কমিটিতে সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যসংখ্যা সমান সমান হতে হবে - ডা. শফিকুর রহমান

আমরা জুলাই সনদের পক্ষে ছিলাম ও আছি -স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কারের বিষয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব করেছেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ। এ প্রস্তাবকে ইতিবাচক হিসেবে মনে করে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এ কমিটিতে সরকারি দল ও বিরোধী দলের সদস্য সংখ্যা সমান রাখার দাবি জানান। অন্যথায় সংখ্যাগরিষ্টতার জোরে সেখানেও মূল কাজ না হয়ে শুধুই বির্তক হবে বলে তিনি মনে করেন। অপরদিকে আইনমন্ত্রী সমান সংখ্যক সদস্য রাখাকে বৈষম্য বলে উল্লেখ করেছেন।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহবান বিষয়ক নোটিশের আলোচনায় বক্তারা এ অভিমত প্রকাশ করেন। স্পীকার হাফিজ উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে দুই ঘন্টারও বেশি সময় আলোচনা হয়। আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা। তবে প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে কোন বক্তব্য রাখেননি।

সরকারি ও বিরোধী দলের সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে কমিটি করা হোক

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, .ভিন্ন মত অনেক এসেছে। আসার শেষ প্রান্তে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, যে সংস্কার পরিষদের মেম্বার হিসেবে আমরা যে নির্বাচিত হচ্ছি, এর জন্য কোনো ব্যালট ছিল না। আমি বলব ব্যালট ছিল। গণভোটের ব্যালটটাই সেই ব্যালট। এবং যে আদেশ বলে গেজেট হয়েছে ওখানে পরিষ্কার লেখা ছিল যেÑএই নির্বাচনে যারা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হবেন, তারা একই সাথে সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবেও বিবেচিত হবেন।

তিনি বলেন, আজকে তারা নিজেদের তৈরি করা জিনিসের সাথে সবিরোধিতা করতে পারেন না। এটা মেনে নেওয়াই ছিল মহত্বের লক্ষণ। শেষ দিকে এসে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটা প্রস্তাব দিয়েছেন। আজকে পুরা আলোচনাটা হচ্ছে সংস্কারের ওপর, সংস্কার পরিষদের ওপর, এর সভা আহ্বানের ওপর। তিনি যদি ভালো হতো, এরকম করে একটা প্রস্তাব দিতেন যে-এই সংস্কার নিয়ে যে আলোচনা হলো, তাকে একটা জায়গায় পৌঁছানোর জন্য আসুন আমরা একটা বিশেষ কমিটি করি। তাহলে দ্যাট কুড বি এ ম্যাটার অফ কনসিডারেশন।

তিনি আরো বলেন, আমরা এটাকে ইতিবাচকভাবে দেখতে পারি কারণ আমরা সংকট তৈরির জন্য তো এখানে আসিনি, দেশের মানুষের সংকট নিরসনের জন্য এখানে এসেছি। আমরা প্রথম দিনই মাননীয় স্পিকারকে অভিনন্দন জানাতে গিয়ে বলেছিলাম যে-আমরা একটা গঠনমূলক বিরোধী দল হিসেবে এখানে দায়িত্ব পালন করতে চাই। বিরোধিতার খাতিরে কোনো বিরোধিতা নয়, বরঞ্চ যেখানে প্রয়োজন সহযোগিতা আর জাতির অধিকার সংরক্ষণের প্রয়োজনে বিরোধিতা-আমরা আমাদের পজিশনে এখনো আছি। আমরা সরকারি দলকে আন্তরিকভাবে আহ্বান জানাব-আমরাও গ্রহণ করার মাধ্যমে জনগণকে সম্মান করি, তাহলে এই সংসদ সম্মানিত হবে ইনশাআল্লাহ।

তিনি আরো বলেন, জনগনের অভিপ্রায় প্রতিফলিত হোক আমাদের সমন্বিত উদ্যোগে। এখানে আলাদা আমরা এক লাইনে, ট্রেজারি বেঞ্চ এক লাইনে চলতেই থাকলামÑএটার মাধ্যমে সমাধান কীভাবে হবে এটা আমরা সবাই বুঝি। এজন্য আমরাও সমাধান চাই, কিন্তু আমরা ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে চাই। যে বিষয়ের ওপরে আলোচনা হয়েছে, সেই বিষয়ের ওপরে একটা কমিটি আপনি যদি উত্তম মনে করেন আপনি করে দিতে পারেন। তবে সেখানে আমাদের আহ্বান থাকবে যেÑদুই দিক থেকেই সমান সংখ্যক সদস্য নিয়ে যেন এই কমিটি গঠন করা হয়। নইলে আমরা সেখানে আমাদের মতামত সুন্দরভাবে দিতে পারব না। এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে যদি কোনো কমিটি গঠন হয়, তাহলে এখন যেমন এখানে ডিবেট হচ্ছে, তখনও সেখানে ডিবেট হবে। যে লাউ সেই কদুতেই থেকে যাবে, অন্য কোনো ফল আমরা এখান থেকে আহরণ করতে পারব না।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশ এবং জাতির জন্য সংবিধান এবং এই সংসদ। আমরা কে ট্রেজারি বেঞ্চে আর কে অপজিশন বেঞ্চে-এগুলো কোনো পারমানেন্ট জিনিস না। এই স্বাধীন বাংলাদেশেই কিছু কিছু দল তারা ওখানে বসতেন, আজকে তারা কোথাও নেই। আবার এখানে যারা বসতেন, মাঝেমধ্যে ওখানেও বসতেন, আজকে তারা এখানে বসা আছে। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। আমরা দলের অভিপ্রায় নয়, জনগণের অভিপ্রায়টাকেই আমরা সম্মান দিয়ে এখানে এসেছি এবং এই প্রস্তাবটা উপ¯’াপন করেছি।

তিনি বলেন, অতি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রেখেছেন মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। যেহেতু আন্দালিব রহমান পার্থ সাহেব এখানে নেই, এজন্য আমি এ ব্যাপারে কোনো কথা বলব না। উনি ফায়ার করেছেন, কিন্তু কিছু কিছু ফায়ার ওনার ব্যাকফায়ার হয়ে গেছে। জনাব সালাউদ্দিন আহমেদ সাহেব অত্যন্ত বিজ্ঞ লোক। আমি যতদূর জানি তিনি আইনের ছাত্র ছিলেন। আর আমরা পঁচাত্তর পরবর্তী আমলে দফায় দফায় সেই আইনের নামেই আমরা ফ্যাসিবাদের ভিক্টিম হয়েছি। উনার পজিশন একজন জ্ঞানী মানুষ হিসেবে, আর আমাদের পজিশন একজন ভুক্তভোগী হিসেবে। আমরা ভোগ করেছি, ভিক্টিমাইজড হয়েছি আমরা।

