সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল বুধবার বেলা ১১টায় জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের পশ্চিম ব্লকে দলীয় এমপিদের সঙ্গে এ বৈঠক করেন তিনি। বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর ডেপুটি প্রেস সেক্রেটারি জাহিদুল ইসলাম রনি। তিনি জানান, বৈঠকটিতে সরকার দলীয় সাংসদরা অংশ নিয়েছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের আগের দিন হওয়ায় বৈঠকটি রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

জানা যায়, নতুন সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিরোধী দলের ভূমিকা মোকাবিলা এবং সরকারি দলের সংহতি বজায় রাখাই এই সভার মূল লক্ষ্য। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংসদ নেতা হিসেবে নির্বাচিত হওয়ার পর এটিই পূর্ণাঙ্গ সংসদের প্রথম অধিবেশনপূর্ব আনুষ্ঠানিক দলীয় বৈঠক। সংসদীয় ঐতিহ্য অনুযায়ী অধিবেশন শুরুর আগে সরকার ও বিরোধী দল আলাদাভাবে নিজেদের রণকৌশল ঠিক করতে এ ধরনের বৈঠকে বসে।

এদিকে মন্ত্রী এবং দলের সংসদ সদস্যদের চলনেÑবলনে মার্জিত ও সতর্ক থাকতে বলেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান, সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। জাতীয় সংসদ ভবনে বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম সভায় তিনি এ পরামর্শ দেন। সভায় উপস্থিত একাধিক সংসদ সদস্য জানান, গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলার ক্ষেত্রেও মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সতর্ক থাকতে বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে যাঁর যে দায়িত্ব, তাঁর বাইরে যেন কেউ মন্তব্য না করেনÑএ বিষয়ে তিনি গুরুত্বারোপ করেন।

বেলা সোয়া ১১টায় সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে সভা শুরু হয়। সভা শেষ হয় বেলা ১টায়। সভায় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি স্বাগত বক্তব্য দেন। এরপর বক্তব্য দেন বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। সভার মঞ্চে প্রধানমন্ত্রীর এক পাশে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ও সালাহউদ্দিন আহমদ এবং অন্য পাশে চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি বসেন। সভায় বিএনপির ২০৯ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন।

সভায় বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির প্রসঙ্গও তোলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে অনেকে অনেক কথা বলেছে। কিন্তু ভোটের আঙুলের কালির দাগ মোছার আগেই আমরা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু করেছি। এটাই হচ্ছে বিএনপি। এই বিএনপিকেই মানুষ দেখতে চায়।’ প্রধানমন্ত্রী জানান, দ্রুত সময়ের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি বাস্তবায়নের পাশাপাশি সারা দেশে খাল খনন কর্মসূচি শুরু করা হবে। সামনে ডেঙ্গুর মৌসুমকে সামনে রেখে পরিষ্কারÑপরিচ্ছন্নতার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে সবাইকে সতর্ক করেন তিনি।

জুলাই জাতীয় সনদের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সনদের কিছু বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ রয়েছে। সরকার যেসব বিষয় বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেবে।

সভায় মন্ত্রিসভার তরুণ সদস্যদের নিয়মিত ও সময়মতো অফিস করার ওপর জোর দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মন্ত্রিসভায় অনেক জ্যেষ্ঠ নেতা আছেন। বিশেষ করে তরুণদের সকাল নয়টার মধ্যে অফিসে যেতে হবে। অফিসে যাওয়া–-আসার ক্ষেত্রে ট্রাফিক আইন মেনে চলারও পরামর্শ দেন তিনি। প্রধানমন্ত্রী নিজেও ট্রাফিক আইন মেনে চলেন বলে সভায় উল্লেখ করেন। এ ছাড়া দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রতিটি ক্ষেত্রে কৃচ্ছ্রসাধনের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতিÑবিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উত্তেজনা বিশ্ব অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি করছে।

সংসদীয় দলের সভায় জাতীয় সংসদের নতুন স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের দায়িত্ব সংসদ নেতা তারেক রহমানের ওপর ন্যস্ত করা হয়। আজ বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ সংসদ অধিবেশনের শুরুতে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচন হওয়ার কথা রয়েছে। জানা গেছে, আজ বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশন শুরুর পর দুই দিন (শুক্র ও শনিবার) বিরতি হবে। এরপর ১৫ মার্চ আবার সংসদ বসবে। ওই দিন মুলতবি হওয়ার পর ঈদুল ফিতরের পর ২৯ মার্চ আবার অধিবেশন শুরু হবে।

ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা : প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া প্রতিরোধে সারাদেশে প্রতি শনিবার পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার আহ্বান জানিয়েছেন। গতকাল বুধবার বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি এ আহ্বান জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ডেঙ্গু প্রতিরোধে সচেতনতা ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সবচেয়ে কার্যকর উপায়। এ কারণে আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগেই সরকার আগামী ১৪ মার্চ থেকে প্রতি সপ্তাহে সারাদেশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান শুরু করতে যাচ্ছে। এ কার্যক্রমে স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করছে।’তিনি বলেন, ‘প্রতিটি এলাকার জাতীয় সংসদ সদস্যগণসহ সর্বস্তরের জনপ্রতিনিধিদের প্রতি আমার আহ্বান- জনগণকে সঙ্গে নিয়ে প্রতি সপ্তাহের শনিবার নিজ নিজ এলাকার বসতবাড়ি ও আশপাশে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করুন। নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান চললে, আসন্ন দিনে ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ার মতো মরণঘাতী জ্বর থেকে জনগণকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। দেশবাসীর উদ্দেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনার-আমার-আমাদের সবার স্বার্থে একটি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ার মতো মরণঘাতী রোগ মানুষের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ সবাই সচেতন হলে এসব রোগ থেকে নিজেদের রক্ষা করা সম্ভব।’

তিনি বলেন, বিশেষজ্ঞদের মতে এডিস মশার কামড়ে মানুষ ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়। তাই ডেঙ্গু প্রতিরোধে আগাম প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি। তিনি বলেন, ‘আপনার-আমার-আপনাদের-আমাদের প্রত্যেকের স্বার্থে একটি জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আপনারা জানেন, ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ার মতো মরণঘাতী রোগ জনগণের প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অথচ আমরা সবাই সচেতন হলে ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়া থেকে নিজেদের রক্ষা করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞগণ বলছেন, এডিস মশার কামড় থেকে মানুষ ডেঙ্গু কিংবা চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হয়।’

তিনি আরও বলেন, এ কারণে ডেঙ্গু থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আগে থেকেই সকল প্রতিকারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। বর্ষা মৌসুম অর্থাৎ জুন থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত এই সময়টিতে সাধারণত ডেঙ্গুর প্রকোপ সবচেয়ে বেশি থাকলেও জনস্বাস্থ্যবিদগণ বলছেন, বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার বিষয়টি নির্দিষ্ট কোনো মৌসুমে সীমাবদ্ধ নেই। যেকোনও সময়ই মানুষের ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। তারেক রহমান বলেন, ‘বর্ষাকালে জমে থাকা পরিষ্কার পানিতে এডিস মশা জন্মায়। তিন দিন পানি জমে থাকলেই সেখানে মশা জন্মাতে পারে। কীটতত্ত্ববিদ এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণের জন্য ড্রেন, ডোবা, নর্দমার মতো যেসব জায়গায় পঁচা পানি জমে থাকার সুযোগ রয়েছে, সেগুলো পরিষ্কার করে রাখাই সবচেয়ে কার্যকর উপায়।’

সুতরাং, ফুলের টব, ড্রাম, বালতি, পরিত্যক্ত টায়ার, ডোবা, বাড়ি বা বাসার ছাদে পানি জমতে দেবেন না। পানির ট্যাংক ঢেকে রাখা জরুরি। প্রতি সপ্তাহে কমপক্ষে একবার বাড়ি বা বাসার ভেতর-বাহির পরিষ্কার রাখুন। তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘আমাদের সরকারের জাতীয় স্বাস্থ্যনীতির মূল নীতি হচ্ছে প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিউর, অর্থাৎ প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম। কোথাও ময়লা পানি জমে থাকতে দেবেন না। নিজের বাসা-বাড়ি এবং আশপাশ পরিচ্ছন্ন রাখুন। এডিস কিংবা চিকুনগুনিয়া থেকে নিজেকে রক্ষা করুন নিজেদের রক্ষা করুন ও অপরকে রক্ষা করুন।’