বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ ৮ দলীয় জোটে যুক্ত হলো জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি এলডিপি। এতে ৮ দলীয় জোট পরিণত হলো ১০ দলীয় জোটে। এই জোট শুধু নির্বাচনী নয়Ñএটি রাজনৈতিক, আন্দোলন ও দেশ গঠনের জোট হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। জাতীয় স্বার্থে ও জাতীয় ইস্যুতে ভবিষ্যতেও দলগুলো একসঙ্গে কর্মসূচি পালন করবে বলে জানান তিনি।
গতকাল রোববার জাতীয় প্রেসক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি একথা বলেন। এদিন তিনি এনসিপি ও এলডিপির সাথে নির্বাচনী সমাঝোতার ঘোষণা দেন। সাংবাদিকদের সহযোগিতা ও উপস্থিতির জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে জামায়াতের আমীর বলেন, জাতীয় স্বার্থে এই ঐক্য আরও দৃঢ় হবে, ইনশাআল্লাহ।
সাংবাদিক সম্মেলনে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল অলি আহমদ বীর বিক্রম, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক, খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ডা. আহমদ আব্দুল কাদের, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রেসিডিয়াম সদস্য আশরাফ আলী আকন, নেজামে ইসলাম পার্টি বাংলাদেশের সিনিয়র নায়েবে আমীর আব্দুল মাজেদ, ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের নায়েবে আমীর মুজিবুর রহমান হামিদী, জাগপার সহ-সভাপতি রাশেদ প্রধানসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা উপস্থিত ছিলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশ যে সংকটময় সময় পার করছে, সেই বাস্তবতা থেকে প্রিয় বাংলাদেশকে সামনে এগিয়ে নিতে শোষণ-বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার নিয়েই আটটি দল দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করছে। এরই ধারাবাহিকতায় আজ আরও দুটি দলÑকর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রমের নেতৃত্বাধীন এলডিপি এবং এনসিপিÑএই জোটে সম্পৃক্ত হয়েছে।
তিনি জানান, এনসিপির সঙ্গে এরই মধ্যে বৈঠক সম্পন্ন হয়েছে। সময় স্বল্পতার কারণে তারা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত থাকতে না পারলেও দলের আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরাসরি বৈঠকে অংশ নিয়ে তাদের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। শিগগির এনসিপি আলাদা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে তাদের অবস্থান পরিষ্কার করবে।
জামায়াত আমীর বলেন, ৩০০ আসনেই নির্বাচনি সমঝোতা নিয়ে দলগুলোর মধ্যে আলোচনা হয়েছে এবং প্রায় সব আসনে সমঝোতা চূড়ান্ত। শেষপর্যায়ে যুক্ত হওয়া দুই দলের কারণে কিছু কারিগরি বিষয় রয়ে গেছে, যা মনোনয়ন দাখিলের পর পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। নির্বাচন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ঘোষিত তারিখেই একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য তারা সর্বাত্মক সহযোগিতা করবেন।
সরকার ও নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এখনো সবার জন্য সমতল মাঠ তৈরি হয়নি। সংবিধানিক ও নৈতিক দায়িত্ব পালনে নির্বাচন কমিশন ও সরকারকে নিরপেক্ষ থাকতে হবে। কোনো ধরনের পক্ষপাত, ভয়ভীতি বা লোভ-লালসার কাছে নতি স্বীকার করলে জাতি তা মেনে নেবে না।
তিনি বলেন, বিগত কয়েকটি নির্বাচনে ভোটাধিকার থেকে মানুষ বঞ্চিত হয়েছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের কোনো প্রক্রিয়া মেনে নেওয়া হবে না। ভোটাধিকার রক্ষায় এই জোট ঐক্যবদ্ধভাবে লড়াই করবে। সংবাদ সম্মেলনে ডা. শফিকুর রহমান ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে শহীদ ও আহতদের স্মরণ করেন। তিনি শহীদদের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ঘোষিত তারিখের যেন কোনো হেরফের না হয় এবং নির্ধারিত সময়েই জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। নাহিদ ইসলামদের অনুপস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়ে জামায়াত আমীর আরও বলেন, এনসিপির সঙ্গে কিছুক্ষণ আগে বৈঠক শেষ হয়েছে। তারা (এনসিপি নেতারা) এই সংবাদ সম্মেলনে আসার সময় ও সুযোগ পাননি। এ ছাড়া দলীয় পরিসরে সভা করবেন। এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সরাসরি আট দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। তারা তাদের সিদ্ধান্ত দলগুলোকে জানিয়েছেন। আরেকটি সংবাদ সম্মেলন করে তাদের সিদ্ধান্ত জানাবেন।
