মেহেরপুর প্রতিনিধি: “বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধকে উৎসাহিত করে। তাই অপরাধ দমনে দ্রুত, সুষ্ঠু ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে।” বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মেহেরপুর জেলা শাখার উদ্যোগে দিনব্যাপী রুকন শিক্ষা শিবির-২০২৬-এ প্রধান অতিথি হিসেবে এ কথা বলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব মোঃ মোবারক হোসাইন।

আজ শনিবার (২৩ মে) মেহেরপুর পৌর কমিউনিটি সেন্টারে আয়োজিত এ শিক্ষা শিবিরে আদর্শিক মানোন্নয়ন, আত্মশুদ্ধি এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়।

২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে মোবারক হোসাইন বলেন, “১৪শ শহীদ ও প্রায় ৩০ হাজার আহত মানুষের ত্যাগের বিনিময়ে দেশবাসী একটি ন্যায়ভিত্তিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিল। তবে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় সেই প্রত্যাশা পূরণ নিয়ে নানা প্রশ্ন সৃষ্টি হয়েছে।”

সম্প্রতি আলোচিত শিশু রামিসার হত্যাকাণ্ড নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে মোবারক হোসাইন বলেন, “এ ধরনের নির্মম ঘটনা শুধু একটি পরিবারের নয়, সমগ্র মানবতার জন্য বেদনাদায়ক। অপরাধীদের দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো ধর্ষক বা ঘাতক এমন নৃশংস অপরাধ করার সাহস না পায়।”

তিনি আরও বলেন, “যদি অতীতে সংঘটিত অপরাধগুলোর যথাযথ বিচার হতো, তাহলে আজ সমাজে ধর্ষণ ও সহিংসতার মতো ঘটনা এত ভয়াবহ আকার ধারণ করত না। বিচার বিলম্ব বা বিচারহীনতা অন্যায়কে প্রশ্রয় দেয়।”

তিনি সমাজে নৈতিক অবক্ষয়, আইন প্রয়োগের দুর্বলতা এবং অপরাধীদের প্রতি শৈথিল্যকে উদ্বেগজনক উল্লেখ করে বলেন, “শুধু অপরাধ সংঘটনের পর প্রতিক্রিয়া দেখালেই হবে না, বরং পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সমন্বিতভাবে প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নিতে হবে। শিশু ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব।”

এসময় তিনি এনসিপি নেতা নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর ওপর হামলার নিন্দা জানিয়ে বলেন, “রাজনৈতিক সহিংসতা ও সন্ত্রাস কোনো সভ্য সমাজের ভাষা হতে পারে না। মতভিন্নতার সমাধান শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক পন্থায় হওয়া উচিত।”

তিনি আরও বলেন, “ভিন্নমত দমন কিংবা ভয়ভীতি প্রদর্শনের সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে দুর্বল করে এবং সমাজে অস্থিরতা সৃষ্টি করে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে প্রতিপক্ষ হিসেবেই দেখতে হবে, শত্রু হিসেবে নয়। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার প্রবণতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।”

রুকন শিক্ষা শিবিরে ইসলামী আন্দোলনের কর্মীদের আদর্শিক ও নৈতিক উন্নয়নের ওপর গুরুত্বারোপ করে মোবারক হোসাইন বলেন, “আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্য ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজে শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার ভিত্তি। নিয়মিত শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমেই কর্মীদের আত্মশুদ্ধি, দায়িত্ববোধ এবং সাংগঠনিক দক্ষতা বৃদ্ধি সম্ভব।”

তিনি বলেন, “নৈতিকতা, তাকওয়া ও দায়িত্ববোধসম্পন্ন নেতৃত্ব গড়ে তুলতে রুকন শিক্ষা শিবির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যক্তি গঠন থেকেই সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিবাচক পরিবর্তনের সূচনা হয়।”

দিনব্যাপী এ শিক্ষা শিবিরে ইসলামী আন্দোলনের আদর্শ, সাংগঠনিক দায়িত্ব, আত্মশুদ্ধি এবং সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা, প্রশ্নোত্তর ও প্রশিক্ষণ সেশন অনুষ্ঠিত হয়। অংশগ্রহণকারীরা এ ধরনের আয়োজনকে নিজেদের আদর্শিক দৃঢ়তা ও দায়িত্ব পালনে সহায়ক বলে অভিমত ব্যক্ত করেন।

শেষে তিনি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গঠনে সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান এবং বলেন, “সুশাসন, আইনের শাসন ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই অপরাধমুক্ত ও নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব।”

শিক্ষাশিবিরে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ড. সামিউল হক ফারুকী।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন মাওলানা তাজউদ্দিন খান এমপি।

এছাড়াও উপস্থিত ছিলেন জামায়াতের কুষ্টিয়া জেলা আমির ও অঞ্চল টিম সদস্য অধ্যক্ষ খন্দকার এ কে এম আলী মহসিন, চুয়াডাঙ্গা জেলা আমির অ্যাডভোকেট রুহুল আমিন এমপি, মেহেরপুর-২ আসনের জনাব নাজমুল হুদা এমপি, জেলা নায়েবে আমীর মাওলানা মাহবুব উল আলম এবং লেখক-গবেষক ও প্যারেন্টিং কনসালটেন্ট ড. আহসান হাবিব ইমরোজসহ জেলার বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ।