মেধাবীদের মেধার বিকাশের সুযোগ করে দেয়া হবে উল্লেখ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, একটা মায়ের শিশুকেও লেখাপড়ার বাইরে থাকতে দেব না। মাস্টার্স পর্যন্ত ছাত্রীরা সরকারি খরচে পড়ালেখা করবেন।
তিনি বলেন, যে মায়ের সামর্থ্য নাই, সেই শিশুর দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে। যার নুন আনতে পান্তা ফুরায়, তারও যদি মেধাবী ছেলে থাকে; তার মেধাকে বিকশিত করা হবে। যাতে সে আগামী দিনের প্রধানমন্ত্রী হতে পারে। এদেশের মানুষের প্রতি তার দায় দরদ থাকবে, সে বুঝবে এদেশের মানুষ কত কষ্টে জীবন যাপন করে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে আজ ৫ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার সকালে নওগাঁর এ.টিম মাঠে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা একটা ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ চাচ্ছি। তাই আমার যেসব পুরানা বন্ধুরা আমার বিরুদ্ধে মিসাইল নিক্ষেপে শরিক হয়েছেন। আজকে আপনাদের সাক্ষী রেখে বলতে চাই; আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম। আল্লাহতালার কাছে দোয়া করি, আল্লাহ তায়ালা যেন তাদের অপচর্চার ক্ষমা করে দেন। কোনো অপচর্চার জবাব আমি দেইনি এবং দেবো না।
তিনি বলেন, নওগাঁ উত্তর জনপদের একটি গুরুত্বপূর্ণ জেলা। যে জেলাটি বাংলাদেশের খাদ্য এবং ফলের এককভাবে দশভাগের এক ভাগের উৎপাদন করে সারা বাংলাদেশকে সহায়তা করে। কিন্তু বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই জেলাটি তার ন্যায্য পাওনা পাইনি। আস্তে আস্তে জনবসতি বৃদ্ধি পাচ্ছে মানুষের চাপ। শহরের ভেতরে রাস্তাটা বাইডেন হওয়াতে চলাচলের দারুন সমস্যা হচ্ছে। এটিকে ফোর লেন করা দরকার। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিলে- আমরা তা করব।
তিনি আরও বলেন, এছাড়া নঁওগায় একটি মানসম্মত মেডিকেল কলেজ হওয়া দরকার। যদি আল্লাহ আমাদের সুযোগ দেন, আপনাদের দোয়া ভালোবাসা, সমর্থন ও ভোটে যদি নির্বাচিত হতে পারি- ইনশাআল্লাহ এটি হবে।
ডা. শফিকুর রহমান, এটি যেহেতু কৃষি প্রধান এরিয়া ইতোমধ্যে আমরা ঘোষণা দিয়েছি পুরো নর্থ বেঙ্গলকে কৃষি শিল্পের রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এখানে কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট হবে, বিশ্ববিদ্যালয় হবে সেই পড়াশোনা কাগজে নয়, প্র্যাকটিক্যালি হবে প্রফেশনালি হবে। এখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে সে বিদেশে কাজ করবে।
তিনি বলেন, এখানে কৃষিভিত্তক বিশ্ববিদ্যালয় হলে ধান ও ফলের গবেষণার কাজ হয়ে যাবে। এখানে ধান ও পেয়ারা উৎপাদিত হয় প্রচুর। এখানে ফসল সংগ্রহের কোনো উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় তাড়াহুড়ো করে ফসল বিক্রি করে দেন। এতে ফসলের ন্যায্যমূল্য পান না কৃষকরা। আমারা কয়েকটি সংরক্ষণাগার নির্মাণ করে দিবো ইনশাআল্লাহ। আম ও লিচু প্রসেসিং এর ব্যবস্থা করবো, যেটি দিয়ে জুস ও শরবত তৈরি হয়।
