গতকাল শনিবার ৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ বিকেলে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলের পদ্মা হলে “বসবাসযোগ্য ও মানবিক শহর” শীর্ষক একটি পলিসি ডায়ালগ করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রকৌশল বিভাগ।

অনুষ্ঠানের শুরুতে ১৯৪৭, ১৯৭১ ও ২০২৪ সালের শহীদদের স্মরণ করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিম।

মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে কল্যাণের জন্য। সে কারণেই জামায়াতে ইসলামী মনে করে, ঢাকা শহর ও বাংলাদেশকে নিরাপদ, আধুনিক ও বসবাসযোগ্য করে গড়ে তোলা আমাদের সকলের নৈতিক দায়িত্ব। আর তাই, ইনশাআল্লাহ, আমরা ঢাকাকে একটি মানবিক ও বসবাসযোগ্য শহরে পরিণত করতে চাই। আল্লাহ তাআলা আমাদের সুযোগ দিলে আমরা জাতিকে এমন একটি শহর ও দেশ উপহার দিতে বদ্ধপরিকর। এই পলিসি ডায়ালগ প্রোগ্রামটি তিনটি পর্বে পরিচালিত হয়।

প্রথম পর্ব

‘Let Us Build Together Livable, Caring, Governable, Functional Cities and Towns’ শীর্ষক প্রেজেন্টেশন উপস্থাপন করেন ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ টি এম জিয়াউল হাসান। তিনি বিভিন্ন তথ্য ও উপাত্তের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেন কীভাবে ঢাকাকে বসবাসযোগ্য ও মানবিক শহরে পরিণত করা সম্ভব। একই সঙ্গে তিনি সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বরিশাল, রাজশাহী, খুলনা ও রংপুর বিভাগকে উন্নত ও আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেন। পাশাপাশি ৬৪টি জেলাকে কীভাবে সহজ প্রক্রিয়ায় সমৃদ্ধ ও আধুনিক করা যায়, তাও উল্লেখ করেন।

মানবিক ও বসবাসযোগ্য শহর গঠনের জন্য সাতটি পিলারের কথা তুলে ধরা হয়— সকলের জন্য বিদ্যুৎ ও জ্বালানি (Power & Energy) নিশ্চিত করা, নাগরিকদের জন্য সহজলভ্য আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ, ৬৪টি জেলা ও সকল উপজেলা শহরকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন, গৃহায়ণ, আবাসন ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, অর্থনীতির চাকাকে সচল ও পুনর্গঠন।

দ্বিতীয় পর্ব

দ্বিতীয় পর্বে আলোচনা হয় ‘A National Vision for Livable & Human City’—বসবাসযোগ্য ও মানবিক শহরের জন্য জাতীয় লক্ষ্য ও নীতিমালা বিষয়ে। এই সেশনটি পরিচালনা করেন এক্সিস ট্রায়াংগেল গ্রুপের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার শাহজাহান আলম।

এ পর্বে তুলে ধরা হয় যে, গোটা বিশ্বের ১৭৩টি সবচেয়ে খারাপ শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। ঢাকা শহরে বছরে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা হকারদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করা হয় এবং বাস ও বেসরকারি যানবাহন থেকে প্রায় ১,০৫৯ কোটি টাকা চাঁদা আদায় হয়। এছাড়া ৮২ শতাংশ নারী হয়রানির শিকার হন এই শহরে।

তিনি বলেন, জামায়াত ক্ষমতায় এলে এসব দৌরাত্ম্যের অবসান ঘটবে এবং ঢাকা শহরকে একটি মানবিক ও বসবাসযোগ্য নগরীতে রূপান্তর করা হবে। সেখানে আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত থাকবে—উন্নত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ পানির সুব্যবস্থা, অগ্নিনির্বাপন ও ফায়ার সেফটি, গ্রিন পার্ক, হাঁটা চলার উপযোগী পরিবেশ এবং ঢাকার চারপাশে নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পানি ও যাতায়াত ব্যবস্থা (Water Blue Zones)। ট্রাফিক ব্যবস্থাও হবে উন্নত, থাকবে না যানজটের ভোগান্তি।

তৃতীয় পর্ব

তৃতীয় সেশনে ‘Building Together’ শীর্ষক আলোচনা উপস্থাপন করেন পরিকল্পনাবিদ খন্দকার মো. আনসার হোসাইন, সাবেক সচিব, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)।

