নির্বাচন ডেস্ক : দরজায় কড়া নাড়ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ইতোমধ্যে দেশের বড় দুটি দল তাদের নির্বাচনি ইশতেহার প্রকাশ করেছে। ভোটারদের মন জয়ে নিজেদের ইশতেহারকে আকর্ষণীয় করার চেষ্টা করেছে দুই দলই। উভয়ই নিজেদের ইশতেহারে শিক্ষা খাতকে বেশ গুরুত্বসহকারে তুলে ধরেছে।

শিক্ষার মানোন্নয়ন, অবকাঠামো সংস্কার এবং শিক্ষার্থীদের আর্থিক সুরক্ষা প্রদানের ক্ষেত্রে দল দুটির মধ্যে যেমন অভিন্ন লক্ষ্য দেখা গেছে, তেমনি বাস্তবায়নের কৌশলে পরিলক্ষিত হয়েছে কিছু মৌলিক পার্থক্য। বিএনপি যেখানে ‘আনন্দময় শিক্ষার’ ওপর জোর দিয়েছে, জামায়াত সেখানে ‘নৈতিক শিক্ষা’ ও ‘স্থায়ী শিক্ষা কমিশন’ গঠনের মাধ্যমে আমূল পরিবর্তনের কথা বলছে। শিক্ষাখাতে বাজেট বরাদ্দে দুই দলের ইশতেহার প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছে। জামায়াত শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; অন্যদিকে বিএনপি বলেছে ৫ শতাংশ বরাদ্দের কথা। শিক্ষার্থীদের আর্থিক সুরক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন শিক্ষা সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে দুই দলই।

বিএনপি স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত ছেলেদের এবং স্নাতকোত্তর পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি বিনামূল্যে স্কুল ড্রেস এবং শিক্ষা উপবৃত্তি কার্যক্রম সম্প্রসারণের কথা বলেছে।

জামায়াত আরও এক ধাপ এগিয়ে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের মাসিক ৩,০০০ টাকা সহায়তা এবং ১ লাখ মেধাবী শিক্ষার্থীকে মাসে ১০,০০০ টাকা করে ৫ বছর মেয়াদী 'করজে হাসানা' বা সুদমুক্ত ঋণের প্রস্তাব দিয়েছে। এমনকি বিদেশে উচ্চশিক্ষায় আর্থিকভাবে অস্বচ্ছলদের প্রথম দুই সেমিস্টারের ফি সরকার থেকে প্রদানের কথাও বলেছে তারা। মাদ্রাসা ও ধর্মীয় শিক্ষা ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয় ও আধুনিকায়নে দুটি দলই গুরুত্বারোপ করেছে। তবে ধর্মীয় শিক্ষার বিষয়ে জামায়াতের উদ্যোগ তুলনামূলক ভাবে বিএনপির চাইতে বেশি। জামায়াত কওমি মাদ্রাসার স্বকীয়তা বজায় রেখে সিলেবাস পরিমার্জন এবং ইবতেদায়ি মাদ্রাসাগুলোকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মর্যাদা দেওয়ার অঙ্গীকার করেছে। আলেমদের পরামর্শে একটি 'হোলিস্টিক এডুকেশন' বা সমন্বিত নীতিমালার কথা বলেছে তারা। বিএনপি প্রাক-প্রাথমিক থেকেই ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধ শিক্ষার গুরুত্ব দিয়েছে। তবে তাদের ইশতেহারে স্বতন্ত্রভাবে মাদ্রাসা শিক্ষার চেয়ে সামগ্রিক জাতীয় শিক্ষায় নৈতিকতার সম্মিলনের ওপর বেশি জোর দেখা গেছে।

কর্মমুখী শিক্ষা ও ভাষা জ্ঞান বেকারত্ব দূরীকরণে উভয় দলই কারিগরি শিক্ষাকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। বেকার যুবকদের দক্ষ জনশক্তি রূপান্তর করা দুই দলেরই প্রধান উদ্দেশ্য। সেই সাথে তৃতীয় কোন ভাষায় যুবকদের দীক্ষিত করাও তাদের উদ্দেশ্য। মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই কারিগরি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করার কথা বলেছে বিএনপি। বৈশ্বিক বাজারে টিকে থাকতে ইংরেজি ও আরবির পাশাপাশি জাপানিজ, কোরিয়ান ও ইতালিয়ান ভাষাকে ‘তৃতীয় ভাষা’ হিসেবে চালুর ঘোষণা দিয়েছে দলটি।

