বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, আমরা যদি একটি নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আগামী দিনে আমাদের শোক সমাবেশ আর শোক গাঁথার মধ্যেই থাকতে হবে। আমি আশা করি গণতন্ত্রকামী মানুষ আগামী নির্বাচনে দেশে গণতন্ত্রের বিজয় গাঁথা রচনা করবে। গতকাল রোববার দুপুরে জুলাই অভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও গুরুতর আহতদের নিয়ে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় আগামী সংসদ নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মন্তব্য করে তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গণঅভ্যুত্থানে যারা শহীদ হয়েছেন, যারা হতাহত হয়েছেন, তাদের উদ্দেশ্য ছিল একটি স্বনির্ভর, নিরাপদ একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলা। সেই নিরাপদ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার জন্য আগামী জাতীয় নির্বাচন অত্যন্ত, অত্যন্ত এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদ বিরোধী ধারাবাহিক আন্দোলন এবং ২৪ সালে ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে আহত এবং হতাহতের প্রতি রাষ্ট্রের অবশ্যই দায়িত্ব রয়েছে। একটি দায়িত্বশীল দল হিসেবে বিএনপি সেই দায়িত্ব অনুভব করে। জনগণের রায় বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে অবশ্যই পর্যায়ক্রমিকভাবে আমরা সেই দায়িত্ব, অঙ্গীকার, প্রতিশ্রুতি দেশের মানুষের সামনে ইনশাল্লাহ পুরণ করব।
ফার্মগেইট কষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বিএনপির উদ্যোগে জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ পরিবার ও গুরুতর আহতদের নিয়ে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারম্যানের সহধর্মিনী ডা. জুবাইদা রহমান অতিথি সারিতে শহীদ পরিবারের সাথে বসেন।
শহীদ পরিবারের সদস্যরা তাদের মনের বেদনা-কষ্টের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লে পুরো অনুষ্ঠান¯’ল এক অন্যরকম পরিবেশ সষ্টি হয়। তারেক রহমান আলোচনার এক পর্যায়ে আহতের আর্তি শুনতে মঞ্চের নিজের আসন ছেড়ে সামনে এসে শহীদ পরিবারের সদস্যদের সাথে কথা বলেন এবং সান্তনা দেন।
২৪ এর আন্দোলন কোনো দলের নয় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ২০২৪ সালের আন্দোলন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠির নয়। এই আন্দোলন ছিলো সত্যিকার অর্থেই অধিকার হারা গণতান্ত্রিক মানুষের গণ আন্দোলন। এই কারণেই আমি বলি, ১৯৭১ সাল ছিলো স্বাধীনতা অর্জনের, ২০২৪ সালের সালের আন্দোলন ছিল দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। সুতরাং ২০২৪ সালকে যদি সুসংহত করতে হয় তাহলে দেশের সকল নারী-পুরুষ এবং প্রতিটি নাগরিকের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন।
সকলকে সজাগ থাকতে হবে মন্তব্য করে বিএনপি চেয়ারম্যান বলেন, যারা স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনকে দলীয় স্বার্থ রক্ষায় পরিণত করতে চায় তাদের সম্পর্কে স্বাধীনতা প্রিয় গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষকে অবশ্যই সজাগ থাকা জরুরী। ২০২৪ সালের স্বাধীনতা রক্ষার আন্দোলনে হতাহত পরিবারের স্বজন কিংবা আহতদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা আমরা আজকে এই অনুষ্ঠানে শুনেছি। তাদের এই কষ্ট কোনো কিছু দিয়ে মোচন করা সম্ভব নয়। কারণ আমিও জানি স্বজন হারানোর বেদনা কতটুকুৃ কোনো কিছু দিয়ে এই বেদনা মোচন করা যায় না।
তবে দুইভাবে গণঅভ্যুত্থানে আহতদের ক্ষতিপুরণ দেয়ার চেষ্টা করতে পারি। তা হ”েছ রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে তাদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করা এবং যে উদ্দেশ্য নিয়ে এই সাহসী মানুষগুলো রাজপথে নেমে এসেছিলো রাষ্ট্র এবং সমাজের সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা। অর্থাৎ মানুষের রাজনৈতিক অধিকার প্রত্যেকটি দল-মত নির্বিশেষে প্রত্যেকটি মানুষের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করা।
