আগামী সপ্তাহেই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট। দীর্ঘদিন পর দেশবাসী একটা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দেয়ার সুযোগ পেলেও প্রচার-প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বেড়ে চলেছে সংঘাত-সহিংসতা। এরই মধ্যে সারা দেশে প্রায় দেড়শ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে, নিহত হয়েছেন পাঁচজন। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন সহ¯্রাধিক। নেতাকর্মীদের মারমুখী আচরণে নির্বাচনী প্রচারণা ক্রমেই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে। এটিকে সষ্ঠু–-নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য এক বড় অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, জুলাই গণ অভূত্থানের পর নতুন প্রত্যাশার বিপরীত পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

সূত্রমতে, প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণায় মেতে উঠেছেন। কিন্তু পরিতাপের বিষয়, প্রচার-প্রচারণাকে কেন্দ্র করে বেড়ে চলেছে সংঘাত-সহিংসতা। সামনের দিনগুলোয় সহিংসতা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। তারা বলছেন, নির্বাচনী সহিংসতা বাড়তে থাকলে তৃতীয় পক্ষ এর সুযোগ নিবে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনের সময় প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলো নিজেদের ইশতেহার প্রচার করার পাশাপাশি প্রতিপক্ষের যুক্তি খ-ন করার প্রয়াস পেয়ে থাকে। এটা গণতান্ত্রিক রীতির মধ্যেই পড়ে। কিন্তু প্রতিপক্ষের সঙ্গে দা-কুড়োল সম্পর্ক কোনোভাবেই মঙ্গল বয়ে আনতে পারে না।

সূত্র মতে, নির্বাচন ঘিরে ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে বিএনপি। তবে ভোটের লড়াইয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীরা। তথ্য অনুযায়ী ৭৯টি আসনে বিএনপির ৯২ জন নেতা স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনী মাঠে সক্রিয় রয়েছেন। প্রত্যেক আসনে সংকট তৈরি হয়েছে বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়ে। শরিকদের ছেড়ে দেওয়া প্রায় প্রতিটি আসনেই বিএনপির প্রভাবশালী স্থানীয় নেতারা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করছেন।

সূত্র মতে, ঢাকা-৭ আসনে দলীয় প্রার্থী হামিদুর রহমানের বিপরীতে লড়ছেন যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক ইসহাক সরকার। ঢাকা-১২তে এখানে জোটের প্রার্থী বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক। তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে আছেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক সাইফুল আলম নীরব। ঢাকা-১৪তে সানজিদা ইসলাম তুলিকে মনোনয়ন দিলেও সেখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন বহিষ্কৃত নেতা সৈয়দ আবু বকর সিদ্দিক সাজু। নারায়ণগঞ্জ- ১ আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মোস্তাফিজুর রহমান ভুঁইয়া। তার বিপরীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন কেন্দ্রীয় যুবদলের সাবেক সহ-সম্পাদক মোহাম্মদ দুলাল হোসেন। নারায়ণগঞ্জ-২ এ ঢাকা বিভাগীয় বিএনপির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম এই আসনে বিএনপির প্রার্থী। তার বিরুদ্ধে নির্বাচন করছেন তিনবারের সংসদ সদস্য ও জেলা বিএনপির সাবেক আহ্বায়ক কমিটির সদস্য আতাউর রহমান খান আঙ্গুর। এরকম শতাধিক আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছে বিএনপি। দলের পক্ষ থেকে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থার প্রক্রিয়া চলমান থাকলেও নির্বাচনের আগ মুহূর্তে এই অভ্যন্তরীণ কোন্দল যে আরও বাড়বে সেটা স্পষ্ট হচ্ছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান বলেন, শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে এখন পর্যন্ত প্রায় ৯০ জন নেতাকে বহিষ্কার করা হয়েছে এবং এই প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। তবে বিএনপির উপদেষ্টা মাহাদী আমিনের মতে, বিদ্রোহীরাও দলের অনেক ত্যাগী নেতা। তাদের বুঝিয়ে মাঠ থেকে সরানোর চেষ্টা করা হলেও অনেকে সাড়া দেননি।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, শতাধিক বিদ্রোহী প্রার্থীর উপস্থিতি ভোটের মাঠে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষ করে নির্বাচনী প্রচারণায় নিজ দলের মধ্যকার সহিংসতা ক্রমশ মারাত্বক রূপ নিচ্ছে। এসব সহিংসতা থেকে সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নারীরাও রেহাই পাচ্ছে না। এই পরিস্থিতি সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায় বলে মত রাজনীতিকদের।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আল মাসুদ হাসানুজ্জামান গণমাধ্যমে বলেন, নির্বাচনী প্রক্রিয়ার জন্য এসব ঘটনা খুবই উদ্বেগজনক ও নেতিবাচক দৃষ্টান্ত। প্রতিপক্ষ প্রার্থীদের মধ্যে সংগঠিত সহিংসতা, সন্ত্রাস ও আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার নতুন প্রত্যাশার বিপরীত বরং পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এতে সুষ্ঠু নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি মনে করেন, সংশ্লিষ্ট দলগুলোর উচিত পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিশীল থেকে শান্তিপূর্ণভাবে প্রচারণা চালানো। কারণ এ ধরনের সহিংসতায় ভোটারদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয় এবং তারা স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবে কি না তা নিয়ে শঙ্কায় পড়ে।