জামায়াত উচ্চশিক্ষাকে চাকরিমুখী করতে স্নাতক পর্যায়ের কোর্স পরিবর্তনের কথা বলেছে। কর্মমুখী কোর্স চালুর করা আশ্বাস দিয়েছে জামায়াত। এছাড়া বিদেশগামীদের জন্য বিনামূল্যে ভাষা শিক্ষা এবং প্রতিটি ইন্টার্নশিপের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সুযোগ নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইংরেজি ও আরবিসহ বহুল ব্যবহৃত ভাষাগুলো শিক্ষায় জোর দিয়েছে দলটি।

বিএনপি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই জোন তৈরি এবং বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়কে করমুক্ত করার আশ্বাস দিয়েছে। 'লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস' বা আনন্দময় শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের চাপ কমানোর কথা বলেছে দলটি।

জামায়াতের কাঠামোগত সংস্কার: জামায়াত একটি ‘স্থায়ী শিক্ষা কমিশন’গঠনের মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদী সংস্কার চায়। তারা শিক্ষকদের জন্য আলাদা বেতন কাঠামোর প্রস্তাব করেছে। শিক্ষার্থীদের মূলত কর্মমুখী করাই তাদের লক্ষ্য, যাতে কাউকে স্নাতক শেষ করে বেকার বসে থাকতে না হয়। নারী শিক্ষা ও সুরক্ষা নারী শিক্ষার প্রসারে দল দুটির মধ্যে ইতিবাচক প্রতিযোগিতা লক্ষ্য করা গেছে। ইডেন, বদরুন্নেসা ও হোম ইকোনমিকস কলেজকে একীভূত করে বিশ্বের সর্ববৃহৎ ‘নারী বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠার চমকপ্রদ প্রস্তাব দিয়েছে জামায়াত। সেই সাথে নারী শিক্ষার্থীদের মাতৃত্বকালীন সুবিধার কথাও উল্লেখ করেছে। বিএনপি মেয়েদের জন্য মাস্টার্স পর্যন্ত অবৈতনিক শিক্ষা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারী শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ভেন্ডিং মেশিন স্থাপনের মতো আধুনিক উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। রাজনীতি ও পরিবেশ উভয় দলই ছাত্ররাজনীতির বর্তমান ধারার পরিবর্তন চায়। বিএনপি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে সন্ত্রাসমুক্ত করার কথা বললেও জামায়াত স্পষ্টভাবে ‘দলীয় লেজুড়বৃত্তিক ছাত্ররাজনীতির পরিবর্তে ‘ছাত্র সংসদ’ ভিত্তিক রাজনীতির কথা বলেছে।

দীর্ঘ ১৭ বছর পর এই নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের আগ্রহের কমতি নেই। ইশতেহার প্রকাশের পর দুই দলের ইশতেহারই গুরুত্বের সাথে দেখছেন শিক্ষার্থীরা। বিশেষ করে জামায়াতের ‘করজে হাসানা’ প্রজেক্ট ও বিদেশে উচ্চশিক্ষায় ফি প্রদানের প্রস্তাবটি প্রশংসিত হচ্ছে। এ বিষয়ে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী রাব্বি হাসান বলেন, ব্যক্তিগতভাবে জামায়াতের ‘করজে হাসানা’ প্রজেক্টটি আমার দারুণ লেগেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে অনেক শিক্ষার্থীকে নিজের খরচ চালাতে হিমশিম খেতে হয়। সহজে ঋণ পাওয়া গেলে সেটি দারুণ হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সামিহা রহমান বলেন, দুই দলই শিক্ষার মানোন্নয়নে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। শিক্ষাখাতে দুর্নীতি বন্ধে জামায়াত এবং আধুনিকায়নে বিএনপি গুরুত্ব দিয়েছে। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, আমরা আশা করব তারা যেন নিজেদের ইশতেহার বাস্তবায়নের পাশাপাশি অন্য দলের ভালো প্রস্তাবগুলোও বিবেচনায় নেয়।