে এই ঘটনা ঘটে। ওই বৈঠকে ভোটারদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন বিএনপি মনোনীত প্রার্থী নাদিরা আক্তার।
আওয়ামী লীগের এসব নেতার দাবি, তারা সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটনের নির্দেশে ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনি প্রচারে সমর্থন জানাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের এমন প্রচারকে ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।
বিএনপির একাংশের নেতা-কর্মীরা বলছেন, মাদারীপুর-১ আসনটি আওয়ামী লীগ অধ্যুষিত এলাকা। জেলার বর্তমান ও সাবেক সব জনপ্রতিনিধি আওয়ামী লীগ ও সাবেক চিফ হুইপ নূর-ই আলম চৌধুরী লিটনের অনুসারী। সাবেক এই সংসদ সদস্যের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর থেকে আওয়ামী লীগের পলাতক নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে উঠান বৈঠকগুলোতে হাজির হয়ে বিএনপির প্রার্থীর প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। এর ফলে বিএনপি প্রার্থী নাদিরা আক্তার তার প্রতিদ্বন্দ্বী দুই 'বিদ্রোহী' প্রার্থীর তুলনায় ভোটের মাঠে এগিয়ে গেছেন বলে মনে করছেন দলটির নেতা-কর্মীরা।
পৌর বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম আহ্বায়ক হেমায়েত হোসেন খানের সভাপতিত্বে উঠান বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক শাহাদাত হোসেন খান, যুগ্ম আহ্বায়ক জহের গোমস্তা, সদস্য আবু জাফর চৌধুরী, পৌর বিএনপির সদস্যসচিব আজমল খানসহ বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতারা। উঠান বৈঠকটি পরিচালনা করেন উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব সোহল রানা।
সভায় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষে সমর্থন জানিয়ে বক্তব্য দেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন শিবচর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ও সাবেক পৌর মেয়র মো. আওলাদ হোসেন খান, কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান বিএম আতাহার ব্যাপারী, শিবচর উপজেলা যুবলীগের সভাপতি ইলিয়াস পাশা, চরজানাজাত ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর হোসেন রায়হান সরকার, কাঁঠালবাড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মোহসিন উদ্দিন, বহেরাতলা উত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন হায়দার, মাদবরেরচর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফজলু মুন্সি, বাঁশকান্দী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান খোকন বায়াতি, কুতুবপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. হাজী আতিকুর মাদবর, পৌরসভার সাবেক কাউন্সিলরসহ আওয়ামী লীগের বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীরা।
উঠান বৈঠকে শিবচর পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা আক্তার হোসেন খান 'জয় বাংলা' স্লোগান দিয়ে তিন মিনিটের বক্তব্য দেন। এ সময় তিনি বিএনপির ধানের শীষের পক্ষে কাজ করে যাওয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। বক্তব্য শেষে তিনি 'জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু' বলেন।
উঠান বৈঠকে বিএনপির প্রার্থী নাদিরা আক্তার বলেন, 'আমাদের আগামীর রাষ্ট্রনায়ক আমাদের দলের চেয়ারম্যান বলেছেন, সবার আগে বাংলাদেশ। তাই আমরা বলব, সবার আগে শিবচর। আমরা এক ও ঐক্যবদ্ধভাবে চলব। ঐক্যবদ্ধভাবে বিএনপিকে বিজয়ী করে আনতে হবে। ঐক্যবদ্ধ না থাকলে আমাদের আশা–আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারব না। কে কোন দল করল সেটা বড় বিষয় না, বড় বিষয় হলো, আমরা সবাই মানুষ।' নাদিরা আক্তার আরও বলেন, 'আগামীতে কারও নামে কোনো মিথ্যা মামলা শিবচরে থাকবে না। নির্বাচনের পর আপনাদের (আওয়ামী লীগ নেতাদের) কোনো অযথা হয়রানি করা হবে না। আমরা এক ও ঐক্যবদ্ধ থাকলে শিবচরকে আধুনিক হিসেবে গড়ে তুলতে কঠিন হবে না। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে শিবচরকে গড়ব।'
বিএনপি প্রথমে মাদারীপুর-১ আসনে শিবচর উপজেলা বিএনপির সদস্য কামাল জামান মোল্লাকে মনোনয়ন দিয়েছিল। পরে মনোনয়ন না পেয়ে সাজ্জাদ হোসেন সিদ্দিকীর সমর্থকেরা অসন্তোষ প্রকাশ করলে তার মনোনয়ন স্থগিত করে দ্বিতীয় দফায় জেলা বিএনপির সদস্য ও শিবচর উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক নাদিরা আক্তারকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। সম্প্রতি এই আসনের দুই বিদ্রোহী প্রার্থীসহ উপজেলা বিএনপির ১০ নেতাকে সব পদ থেকে বহিষ্কার করেছে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটি।
এদিকে দল থেকে বিদ্রোহী দুই প্রার্থীকে বহিষ্কার করার পরে তারাও আওয়ামী লীগের নেতাদের সমর্থন নিয়েছেন। সম্প্রতি জাহাজ প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী কামাল জামান মোল্লার উঠান বৈঠকে শিবচর আওয়ামী লীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল লতিফ মোল্লা, শিবচর পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি তোতা খানকে বিগত দিনের জন্য নিজেদের ভুল স্বীকার করে দুঃখপ্রকাশ করতে দেখা গেছে।