বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শেরপুর জেলা শাখার সেক্রেটারি ও শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী– ঝিনাইগাতী) আসনে জামায়াতে ইসলামী মনোনীত ও ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের সমর্থিত প্রার্থী আলহাজ্ব মো: নুরুজ্জামান বাদল (৫১) ইন্তেকাল করেছন। ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মঙ্গলবার (৩ফেব্রুয়ারি) দিবাগত গভীর রাত প্রায় ২ঘটিকার সময় তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন শেরপুর জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা হাফিজুর রহমান।

এছাড়া বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।

জানা গেছে, মঙ্গলবার রাত ১০টার দিকে হঠাৎ শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যায় গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন নুরুজ্জামান বাদল। তাৎক্ষণিকভাবে তাকে শ্রীবরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। পরে সেখান থেকে দ্রুত ময়মনসিংহে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।

ময়মনসিংহ নেওয়ার পথে রাত ২টার দিকে শহরের প্রবেশমুখ ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে তার অবস্থার অবনতি ঘটে এবং সেখানে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। পরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে তার মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যায়। পরিবারের পক্ষ থেকে মৃতের ভাই সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ওয়ারেন্ট অফিসার মো. মাসুদুজ্জামান বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

এছাড়াও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে দেওয়া একটি পোস্টে নুরুজ্জামান বাদলের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। পোস্টে বলা হয়, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী শেরপুর জেলা শাখার সম্মানিত সেক্রেটারি ও শেরপুর-৩ সংসদীয় আসনে জামায়াত মনোনীত এমপি প্রার্থী নুরুজ্জামান বাদল আনুমানিক আজ রাত ৩টায় কিডনিজনিত রোগে হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

পোস্টে আরও উল্লেখ করা হয়, আল্লাহ তায়ালা তাকে জান্নাতুল ফেরদাউস দান করুন এবং তার শোকসন্তপ্ত পরিবার-পরিজন ও সহকর্মীদের ধৈর্য ধারণের তৌফিক দান করুন।

জানাযা ও দাফন

মরহুমের ১ম জানাজা-

দুপুর ২.৩০টা, শেরপুর পৌর ঈদগাহ মাঠ, শেরপুর। ও বিকাল ৫টায়, শ্রীবরদী সরকারি কলেজ মাঠে ২য় জানাজা শেষে শ্রীবরদী পৌর শহরের ০১নং ওয়ার্ডের দক্ষিণ পোড়াগড় গ্রামে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হবে।

ব্যক্তিগত পরিচয়ঃ

জনাব নুরুজ্জামান বাদল ছিলেন শ্রীবরদী উপজেলার সকল মহলের এক পরিচিত নাম। ধর্ম-বর্ণ, জোয়ান-বৃদ্ধ সকলের কাছেই তিনি আপনজন। সততা, নৈতিকতা ও আদর্শিক রাজনীতিতে তার পদচারনা তাকে সকলের কাছে গ্রহনযোগ্য করে তুলেছে। তিনি শ্রীবরদী উপজেলার সাবেক তাতিহাটী ইউনিয়ন, বর্তমানে শ্রীবরদী পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের পোড়াগড় গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করে। তার পিতা মরহুম মোহাম্মদ আলী, একজন বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও শিক্ষানুরাগী। ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর রুকন এবং থানা সেক্রেটারি হিসেবেও দ্বায়িত্ব পালন করছেন । শ্রীবরদী সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন, তাদের মধ্যে তিনি একজন। প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে দূর-দূরান্তে ঘুরে ঘুরে কলেজের জন্য ছাত্র-ছাত্রী সংগ্রহ করে এই উপজেলায় শিক্ষার-আলো সম্প্রসারণে উনার অবদান অনস্বীকার্য। তার মাতা নুরজাহান বেগম। দাদা মরহুম হোসেন আলী মুন্সী। মরহুম হোসেন আলী মুন্সী অত্র এলাকার আধ্যাত্বিক মুসলিম ছিলেন। তার মাতুলালয় এতিহ্যবাহী রাণীশিমুল ইউনিয়নের তেতুলীয়া গ্রামে। নানা হাজী আব্দুল গফুর-ও [ গফুর হাজী ] ছিলেন একজন বিশিষ্ট

রাজনীতিবিদ, রানীশিমুল ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক জনপ্রিয় চেয়ারম্যান, এবং কর্মজীবনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। পারিবারিক ঐতিহ্যই তাকে রাজনীতি ও সমাজসেবার সাথে জড়িত করেছে।

শিক্ষাগত যোগ্যতাঃ

তিনি শ্রীবরদীর ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শ্রীবরদী এ. পি. পি. আই. থেকে এস এস সি, শ্রীবরদী সরকারী কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেন। পরবর্তীতে শ্রীবরদী সরকারি কলেজ থেকে ব্যাচেলর অফ আর্টস (বিএ) পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে গ্রেফতার হলে তিনি সেখানে আর পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি। পরবর্তীতে শেরপুর সরকারি কলেজ থেকে বিএ পাশ করেন। ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন এবং সবশেষে আইন বিষয়ে 'এলএলবি' ডিগ্রি সমাপ্ত করেছেন।

