অভ্যন্তরীণ কোন্দল, চাঁদাবাজী, দলের মনোনীত প্রার্থীদের বিপক্ষে অবস্থান, প্রচারণায় অংশগ্রহণে অনীহা, কেন্দ্র ভোটার আনায় সক্রিয় না থাকা, সাংগঠনিক দুর্বলতা, প্রতিপক্ষের সাথে গোপনে আঁতাতের কারণে বিএনপি’র ঘাঁটি বলে পরিচিত খুলনা বিভাগে ভরাডুবি হয়েছে। দখল করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিভাগের ৩৬টি সংসদীয় আসনের মধ্যে দাঁড়িপাল্লা জয় পেয়েছে ২৫টিতে। বিএনপি পেয়েছে মাত্র ১১টি আসন।

খুলনা আঞ্চলিক নির্বাচন কার্যালয় থেকে জানা যায়, খুলনা বিভাগের ১০ জেলার ৩৬টি আসনের মধ্যে খুলনা চারটিতে বিএনপি ও দুটিতে জামায়াতে ইসলামী, বাগেরহাটে জামায়াতে ইসলামী তিনটি ও বিএনপি একটিতে, সাতক্ষীরার চারটিতেই জামায়াতে ইসলামী, যশোরের পাঁচটি জামায়াতে ইসলামী ও একটি বিএনপি, মাগুরার দু’টিতেই বিএনপি, ঝিনাইদহে তিনটিতে জামায়াতে ইসলামী ও একটি বিএনপি, মেহেরপুরের দু’টিতেই জামায়াতে ইসলামী, কুষ্টিয়ার তিনটিতে জামায়াতে ইসলামী ও একটি বিএনপি, চুয়াডাঙ্গার দু’টিতেই জামায়াতে ইসলামী, নড়াইলের একটি বিএনপি ও একটিতে জামায়াত ইসলামী জয়লাভ করেছে।

নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনে ১৯৯১ সালের পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি পেয়েছিল নয়টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ছয়টি, ১৯৯৬ সালের সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ১২টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী একটি, ২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২১টি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ৭টি, ২০০৮-এর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি দুইটি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দু’টি আসনে জয় পেয়েছিলো।

এক সময় খুলনা বিএনপি’র নেতৃত্ব দিয়েছেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, সাবেক তথ্যমন্ত্রী তরিকুল ইসলাম, সাবেক স্পিকার শেখ রাজ্জাক আলী ও সাবেক মেয়র এডভোকেট শেখ তৈয়েবুর রহমান। এখন বিএনপিতে এই মাপের কোন নেতা নেই। অভিভাবকহীন হয়ে পড়েছে খুলনা বিভাগীয় বিএনপি। সর্বশেষ কেন্দ্রীয় বিএনপি’র খুলনা বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক নজরুল ইসলাম মঞ্জুকে শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে তাঁর পদ স্থগিত করা হয়। তাকে খুলনা-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী করা হলেও পদ ফিরিয়ে দেয়নি দলের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। তাঁর জায়গায় ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের সমন্বয় করে নেতৃত্ব দেয়ার মত সক্ষমতা ও সাংগঠনিক সমর্থন না থাকায় দিশাহীন বিএনপি সাংগঠনিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছে। অনৈক্যের কারণে দল অনেকটা ছন্নছাড়া অবস্থায় আছে। অধিকাংশ জেলা পর্যায়ের কমিটি নড়বড়ে অবস্থায় রয়েছে। কমিটি নেই অনেক উপজেলা পর্যায়ে। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, যশোর, কুষ্টিয়া ও মেহেরপুরে দলীয় কোন্দল ভরাডুবিতে ভূমিকা রেখেছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে মনোনয়ন না পাওয়া নেতারা গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীকে হারানোর মিশন নিয়ে নামে এবং তারা সফলও হয়েছে। এ ধরনের ভূমিকায় থাকা অনেক নেতার বিরুদ্ধে গোপনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর সাথে গোপনে আঁতাত করার অভিযোগ উঠেছে।

