জুলাই সংস্কার প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন ছাড়া বিরোধী দল ডেপুটি স্পিকার পদ নেবে না বলে জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকারি দলের গৃহীত সব সিদ্ধান্ত এবং পদক্ষেপে আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। কিন্তু দেশ ও জাতির ক্ষতি হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা পদক্ষেপ নিলে আমরা আমাদের দায়িত্ব সেভাবেই পালন করব। ভুল করলে প্রথমে আমরা সেই ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধনের সুযোগ দেব, পরামর্শ দেব। যদি দেখি পরামর্শে কাজ হচ্ছে না, তাহলে প্রতিবাদ করব। প্রতিবাদে যদি কাজ না হয়, তাহলে জনগণের অধিকারের পক্ষে আমরা শক্ত হয়ে দাঁড়াব। গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের এলডি হলে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশ ও জাতির জন্য বিরোধীদল হিসেবে আমাদের ভূমিকা কী হবে তার জন্যই আমরা বসেছিলাম। আমরা আজ সব সদস্যের পরামর্শ নিয়েছি। আমরা চাই জাতীয় সংসদ দেশ গঠনে অর্থবহ ভূমিকা পালন করুক। যিনি স্পিকার থাকবেন, বিরোধীদলকে যথেষ্ট সুবিধা দেবেন। তাহলে গণতন্ত্রের সৌন্দর্য ফুটে উঠবে। তিনি বলেন, আমরা চাই জাতীয় সংসদ জাতির প্রত্যাশাপূরণে অর্থবহ হউক। সকল ব্যাপারে বিরোধীতা নয়, আবার না বুঝেও সহযোগিতা নয়। জাতির কল্যাণ সরকারের কাজে সহযোগিতা থাকবে। কিন্তু দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে কিছু করলে প্রতিবাদ করবো। জনগণের জন্য প্রতিরোধে দাঁড়াবো। সরকার সংখ্যা গরিষ্ঠতার বলে কিছু করতে চাইলে করতে পারবে।

জামায়াত আমীর বলেন, এই সংসদ বিশেষ প্রেক্ষাপটে হয়েছে। এবার দুটি নির্বাচন হয়েছে। দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দুটি নির্বাচন আমরা মেনে নিয়েছি। অর্ডিন্যান্সকে সম্মান করে আমরা দুই জায়গায় শপথ নিয়েছি। দুঃখের বিষয় হলো সরকারি দল এখনো সংবিধান সংস্কারের শপথ নেয়নি। ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, জুলাইকে সম্মান করতে হবে। চব্বিশ থাকলেই ছাব্বিশ থাকবে, নাহলে ছাব্বিশের অস্তিত্ব থাকবে না। ২৪-কে অমান্য, অগ্রাহ্য করে, পাশ কাটিয়ে ২৬- এ জাতির জন্য কোনো সুখকর হবে না। তিনি বলেন, আমরা চাই যে চারটি বিষয়ে গণভোটে দেওয়া হয়েছে, তার সর্বাত্মক বাস্তবায়ন হোক। তিনি বলেন, আমরা চাই- যে চারটি বিষয় গণভোটে দেয়া হয়েছে তার সর্বাত্মক বাস্তবায়ন হোক।

‘রাষ্ট্রপতি সংসদে ভাষণ দিলে আপনারা ওয়াক আউট করবেন কিনা’- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমীর বলেন, সূর্য উঠলে দেখতে পাবেন। আরেক প্রশ্নের জবাবে জামায়াত আমীর বলেন, তারা (বিএনপি) আমাদেরকে আনঅফিশিয়ালি প্রস্তাব দিয়েছে, আমরা তাদেরকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। কিন্তু আমরা চাই জুলাই সনদের প্রস্তাব পুরোপুরি বাস্তবায়ন হোক। আমরা আংশিক কোনো বিষয় মানতে চাচ্ছি না। ডা. শফিকুর রহমান বলেন, একটি গণভোট, আরেকটি সংসদ নির্বাচন। দেশের স্বার্থে দুটোই মেনে নিয়েছি। একটা থেকে আরেকটা আলাদা করার সুযোগ সেই। সংস্কার পরিষদে শপথ নিয়েছি, কিন্তু সরকারি দল শপথ নেয়নি। ২৪ থাকলে ২৬ থাকবে, নইলে থাকবে না। আশা করব তারা দ্রুত শপথ নেবে। ৬৯% মানুষ গণভোটের পক্ষে রায় দিয়েছে। এ লড়াই সংসদ ও রাজপথে একসাথে চলবে। এটা গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। কোনো বিষয় নিয়ে আদালতে যাওয়া ঠিক হবে না। বিরোধী দলকে পর্যাপ্ত কথা বলার সুযোগ দেবেন আশা করি।