তিনি আরো বলেন, ৭৩ সালের পরের অর্ডার যে আইন নয়, সেটার উল্লেখ করেছেন। কিন্তু এরপরে বহু অর্ডারও, বহু অধ্যাদেশ, বহু আদেশ আইনের রূপ নিয়েছে। আজকে যদি সেই সমস্ত সম্মানিত ব্যক্তিদের সম্পর্কে কথা বলি, তারা আজকে দুনিয়ায় নেই, অনেককেই আমরা অন্তর থেকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করি, তাদের প্রতি অশ্রদ্ধা হবেÑআমি সেই জায়গায় ফিরে যেতে চাই না। আবারও বলব, সংবিধান এবং আইন মানুষের জন্য, আইন কিংবা সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। এই জিনিসটা আমরা খেয়াল রাখলে ভালো হতো। ব্যক্তিগতভাবে আমি বিশ্বাস করি এখানে যারা এসেছেন তারা জনগণের মধ্যে অতি শ্রদ্ধার পাত্র। কাজেই কাউকে হেয় করে কথা বলাটা আমি কখনো সমীচীন মনে করি না, আমি সেদিকে যাব না। আমাদের জনাব সালাউদ্দিন আহমেদ সাহেব বলেছেন যে আদেশটা দেওয়া হয়েছে, এটা একটা অন্তহীন প্রতারণা করা হয়েছে। কে করেছে? অন্তর্বর্তী সরকার এবং প্রেসিডেন্ট মিলে করেছেন। তো এটা তো নভেম্বরের ১৩ তারিখ হয়েছে। আর ভোট হয়েছে ২৬ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি। দীর্ঘ সময় মাঝখানে ছিল।

তিনি আরো বলেন, যার কারণে উনাদের গণভোট এবং সংসদ নির্বাচনের দাবিটা সরকার গ্রহণ করার কারণে উনারা ফরমাললি অভিনন্দন জানিয়েছেন। তাহলে গণভোটটা তো উনাদেরও দাবি ছিল। গণভোটে কী কী বিষয় অন্তর্ভুক্ত হবে তা কিন্তু আগেই তাদের ওয়েবসাইটে প্রচার করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন এটা করেছে যথেষ্ট সময় দিয়ে। আমরা দেখেছি, সরকারি দলও এটা দেখার কথা। এসব কিছু দেখে শুনেও যদি আমিও বলি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেন যে সবাই গণভোটে 'হ্যাঁ' বলুক, তাহলে আমরা দোষটা করলাম কোথায়? আর আমাদের মধ্যে ভাগটা হলো কোথায়? আমরা তো এক হয়েই করেছি।

তিনি উল্লেখ করেন, আমরা আমাদের জায়গায় আছি, আমরা জায়গা পরিবর্তন করি নাই। আমি ধন্যবাদ জানাই জনাব সালাউদ্দিন আহমেদ সাহেবকে। উনি বলেছেন যে উনিই দাবিটা প্রথম করেছিলেনÑজনগণ কী চায় সেটা আমরা জনগণের কাছে ছেড়ে দেই। যদি বেশিরভাগ জনগণ এটা সমর্থন করে তাহলে আমরা এটা সবাই মানব। বেশিরভাগ জনগণ সমর্থন করেছে এখন এটা মানার প্রশ্ন। যদি আমরা অসাংবিধানিক বলি, আবারও বলব অতীতের অনেক গণভোট নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আমি সেদিকে যাব না। অসাংবিধানিক বা সংবিধান বহির্ভূত অনেক কাজই তো হয়ে গেছে, সবাই মিলেই তো করলাম। তো সেই জায়গায় তো আমরা কোনো আপত্তি করলাম না। কেন করলাম না? এটা দেশ এবং জনগণের জন্য প্রয়োজন ছিল। সেই জায়গায় যদি না করে এই জায়গায় তারা যদি এই শপথটা নিয়ে আজকে এই সংকট তৈরি না করতেন, এখানে এটা আলোচনারই দরকার ছিল না। এই সময় নষ্ট করার দরকার ছিল না এই মহান পার্লামেন্টের, এই মহান সংসদের।

ফ্যাসিবাদ যেন আর ফিরে না আসে: সংসদে ডা. শফিকুর রহমান

সূচনা বক্তব্যে বিরোধী দলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের ইতিহাসে বারবার জনগণের ভোটাধিকার হরণ ও হত্যা করা হয়েছে। জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তার মূল লক্ষ্যই হলো দেশে যেন আর কখনও ফ্যাসিবাদ ফিরে আসতে না পারে।

তিনি বলেন, ‘একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র যেখানে কোনও রাজতন্ত্র থাকে না, সেখানে বংশ পরম্পরায় শাসনেরও ব্যবস্থা থাকে না। জনগণের ভোটের মাধ্যমেই সরকার গঠিত হয় এবং দেশ পরিচালনা করে। কিন্তু দুঃখের বিষয়, অতীতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও বারবার জনগণের ভোটের অধিকার খর্ব করা হয়েছে, কোনও কোনও ক্ষেত্রে হত্যা করা হয়েছে।’

দেশের প্রথম নির্বাচিত সরকারের সমালোচনা করে বলেন, ‘বহুদলীয় গণতন্ত্রের কারণে যারা সুযোগ পেয়েছিলেন, তারাই বহুদলীয় গণতন্ত্রকে হত্যা করে একদলীয় বাকশাল কায়েম করেছিলেন। বাহাত্তরের সংবিধানে একদলীয় শাসনব্যবস্থা সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত হয়ে যাওয়ায় জনগণের ভোটের আর কোনও মূল্যায়ন ছিল না।’

শফিকুর রহমান বলেন, ‘সর্বশেষ ২০০৯ সালে যারা সরকার গঠন করেছিল, তারা ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালে ডামি ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখে। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছর ধরে জাতির ওপর প্রচ- দুঃশাসন চাপিয়ে দিয়ে তা-ব চালানো হয়েছে। অসংখ্য মায়ের বুক খালি হয়েছে, শিশুরা এতিম হয়েছে। অনেক লোককে গুম করা হয়েছে, যার মধ্যে ২৩৫ জন মানুষ এখনও আপনজনের কাছে ফিরে আসেননি। এই সময়ে বিচারবহির্ভূত হত্যাকা-ের শিকার হয়েছেন দুই হাজার ৬৬২ জন মানুষ, যারা ন্যূনতম বিচার পাওয়ার সুযোগ পাননি। এছাড়া রাষ্ট্রের সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করে দলীয় কর্তৃত্ব কায়েম করা হয়েছিল।’

জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর বলেন, ‘এসব অপকর্মের পরিণতি হিসেবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে তরুণ ছাত্রসমাজের দাবানল জ্বলে ওঠে, যা ৫ আগস্ট পরিণতি লাভ করে। এই জন্যই দেশের ক্যালেন্ডারে ৩৬ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই আন্দোলনে শুধু নির্দিষ্ট কোনও গোষ্ঠীর নয়, কৃষক, শ্রমিক, মেহনতি জনতা, মাঝি, মজুরÑসবাই সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। দুধের শিশু নিয়ে মা রাস্তায় নেমেছিলেন এবং চার বছরের শিশুও এই আন্দোলনে শহীদ হয়েছে।’

‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’ উত্থাপনের প্রেক্ষাপট বর্ণনা করে তিনি বলেন, ‘এত রক্তের বিনিময়ে যে আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে, তা হলো ওই ফ্যাসিবাদ যেন আর ফিরে না আসে। একটি ন্যায্যতার ভিত্তিতে, ন্যায়বিচারের ওপরে এমন একটি দেশ কায়েম হবে, যেখানে নাগরিক হিসেবে সবাই সমান অধিকার পাবে। এই আকাক্সক্ষার ভিত্তিতেই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে দীর্ঘ আলোচনার পর অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের প্রস্তাব চূড়ান্ত করেছে এবং মহামান্য রাষ্ট্রপতি এ বিষয়ে আদেশ জারি করেছেন।’

আইনমন্ত্রী

আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান বলেছেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ আইন সম্মত হয়নি। এটি কোন আইনই হয়নি। সুতরাং মানতে বাধ্য নয়। তবে আমরা জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এটি বাস্তবায়ন করবো। এজন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি করা যেতে পারে। তবে একমিটিতে বিরোধী দলীয় নেতা যে, সমান সংখ্যক সদস্যের কথা বলেছেন তা বৈষম্যমূলক। কেননা দুইতৃতীয়াংশ সদস্যদের প্রতিনিধি আর ৭৭ জনের বিরোধী দলের সদস্য সংখ্যা সমান হতে পারে না।

‘জুলাই জাতীয় সনদ’ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার)’ বাস্তবায়ন এবং রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের লক্ষ্যে জাতীয় সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল ও স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে একটি ‘সংবিধান সংশোধন বিশেষ সংসদীয় কমিটি’ গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ কমিটির মাধ্যমে আলাপ-আলোচনা ও সমঝোতার ভিত্তিতে জনপ্রত্যাশিত সংবিধান সংশোধনী বিল সংসদে উত্থাপন ও পাসের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

সংসদে বিরোধী দলীয় নেতার উত্থাপিত আলোচনার জবাব দিতে গিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আজ যে নোটিশটি বিরোধী দলীয় নেতা উত্থাপন করেছেন, তার মূল আলোচ্য বিষয় হচ্ছে– সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান প্রসঙ্গে।

প্রশ্ন উঠেছে, এই পরিষদের অধিবেশন কেন রাষ্ট্রপতি আহ্বান করলেন না? এই আদেশটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের একটি অন্তহীন প্রতারণার দলিল।

রাষ্ট্রপতির আদেশ জারির ক্ষমতা ও আইনি বৈধতা নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭৩ সালের ৭ এপ্রিলের পর রাষ্ট্রপতির আর আদেশ জারির ক্ষমতা রইল না। তারপরও রাষ্ট্রপতি আদেশ জারি করলেন কীভাবে? যেই আদেশের জন্মই বৈধ হলো না, সেই আদেশ লিগ্যাল ল্যাংগুয়েজে ‘ভয়েড অ্যাব ইনিশিও’ বা সূচনা থেকেই অবৈধ। এই আদেশটি রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশ না হওয়ার কারণে সংসদের প্রথম দিনে উপস্থাপন করা হয়নি।

গণভোট ও জুলাই জাতীয় সনদের বিষয়ে তিনি বলেন, সারা জাতির মধ্যে একটি বিভ্রান্তি সৃষ্টি করা হচ্ছে যে, বিএনপি সংস্কার চায় না বা বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ মানে না। আমরা জুলাই জাতীয় সনদের পক্ষে ছিলাম এবং আছি। এই সনদের প্রতিটি অক্ষর, শব্দ ও বাক্য আমরা ধারণ করি। কিন্তু যে আদেশটি (সংবিধান সংস্কার বাস্তবায়ন আদেশ) নিয়ে বিতর্ক হচ্ছে, সেটি আমরা মানছি না, কারণ এর কোনো আইনি ভিত্তি নেই।

গণভোটের ব্যালট নিয়ে প্রশ্ন তুলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্ন দেওয়া হয়েছিল এবং জনগণকে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছিল। এই চারটির মধ্যে তিনটি প্রশ্নের সঙ্গে জুলাই জাতীয় সনদের মিল আছে, কিন্তু একটির সঙ্গে নেই। আপনি জাতিকে এভাবে জোর করে কোনো আইন গেলাতে পারেন না।

সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্যদের শপথ গ্রহণ প্রসঙ্গে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, অস্তিত্বহীন একটি পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়ার কোনো আইনি বিধান ছিল না। প্রধান নির্বাচন কমিশনার এই শপথের ফরম সংসদে পাঠানোর এখতিয়ার রাখেন না। এটি সংবিধানের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।

রাষ্ট্র কাঠামো মেরামতের ঐতিহাসিক অঙ্গীকার প্রতিপালনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা সরকারি দল, বিরোধী দল সবাইকে নিয়ে মহান জাতীয় সংসদে সমঝোতার ভিত্তিতে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের গণতান্ত্রিক সংশোধনী আনতে চাই। তাই আমি সংসদ নেতার (প্রধানমন্ত্রী) পক্ষে প্রস্তাব রাখছি– সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী সব রাজনৈতিক দল এবং স্বতন্ত্র সদস্যদের সমন্বয়ে সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি বিশেষ সংসদীয় কমিটি গঠন করা হোক। ওই কমিটিতে সবার আলোচনার ভিত্তিতে একটি সংবিধান সংশোধনী বিল এই মহান সংসদে উত্থাপন ও গ্রহণ করা হোক।

রফিকুল ইসলাম খান

রফিকুল ইসলাম খান বলেন, এই যে ফ্যাসিবাদ থেকে আমাদের আমরা সবাই মুক্ত হয়েছি, এ কথা তো অস্বীকার করার কারোরই উপায় নেই। এবং আমরা দীর্ঘ ১৬ বছর, যদি আমরা ওয়ান-ইলেভেনের সরকার ধরি, তাহলে প্রায় ১৮ বছর। ১৮ বছর এ দেশের মানুষ ফ্যাসিবাদের কবলে ছিল, ফ্যাসিবাদের জুলুম-নির্যাতনের শিকার আমরা ছিলাম। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আজকে যিনি সংসদ নেতা, তিনিও সেই ওয়ান-ইলেভেনের সরকারের জুলুম-নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। দীর্ঘ সংগ্রামের পর যখন ফ্যাসিবাদী সরকারের প্রধানমন্ত্রী পলায়ন করে চলে গেলেন বাংলাদেশ থেকে, তখন একটি সাংবিধানিক সংকট দেশে তৈরি হয়েছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কথা সংবিধানে নাই। তাহলে সরকার গঠিত হলো কীভাবে? খুবই পরিষ্কার, জনগণের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতেই, এই আকাক্সক্ষার ভিত্তিতেই এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়েছিল। তাহলে বোঝা যায়, সব জিনিস সবসময় সংবিধান ছাড়াও চলেছে।