১০ দল মজবুত নির্বাচনী সমঝোতায় এক হয়েছে জানিয়ে শফিকুর রহমান বলেন, দলগুলো নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সারা দেশের ৩০০ আসন (প্রার্থী) নির্ধারণ করেছে। দুটি দল একেবারে শেষ পর্যায়ে এসেছে। আরও অনেক দল আসন সমঝোতায় আগ্রহী ছিল। তবে এ মুহূর্তে এই প্রক্রিয়ায় তাদের সম্পৃক্ত করা দুরূহ হয়ে গেছে। অনেকের আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও তাদের সম্পৃক্ত করা যাচ্ছে না। এ জন্য তিনি দলগুলোর নেতাদের কাছে দুঃখপ্রকাশ করেন।
আসন সমঝোতার বিষয়ে জামায়াতের আমীর বলেন, ‘আমাদের আসন সমঝোতা অলমোস্ট কমপ্লিট (প্রায় শেষ)। সামান্য একটু বিষয় যেগুলো রয়েছে, আমরা আশা করছি নমিনেশন ফাইল করার পরপরই আমরা সেটাও ইনশাআল্লাহ আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে সুন্দরভাবেই সমাধান করতে পারব, আপনারা দোয়া করবেন। এ ক্ষেত্রে কোনো সমস্যা হবে না। এ ব্যাপারে আমরা খুবই আস্থাশীল।’
জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠানে দেড় মাসেরও কম সময় হাতে আছে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, নির্বাচনকে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য করতে দলগুলো অঙ্গীকারবদ্ধ। দলগুলো চায়, কোনো হেরফের না হয়ে যে তারিখ নির্ধারণ হয়েছে, সেই তারিখেই নির্বাচন হোক।
নির্বাচন আয়োজনে সরকার ও নির্বাচন কমিশনকে তাদের ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করতে হবে উল্লেখ করে জামায়াতের আমীর বলেন, এখনো তাদের অনেক বাকি রয়ে গেছে। এখনো সব দলের জন্য সমতল মাঠ তৈরি হয়নি। এটি তৈরির দায়িত্ব সরকার ও নির্বাচন কমিশনের। তারা যেন যেকোনো ধরনের লোভ-লালসা, ভয়-ভীতি এবং কারও প্রতি কোনো ধরনের আনুকুল্যের ঊর্ধ্বে উঠে তাদের দায়িত্ব পালন করে। জাতি তাদের কাছে সেই প্রত্যাশাই করে। এর ব্যতিক্রম জাতি মানবে না। গত তিনটি নির্বাচনে মানুষ ভোট দিতে পারেনি। আগামী নির্বাচনে কেউ ভোটের অধিকার হরণ করতে চাইলে সেটি বরদাশত করা হবে না।
সংবাদ সম্মেলনে এক সাংবাদিক জানতে চান, সমঝোতায় আসন বিন্যাস কীভাবে হলো? জবাবে জামায়াতের আমীর বলেন, ‘জানবেন। ডিটেইলসটা জানবেন। আমি বলছি, অল্প একটু আমাদের বাকি আছে। আমরা অতিসত্বর আপনাদের তা স্পষ্ট করে দেব, ইনশা আল্লাহ।’
নতুন দল আসায় এই জোট নির্বাচনী জোট হলো কি নাÑএমন প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এটা দেশ গঠনের জোট। এটা নির্বাচনের জোট, এটা রাজনৈতিক জোট। এটা সকল ধরনের... মানে, ওই জোট বলেন আর সমঝোতা বলেন, যা-ই বলেন, এটা সবগুলো পারপাস কাভার করার জন্য।’ ভবিষ্যতে আন্দোলনেও এসব দল একসঙ্গে থাকবে কি না, এ প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমীর বলেন, ‘আমরা আশা করছি, একসাথেই আমরা করব ইনশা আল্লাহ। দলীয় কর্মসূচি যার যার থাকবে। তারপরে ন্যাশনাল ইস্যুতে যেখানেই প্রয়োজন, আমরা একসাথে করব ইনশা আল্লাহ।’
আরেক প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, এখানে কোনো একক দল আসন বণ্টন করবে না। ন্যায্যতার ভিত্তিতে সবার হাতে আসন তুলে দেওয়া হবে। সবাই সবাইকে তুলে দেবে। এখানে নির্দিষ্ট কোনো দল কাউকে তুলে দিচ্ছে না। সংবাদ সম্মেলনে জামায়াত আমিরের বাঁ পাশে বসেছিলেন এলডিপির চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদ। তবে তিনি কোনো বক্তব্য দেননি।
আগে থেকে জোটে থাকা আট দল হলো বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি।