১০-১২ টি আসন ছাড়ার কথা ভাবা হচ্ছে

যুগপৎ আন্দোলনের শরিকদের নিয়ে নির্বাচন এবং সরকার গঠনের ঘোষণা থাকলেও আসন ছাড় নিয়ে বিএনপির ভূমিকায় একেবারেই ‘নাখোশ’ জোটবদ্ধ দলগুলো। অনেকেই বিএনপির সাথে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে ছিন্ন করার ঘোষণা দিয়েছে। কোন কোন দল বিএনপিকে ছাড়াই নির্বাচনের কথা বলছে। নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার আগে মিত্র দলগুলোর সাথে আসন বিন্যাস নিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে না আসায় অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ছোট দলগুলোর সাথে নির্বাচন ইস্যুতে বিএনপির এমন মনোভাবে দীর্ঘদিনের সম্পর্কে বড় ধরণের ফাটল দেখা দিবে। তবে বিএনপির নেতারা বলছেন, শরিকদের কয়েকটি আসন তারা ছেড়ে দিবেন। তবে যে সব দল নাম সর্বস্ব, তাদের মনোনয়ন দিয়ে আসন হারাতে তারা রাজি নন। ক্ষমতায় গেলে এসব দলকে নানাভাবে ক্ষমতার কাছাকাছি রাখা হবে।

এদিকে আজ সোমবার জরুরি সাংবাদিক সম্মেলন ডেকেছে ১২ দলীয় জোট। এই জোট প্রধান জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার বলেন, তারা আগামী নির্বাচন ও যুগপৎ আন্দোলনের সঙ্গী বিএনপির ঘোষিত ২৭২টি মনোনয়নের বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান শরিকদের সঙ্গে বৈঠকে নির্বাচন ও সরকার গঠনের যে দৃঢ় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এই ২৭২টি আসনে মনোনয়ন ঘোষণার মাধ্যমে প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করা হয়েছে। এ বিষয়ে ভবিষ্যৎ রাজনীতি ও করণীয় সম্পর্কে সোমবার সাংবাদিক সম্মেলনে জোটের পক্ষ থেকে সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রদান করা হবে।

বিএনপি ৩ নভেম্বর ২৩৭টি আসনে দলীয় সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করে। বাকি ৬৩টি আসনে জোটের প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেয়ার কথা থাকলেও ০৪ ডিসেম্বর আরো ৩৬টি আসনে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে। এরপরই মূলত জোটগুলোর সাথে দূরত্বের সূচনা হয়। বাদ বাকি ২৮ আসনের তালিকা যথা সময়ে ঘোষণা করা হবে বলে জানালেন বিএনপি মহাসচিব। জানা গেছে, বাকি আসন গুলোতেও বিএনপিকেই প্রাধাণ্য দেয়া হবে।

প্রার্থীতা নিয়ে নাগরিক ঐক্য সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বিএনপি এখন পর্যন্ত আমাদের (গণতন্ত্র মঞ্চ) একজনকেও বলেনি যে আপনারা নমিনেশন পাবেন। তারা কাকে কোথায় ভাবছে, তার প্রস্তাব পেলে আমরা এ বিষয়ে কথা বলতে পারতাম। তিনি বলেন, তারা যেখানে জোটবদ্ধ দলগুলোকে মনোনয়ন দিবে বলেছে, সেখানেও প্রার্থীতা ঘোষণা করেছে। তিনি জানান, নিজ এলাকা বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসন থেকে তিনি নির্বাচন করতে আগ্রহী। কিন্তু পত্রপত্রিকায় নানা কথা লেখা হচ্ছে। বগুড়ায় সেখানকার বিএনপির নেতারা নানা কথা ছড়াচ্ছেন। এখন পর্যন্ত আমরা কিছুই জানি না।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, শরিকদের আসন নিয়ে স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা হয়েছে। যারা শরিকদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করছেন, তাদের নিয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান বসবেন। খুব দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, যুগপৎ আন্দোলনের শরিক জোট ও দলগুলোর কাছ থেকে বিএনপি যে প্রার্থী তালিকা পেয়েছে, সেটি বেশ বড়। জোট ও দলগুলোকে তালিকা সংক্ষিপ্ত করতে বলা হয়েছে। সে আলোকে ছয়টি দলের জোট গণতন্ত্র মঞ্চ তাদের ১৪২ জনের প্রার্থী তালিকা সংক্ষিপ্ত করে ৫০ জনের নাম দিয়েছে। এভাবে অন্য দলগুলোও প্রার্থী তালিকা ছোট করে জমা দিয়েছে। সে তালিকা ধরে বিএনপির নীতিনির্ধারক নেতারা সম্ভাব্য প্রার্থীর জিতে আসার সম্ভাবনা যাচাই করে দেখেছেন।

বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে জানা গেছে, দলের নীতিনির্ধারক নেতারা নিজেরা শরিক দলের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের প্রার্থিতার বিষয়টি নানাভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করছেন। বিগত আন্দোলনে শরিক দলগুলোর নেতাদের ভূমিকা, তাদের রাজনৈতিক অবস্থান, ভবিষ্যৎ সরকার গঠনে তাদের প্রয়োজনীয়তা, এ বিষয়গুলো প্রার্থিতার ক্ষেত্রে বিবেচনায় নিচ্ছেন। সে হিসেবে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দল ও জোটের জন্য ১০-১২টি আসন ছাড়ের কথা ভাবা হচ্ছে। বিএনপির এমন একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, যে সব প্রার্থীর এলাকায় কোনো কর্মী-সমর্থক নেই, তাদের প্রার্থী করা হবে না।

বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, মিত্রদের সাথে আলোচনা করে তাদের সাথে নিয়েই এগুবে বিএনপি এবং এ জন্য দলের একটি কমিটিও কাজ করছে।

বিএনপির দুই পর্বে ঘোষিত প্রার্থী তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মিত্র দল হিসেবে পরিচিত কয়েকটি দলের শীর্ষ নেতাদের আসনেও দলীয় প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে বিএনপি, যা ওই সব দলের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ তৈরি করে।

লেবার পার্টির সভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান ইরান এ প্রতিবেদককে বলেন, আমাদের সাথে আলোচনা না করেই যেভাবে আমাদের প্রত্যাশিত আসনগুলোতে বিএনপি প্রার্থী দিয়েছে তাতে আমরা ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত। ২০ বছর এক সাথে চলেছি বিএনপির সাথে, আর ২০ দিনও চলতে চাই না। তারা আমাদের অবদান অস্বীকার করেছে। বেঈমানী করেছে। বিএনপির সাথে সব ধরণের সম্পর্ক ছিন্ন করলাম।

বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, দুর্দিনে এবং কঠিন সময়ে যেসব দল ঝুঁকি নিয়ে বিএনপির সাথে ছিল তাদের সাথে আলোচনা না করে বিএনপি ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। বিএনপি প্রজ্ঞার পরিচয় দিতে না পারলে তার ভবিষ্যৎ ঝুঁকি হবে অনেক বড়। ছোট ভুল থেকে বড় বিপর্যয় আসতে পারে।

জোটের আরেক নেতা জোনায়েদ সাকি বলেন, বিগত দিনের যুগপৎ আন্দোলনের সমঝোতা কীভাবে নির্বাচনী সমঝোতায় প্রতিফলিত হবে সেটা নিয়ে কাজ করতে হবে। নির্বাচনী সমঝোতার প্রশ্নে আলোচনা শুরু হয়েও থেমে আছে। সেজন্যই সেটা নিয়ে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে। আমার বিশ্বাস আলোচনার মাধ্যমেই এগুলোর নিষ্পত্তি হবে।

বিএনপির নির্বাচন প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত কয়েকজনের সাথে আলোচনা করে যে ধারণা পাওয়া গেছে তাতে সর্বোচ্চ ১০-১২টি আসন সমমনা দলগুলোর নেতাদের ছেড়ে দিতে পারে দলটি। সেক্ষেত্রে ঢাকা-১৭ আসনে আন্দালিব রহমান পার্থ, ঢাকা-১৩ আসনে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের (এনডিএম) চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে জোনায়েদ সাকি এবং বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না রয়েছেন। এর বাইরে লক্ষ্মীপুর, কিশোরগঞ্জ, ঝিনাইদহ, চট্টগ্রাম ও পটুয়াখালীতে একটি করে আসনে সমমনা কয়েকটি দলের নেতারা বিএনপির সমর্থন পাবেন বলে আভাস দেওয়া হয়েছে। দলীয় নেতাদের দেওয়া এসব তথ্য শেষ পর্যন্ত সঠিক হলে, বিএনপির সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা জাসদ (রব), গণফোরাম, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি ও লেবার পার্টির নেতারা আদৌ নির্বাচনে বিএনপির সমর্থন পেয়ে প্রার্থী হতে পারেন কি-না তা নিয়ে সংশয় রয়েছে অনেকের মধ্যেই।

এদিকে মনোনয়ন দিলেও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়েও রয়েছে অসন্তোষ। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর উপজেলায় জোনায়েদ সাকির বিরুদ্ধে মিছিল করে স্থানীয় বিএনপি। গত ১২ই অক্টোবর একটি ঝাড়ু মিছিল রাজনীতিতে নানা আলোচনার জন্ম দেয়। জোনায়েদ সাকির বিরুদ্ধে এই মিছিল বেশ আলোড়ন তোলে স্থানীয় রাজনীতিতে। কারণ, সচেতন মহিলা সমাজের ব্যানারে মিছিল হলেও অভিযোগ ওঠে এর পেছনে ভূমিকা রেখেছেন বিএনপির স্থানীয় কয়েকজন নেতা। এমনকি মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই ঐ এলাকায় বিএনপি থেকে ধানের শীষের প্রার্থী দিতে হবে এমন দাবিও তুলেছিলেন।ফলে গণসংহতি আন্দোলনের পক্ষ থেকেও অভিযোগ করা হয়, ‘বিএনপির একটি অংশের ইন্ধনে’ জোনায়েদ সাকির বিরুদ্ধে মিছিলের আয়োজন করা হচ্ছে। উদ্দেশ্য বিএনপি ও জোটের পক্ষ থেকে তার প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনাকে বাধাগ্রস্ত করা।

বিএনপির একাধিক নেতার সাথে কথা বলে জানা গেছে, মূলত দলীয় প্রতীকে নির্বাচন করতে হবে বলে যুগপৎ আন্দোলনে থাকা কিছু নেতাকে নির্বাচনে প্রার্থী করে ঝুঁকি নিতে চাইছে না দলের শীর্ষমহল। এছাড়া যাদের জোট থেকে মনোনয়ন দেয়া হবে, তাদের সে সব আসনেও বিএনপির বিদ্রােহী প্রার্থীদেরই বিজয়ী করার নির্দেশনা রয়েছে। কারণ এমন অনেক নেতাই রয়েছেন, যাদের এলাকায় তেমন কর্মী সমর্থক নেই।

এর আগে চলতি বছরেই পটুয়াখালিতে নিজ নির্বাচনী আসনে গণসংযোগে গেলে সেখানে হামলার শিকার হন গণঅধিকার পরিষদের শীর্ষ নেতা নুরুল হক নূর। সেখানেও অভিযোগ ওঠে স্থানীয় বিএনপির বিরুদ্ধে। এছাড়া অন্যান্য আসনে বিএনপির প্রার্থী থাকায় এর সমাধানও জটিল হতে পারে।