নির্বাচন কমিশনের সবচেয়ে বড় কাজ হলো জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোট গ্রহণ। আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অন্যান্য সকল নির্বাচনের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ন। এ নির্বাচন কখন কিভাবে অনুষ্ঠিত হবে তার কর্মপরিকল্পনা (রোডম্যাপ) ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। এত গুরুত্বপূর্ণ একটি রোডম্যাপের ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ে সচিব আখতার আহমেদ। অথচ অতীতে সকল নির্বাচনের রোডম্যাপ খোদ নির্বাচন কমিশন ঘোষণা করতেন। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এসব বিষয়ে বিস্তারিত সাংবাদিকদের কাছে তুলে ধরবেন। কিন্তু এবার নির্বাচনের রোডম্যাপ ইসির সচিবকে দিয়ে ঘোষনা করানো হয়েছে। অথচ অনেক ছোট বিষয়েও ইসি ব্রিফিং করে থাকেন। এ রোডম্যাপে নির্বাচনের কোন তারিখ নেই। নির্বাচনে আস্থা ফেরানোর মতো কোন বক্তব্য নেই। লেবেল প্লেই ফিল্ড নিশ্চিত করার বিষয়ে কোন প্ল্যান নেই। এমন কী রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে আলোচনার আগেই নির্বাচনী আইনসমূহের সংশোধনী চূড়ান্ত করবে ইসি। এসব বিষয়ই রোডম্যাপে রয়েছে। ইতোমধ্যে এ রোডম্যাপ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা ও সমালোচনা।
গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইসি ভবনের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ নির্বাচনে রোডম্যাপ প্রকাশ করেন। এ রোডম্যাপে তিনি নির্বাচনের কোন সুনির্দিষ্ট তারিখ ঘোষণা করতে পারেননি। এমন কী ভোট গ্রহণের সম্ভাব্য সপ্তাহও উল্লেখ করতে পারেননি। তফসিল ঘোষণা বিষয়ে বলেছেন, ভোটগ্রহণের অন্তত ৬০ দিন আগে তফসিল ঘোষণা করা হবে। তিনি নির্বাচনের সময় সর্ম্পকে সরকারের ঘোষনার কথা উল্লেখ করে বলেছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দপ্তর থেকে জানানো হয়েছে, আগামী রমজানের আগে ভোটের ব্যবস্থা করতে হবে। আগামী বছরের ১৭ থেকে ১৯ ফেব্রুয়ারি রমজান শুরু হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। সে হিসেবে ভোট রমজানের আগেই অনুষ্ঠিত হবে।
২৪ দফার রোডম্যাপে বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপ শুরু হবে, চলবে প্রায় দেড় মাস। কিন্তু তার আগেই নির্বাচন সংশ্লিস্ট আইনসমূহের সংশোধণী চূড়ান্ত করবে ইসি। এ সর্ম্পকে বলা হয়েছে, নির্বাচন পরিচালনার আইনি ভিত্তি হিসেবে নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা, নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯১ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯ বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ে বিবেচনাধীন রয়েছে। এছাড়া সংসদীয় আসনের সীমানা নির্ধারণ আইন সংশোধন, ভোটার তালিকা আইন সংশোধন, ভোটকেন্দ্র নীতিমালা, দেশি-বিদেশি পর্যবেক্ষক ও সাংবাদিক নীতিমালা, নির্বাচন পরিচালনা (সংশোধন) ২০২৫, নির্বাচন কর্মকর্তা (বিশেষ বিধান) আইন ১৯৯১ এবং নির্বাচন কমিশন সচিবালয় আইন ২০০৯-এর সংশোধনী প্রক্রিয়া ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে চূড়ান্ত হবে।
ভোটের সময় আইন শৃংখলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের কোন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরা হয়নি। এমন কী এবিষয়ে ইসি দায় এড়িয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উপর দিয়েছে।
বিদ্যমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে সুষ্ঠু ভোটের পরিবেশ আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে ইসি সচিব বলেন, কেনো থাকবে না, এটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয়। আমাদের কাজ হলো নির্বাচন সংক্রান্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।
নির্বাচনে সিসি ক্যামেরা বা আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর বডি ক্যামেরা ব্যবহারের বিষয়টি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের ব্যাপার বলেও জানান তিনি। তিনি বলেন, এটা নির্বাচন কমিশনের চাহিদার বিষয় নয়। ওই আলোচনায় যদি আমাদের অংশ নেওয়ার প্রয়োজন হয়ে থাকে বা আমাদের অংশগ্রহণ কোথায় কতটুকু হতে হবে সেটা আলোচনা সাপেক্ষে। কিন্তু উদ্যোগী মন্ত্রণালয় তো স্বরাষ্ট্র, নির্বাচন কমিশন তো না।