নওগাাঁর উন্নয়ন পরিকল্পানা তুলে ধরে আমীরে জামায়াত বলেন, কুসুম্বা মসজিদ ও পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে গড়ে তুলবো। দুবলাহাটি রাজবাড়ীসহ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান সংরক্ষণ ও পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হবে। পর্যটন বর্তমান বিশ্বে বিপুল আয়ের উৎস। বাংলাদেশে পর্যটনের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ৫৪ বছর যারা ক্ষমতায় এসেছিলেন তারা নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করলেও জনগণের ক্ষমতা বৃদ্ধি করেননি। তারা নিজেদের কপাল কিসমত বড় করেছেন, জনগণের টাকা লুট করেছেন, চুরি করেছেন, ব্যাংক ডাকাতি করেছেন। শেয়ারবাজার লুট করেছেন। মেগা প্রকল্পের নামে মেগা দুর্নীতি করেছেন। এই লুণ্ঠন করা টাকাগুলো দেশে রাখার সৎ সাহস ছিল না বলে বিদেশে প্রচার করে দিয়েছিলেন। এই টাকার পরিমাণ ২৮ লক্ষ কোটি টাকা। এই টাকা কার? এই টাকার মালিক জনগণ। জনগণের ট্যাক্সের টাকা, ঋণের টাকা, অনুদানের টাকা চুরি করে বিদেশে পাঠিয়ে দিয়েছে। এই টাকা ওদের পেটে হাত ঢুকিয়ে বের করে নিয়ে আসা হবে। তারপর এটা দেশের কোষাগারে জমা রাখা হবে। সেখান টাকা দিয়ে বিগত ৫৪ বছরে বাংলাদেশের যে এলাকা বেশি অবহেলিত- বঞ্চিত হয়েছে, সেই জায়গা থেকে উন্নয়ন শুরু হবে।
আমীরে জামায়াত বলেন, আমরা বেইনসাফি করতে পারবো না। কোনটা প্রধানমন্ত্রীর বাড়ি আর রাষ্ট্রপতির আমরা ওটা দেখতে পারবো না। কোন জায়গার মানুষ দুঃখ কষ্টে আছে সেখান থেকে আগে উন্নয়ন শুরু হবে।
তরুণদের প্রত্যাশা তুলে ধরে তিনি বলেন, জুলাইয়ে কোনো তরুণ তরুণী কি দাবি করেছিল, আমাদের বেকার ভাতা দিতে হবে? না! তাহলে আজকে বেকার ভাতার কথা উঠছে কেন? তারা হাতে হাতে কাজ দাবি করছিল। আমরা কথা দিচ্ছি, যথাযথ শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের হাতকে দেশ গড়ার কারিগরে পরিণত করা হবে।
যুবকদের দক্ষতা উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা যুবকদের ভাষাভিত্তিক ও পেশাভিত্তিক উভয় দক্ষতায় প্রদান করবো। তারপর বলবো দেশ তোমরা বদলে দাও। জুলাইয়ে মা বোনদের বিশেষ অবদান ছিলো। যেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের গায়ে হাত দিয়েছিল। সাথে সাথে সারাদেশ স্ফুলিঙ্গের ন্যায় ফেটে পড়েছিল। তার পরে দিনই আপনাদের সন্তান, পার্শ্ববর্তী রংপুরের পীরগঞ্জের যুবক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্র আবু সাঈদ, আমাদের অহংকার, জুলাইয়ের আইকন রাস্তায় নেমে বিপ্লবের নেতৃত্ব দিয়েছিল। সে বলেছিল, হয় আমার অধিকার দে, নয় একটি গুলি দে। ডানা মেলে বলেছিল, বুকের ভিতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর।
জুলাই আন্দোলনে মেয়েদের অবদান তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এক মেয়ে ট্যাংকের সামনে দাঁড়িয়ে বললো, পিছনে পুলিশ, সামনে স্বাধীনতা। মা তার দশ মাসের শিশু কোলে নিয়ে রাস্তায় নেমে বলেছিল, আজকে আমার শিশু একটা নয় লক্ষ কোটি তরুণ যুবক যারা আন্দোলনে নেমেছে সবাই আমাদের সন্তান। সেই মায়েদের নিয়ে অপমানজনক আচরণ ইদানিং অনেকে করছেন। আমি বিনয়ের সাথে বলবো, প্লিজ, এগুলো করবেন না। আমরা মায়ের বুকের দুধ খেয়ে বড় হয়েছি, তাদের বুকের বিছানায় লালিত পালিত হয়েছি। মায়ের জাতিকে যত সম্মান দিব, আল্লাহ এ জাতিকে তত সম্মানিত করবেন।