তিনি বলেন, আজকে যে গণভোটের ব্যাপারে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, ৭৭ সালে গণভোট হয়েছে। এরশাদের সময়েও হয়েছে। ৯১ সালেও গণভোট হয়েছে। এবং এই কোনো গণভোটের কথাই সংবিধানে ছিল না। কিন্তু গণভোট হয়েছে এবং সেই গণভোট অনুযায়ী কিন্তু আমরা দেখেছি কার্যকরও হয়েছে। কাজেই এবারও প্রায় ৭৭ ভাগ মানুষ... ৭০ ভাগ মানুষ এই জুলাই বিপ্লবের পক্ষে, সংস্কারের পক্ষে তাদের রায় দিয়েছে। সরকারি দলের একজন সদস্য বলেছেন যে ৫১ ভাগ পরিবর্তনের পক্ষে, সংশোধনীর পক্ষে মত দিয়েছে। ৫১ ভাগ শক্তিশালী না ৭০ ভাগ শক্তিশালীÑএ কথা খুব পরিষ্কার, এটা সবাই বুঝবে যে ৭০ ভাগ অনেক শক্তিশালী।

তিনি বলেন, সুপ্রিম কোর্টকে আলাদা সচিবালয়ের মধ্যে, বিচার ব্যবস্থাকে আলাদা সচিবালয়ের মধ্যে নিয়ে যাওয়া। দেখেন আজকে প্রধান বিচারপতি একজন দলীয় লোক ছিলেন খায়রুল হক। কেয়ারটেকার সরকারকে ল-ভ- করে দেওয়ার কারণেই এই ফ্যাসিবাদী সরকার দীর্ঘদিন দীর্ঘায়িত হয়েছে। সংবিধান পানি নয়, কোনো ওহি নয়। জনগণের জন্য সংবিধান, সংবিধানের জন্য জনগণ নয়। কাজেই জনগণের প্রয়োজনে সংবিধান সংস্কার করা কোনোই অসুবিধা থাকার কথা নয়।

তিনি আরো বলেন, আমার এখনও স্পষ্ট মনে আছেÑসংবিধানের কথা বলে আমাদের ওপর বিরোধী দলের ওপর যে জুলুম-নির্যাতন চালানো হয়েছে। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেনÑআমরা যদি আবার সুযোগ পাই, এই সংবিধানকে ছুঁড়ে ফেলে দেব। উনি তো বলছিলেন। তাহলে কি ওনার কথা কি একেবারেই অমূলক ছিল? শুধু তাই নয়, আমরা সবসময় লক্ষ্য করেছি, সরকারে যারাই থাকে তারা সবকিছুকে দলীয়করণ করার চেষ্টা করেন। আমরা আশা করব, এখন যারা সরকারে আছেন তারা দলীয়করণ করবেন না। যদি না-ই করেন, তাহলে আপনাদের সংস্কারের ভয় কেন? সংস্কার করতে আপনাদের অসুবিধা কী? আমরা সবাই মিলে যেটা প্রয়োজন, সবাই মিলে আমরা সংস্কার করে আমরা এই দেশটাকে একটা সুস্থ রাজনীতির দিকে নিয়ে যেতে চাই। যাতে করে আর কোনো ফ্যাসিবাদের জন্ম বাংলাদেশে না হয়, আর ফ্যাসিবাদী কোনো সরকার যেন বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ না পায়Ñএই পরিবেশটাই তো আমরা সবাই চাচ্ছি। আমার ধারণা আমরাও চাচ্ছি, সরকারি দলও চাচ্ছে।

নতুন কোনো পদধ্বনি শুনতে পারছি কি না-নুরুল ইসলাম

নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে যেভাবে সংবিধানকে উপজীব্য বানিয়ে আমাদের উপরে নিপীড়নের স্টিম রোলার চালানো হয়েছে, আমরা আবারও সংবিধানকে ঠিক সেইভাবে আমাদের জনগণের সামনে নিয়ে এসে আবারও আমরা নতুন কোনো পদধ্বনি শুনতে পারছি কি না, আজকে তা সামনে আনতে হবে। আমাদের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেনÑযেদিন এ দেশে জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন এই সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া হবে। তো আজকে কেন আমরা একই সংবিধানের প্রতি সেই ভালোবাসা আমরা দেখাচ্ছি, বুকে টেনে নিচ্ছি কেন? একটু পরেই আমি বলতে চাইব, সংবিধানের যে অংশ আমার জন্য প্রযোজ্য আমি সেটিকে মেনে নিচ্ছি, যেটি আমার জন্য প্রযোজ্য নয় আমি সেটিকে... সংবিধানকে আমরা ইগনোর করছি।

তিনি বলেন, সংবিধানের ৭২-এর ৩ অনুচ্ছেদে-সংবিধানের মেয়াদকাল হবে ৫ বছর। সংসদের মেয়াদকাল হবে ৫ বছর, সরি। আমরা ২০২৯ সালে আমাদের নির্বাচন করার কথা, আমরা ২০২৬ সালে নির্বাচন কীভাবে করলাম? তাহলে এটি সংবিধান বিরোধী, তাহলে কি আমরা বলব যে আমাদের সংবিধান অবৈধ, আমাদের নির্বাচন অবৈধ, আমাদের সরকার অবৈধ, আমাদের প্রধানমন্ত্রীসহ সার্বিক ব্যবস্থাপনাটাই কি অবৈধ বলব? তাহলে তো আমরাও সেই অবৈধ চক্রের মধ্যে আমরা আটকে যাচ্ছি। সংবিধানের ১২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ ভেঙে যাওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হওয়ার কথা ছিল। সেটা কি হয়েছে? সেটা হয় নাই। তাহলে এটি কোন সংবিধানের বলে আমরা নির্বাচন করলাম?

তিনি আরো বলেন, মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের গণভোটের কথা বলতে চাই। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৭৭ সালের ৩০শে মে তিনি রেফারেন্ডাম অর্ডিন্যান্স ১৯৭৭-এর মাধ্যমে গণভোটের আয়োজন করেছিলেন। এবং এই গণভোটকে পরবর্তীতে সংবিধানের ১৪২ (ক) অনুচ্ছেদে এটাকে সংযোজন করা হয়েছিল। এটি কোন সংবিধানের বলে করা হয়েছিল? তখন তো কোনো সংবিধান ছিল না।