কর্মজীবনঃ

ছাত্রজীবনেই তিনি অনুভব করেন যে, জনবহুল তাতীহাটীতে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন; যা অত্র এলাকার জনগণের দীর্ঘদিনের আকাঙ্খা। তাই শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করেই অনেক লোভনীয় চাকুরী পরিত্যাগ করে স্কুল প্রতিষ্ঠায় নিজেকে আত্ননিয়োগ করেন। অত্র এলাকার বিশিষ্ট শিক্ষানুরাগী ও সমাজসেবক অধ্যাপক মাজহারুল ইসলামের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রতিষ্ঠা করেন 'তাতীহাটী আইডিয়াল স্কুল'। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই তিনি প্রতিষ্ঠানটির প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। তার দক্ষ পরিচালনায় বর্তমানে ফলাফল বিবেচনায় এটি শ্রীবরদীর অন্যতম সেরা স্কুল। পাশের হার প্রায় শতভাগ। এছাড়াও সাহিত্য, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া অঙ্গনে এস্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা বিভিন্ন স্তরে প্রতিনিয়ত অর্জন করছে শ্রেষ্ঠত্ব।

বৈবাহিক জীবনঃ

তিনি ১৯৯৭ সালে শ্রীবরদী উপজেলা সদরের সাতানী শ্রীবরদী মহল্লার বাসিন্দা শ্রীবরদী এ পি পি আই এর শিক্ষক জনাব মরহুম মোঃ আবেদ হোসেনের দ্বিতীয় মেয়ে নাসরিন বেগমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। প্রাণীবিদ্যায় মাষ্টার্স ডিগ্রি অর্জনকারী জনাবা নাসরিন বেগম রাণীশিমুল ইউনিয়ন গার্লস স্কুলের শিক্ষিকা হিসেবে কর্মরত রয়েছেন। এই দম্পতির এক পুত্র সন্তান রয়েছে।

রাজনৈতিক জীবনঃ

ছাত্রজীবন থেকেই নুরুজ্জামান বাদল রাজনীতির সঙ্গে ওতোপ্রোতো ভাবে জড়িত। তিনি বাংলাদেশ ইসলামি ছাত্রশিবির, শ্রীবরদী সরকারি কলেজের সভাপতি, শ্রীবরদী শহর শাখার সভাপতি ও ১৯৯৩-৯৪ সালে শ্রীবরদী উপজেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তী ১৯৯৫-১৯৯৬ সালে শেরপুর জেলা সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন।

ছাত্রজীবন শেষে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীতে যোগ দেন। ছিলেন শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের আমীর। দ্বায়িত্ব পালন করেছেন জেলা জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও নায়েবে আমির-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে। ২০ দলীয় ঐক্যজোটে ছিলেন শেরপুর জেলার অন্যতম শীর্ষনেতা। মৃত্যুকালে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, শেরপুর জেলার সন্মানিত সেক্রেটারির দায়িত্বে ছিলেন।

কারাবরণঃ

তিনি এ পর্যন্ত ৫ বার কারা নির্যাতনের স্বীকার হন। ১৯৯৩ সালের তাকে পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে শ্রীবরদী সরকারি কলেজে পরীক্ষার হল থেকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতার করা হয়। পরবর্তীতে একই মামলায় দ্বিতীয়বারের মতো কারাবরণ করেন। ১৪ দলীয় জোটের সময় তিনি ২০১০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তৃতীয়বারের মতো কারাবরণ করেন। পরবর্তীতে তিনি এ-মামলায় বেকসুর খালাস পান। ২০১৩ সালের রমজান মাসে তিনি অসুস্থ অবস্থায় বাড়ি থেকে গ্রেফতার হন। এরপরও ষড়যন্ত্র থেমে নেই। ২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারীর ঘটনার দিন তিনি ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকলেও তাকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত দেখিয়ে দুটি মামলায় প্রধান আসামী করা হয়েছিল। ২০১৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে প্রায় সকল মামলায় উচ্চ আদালত কর্তৃক জামিন নিয়েই তিনি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেছিলেন। সর্বশেষ নির্বাচন শেষ করার ১৫ দিনের মাথায় তিনি ৮/১০ টি মামলা মাথায় নিয়ে স্যারেন্ডার করেন এবং ৬ মাস কারাবন্দী ছিলেন।

এরপরেও তিনি জেল, জুলুম, নির্যাতন ও সকল রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে দেশমাতৃকার সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, জীবনের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত তিনি শ্রীবরদী-ঝিনাইগাতী'র জনগণের পাশে আছেন এবং থাকবেন; কোন ষড়যন্ত্রই তাকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারবে না। আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মনোনীত একজন সংসদ সদস্য পদপ্রার্থী হিসেবে দলমত নির্বিশেষে সকলের মনে জায়গা করে নিয়েছেন।

মৃত্যুর শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মানের জন্য কাজ করে গেছেন।