তিনি ঢাকা শহর ও বাংলাদেশের রাস্তা ও যানজট সমস্যার কারণ ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন, এক্সপ্রেসওয়েগুলো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও গবেষণা ছাড়াই নির্মাণ করা হয়েছে ও হচ্ছে। এর ফলে শুধু অর্থের অপচয় নয়, বরং অবকাঠামো ও পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে এবং সাধারণ মানুষের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। এ কারণে প্রতিদিন দুর্ঘটনার হার বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশের পরিবেশ ও বাস্তবতা বিবেচনায় রেখে বাস্তবসম্মত উপায়ে এসব সমস্যার সমাধান করা হবে। জামায়াত ক্ষমতায় এলে প্রাণ ও প্রকৃতিকে কাজে লাগিয়ে ভারসাম্য বজায় রেখে রাস্তা নির্মাণ, জলাশয়, পুকুর, ড্রেন, নালা, খাল-বিল ও নদ-নদী ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আধুনিক ও বিজ্ঞানসম্মতভাবে বসবাসযোগ্য ও মানবিক শহর গড়ে তোলা হবে। যেখানে কোনো অনাচার থাকবে না, নারী ও শিশুর জীবন হবে নিরাপদ ও সহজ।

অনুষ্ঠানে তিনটি পর্বে প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন—

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এ টি এম জিয়াউল হাসান, দেওয়ান এ. এইচ. আলমগীর — নীতিবিষয়ক বিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আব্দুর রব — উপাচার্য, এমআইইউ প্ল্যানার মেহেদী আহসান — সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি), ড. আদিল মোহাম্মদ খান — সাবেক সভাপতি, বিআইপি ও অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়,

ড. ফজলে এলাহী — সাবেক উপাচার্য, আইইউটি, প্রকৌশলী আবিদ হাসান সিদ্দিক-- পরিচালক, রিহ্যাব ও সভাপতি, দি ফোরাম অফ ইঞ্জিনিয়ার্স, ডিসিএন, প্রকৌশলী শাহজাহান আলম — জাতীয় পরামর্শক (অগ্নি নিরাপত্তা ও পরিবেশ), খন্দকার মো. আনসার হোসেন — সাবেক প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ); সাবেক সচিব, বিআইপি; অ্যাডজাংক্ট ফ্যাকাল্টি, বুয়েট মারদিয়া মমতাজ — সহকারী অধ্যাপক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ড. মাহবুবুল বারী — আন্তর্জাতিক পরিবহন বিশেষজ্ঞ, ড. মুসলেহ উদ্দিন হাসান — অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ (ইউআরপি), বুয়েট

অনুষ্ঠানে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও অভিজ্ঞ প্রকৌশলীবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন।

অনুষ্ঠানের উদ্বোধন হয় ক্বারি হাফেজ বেলাল হোসাইনের পবিত্র কুরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। শুরুতে উদ্বোধনী বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শূরা সদস্য ও কেন্দ্রীয় নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সদস্য পরিকল্পনাবিদ সিরাজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, আল্লাহ তাআলা যদি জামায়াতে ইসলামীকে দেশের সরকার গঠনের সুযোগ দেন, তবে গোটা বাংলাদেশকে সত্যিকার অর্থে মানবিক ও বসবাসযোগ্য করে গড়ে তোলার জন্য কাজ করা হবে। আর সেক্ষেত্রে পলিসি প্রণয়নে সহযোগিতা করা আজকের এই আয়োজনের মূল উদ্দেশ্য। যা এ দেশের সকল নাগরিকের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন। ইনশা আল্লাহ, ভবিষ্যতে এটি আর স্বপ্ন থাকবে না, বাস্তবে রূপ নেবে।

অনুষ্ঠানের সমাপনী বক্তব্যে ইয়ুথ গ্রুপের সাবেক নির্বাহী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার হাফিজুর রহমান সকলকে অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার জন্য আন্তরিক কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা জানান।

তিনি বলেন, ‘মানবিক ও বসবাসযোগ্য শহর’ গড়ে তোলা শুধু প্রত্যয় নয়—বরং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষা ও সুন্দর জীবনযাপনের জন্য নিরাপদ শহর গড়া বাংলাদেশের জন্য অপরিহার্য।

প্রেস বিজ্ঞপ্তি