২৪ এর হতাহতদের জন্য মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়ে আলাদা বিভাগ হবে জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, বিএনপি এর আগে যখন দেশ পরিচালনার দায়িত্বে ছিল তারা মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় নামক একটি মন্ত্রণালয় তৈরি করেছে। যা ১৯৭১ সালে যারা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন অর্থাৎ এক কথায় মুক্তিযোদ্ধা পরিবারদের কল্যাণ তারা দেখভাল করে থাকে। আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি, মানুষের সমর্থনে বিএনপি আগামী দিনে সরকার গঠনে সক্ষম হলে এই শহীদ পরিবার যারা আছেন, জুলাই যোদ্ধা যারা আছেন, জুলাই আন্দোলনের যারা শহীদ পরিবার বা যোদ্ধা আছেন, তাদের যে কষ্টের কথাগুলো যে কয়জন ব্যক্তি, যে কয়জন মানুষ তুলে ধরেছেন, সেই কষ্টগুলোর যাতে আমরা কিছুটা হলেও সমাধান করতে পারি, যাকে আমরা হারিয়ে ফেলেছি তাকে তো আমরা ফিরিয়ে আনতে পারবো না। কিš‘ যারা পেছনে রয়ে গিয়েছেন সেই পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন সুবিধা-অসুবিধাগুলো যাতে দেখভাল করতে পারি সেজন্য মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আমরা আরেকটি ডিপার্টমেন্ট তৈরি করব। যাদের দায়িত্ব হবে এই মানুষগুলোর দেখভাল করা।
তিনি বলেন, কারণ তারাও (২৪ ‘র যোদ্ধারা) একজন মুক্তিযোদ্ধা। তারাও মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনারা গণ্য। একাত্তর সালে এই দেশের মানুষ মুক্তিযোদ্ধারা এই দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য জীবন দিয়েছিলেন, এই দেশের স্বাধীনতা অর্জনের জন্য যোদ্ধারা ত্যাগ স্বীকার করেছিলেন। ঠিক একইভাবে ২৪‘র যোদ্ধারা যুদ্ধ করেছেন, তারা স্বাধীনতা সার্ব রক্ষার যুদ্ধ করেছেন। সেজন্যই মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে আমরা আপনাদের জন্য আরেকটি বিভাগ তৈরি করব।
জুলাইয়ে গণহত্যা হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফ্যাসিবাদী বিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম হয়েছে , খুন অপহরণের শিকার হয়েছে, এরকম অনেকগুলো পরিবারের সাথে আমার কথা হয়েছে, দেখা হয়েছে। অসংখ্য অগণিত পরিবার সব হারিয়ে ছিন্ন বি”িছন্ন হয়ে গিয়েছে। শুধুমাত্র জুলাই গণঅভ্যুত্থানেও ১৪‘শও বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন, আহত হয়েছেন ত্রিশ হাজারের মতো মানুষ। এই ত্রিশ হাজার এর মতো মানুষের মধ্যে এমন কিছু মানুষ আছেন যাদের সংখ্যা ৫‘শ মতো। যাদের কারো এক চোখ অথবা কারো দুই চোখই নষ্ট হয়ে গিয়েছে, পঙ্গু হয়েছেন অনেকে। জুলাই অভ্যুত্থানে যেভাবে দেড় হাজারের মত মানুষকে যে হত্যা করা হয়েছে এটিকে এক বাক্যে স্রেফ আমরা একটি গণহত্যা বলতে পারি। জুলাই গণঅভ্যুথনে যারা বিভিন্নভাবে আহত হয়েছেন তাদের অনেকেই আজকের এই অনুষ্ঠানে উপ¯ি’ত আছেন। আমাদের সামনে বক্তব্য রেখেছেন কেউ কেউ। অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণকারী আহতদের যারা বক্তব্য রেখেছেন তাদের কষ্টের কথাগুলো আমরা শুনেছি।
তিনি বলেন, আপনাদের কারণেই আপনাদের সাহসী ভূমিকার কারণেই কারণেই ফ্যাসিবাদী চক্র শুধুমাত্র রাষ্ট্র ক্ষমতা নয় বরং এই দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। ২০২৪ সালের ১৯ আগস্ট আমি আপনাদের ভূমিকার কথা স্মরণ করে একটি বক্তব্য রেখেছিলাম। সেই বক্তব্যে আমি বলেছিলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শহীদ আবু সাঈদ, মাহফুজুর রহমান মুগধ, কলেজ ছাত্র ওয়াসিম আকরাম, মাদ্রাসা ছাত্র আব্দুল্লাহ আল মামুন, স্কুল ছাত্র রিফাত হোসেন, কুমিল্লার আইনজীবী আবুল কালাম, চুয়াডাগার রাজমিস্ত্রী উজ্জ্বল হোসেন, নোয়াখালীর দোকান কর্মচারী আসিফ, বরগুনার ওষুধ কোম্পানির সেলসম্যান আল আমিন, পাবনার গাড়িচালক আরাফাত হোসেন, মিরপুরের গুলিবিদ্ধ ২২ বছর বয়সী মুত্তাকিন, দোকান কর্মচারী আতিকুল, অষ্টম শ্রেণীর শিক্ষার্থী তামিমের মতন অনেকের হাত কিংবা পা কেটে ফেলতে হয়েছে। হত্যা থেকে ছয় বছরের শিশু রিয়া গোপাও কিš‘ রেহাই পায়নি সেদিন।
তিনি বলেন, এক বক্তব্যে হয়তো আমরা সকলের নাম বলতে পারবো না। এত মানুষ শহীদ হয়েছেন, এত মানুষ আহত হয়েছেন। ফ্যাসিবাদ শাসন শোষণের বিরুদ্ধে ২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে দল ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে দেশের স্বাধীনতা প্রিয়, গণতান্ত্রকামী প্রত্যেকটি সেক্টরের প্রতিটি শ্রেণী-পেশার মানুষ সেদিন রাজপথে নেমে এসেছে। সেদিনকার ক্যামেরায় বন্দি যত ছবি উঠেছে প্রত্যেকটি ছবি এই কথারই সাক্ষ্য দেয়। ২৪ সালের শহীদদের রুহের মাগফেরাত কামনার পাশাপাশি আহতদের দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন বিএনপির চেয়ারম্যান।
বিএনপির ¯’ায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের সভাপতিত্বে ও সহ দফতর সম্পাদক আবদুস সাত্তার পাটোয়ারির সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, আমরা বিএনপি পরিবারের আহ্বায়ক আতিকুর রহমান রুমনসহ শহীদ পরিবারের সদস্য ও আহত ব্যক্তিরা বক্তব্য রাখেন।