একটা দায়িত্বশীল বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করতে চান উল্লেখ করে জামায়াত আমীর বলেন, ‘সব ব্যাপারে বিরোধিতা নয়, আবার না বুঝেও কোনো সহযোগিতা নয়। দেশ ও জাতির কল্যাণে সরকারি দলের গৃহীত সব সিদ্ধান্ত এবং পদক্ষেপে আমাদের সমর্থন ও সহযোগিতা থাকবে। কিন্তু দেশ ও জাতির ক্ষতি হয় এমন কোনো সিদ্ধান্ত কিংবা পদক্ষেপ নিলে আমরা আমাদের দায়িত্ব সেভাবেই পালন করব। ভুল করলে প্রথমে আমরা সেই ভুল ধরিয়ে দেব, সংশোধনের সুযোগ দেব, পরামর্শ দেব, যদি দেখি পরামর্শে কাজ হচ্ছে না, তাহলে প্রতিবাদ করব। প্রতিবাদে যদি কাজ না হয়, তাহলে জনগণের অধিকারের পক্ষে আমরা শক্ত হয়ে দাঁড়াব। সংখ্যাগরিষ্ঠতার বলে সরকার কোনো কিছু করতে চাইলে সেটা তারা পারবে উল্লেখ করে শফিকুর রহমান বলেন, কিন্তু যদি আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে যৌক্তিক বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তাহলে সেটা হবে জাতির জন্য উত্তম।

জামায়াতের আমীর বলেন, এই সংসদটা হঠাৎ করে এভাবে হয়নি, একটা বিশেষ প্রেক্ষাপটে হয়েছে। বাংলাদেশের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদ মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। স্বাধীনতার পর ১৯৯১ সালে গঠিত সংসদ প্রথম তার মেয়াদ পূর্ণ করে। এরপর ১৯৯৬ ও ২০০১ সালে এই সুযোগ এসেছিল। ২০০৮ সালে গঠিত সংসদও মেয়াদ পূর্ণ করেছিল। বাকি যেগুলো হয়েছে, সেগুলোকে জনগণ নির্বাচন হিসেবে দেখে না, মানে না। এর কোনো নৈতিক বৈধতা ছিল না। এরপর এ নির্বাচন তো ২০২৬ সালে হওয়ার কথা ছিল না। সংবিধান মানলে এ নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল ২০২৯ সালে। এটা ২০২৬ সালে হয়েছে চব্বিশের সীমাহীন ত্যাগ-তিতিক্ষার কারণে।

এ প্রসঙ্গে চব্বিশে অনেক মানুষের শাহাদাতবরণ, আহত হওয়া, পঙ্গুত্ববরণ এবং আওয়ামী লীগের শাসনামলে খুন, গুম, আয়নাঘরে নির্যাতন ও কারাবরণের কথা উল্লেখ করেন শফিকুর রহমান। ১৯৪৭, ১৯৫২, ১৯৭১ ও ১৯৯০ সালকে জাতির ‘টার্নিং পয়েন্ট’ উল্লেখ করে জামায়াতের আমীর বলেন, ‘এই টার্নিং পয়েন্টগুলাকে যেমন আমরা ধারণ করি, আমরা সিরিয়াসলি ধারণ করি চব্বিশকে। জুলাই যোদ্ধাদের মূল স্লোগান ছিল “উই ওয়ান্ট জাস্টিস”। আমরা সব ক্ষেত্রে সুবিচার চাই, বৈষম্যহীন একটি সমাজ চাই।’

এই সমাজ গড়ার জন্যই এবার সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে আরেকটা নির্বাচন হয়েছে মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘সেটা হচ্ছে সংস্কার পরিষদের নির্বাচন। যে অর্ডিন্যান্সের কারণে সংসদ নির্বাচন হয়েছে, একই অর্ডিন্যান্স বলেছে দুটি নির্বাচন একই দিনে হবে। একটা সংস্কার বিষয়ে জনগণের মতামত গণভোট, আরেকটা সংসদ নির্বাচন। ফলাফল যেটা হয়েছে, সেটা সবাই দেখেছেন। আমরা দেশের বৃহত্তর স্বার্থে দুটি ফলাফলই মেনে নিয়েছি। ফলে একটি নির্বাচনকে আরেকটির থেকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। এই নির্বাচন দুটি একটি আরেকটির পরিপূরক।’

সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, এটিএম আজহারুল ইসলাম, সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রমুখ।