দেশের কিছু জায়গায় মায়েদের অসম্মানের ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আপনি যদি আপনার মা, বোন ও মেয়েকে সম্মান করে থাকেন, তাহলে বাংলাদেশের ৯ কোটি মাকেও সম্মান করতে হবে। আর যদি আপনি আপনার মাকে সম্মান করতে না জানেন- তাহলে আর কাউকে সম্মান করতে জানবেন না। আর যদি এসব কাজ থেকে ফিরে না আসেন। জুলাইয়ের ১৫ তারিখ মায়েদের গায়ে হাত দেয়াতে যে পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল; মনে রাখবেন, জুলাইয়ে তরুণরা ঘুমিয়ে পড়েনি। তারা আবার গর্জে উঠবে। মায়ের অপমান সহ্য করবে না।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, এদেশে শুধু আমরা শুধু মুসলমানরা নয়, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টানরা একসাথে বসবাস করছি। আমাদের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ নাই কোনো মেজরিটি-মাইনরিটি মানবো না। এদেশে যারা মুসলমান নয়, তারা ভয়ের মধ্যে থাকবে কেন? আমরা এটি গুড়িয়ে একাকার করে দিতে চাই। সবাইকে নিয়ে আমরা দেশ সাজাবো। যার মধ্যে যোগ্যতা এবং দেশপ্রেম থাকবে,তার কাছে কাজ পৌঁছে যাবে।
১২ ফেব্রুয়ারি ভোট ও গণভোট নিয়ে তিনি বলেন, আমাদের দুটি ভোট দিতে হবে। মানবিক বাংলাদেশ গঠনে 'হ্যাঁ' ভোট দিতে হবে। পরবর্তী ভোট দেবেন ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গঠনে। আমরা চাঁদাবাজি করি না, করতেও দেবো না। ব্যাংক ডাকাতি আমরা করি না, কোনো ব্যাংক ডাকাতের সাথে আমাদের আপস হবে না।
সংখ্যালঘুর অধিকার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মাইনরিটির অধিকার নিয়ে যারা আগের ফ্যাসিস্ট সরকার চিল্লা-হাল্লা করতেন, তারা আপনাদের পাশের সাওতাল পল্লীতে কী করেছে, আপনারা দেখেননি? মায়েদের জন্য ঘরে, বাইরে চলাচলে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে। কোনো জালিম সাহস করবে না, নারী জাতির কারও দিকে চোখ তুলে থাকানোর।
আমীরে জামায়াত বলেন, এই ভোটটা হবে ইনসাফের প্রতীকে। ১১ দলের বিভিন্ন প্রকীকে যে যেখানে আছেন, প্রত্যেকে তার পক্ষে কাজ করবেন। নওগাঁর সবগুলো আসনে দাঁড়িপাল্লা, আলহামদুলিল্লাহ। আমীরে জামায়াতবক্তব্য শেষে নওগাঁর ৬টি আসনে ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থীদের পরিচয় করে দেন।
নওগাঁ জেলা জামায়াতের আমীর ও নওগাাঁ-৪ আসনে এমপি প্রার্থী খ. ম আব্দুর রাকিবের সভাপতিত্বে জনসভায় আরও বক্তব্য দেন ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, এবি পার্টির আহ্বায়ক এডভোকেট আতিকুর রহমান, নওগাঁ-১ আসনের প্রার্থী অধ্যাপক মাহবুবুল আলম, নওগাঁ-২ আসনের প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মো. এনামুল হক, নওগাঁ-৩ আসনের প্রার্থী মো. মাহফুজুর রহমান, নওগাঁ-৫ আসনের প্রার্থী আবু সাদাত মো. সায়েম, নওগাঁ-৬ আসনের প্রার্থী মো. খবিরুল ইসলামসহ ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ের নেতারা।
এছাড়া, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমির সহকারী অধ্যাপক মহিউদ্দিন, ছাত্রশিবিবের কেন্দ্রীয় সাবেক সেক্রেটারি আ.স.ম মামুন শাহিন, মাওলানা মুফতি ইসরাফিল আলম, জেলা ছাত্রশিবিরের সভাপতি আব্দুর রাকিব এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ফাহমিনের মা কাজী নুলুন মাখমিনসহ অনেকে বক্তব্য রাখেন। এ সময় জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যান্য শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরাও সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন