বাংলাদেশের ইতিহাসে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে শুরু হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ২০২৬-এর আনুষ্ঠানিক ডামাডোল। গত ২২ জানুয়ারি থেকে দেশজুড়ে শুরু হওয়া এই নির্বাচনী প্রচারণা কেবল ক্ষমতার পটপরিবর্তনের লড়াই নয়, বরং এক দীর্ঘ দুঃশাসন পরবর্তী ‘নতুন বাংলাদেশ’ বিনির্মাণের মহোৎসবে পরিণত হয়েছে। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল ইতোমধ্যে তাদের ইশতেহার ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন নিয়ে ভোটারদের দ্বারে দ্বারে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামÑএই তিন শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি ও পরিকল্পনা এখন সাধারণ মানুষের মুখে মুখে।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী: ইনসাফভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্রের ব্লু-প্রিন্ট

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান আগামীর বাংলাদেশ বিনির্মাণে এক বৈপ্লবিক ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন। ২০ জানুয়ারি রাজধানীতে অনুষ্ঠিত ‘পলিসি সামিট-২০২৬’-এ তিনি যে ‘পলিসি পেপার’ তুলে ধরেছেন, তা মূলত একটি মধ্যম আয়ের ও মর্যাদাবান রাষ্ট্র গড়ার নীলনকশা।

বেকার মুক্ত বাংলাদেশ ও দক্ষতা উন্নয়ন: ডা. শফিকুর রহমান স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, জামায়াত কেবল ‘বেকারভাতা’ দিয়ে নাগরিকদের পরনির্ভরশীল করতে চায় না। বরং প্রতিটি যুবক-যুবতীকে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ‘স্কিলড সিটিজেন’ বা দক্ষ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা হবে। জামায়াতের পরিকল্পনা অনুযায়ী, আগামী ৫ বছরে ১ কোটি তরুণকে কারিগরি ও বাজারভিত্তিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে এবং উচ্চশিক্ষা শেষে চাকরির আগ পর্যন্ত ৫ লক্ষ গ্রাজুয়েটকে সুদমুক্ত ঋণ (কর্জে হাসানা) প্রদান করা হবে।

অর্থনৈতিক সংস্কার: জামায়াতের পলিসি পেপারে দীর্ঘমেয়াদে আয়কর ১৯ শতাংশ এবং ভ্যাট ১০ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ এবং শিল্প খাতে আগামী ৩ বছর বিদ্যুৎ-গ্যাসের দাম না বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি ব্যবসায়িক মহলে স্বস্তি এনেছে।

সুশাসন ও নারী অধিকার: নারীদের নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়নকে জামায়াত আমীর ‘অর্থনৈতিক প্রয়োজন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, ইডেন ও বদরুন্নেসা কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা হবে। প্রশাসন থেকে দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও স্বজনপ্রীতি নির্মূল করে একটি ‘স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।

বিএনপি: রাষ্ট্র মেরামত ও সামাজিক সুরক্ষা

বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বহুল আলোচিত ‘৩১ দফা’ রূপরেখার ভিত্তিতে ‘রাষ্ট্র মেরামত’ ও জনকল্যাণের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। তিনি নির্বাচনী জনসভাগুলোতে জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছেন।

ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ড: তারেক রহমানের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি হলো দেশের প্রতিটি পরিবারকে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান করা। এর মাধ্যমে হতদরিদ্র ও নিম্নআয়ের পরিবারগুলোকে খাদ্য সহায়তা বা সরাসরি নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হবে। একইভাবে কৃষকদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’ চালু করে সার, বীজ ও ঋণের নিশ্চয়তা দেওয়া হবে।

শাসনতান্ত্রিক সংস্কার ও ক্ষমতার ভারসাম্য: বিএনপির ৩১ দফায় রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা, দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ প্রবর্তন এবং একজন ব্যক্তির দুই মেয়াদের বেশি প্রধানমন্ত্রী না থাকার বিধান রাখা হয়েছে। তারেক রহমান প্রবাসীদের জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে সারা দেশে কারিগরি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

আইনশৃঙ্খলা ও মর্যাদা: তিনি বারবার বলছেন, নির্বাচনের প্রধান লক্ষ্য হবে মানুষের কথা বলার অধিকার এবং ভোটাধিকার ফিরিয়ে দেওয়া। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করে একটি পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তর করার প্রতিশ্রুতিও তার প্রচারণায় প্রাধান্য পাচ্ছে।

জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি): জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষা ও তারুণ্যের জয়গান

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম রূপকার নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে গঠিত এনসিপি এবারের নির্বাচনে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। তারুণ্যের এই শক্তিটি ‘দেশ পরিবর্তনের’ স্লোগান নিয়ে মাঠে নেমেছে।

বৈষম্যহীন সমাজ ও বিপ্লবের চেতনা: নাহিদ ইসলাম তার প্রচারণায় বারবার বলছেন, এবারের নির্বাচন কেবল সরকার পরিবর্তনের নয়, বরং প্রচলিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা পরিবর্তনের নির্বাচন। জুলাই শহীদদের স্বপ্নের প্রতিফলন ঘটিয়ে একটি বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনই এনসিপির মূল লক্ষ্য।

সংস্কার ও তারুণ্যের অংশগ্রহণ: রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তরুণদের সরাসরি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে চায় এনসিপি। তারা বিচার বিভাগ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক ক্ষেত্রগুলোতে গভীর সংস্কারের কথা বলছে। নাহিদ ইসলামের মতে, জনগণ এখন আর কেবল রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতিতে তুষ্ট নয়, তারা চায় দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন।

নির্বাচনের মাঠের বিশেষ সমীকরণ ও জোটের রাজনীতি

এবারের নির্বাচনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী হিসেবে এনসিপির প্রতীক ‘শাপলা কলি’ এবং জামায়াতে ইসলামীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ বা অন্যান্য মিত্রদের প্রতীকের মধ্যে একটি সমন্বিত প্রচারণা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ডা. শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলামকে একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে, যা আগামীর জাতীয় ঐক্যের ইঙ্গিত দেয়। অন্যদিকে বিএনপি একক শক্তিতে সারা দেশে তাদের অবস্থান শক্তিশালী করছে।

নারীদের অংশগ্রহণ: নির্বাচন কমিশনের তথ্যমতে, এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত-এনসিপি জোট থেকে বিপুল সংখ্যক নারী কর্মী মাঠে কাজ করছেন। যদিও কিছু জায়গায় নারীকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে, তবে ডা. শফিকুর রহমান ঘোষণা করেছেন যে, নারী-পুরুষ মিলেমিশেই আমরা আগামীর বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়বো।

আগামীর চ্যালেঞ্জ ও ভোটারের প্রত্যাশা

নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সাথে সাথে ভোটারদের প্রত্যাশাও তুঙ্গে। বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এলডিসি উত্তরণের পথে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং সুশাসনই হবে উন্নয়নের প্রধান চাবিকাঠি। ভোটাররা চাইছেন এমন একটি নেতৃত্ব, যারা কেবল প্রতিশ্রুতি দেবেন না, বরং বিগত দেড় দশকের ক্ষত মুছে ফেলে একটি নিরাপদ ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ উপহার দেবেন।

ডা. শফিকুর রহমানের ‘ইনসাফভিত্তিক সমাজ’, তারেক রহমানের ‘রাষ্ট্র মেরামত’ আর নাহিদ ইসলামের ‘বিপ্লবী আকাক্সক্ষা’Ñএই তিন ধারার সমন্বয়ে বাংলাদেশ এক নতুন অধ্যায়ের দিকে এগোচ্ছে। ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিতব্য এই নির্বাচনে জনরায়ের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে কোন পথে হাঁটবে আগামীর বাংলাদেশ। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার, বাংলাদেশের মানুষ আর কোনোভাবেই স্বৈরতন্ত্র বা একদলীয় শাসন চায় না; তারা চায় মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং তাদের কণ্ঠের যথাযথ মূল্যায়ন।