তিনি বলেন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখানে আছেন। তিনি তার নির্বাচনী প্রচারণায় বলেছিলেনÑদলীয় প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার পাশাপাশি 'হ্যাঁ' ভোটের পক্ষে দয়া করে একটি ভোট দেওয়ার জন্য গণভোটকে তিনি ওন করেছিলেন। আজকে কোন কারণে গণভোটকে আমরা ওন করছি না, এটি জনগণের মনে প্রশ্ন। যে সংবিধানকে তারা আমাদের ওপরে ছুরি হিসেবে কাজে লাগিয়ে আমাদের ওপরে নির্যাতনের স্টিম রোলার চালিয়েছিলেন, আজকে সেই সংবিধান নিয়ে আমাদের এই যে মাতামাতি। আমরা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে চেতনা, যে স্পিরিট, সেটিকে প্রকৃত অর্থে যদি আমাদের ধারণ করতে হয়, তাহলে তো 'উই ওয়ান্ট জাস্টিস'কে ধারণ করতে হবে। তাহলে বৈষম্যহীন বাংলাদেশকে ধারণ করতে হবে। তাহলে প্রেসিডেন্ট এবং প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্যকে ধারণ করতে হবে। দুই টার্মের বেশি প্রধানমন্ত্রী... এটা ধারণ করতে হবে। দুইটি দল, দলীয় দায়িত্ব এবং প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব এগুলো একজন ব্যক্তির ওপরে থাকবে না সেটিকে ধারণ করতে হবে। সেই বিষয়গুলোকে ধারণ করে আমরা ফ্যাসিবাদ মুক্ত নতুন বাংলাদেশ যদি প্রতিষ্ঠা করতে চাই, তাহলে অবশ্যই জুলাই আদেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে যে গণভোট হয়েছে, সেই গণভোটকে আমাদেরকে ওন করতে হবে এবং সেই গণভোটকে কাজে পরিণত করতে হবে, মেনে নিতে হবে, এর কোনো বিকল্প নাই।

সাইফুল আলম খান মিলন আন্দালিব রহমানের অসংসদীয় বক্তব্য এক্সপাঞ্চ করার জন্য দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পার্থ সাহেব বেশকিছু বক্তব্য দিয়েছেন যা অসংসদীয়। মাননীয় স্পীকারকে অনুরোধ করবো,তার অসংসদীয় বক্তব্যগুলো এক্সপাঞ্চ করা হোক।

ছাত্র-জনতা ফ্যামিলি কার্ড নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য রক্ত দিয়েছে: সংসদে ড. মাসুদ

জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা ফ্যামিলি কার্ড বা রাস্তা সংস্কারের জন্য রক্ত দেয়নি, তারা রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য জীবন দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান সরকার বিগত সরকারের মতোই উন্নয়নের কথা বলে জুলাইয়ের সেই আকাক্সক্ষা ও ‘জুলাই সনদ’ ভুলিয়ে দিতে বসেছে বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ।

বক্তব্যের শুরুতে এক রাজা ও তার নির্বোধ উজিরের গল্প টেনে আনেন জামায়াতে ইসলামীর এই সংসদ সদস্য।

তিনি বলেন, উজিরকে কাজের তালিকা করে দিয়েছিলেন রাজা। একবার ঘোড়ায় ওঠার সময় রাজার পা রেকাবে আটকে গেলে তিনি উজিরকে সাহায্য করতে বলেন। কিন্তু উজির তার কাজের তালিকায় এই উদ্ধারের কথা লেখা না থাকায় রাজাকে সাহায্য করেননি। বর্তমান সংসদের অবস্থাও ওই উজিরের মতো। আমরা লাইনে দাঁড়ি-কমা, সেমিকোলন খুঁজছি, অথচ মূল কাজ ফেলে রেখেছি। রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় ‘নেসেসিটি নৌজ নো ল’ ( Necessity knows no law )-আমরা এই বাক্যটিকে আজ সংবিধানের ধারার মধ্যে আটকে ফেলেছি।

সরকার মূল কাজ থেকে সরে গেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, গত ১৭ বছর উন্নয়নের কথা বলে আমাদের নির্বাচনকে ভুলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। এখন আমরা দেখছি আমাদের নখের কালি শুকাতে না শুকাতেই উন্নয়নের কথা বলে আমরা আবার ‘জুলাই সনদ’টাকেই ভুলিয়ে দিতে বসেছি। আমাদের সন্তানেরা বুকে গুলিবিদ্ধ হয়ে, পা হারিয়ে, চোখ হারিয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে কি প্ল্যাকার্ডে লিখেছিল যে, আমরা একটা ফ্যামিলি কার্ডের জন্য দাঁড়িয়েছি? তারা লিখেছিলÑ ‘রাস্তা সংস্কারের কাজ নয়, রাষ্ট্র সংস্কারের কাজ চলছে’।

সংস্কারের পরিবর্তে সরকার সংশোধনীর পথে হাঁটছে জানিয়ে ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, আমরা সংস্কারের পরিবর্তে এখন সংশোধনীর দিকে যাচ্ছি। এই সংশোধনীর জন্য আমাদের তরুণ-যুবকেরা, আমাদের জনতা কাজ করেনি। সংশোধনীর জন্য তো শেখ হাসিনাও সেদিন বলেছিলেন-২৪ ঘণ্টা দরজা খোলা আছে। কিন্তু ছাত্র-জনতা সেই সংশোধন মেনে নেয়নি, তারা সংস্কার চেয়েছিল। অথচ আমরা আজ সংস্কারটা মাথায় নিতে পারছি না। ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার করার কথা থাকলেও সরকার খাল খনন, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের দিকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে বলে সংসদে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।

সরকারের ‘সবাই মিলে বাংলাদেশ’ স্লোগানের সমালোচনা করে বিরোধীদলীয় এই আইনপ্রণেতা বলেন, ১১টা সিটি কর্পোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক বদল হয়েছে। সবাই মিলে বাংলাদেশ হলে, সরকারি দলের বাইরে একজনও যোগ্য ও সৎ মানুষ কি খুঁজে পাওয়া গেল না? স্থানীয় সরকারে নির্বাচনের দিকে না গিয়ে তড়িঘড়ি করে নিজ দলীয় লোকদের প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এটা কি সবাই মিলে বাংলাদেশ?

সরকারি দলের বেঞ্চ (ট্রেজারি বেঞ্চ) থেকে জুলাই সনদের ভিত্তিতে নেওয়া শপথকে ‘অবৈধ’ বলার জবাবে ড. মাসুদ বলেন, এই অবৈধ কাজে আমাদের কারা সহযোগিতা করেছেন? এই অবৈধ প্ররোচনা আমাদের কে দিয়েছেন? জাতীয় সংসদে আমাদের কাছে কাগজ (শপথপত্র) প্লেস করেছে কে? যারা প্লেস করেছে, তাহলে তাদের তো আগে আইনের আওতায় নিয়ে আসা উচিত। আমি তো আর বাউফল থেকে সংস্কারের শপথের কাগজ পকেটে করে নিয়ে আসিনি।

নাজিবুর রহমান

নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ আইন কী না? এটা নির্ণয় করার অধিকার কার রয়েছে? সংবিধান এখানে কী বলছে? আমাদের এখানে যেটা বক্তব্য, সংবিধানের ১০২ নম্বর অনুচ্ছেদে পরিষ্কার বলা হয়েছে শুধুমাত্র হাইকোর্টের এই অধিকার রয়েছে। মাননীয় আইনমন্ত্রীর সেই অধিকার নেই। আমাদের পার্লামেন্ট, এখানে আমরা আইন বানাই, আমাদের আইন কি বিধি বহির্ভূত কি এখতিয়ার বহির্ভূত কি না, এটা বলার এখতিয়ার নেই। এটা এখতিয়ার রয়েছে শুধুমাত্র হাইকোর্টর।

