জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের বলেছেন, 'সোজা আঙুলে যদি ঘি না ওঠে, তাহলে আঙুল বাঁকা করব। কিন্তু ঘি আমাদের লাগবেই। সুতরাং যা বোঝাতে চাই বুঝে নিন। নো হাংকি পাংকি, জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট লাগবেই। গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে রাজধানীর পল্টন মোড়ে গণমিছিল-পূর্ব সমাবেশে তিনি এ হুঁশিয়ারি দেন। বলেন, আমরা আপনাদের চালাকি বুঝি। আপনাদের চালাকির ভিত্তিতেই দাবি আদায়ের পন্থাও আমরা আবিষ্কার করবো। আমরা এখানো নিয়মতান্ত্রিক পন্থায় আন্দোলনে আছি। তিনি নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) তৈরির জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারের কাছে আহ্বান জানান। বলেন, প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। এরপরও উন্নতি না হলে আগামী ১১ নভেম্বর ঢাকা মহানগরী হবে জনতার নগরী।
জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি ও নির্বাচনের আগে গণভোটসহ ৫ দফা দাবিতে যুগপৎ আন্দোলন করছে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনসহ সমমনা আটটি দল। এদিন গণমিছিল নিয়ে প্রধান উপদেষ্টা বরাবর স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ছিল দলগুলোর। সকাল ১১টার দিকে দলগুলো আলাদা মিছিল নিয়ে পল্টন মোড়ে এসে সমবেত হয়। সংক্ষিপ্ত সমাবেশ শেষে দুপুর ১২টার দিকে তারা প্রধান উপদেষ্টার বাসভবন যমুনা অভিমুখে যাত্রা শুরু করে। এর আগে সমাবেশে জামায়াতের নায়েবে আমীর তাহের বলেন, 'নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পরেও গণভোট করতে আইনি বাধা নেই। এ বিষয়ে সময়ক্ষেপণ অন্তর্বর্তী সরকারকে বিপদে ফেলবে। গণভোটে টাকার অভাব হবে না জানিয়ে তিনি আরও বলেন, অনেকে গণভোটের ক্ষেত্রে খরচের কথা বলেন। একদিনে বাংলাদেশে যে পরিমাণ চাঁদাবাজি হয়, সেই টাকা দিয়ে একটা গণভোট করা সম্ভব।
জামায়াতের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক দলগুলোকে আলোচনার আহ্বান জানানো হয়েছে জানিয়ে তাহের আরও বলেন, 'সরকারকেও এক্ষেত্রে ভূমিকা পালন করতে হবে। দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার জন্য জামায়াত একটি কমিটি গঠন করেছে। অন্য দলগুলোও যাতে আলোচনার জন্য কমিটি গঠন করে।
আলোচনার জন্য বৃহস্পতিবার সকালে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে কল করেও পাননি বলে জানান ডা. তাহের। বলেন, 'মিছিল শেষে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে আবারও কল করা হবে। তাকে অনুরোধ করা হবে বিএনপির পক্ষ থেকেও যাতে আলোচনায় অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত আসে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এই শীর্ষ নেতা বলেন, মেজর দলগুলো বসে শুধু জুলাই সনদ নয়, আগামী নির্বাচন কীভাবে হবে সেই বিষয়েও আলোচনা করবে। সেই আলোচনায় নির্বাচনে ভোট ডাকাতি যে হবে নাÑদলগুলোকে এই বিষয়ে ঐক্যমত্য পোষণ করতে হবে। জাতির কাছে টেলিভিশনে ওয়াদা করতে হবেÑকেন্দ্র দখল হবে না। করলে সেই কেন্দ্রের ভোট বাতিল হবে, এমন ঘোষণা দিতে হবে। প্রধান উপদেষ্টাকেও বলতে হবে, নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সেটি বাতিল করে নতুন করে নির্বাচন দেবেন। এদেশের মানুষ আরেকটি প্রহসনের নির্বাচন দেখতে চায় না।
তিনি নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) তৈরির জন্য নির্বাচন কমিশন ও সরকারের কাছে আহ্বান জানান। বলেন, প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হবে। এরপরও উন্নতি না হলে আগামী ১১ নভেম্বর ঢাকা মহানগরী হবে জনতার নগরী।
জাতীয় নির্বাচন পেছালেও গণভোট আগে হতে হবে বলে সমাবেশে দাবি জানান ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান। তিনি বলেন, '(জাতীয়) নির্বাচনের সাথে গণভোট হবে না।... যেদিনই নির্বাচন হোক, গণভোট আগে দিতে হবে। নির্বাচন পিছিয়ে গেলেও গণভোট আগে হতে হবে। যারা বলেছে, সংস্কার লাগবে না, তাদের সঙ্গে আলোচনা হবে না।'
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের সঞ্চালনায় সমাবেশে আরও বক্তব্য দেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী ও নায়েবে আমীর আহমদ আলী কাসেমী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ইউসুফ সাদিক হক্কানী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ।
এদিকে প্রধান উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার পর সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, ১১ নভেম্বর আটটি রাজনৈতিক দলের উদ্যোগে রাজধানীতে মহাসমাবেশ হবে। ঢাকার মহাসমাবেশ লক্ষ লক্ষ জনতার পদভারে মুখর হওয়ার আগে সরকার যেন পাঁচ দফা দাবি মেনে নিয়ে জুলাই সনদের গণ আকাক্সক্ষার প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে। তা না হলে ১১ নভেম্বর ঢাকার চিত্র ভিন্নরকম হবে।
গতকাল বৃহস্পতিবার বেলা দুইটার দিকে ঢাকার মৎস ভবন মোড়ে এক ব্রিফিংয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার এ কথা বলেন। এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি ও ওই আদেশের ওপর নভেম্বরের মধ্যেই গণভোট আয়োজন করাসহ পাঁচ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্যে স্মারকলিপি দেওয়ার কর্মসূচি ঘোষণা করে জামায়াতসহ আন্দোলনরত আটটি দল।
এরপর ৮ দলের ৯ জন নেতা রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টাকে স্মারকলিপি দিতে যান। তাঁরা হলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব ফজলুল বারী মাসউদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সাংগঠনিক সম্পাদক এনামুল হক মূসা, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ইউসুফ সাদিক হক্কানী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযহার, জাগপার সহসভাপতি ও মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির সভাপতি এ কে এম আনোয়ারুল ইসলাম। সেখান থেকে ফিরে ব্রিফিংয়ে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নেতারা যখন যমুনায় গেলেন, তখন প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠক চলছিল। জামায়াতসহ অন্য দলগুলোর আবেদন ছিল, প্রধান উপদেষ্টা না হলেও একজন উপদেষ্টাকে তাদের কাছে পাঠাতে হবে। পরে প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খানকে পাঠানো হয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শিল্প উপদেষ্টা রাজনৈতিক সংকট নিরসনে সরকারের আন্তরিকতার কথা জানিয়েছেন। পাশাপাশি এক সপ্তাহের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা করে সরকারকে সিদ্ধান্ত জানানোর স্মরণ করে দিয়েছেন। আটটি দল এ ক্ষেত্রে সরকারকে সহযোগিতার কথা বলেছে। দলগুলোর এই আলোচনায় সরকারেরও সহযোগিতা প্রয়োজন বলে শিল্প উপদেষ্টাকে জানানো হয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, আটটি দলের দাবিগুলো শিল্প উপদেষ্টাকে পড়ে শোনানো হয়েছে। তিনি দাবির প্রতি দ্বি-মত করেননি। প্রধান উপদেষ্টার কাছে এই স্মারকলিপি পৌঁছে যথাযথ প্রক্রিয়ায় পৌঁছে দেওয়ার কথা বলেছেন তিনি।
জামায়াতসহ আট দলের দাবিগুলো হলো জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি এবং ওই আদেশের ওপর নভেম্বর মাসের মধ্যেই গণভোট আয়োজন করা; আগামী জাতীয় নির্বাচনে উভয় কক্ষে বা উচ্চকক্ষে পিআর (সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব) পদ্ধতি চালু করা; অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের লক্ষ্যে সবার জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড (সবার জন্য সমান সুযোগ) নিশ্চিত করা; ‘ফ্যাসিস্ট’ সরকারের সব জুলুম-নির্যাতন, গণহত্যা ও দুর্নীতির বিচার দৃশ্যমান করা এবং ‘স্বৈরাচারের দোসর’ জাতীয় পার্টি ও ১৪ দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা।