কবির আহমদ, সিলেট ব্যুরো : মৌলভীবাজারের রাজনগরের বাসিন্দা মরহুম অর্থমন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের আশির্বাদপুষ্ট আরিফুল হক চৌধুরী মানেই যেনো নাটকীয়তা, মানেই হঠাৎ কোন কিছু করে বসা, টান টান উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তা। এবারও তার ব্যতিক্রম হলো না। নানান নাটকীয়তা আর অনিশ্চয়তা শেষে সিলেট-৪ আসনে বিএনপির প্রার্থী হওয়ার কথা জানালেন আরিফ। আর এতে কপাল পড়ছে এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন প্রত্যাশীদের। যারা দীর্ঘদিন ধরে মাঠে সক্রিয় ছিলেন, যারা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে জেল-জুলুম সহ্য করেছেন।

গত কয়েক সপ্তাহ আগে সিলেট-১ আসনে তিনি কাজ করে যাওয়ার ঘোষণা পাওয়ার ‘ইজাজত’ পেয়েছেন বলে সিলেটের বিশিষ্টজনদের নিয়ে হযলত শাহজালাল (রহঃ) মাজার জিয়ারতের মাধ্যমে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রচারণা চালান। কিন্তু গত কয়েকদিন আগে সিলেট-১ আসনে বেগম খালেদা জিয়ার অপর উপদেষ্টা খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির সিলেট-১ আসনে প্রার্থীতা পাওয়ায় আরিফুল হক চৌধুরী একদিন নীরব থেকে গত শুক্রবার থেকে সিলেট-৪ আসনে প্রচারণা শুরু করেছেন। যদিও বিএনপি’র ২৩৭টি ঘোষিত প্রার্থী তালিকায় সিলেট-৪ আসনেও আরিফুল হক চৌধুরীর নাম নেই। এনিয়ে উক্ত আসনে অন্যান্য মনোনয়ন প্রত্যাশীরা ও তাদের অনুসারীদের মধ্যে চলছে কানাঘোষা। আসলেই কে পাচ্ছেন সিলেট-৪ আসন? আরিফুল হক চৌধুরী সিলেট সিটি কর্পোরেশনের সাবেক দুই বারের মেয়র এবং বেগম খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে মরহুম অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মোহিত ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. এক. এম. মোমিনের সাথে ছিল তার খুবই ঘনিষ্ঠতা। এই সুবাদে তিনি তার নগরীতে ব্যাপক কর্মকান্ড করিয়ে যেমন আলোচিত হয়েছেন তেমনি হয়েছেন সমালোচিত। এই আরিফুল হক চৌধুরী গত কয়েক দিন আগে সিলেট আন্দোলন নামে একটি ব্যানারে সিলেটের বিশিষ্টজনদের নিয়ে সিলেটের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের প্রধান ফটকে তালা ঝুলিয়ে দিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসেন।

স্থানীয় বিএনপির একটি সূত্র জানিয়েছে, সিলেট-৪ আসনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন অনেকে। এর মধ্যে বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ সিদ্দিকী, গোয়াইনঘাট উপজেলা বিএনপির দুবারের সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুল হাকিম চৌধুরী, জেলা বিএনপির উপদেষ্টা হেলাল উদ্দিন আহমদ, বিএনপি-দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য দিলদার হোসেন সেলিমের স্ত্রী জেবুন্নাহার সেলিম, মহানগর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বদরুজ্জামান সেলিম, কেন্দ্রীয় বিএনপির সাবেক সহস্বেচ্ছাসেবক–বিষয়ক সম্পাদক সামসুজ্জামান জামান উল্লেখযোগ্য।

আর দীর্ঘদিন ধরেই সিলেট-১ আসনে নির্বাচন করার আগ্রহ প্রকাশ করে আসছিলেন বিএনপির চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা আরিফুল হক চৌধুরী। এই আসনের মনোনয়ন পেতে গণসংযোগে মাঠে নেমেছিলেন।

সিলেট-১ আসন না পেলে পুণরায় সিলেট সিটির মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন বলেও জানিয়েছিলেন সাবেক এই মেয়র। কোনভাবেই সিলেট নগর ছাড়তে চান না বলেও জানেয়েছিলেন তিনি। অথচ নগর ছাড়তে ‘অনিচ্ছুক’ আরিফ সিলেট-৪ আসনে গত শুক্রবার বাদ জুম্মা সাবেক এই এলাকার সাবেক এমপি মরহুম দিলদার হোসেন সেলিমের কবর জিয়ারতের মাধ্যমে প্রচারণা চালিয়ে তিনি বলেছেন, তার দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নির্দেশে তিনি সিলেট-৪ আসনের প্রার্থী হয়েছেন।

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি সারা দেশে প্রার্থীদের প্রাথমিক তালিকা ঘোষণা করেছে। ৬৩টি আসনে প্রার্থী ফাঁকা রাখে দলটি, যার মধ্যে সিলেট-৪ আসন ছিল। আর সিলেট-১ আসনে চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা খন্দকার মুক্তাদিরকে মনোনয়ন দেওয়া হয়।

গত বুধবার বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া বাসায় তলব করে সিলেট-৪ আসনে মনোনয়ন দিয়েছেন বিএনপি নেতা ও সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীকে। এ তথ্য তিনি গনমাধ্যমকে জানিয়েছেন।

জানা যায়, সিলেটের সীমান্তবর্তী গোয়াইনঘাট, জৈন্তাপুর ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার ২৫টি ইউনিয়ন নিয়ে সিলেট-৪ আসন গঠিত। প্রাকৃতিক সম্পদে ভরপুর বৃহত্তম পাথর কোয়ারি ভোলাগঞ্জ, জাফলং, বিছনাকান্দি ও শ্রীপুর এই আসনে রয়েছে। দেশের অন্যতম স্থলবন্দর তামাবিল এই আসনে অবস্থিত। তাই সব রাজনৈতিক দলের কাছেই আসনটির গুরুত্ব বেশি। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বদলে গেছে রাজনীতির মাঠের হালচাল। আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা ভোটের মাঠে নেই। ফলে এবার এই আসনে জয়ের বড় সুযোগ দেখছে বিএনপি ও জামায়াত ইসলামী।

জামায়াত ইসলামীর পক্ষ থেকে এই আসনে প্রার্থী হয়েছেন দলটির সিলেট জেলা সেক্রেটারি ও জৈন্তাপুর উপজেলার দুই বারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান আলহাজ¦ জয়নাল আবেদীন। আর বিএনপির অন্তত হাফ ডজন মনোনয়ন প্রত্যাশী মাঠে সক্রিয় ছিলেন। প্রতিদিনই গণসংযোগ চালিয়ে আসছিলেন তারা।

এ প্রসঙ্গে আরিফুল হক চৌধুরী দৈনিক সংগ্রামকে জানান, দলের উচ্চপর্যায় থেকে তাঁকে সিলেট-১-এর পরিবর্তে বেশ কয়েকবার সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হওয়ার জন্য বললেও তিনি রাজি হননি। গত বুধবার রাতে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া তাঁকে সিলেট-৪ আসনে প্রার্থী হতে নির্দেশনা দেন। এ নির্দেশ অমান্য করার সুযোগ নেই তার। তিনি আর জানান, দলের চেয়ারপারসনের নির্দেশ আমি কখনোই অমান্য করিনি, করবো-ও না। তাই সিলেট-৪ আসনেই নির্বাচন করবো, সব আল্লাহর ইচ্ছা।