তিনি বলেন. সেটা হলো জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণের কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার, যেই পাওয়ারের আলোকে রাষ্ট্রপতিকে আদেশ দেওয়ার ক্ষমতা দেওয়া হয়। ১৩তম সংশোধনীর মামলায় যে কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার, জনগণের সাংবিধানিক অধিকারের বিষয়ে নিশ্চিত করা হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারকে আজকে পরিষ্কার করতে হবে জুলাইকে তারা বিপ্লব হিসেবে স্বীকার করে কিনা। জুলাই যদি বিপ্লব হয়, যেভাবে ১৩তম সংশোধনীতে কেয়ারটেকার গভমেন্টের আন্দোলনের সময় জনগণের অভিপ্রায়কে কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার ট্রিগার করেছিল বলে আদালত রায় দিয়েছে, একইভাবে জুলাইয়ের বিপ্লবের মাধ্যমেও জনগণের কনস্টিটিউয়েন্ট পাওয়ার ট্রিগার হয়েছিল বলেও মেনে নিতে হবে।

তিনি আরো বলেন, জুলাইয়ের সনদ বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংশোধন প্রয়োজন নাকি সংস্কার প্রয়োজন? এক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হলো বাংলাদেশে বিদ্যমান সাংবিধানিক যে আইন রয়েছে, যে ডকট্রিন অফ বেসিক ফিচার যেটা অষ্টম সংশোধনীর মামলায় আমাদের দেশে ইন্ট্রোডিউস করা হয়েছিল এবং পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে যেটা আরও বেশি এস্টাবলিশড হয়েছে, সেটার আলোকে যে ধরনের সংস্কার আমরা চাচ্ছি জুলাইয়ের সনদের মাধ্যমে, সেই সংস্কার সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে সম্ভব নয়, এজন্য প্রয়োজন সংবিধান সংস্কার।

রাষ্ট্রপতির আদেশ আইন কি না। যেটা আমি বলতে চাই ১৫২ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে আদেশ অবশ্যই আইন। এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে তিনটি অবস্থান আমরা লক্ষ্য করছি। আইনমন্ত্রী ২৯শে মার্চ তিনি তার বক্তব্য... যদি উনি মনে করতেন এটা আইন কিন্তু বৈধ আইন নয়। মাননীয় অ্যাটর্নি জেনারেল, তিনি তখন অ্যাটর্নি জেনারেল হননি, ১৮ই মার্চ একটি কলাম লিখে বলেছেনÑআদেশ যে আইনের অন্তর্ভুক্ত সে কথা অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই।

তিনি আরো বলেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১৫ই মার্চ এই সংসদে দাঁড়িয়ে বলেছেন-এটি না অধ্যাদেশ, না আইন, মাঝামাঝি একটি জিনিস। এ বিষয়ে আমি সংক্ষেপে যেটা বলতে চাই-এই আইনের বৈধতা নিয়ে একটি মামলা হয়েছে হাইকোর্টে, সেই মামলায় রুল জারি হয়েছে। একটি মামলায় যখন রুল জারি হয়, কোর্ট তখন প্রকারান্তরে ডিক্লেয়ার করেন প্রিফেসিয়ে এটা প্রুভড হয়েছে এটি ল । কারণ যদি ল না হতো তাহলে এটাকে চ্যালেঞ্জ করে রিট করার কোনো সুযোগ নেই। কোর্ট যখন এটাকে ল বলে স্বীকার করে নিয়েছেন, আমাদের সংসদ, আমাদের আইনমন্ত্রী, আমাদের কারো পক্ষে কি সেটাকে আইন হিসেবে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ আছে কি না? এখানে রুল জারি হয়েছে, স্টে হয়নি। যদি স্টে না হয়, সংবিধানের যে বাইবেল মনে করা হয় সেই মাহমুদুল ইসলামের বই 'কনস্টিটিউশনাল ল অফ বাংলাদেশ'-এ এখানে পরিষ্কার বলা হয়েছেÑযদি কোথাও রুল জারি করা হয় কিন্তু স্টে না করা হয়, এটাকে স্টিল কনসিডার করা হবে ইন্ট্রা-ভায়ার্স নট আল্ট্রা-ভায়ার্স। আল্ট্রা-ভায়ার্স হলো আইন বহির্ভূত আর ইন্ট্রা-ভায়ার্স হলো আইন সম্মত। সুতরাং এটা মানতে আমরা সবাই বাধ্য। এই আদেশের দশম অনুচ্ছেদ এবং ১২ অনুচ্ছেদকে লঙ্ঘন করে সরকার এবং রাষ্ট্রপতি এই আইনের ব্যত্যয় ঘটিয়েছেন, আইনের শাসনের এখানে ব্যত্যয় ঘটেছে।

তিনি আরো বলেন, রাষ্ট্রপতির আদেশ দেওয়ার এখতিয়ার আছে কি না। এটাকে এখতিয়ার দিল কীভাবে দিল? এক্ষেত্রে এই সংসদে বলা হয়েছেÑজনগণের আবেগ দিয়ে রাষ্ট্র চলে না, রাষ্ট্র চলে সংবিধান দিয়ে। সংবিধান অনুযায়ী জনগণের আবেগ হলো সংবিধানের বাবা। এটা আমার কথা না, সংবিধানের সপ্তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছেÑজনগণের পরম অভিপ্রায় রূপে এই সংবিধানই দেশের সর্বোচ্চ আইন, প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ আইন। এই নিয়ে যে মামলাটি হয়েছে ১৩তম সংশোধনীর মামলা, সেখানে তৎকালীন অ্যাটর্নি জেনারেল আজকের আইনমন্ত্রী বলেছিলেনÑজনগণের সাংবিধানিক ক্ষমতা কখনো পরিত্যক্ত হয় না, আর এর অবস্থান সংবিধানের উপরে। সেই মামলায় কোর্ট রায় দিয়েছিল-এই যে সংবিধানের উপরে জনগণের সাংবিধানিক ক্ষমতা আছে, এটাকে কোর্টেও চ্যালেঞ্জ করা যাবে না, এটা বিয়ন্ড চ্যালেঞ্জ।

আন্দালিব রহমান পার্থ

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘জুলাই নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই, আমাদের সমস্যা হচ্ছে প্রক্রিয়া নিয়ে। আপনারা যদি সংবিধান ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে বানাতে চাইতেন, তবে সেই সময় রেভল্যুশনারি (বিপ্লবী) বা ট্রানজিশনাল সরকার করলেন না কেন? একটি সাধারণ সরকারে থেকে, পুরোনো সংবিধানে থেকে আপনারা সংবিধান বাতিল করতে চাচ্ছেনÑ এটা আসলে হয় না।

যৌক্তিক প্রশ্ন তুললেই ‘জুলাইয়ের বিপক্ষের শক্তি’ বানানোর চেষ্টা হয় অভিযোগ তুলে এর সমালোচনা করেন পার্থ। তিনি বলেন, ‘কেউ কথা বললেই তাকে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর একটা পাঁয়তারা দেখতে পাচ্ছি। এটা আমাকে আওয়ামী লীগ সরকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন আমরা তেলের দাম নিয়ে কথা বললেও বলা হতোÑ ওরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না। এখন আমি সেই একই আচরণ দেখতে পাচ্ছি।’

আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ক্রিকেটীয় ভাষায় আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘শোনেন, আপনারা শেষ ৬ বলে ১২ রান করেছেন, কিন্তু এর আগের ৩০০ রান আমরা সবাই মিলে করেছি। সুতরাং আপনারা এমন কথা বলবেন না যাতে দেশবাসী বিভ্রান্ত হয়, যেন জুলাইয়ে আমাদের কোনো কন্ট্রিবিউশনই নাই! ১৭ বছর আমরা কষ্ট করেছি, জেলে গিয়েছি। যেদিন আবু সাঈদ শহীদ হয়েছিল, সেদিন চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরামও কিন্তু শহীদ হয়েছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণভোটের কারিগরি দিক নিয়েও সংসদে প্রশ্ন তোলেন পার্থ। তিনি বলেন, ‘আপনারা গণভোটে চারটি বিষয় দিয়েছেন। কিন্তু কোনো ভোটার যদি একটি বিষয়ে একমত না হয়, তবে সে কী করবে? হ্যাঁ-তে ভোট দেবে নাকি না-তে? আপনারা তো ভোটারদের বাধ্য করেছেন। সনদের বাকি বিষয়গুলো কেন গণভোটে দিলেন না?’

জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বক্তব্যের শেষে পার্থ বলেন, ‘সংবিধানের ওপর আমাদের শ্রদ্ধা থাকতে হবে, একইসঙ্গে জুলাইয়ের স্পিরিটকেও তুলে ধরতে হবে। আমরা সবাই মিলে বসে আলাপ করি। কিন্তু কোনো সদস্যের বক্তব্যে যেন জুলাইকে আন্ডারমাইন করা না হয়। আসুন আমরা পজিটিভ কিছু নিয়ে আসি। তবে কেউ যদি জুলাইয়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে চান, তারা কোনোদিন সফল হবেন না।’

‘উনি ক্লাস এইট-নাইন লেভেলের ডিবেট করেছেন’- আবুল হাসনাত

যারা বিদ্যমান সংবিধান ছুড়ে ফেলতে চান, তাদের ‘স্বাধীনতাবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য মো. আবুল হাসনাত (হাসনাত আব্দুল্লাহ)। তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেছেন, আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াও বলেছিলেনÑজনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হলে এই সংবিধান ছুড়ে ফেলা হবে। যারা আজ সংসদে সংবিধান রক্ষার দোহাই দিয়ে টেবিল চাপড়াচ্ছেন, তারা কি এর মাধ্যমে বেগম জিয়াকেই অপমান করলেন না?

এর আগে ক্ষমতাসীন বিএনপির জোট শরিক বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপির চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ তার বক্তব্যে সংবিধান ছুড়ে ফেলার সমর্থকদের কড়া সমালোচনা করেন, যার প্রেক্ষিতে হাসনাত আব্দুল্লাহ এই পাল্টা বক্তব্য দেন।

বক্তব্যের শুরুতে হাসনাত আব্দুল্লাহ বলেন, ‘কিছুক্ষণ আগে মাননীয় সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থ যখন বক্তব্য দিচ্ছিলেন, উনি সংবিধান যারা ছুড়ে ফেলতে চায় তাদের স্বাধীনতাবিরোধীদের সঙ্গে অ্যালাইন (চিহ্নিত) করলেন। আর ট্রেজারি বেঞ্চের (সরকারি দলের বেঞ্চ) মাননীয় মন্ত্রীরা সেটাতে টেবিল চাপড়ে সমর্থন দিলেন। কিন্তু গণতন্ত্রের জন্য আপসহীন লড়াই করা বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেনÑ যেদিন জনতার সরকার প্রতিষ্ঠিত হবে, সেদিন এই সংবিধানকে ছুড়ে ফেলা হবে। ট্রেজারি বেঞ্চের অনেক মন্ত্রী সারাজীবন বেগম জিয়ার সাথে রাজনীতি করেছেন। আজ যখন তারা সংবিধান ছুড়ে ফেলার বিপক্ষে হাততালি দিচ্ছেন, তখন কি তারা বেগম জিয়াকে অপমান করছেন না? এটা তারা ভেবে দেখবেন।’

আন্দালিব রহমান পার্থের বক্তব্যের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘উনি ক্লাস এইট-নাইন লেভেলের ডিবেট করেছেন। উনি বলেছেন ৭২-এর সংবিধানের কিছু বিষয় মেনেছেন, কিছু মানেননি। অর্থাৎ কেবল ওই অংশটুকুই মানছেন যা উনাদের পক্ষে যায়। যারা এই ধরনের প্রকৃতিসম্পন্ন, তারা মূলত সুবিধাবাদী। কখনো সাংবিধানিক, কখনো অসাংবিধানিকÑ এমন দ্বিমুখী নীতি চলে না।’

সংবিধানের আইনি জটিলতা তুলে ধরে হাসনাত আব্দুল্লাহ প্রশ্ন তোলেন, ‘যদি আমরা এই সংবিধানকে আক্ষরিকভাবে মেনে চলি, তবে বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের বৈধতাই তো প্রশ্নবিদ্ধ হয়। চব্বিশের ৬ আগস্ট অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। সংবিধান অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে তাকে নিয়োগ দেওয়ার কথা। সেদিন কোন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল, তা অ্যাটর্নি জেনারেল জানাবেন কি? তখনকার প্রধান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান তখন কোথায় ছিলেন?’

বেগম জিয়ার কারামুক্তির প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘এই সংবিধানকে যদি বাইবেল বা গসপেল ধরে নেই এবং ভ্যাটিকান সিটির মতো দেশ চালাতে চাই, তবে ৬ আগস্ট বেগম জিয়া জেল থেকে বের হতে পারতেন না। তিনি জেল থেকে বের হয়েছিলেন ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ও জনরায়ের ভিত্তিতে, বিদ্যমান সংবিধানের ভিত্তিতে নয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘গাং পার হইলে মাঝি কোন দুলাভাইÑ এমন আচরণ করবেন না। গত ১৭ বছর আপনাদের নেতা-কর্মীরা ধানক্ষেতে ঘুমিয়েছে, মহাসচিব কান্নাকাটি করেছেন। ফ্যাসিবাদবিরোধী সব রাজনৈতিক দলের রক্ত, শ্রম ও ঘামের বিনিময়ে হাসিনার পতন হয়েছে। এই জনরায় কোনো কিতাবের কাছে মাথা নত করবে না।’

সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে হাসনাত বলেন, ‘দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষ এই সংবিধানের কাঠামোগত পরিবর্তনের পক্ষে রায় দিয়েছে। আন্দালিব রহমান পার্থ সাহেব বলেছেনÑঅর্ডারে নাকি সংস্কার পরিষদের কথা নেই। উনি যদি একটু পরিশ্রম করে একটা পাতা উল্টাতেন, তবেই দেখতে পেতেনÑসেখানে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের কথা স্পষ্ট বলা আছে।’