বিশ্লেষকদের অভিমত

রাজনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষক প্রফেসর ড. আবদুর রবের মতে, নতুন বাংলাদেশ হবে জনগণের রাষ্ট্র, যেখানে শোষণমুক্ত সমাজ গঠনের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। তিনি মনে করেন, এলডিসি উত্তরণের এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে কেবল রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং জনগণের অংশগ্রহণই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে।

অন্যদিকে, ডাকসু বা জকসুর মতো ছাত্র সংগঠনগুলোর নির্বাচিত প্রতিনিধিরাও শিক্ষার্থীদের অধিকার ও নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছেন। তারা মনে করেন, ছাত্র রাজনীতিতে পেশিশক্তির বদলে মেধা ও আদর্শের লড়াই থাকা জরুরি।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের এই প্রচারণা উৎসবমুখর হওয়ার পাশাপাশি জনগণরে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির এক বিশাল দলিলে পরিণত হয়েছে। ভোটাররা এখন অপেক্ষা করছেন সেই দিনটির জন্য, যেদিন তারা ব্যালটের মাধ্যমে তাদের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বেছে নেবেন।

বিষয় জামায়াতে ইসলামী বিএনপি জাতীয় নাগরিক পার্টি - এনসিপি

মূল দর্শন ইনসাফভিত্তিক সমাজ ও ইসলামি মূল্যবোধ। রাষ্ট্র মেরামত ও ৩১ দফা সংস্কার কর্মসূচি। জুলাই বিপ্লবের আকাক্সক্ষা ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র।

বেকারত্ব ও কর্মসংস্থান দক্ষতা উন্নয়ন: ৫ বছরে ১ কোটি তরুণকে কারিগরি প্রশিক্ষণ। বেকারভাতার বদলে কর্মসংস্থান। ফ্যামিলি কার্ড: দরিদ্রদের জন্য কার্ডের মাধ্যমে সরাসরি আর্থিক ও খাদ্য সহায়তা। তারুণ্যের নেতৃত্ব: নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

শিক্ষা খাত স্নাতক শেষে ৫ লক্ষ গ্রাজুয়েটকে সুদমুক্ত ঋণ (কর্জে হাসানা)। নারী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা। যুগোপযোগী শিক্ষা সংস্কার ও কারিগরি শিক্ষার বিস্তার। শিক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কার ও গবেষণায় বরাদ্দ বৃদ্ধি।

শাসনতান্ত্রিক সংস্কার দুর্নীতিতে জিরো টলারেন্স এবং ‘স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড’ চালু। ক্ষমতার ভারসাম্য: দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ ও প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদের সীমাবদ্ধতা। ফ্যাসিবাদের বিলোপ ও নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত।

অর্থনীতি ও কর আয়কর ১৯% এবং ভ্যাট ১০% এ নামিয়ে আনা। কৃষকদের জন্য সুদবিহীন ঋণ। বাজার নিয়ন্ত্রণ ও শক্তিশালী মুদ্রানীতি। কৃষকদের জন্য ‘কৃষি কার্ড’ প্রবর্তন। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি ও লুণ্ঠিত সম্পদ দেশে ফিরিয়ে আনা।

নারী ও সংখ্যালঘু নারীদের সর্বোচ্চ মর্যাদা ও নিরাপত্তা। ইডেন-বদরুন্নেসা মিলিয়ে নারী বিশ্ববিদ্যালয়। ধর্মীয় সংখ্যালঘু ও নারীদের জন্য সাংবিধানিক সুরক্ষা ও অধিকার নিশ্চিত করা। প্রতিটি কণ্ঠের মূল্য (ঈড়ঁহঃরহম ঊাবৎু ঠড়রপব) ও বৈষম্যহীন অন্তর্ভুক্তি।

আইসিটি ও প্রযুক্তি ভিশন ২০৪০: ২০ লাখ আইসিটি জব এবং ১৫ লাখ ফ্রিল্যান্সার তৈরি। আইসিটি সেক্টরের আধুনিকায়ন ও অবাধ ইন্টারনেট সুবিধা। ডিজিটাল বিপ্লব ও ফ্রিল্যান্সারদের জন্য ন্যাশনাল গেটওয়ে।