এদিকে বিদ্রোহী পার্থীদের পাশাপাশি অন্য রাজনৈতিক দলের প্রার্থীদের মধ্যে সংঘাত সহিংসতা বাড়ছে। গত ২২ জানুয়ারি থেকে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু হওয়ার পর এ পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থানে ৪০ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এসব হামলার অধিকাংশই বিএনপির নেতাকর্মীরা করছে বলে অভিযোগ করছে প্রতিপক্ষরা। এমন পরিস্থিতি প্রতিরোধে প্রশাসনের নিরপেক্ষতা এবং দায়িত্বশীলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে কয়েকটি দল। যদিও এ বিষয়ে ইসি সূত্র জানিয়েছেন, সংঘাত ঠেকাতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করছে তারা।

জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক ও ঢাকা-১১ আসনের প্রার্থী নাহিদ ইসলাম অভিযোগ করেছেন, বিএনপির কর্মীরা তাদের ব্যানার-পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে এবং সমর্থকদের হুমকি দিচ্ছে। আমার বাংলাদেশ পার্টির (এবি পার্টি) চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু অভিযোগ করেন, বরিশাল, ফেনীসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের নেতা-কর্মীদের প্রচারে বাধা দেওয়া হচ্ছে, যা অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের অন্তরায়। এ বিষয়ে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা দৃশ্যত নিষ্ক্রিয় ও হতাশাজনক। এ ছাড়া তাদের প্রার্থীদের ওপর হামলার পরও স্থানীয় প্রশাসন কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মাঠপর্যায়ে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করতে প্রশাসনের দৃঢ় অবস্থানের ঘাটতি রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মাহমুদুল হাসান বলেন, নির্বাচন যত এগোয়, মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতা তত তীব্র হয়। এ সময় আচরণবিধি লঙ্ঘন বা প্রতিপক্ষকে ভীত করার ঘটনা বাড়লে নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। আইন শৃঙাখলা বাহিনী ও কমিশনের উচিত এসব অভিযোগ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া, যাতে সব দল সমান সুযোগ পায়।

এদিকে ভোটের দিন যত এগিয়ে আসছে, রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যের ভাষা ততই আক্রমণাত্মক হয়ে উঠছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এই উত্তেজনা শুধু কথার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে না। হামলা, পাল্টা ধাওয়া এবং প্রার্থীদের ওপর ডিম নিক্ষেপ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে যে সংযম, সহনশীলতা ও দায়িত্বশীল আচরণের প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তবে প্রতিফলিত হচ্ছে না।

নির্বাচন ঘিরে মাঠের পরিস্থিতি অসহিষ্ণুতার দিকে যাচ্ছে বলে মনে করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মামুন আল মোস্তফা। তিনি বলেন, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাঠের পরিস্থিতি ধীরে ধীরে অসহিষ্ণুতার দিকে যাচ্ছে। তিনি বলেন, নির্বাচন ঘিরে সহিংসতা নতুন নয়, তবে এবার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন রূপ নিয়েছে।