এদিকে ইসির ঘোষিত রোডম্যাপ নিয়ে আলোচনা সমালোচনা শুরু হয়েছে। নানা প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। রোডম্যাপ পেয়ে বিএনপিসহ তাদের সমমনা জোটের নেতারা যখন স্বস্তি প্রকাশ করছেন, তখন পুরোপুরি ভিন্নমত ও প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী, জুলাই বিপ্লবীদের দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলাম আন্দোলনসহ কয়েকটি রাজনৈতিক দল।
সংস্কার ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার আগে নির্বাচনের পথ নকশাকে অপরিপক্ব ও প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হিসেবে দেখছেন তারা। জামায়াত-এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নেতারা নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে রোডম্যাপ দেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের দাবি, পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন হতে হবে।
রোডম্যাপ ঘোষণায় বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, যারা নির্বাচনে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করবে, তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। তাই হঠকারী সিদ্ধান্ত নিলে তার ক্ষতি সংশ্লিষ্টদেরই হবে। ঘোষিত রোডম্যাপ অনুযায়ী নির্বাচন হবেই। এর কোন বিকল্প নেই।
এদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েব আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেছেন, প্রধান উপদেষ্টা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে নির্বাচনি রোডম্যাপ ঘোষণা করেছেন। এই রোডম্যাপ একটি সুষ্ঠু নির্বাচনকে ভন্ডুল করার নীল নকশা। তিনি বলেন, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন নিয়ে জামায়াতের কোন আপত্তি নেই। কিন্তু একটি সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচনের জন্য কিছু বিষয় সুরাহা হওয়া খুবই জরুরি। এরমধ্যে জুলাই চার্টারকে আইনগত ভিত্তি দিতে হবে; এবং এর ভিত্তিতেই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দিতে হবে। কিন্তু সেগুলো না করেই নির্বাচনের যে পথ নকশা ঘোষণা করা হয়েছে সেটি একটি সুষ্ঠু নির্বাচন ভন্ডুল করার নীল নকশা বলে আমি মনে করি। আমরা এটা হতে দেব না। আমরা সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে বাধ্য করবো, জুলাই চার্টার ও পিআর এর মাধ্যমে নির্বাচন হতে হবে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক আরিফুল ইসলাম আবিদ বলেছেন, আমরা আশা করেছিলাম, নির্বাচনী রোডম্যাপ প্রকাশের আগেই সরকার সংস্কারবিষয়ক পর্যাপ্ত অগ্রগতি অর্জনের রোডম্যাপ প্রকাশ করবে। কিন্তু হতাশার সঙ্গে লক্ষ্য করছি, অজানা কারণে ঐকমত্য কমিশনের পরবর্তী দফার বৈঠক পেছানো হয়েছে এবং এখনও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দেওয়ার উপায় নির্ধারণ হয়নি। জুলাই সনদ চূড়ান্ত না করে এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে উপনীত না হয়ে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা ঐকমত্য কমিশন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল।
পুরোনো বন্দোবস্তের নির্বাচনী রোডম্যাপ জুলাইকে অস্বীকার করার নামান্তর বলে মন্তব্য করেছে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ। এক বিবৃতিতে দলের যুগ্ম মহাসচিব ও দলীয় মুখপাত্র মাওলানা গাজী আতাউর রহমান বলেন, জাতি সংবিধান, রাজনৈতিক সংস্কৃতিসহ সামগ্রিক সংস্কারের জন্য অধীর অপেক্ষা করছে। সংস্কারের জন্য নানা কার্যক্রম হয়েছে, কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, সংস্কারের সকল চেষ্টাই এখন কাগুজে দলিলে পরিণত হয়েছে। মৌলিক সংস্কারের সামান্যতমও বাস্তবায়ন হয় নাই। তাই অন্য যেকোনো রোডম্যাপের আগে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ দিতে হবে। আতাউর রহমান আরো বলেন, নির্বাচনের রোডম্যাপ দিয়েছেন; ভালো। এখন দ্রুততার সঙ্গে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের রোডম্যাপ ঘোষণা করতে হবে। অন্যথায় জুলাই অভ্যুত্থানের মূল লক্ষই ব্যর্থ হবে, আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তা হতে দেবে না।
নির্বাচন জুলাই সনদের অধীনে করার দাবি জানিয়ে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, নির্বাচনের তারিখ যদি পিছিয়েও দেওয়া হয়, তাতেও দলটির কোনো আপত্তি থাকবে না। ফুয়াদ বলেন, দায়সারা নির্বাচন করার উদ্যোগ নিতে যাচ্ছে কমিশন। বর্তমান পরিস্থিতিতে কমিশন নির্বাচন করাতে পারবে কি না, তা নিয়ে সংশয় আছে। ইসি বা নির্বাচনী কর্মকর্তার কারো ভালো করার অভিজ্ঞতা নেই। অথচ এসব ঠিক না করে নির্বাচন করলে সামনের নির্বাচন হবে ইতিহাসের সুষ্ঠু কিন্তু একতরফা।