প্রধানমন্ত্রী ‘হ্যাঁ’ ভোট চেয়ে কেন গণভোটের রায় মানতে চাইছেন না: সংসদে আখতার

অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে যে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ঐকমত্য হয়েছিল, ক্ষমতায় গিয়ে বর্তমান সরকার তা ভুলে গেছে বলে অভিযোগ করেছেন বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্য আখতার হোসেন। একইসঙ্গে জনগণের ম্যান্ডেট বা গণভোটের রায়কে অস্বীকার করা অসাংবিধানিক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

বিরোধী দলের পক্ষ থেকে এ প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য রাখতে গিয়ে আখতার হোসেন বলেন, ৫ আগস্ট থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত দেশে কোনো সরকার ছিল না। ওই সময় কোন সংবিধানের বলে অ্যাটর্নি জেনারেল নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল? অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শপথ নিয়েছিল, যার কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি ছিল না। ৬ তারিখে সংসদ ভেঙে দেওয়ারও কোনো সাংবিধানিক ফরমুলা ছিল না। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাজারো মানুষের রক্তের বিনিময়ে জনগণের যে অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছিল, তার ভিত্তিতেই রাষ্ট্র কাঠামো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল, যাতে ফ্যাসিবাদ আর ফিরে না আসে।

সরকারি দলের মন্ত্রীদের অতীত অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করে বিরোধী দলীয় এই এমপি বলেন, রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য যে ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়েছিল, সেখানে ৩০টিরও বেশি রাজনৈতিক দল দিনের পর দিন আলোচনা করেছে।

আজ সরকারি দলের বেঞ্চে বসে থাকা মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, জোনায়েদ সাকি, নুরুল হক নুররা সেই ঐকমত্য কমিশনে উপস্থিত ছিলেন। সেখানে জুলাই সনদ বাস্তবায়নের ব্যাপারে সবার মধ্যে আলোচনা হয়েছিল। অথচ আজ সংসদে এসে তারা সেই কথা কীভাবে ভুলে গেলেন?

গণভোটের রায় বাস্তবায়নে সরকারের অনীহার বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, ৫ অক্টোবর বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছিলেন, গণভোটে জনগণের তরফ থেকে যে রায় আসবে, সংসদের প্রত্যেক সদস্যকে তা মানতে হবে। আজ তিনি সেই অবস্থান থেকে সরে গেছেন কেন? স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ৩০ জানুয়ারি রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের জন্মভূমিতে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, দয়া করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিন।

বর্তমান আইনমন্ত্রীর সমালোচনা করে আখতার হোসেন বলেন, আইনমন্ত্রী সংবিধান সংস্কার আদেশের এক্সপার্ট প্যানেলের সদস্য ছিলেন। তিনি নিজেই পরামর্শ দিয়েছিলেন কীভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হবে। আর আজ আইনমন্ত্রী হয়ে তিনি সবকিছু বেমালুম ভুলে গেছেন। তারা হবস, লক আর রুশো পড়ার কথা বলেন কিন্তু নৈতিকতার পাঠ ভুলে গেছেন। ‘আদেশ কোনো আইন নয়’ সরকারি দলের এমন যুক্তির খ-ন করে তিনি বলেন, বলা হচ্ছে আদেশ নাকি আইন নয়। অথচ সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে স্পষ্ট বলা আছে, একটি আদেশও আইন হতে পারে। জনগণ গণভোটের মাধ্যমে যে আদেশের পক্ষে রায় দিয়েছে, তাকে অসাংবিধানিক বলা এই সংসদকে কলঙ্কিত করার শামিল।

সরকারি দলের উদ্দেশ্যে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে আখতার হোসেন বলেন, অধ্যাদেশ নিয়ে টালবাহানা করলে জনগণ আপনাদের ছাড় দেবে না। সরকার দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে। এখানে আইনগত কোনো বাধ্যবাধকতার বিষয় নেই, এটা সদিচ্ছার বিষয়। আপনারা সদিচ্ছা দেখালে এবং গণভোটের রায় মেনে নিলে আর কোনো প্রশ্ন উঠবে না।

আন্দালিব রহমান পার্থ

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘জুলাই নিয়ে আমাদের কোনো সমস্যা নেই, আমাদের সমস্যা হচ্ছে প্রক্রিয়া নিয়ে। আপনারা যদি সংবিধান ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে বানাতে চাইতেন, তবে সেই সময় রেভল্যুশনারি (বিপ্লবী) বা ট্রানজিশনাল সরকার করলেন না কেন? একটি সাধারণ সরকারে থেকে, পুরোনো সংবিধানে থেকে আপনারা সংবিধান বাতিল করতে চাচ্ছেনÑ এটা আসলে হয় না।

যৌক্তিক প্রশ্ন তুললেই ‘জুলাইয়ের বিপক্ষের শক্তি’ বানানোর চেষ্টা হয় অভিযোগ তুলে এর সমালোচনা করেন পার্থ। তিনি বলেন, ‘কেউ কথা বললেই তাকে জুলাইয়ের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর একটা পাঁয়তারা দেখতে পাচ্ছি। এটা আমাকে আওয়ামী লীগ সরকারের কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন আমরা তেলের দাম নিয়ে কথা বললেও বলা হতোÑ ওরা যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চায় না। এখন আমি সেই একই আচরণ দেখতে পাচ্ছি।’

আন্দোলনে রাজনৈতিক দলগুলোর ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ক্রিকেটীয় ভাষায় আন্দালিব রহমান পার্থ বলেন, ‘শোনেন, আপনারা শেষ ৬ বলে ১২ রান করেছেন, কিন্তু এর আগের ৩০০ রান আমরা সবাই মিলে করেছি। সুতরাং আপনারা এমন কথা বলবেন না যাতে দেশবাসী বিভ্রান্ত হয়, যেন জুলাইয়ে আমাদের কোনো কন্ট্রিবিউশনই নাই! ১৭ বছর আমরা কষ্ট করেছি, জেলে গিয়েছি। যেদিন আবু সাঈদ শহীদ হয়েছিল, সেদিন চট্টগ্রামের ওয়াসিম আকরামও কিন্তু শহীদ হয়েছে।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণভোটের কারিগরি দিক নিয়েও সংসদে প্রশ্ন তোলেন পার্থ। তিনি বলেন, ‘আপনারা গণভোটে চারটি বিষয় দিয়েছেন। কিন্তু কোনো ভোটার যদি একটি বিষয়ে একমত না হয়, তবে সে কী করবে? হ্যাঁ-তে ভোট দেবে নাকি না-তে? আপনারা তো ভোটারদের বাধ্য করেছেন। সনদের বাকি বিষয়গুলো কেন গণভোটে দিলেন না?’

জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়ে বক্তব্যের শেষে পার্থ বলেন, ‘সংবিধানের ওপর আমাদের শ্রদ্ধা থাকতে হবে, একইসঙ্গে জুলাইয়ের স্পিরিটকেও তুলে ধরতে হবে।