তারা জানান, বিভাগের ৬ জন বিএনপি নেতা বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় তাদেরকে দল থেকে সরিয়ে দেয়া হয়। এর বাইরেও এক সময়ের প্রভাবশালী বিএনপি নেতা এম এ এইচ সেলিম বাগেরহাটের দু’টি আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন। তাদের ভূমিকার কারণে দাঁড়িপাল্লার বিজয় সহজ হয়েছে।

খুলনা-২ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু পরাজিত হয়েছে দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে। দল তাকে মনোনয়ন দিলেও পদে না ফেরানোর কারণে সাংগঠনিক শক্তিকে কাজে লাগাতে পারেননি তিনি। অনৈক্যের কারণে তার পরাজয় হয়েছে।

তৃণমূল বিএনপি’র অনেক নেতাকর্মীর সাথে কথা বলে জানা যায়, খুলনা বিভাগে বিএনপি’র এই পরাজয় তারা এখনো পর্যন্ত মেনে নিতে পারছেন না। ট্রমার মধ্যে রয়েছেন তারা। দ্রুত বিএনপিকে ঐক্যবদ্ধ করার উদ্যোগ নেবে কেন্দ্র এমন প্রত্যাশা করছেন তারা।

খুলনা বিভাগের ৩৬ আসনের মধ্যে ২৫টি পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মনোনীত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী আর ১১টিতে বিএনপি মনোনীত ধানের শীষের প্রার্থীরা।

খুলনা-১ : আমির এজাজ খান (বিএনপি-ধানের শীষ); খুলনা-২ : শেখ জাহাঙ্গীর হোসেন হেলাল (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); খুলনা-৩ : রকিবুল ইসলাম বকুল (বিএনপি-ধানের শীষ); খুলনা-৪ : এস কে আজিজুল বারী হেলাল (বিএনপি-ধানের শীষ); খুলনা-৫ : আলি আসগার লবি (বিএনপি-ধানের শীষ); খুলনা-৬ : আবুল কালাম আজাদ (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা)।

বাগেরহাট-১ : মাওলানা মশিউর রহমান (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); বাগেরহাট-২ : শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদ (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); বাগেরহাট-৩ : শেখ ফরিদুল ইসলাম (বিএনপি-ধানের শীষ); বাগেরহাট-৪ : আব্দুল আলিম (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা)।

সাতক্ষীরা-১ : মোঃ ইজ্জত উল্লাহ (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); সাতক্ষীরা-২ : আব্দুল খালেক (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); সাতক্ষীরা-৩ : রবিউল বাসার (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); সাতক্ষীরা-৪ : গাজী নজরুল ইসলাম (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা)।

যশোর-১ : মুহাম্মাদ আজীজুর রহমান (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); যশোর-২ : মোহাম্মদ মোসলেহউদ্দিন ফরিদ (জামায়াতে ইসলামী দাঁড়িপাল্লা); যশোর-৩ : অনিন্দ্য ইসলাম অমিত (বিএনপি-ধানের শীষ); যশোর-৪ : মোঃ গোলাম রছুল (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); যশোর-৫ : গাজী এনামুল হক (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); যশোর-৬ : মোঃ মোক্তার আলী (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা)।

মেহেরপুর-১ : মোঃ তাজউদ্দীন খান (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); মেহেরপুর-২ : নাজমুল হুদা (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা)।

কুষ্টিয়া-১ : রেজা আহমেদ বাচ্চু (বিএনপি-ধানের শীষ); কুষ্টিয়া-২ : মোঃ আব্দুল গফুর (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); কুষ্টিয়া-৩ : মুফতি আমির হামজা (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); কুষ্টিয়া-৪ : মোঃ আফজাল হোসেন (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা)

চুয়াডাঙ্গা-১ : এড. মাসুদ পারভেজ (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); আসন নং ৮০ : চুয়াডাঙ্গা-২ : মোঃ রুহুল আমিন (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা)।

ঝিনাইদহ-১ : মোঃ আসাদুজ্জামান (বিএনপি-ধানের শীষ); ঝিনাইদহ-২ : আলী আজম মোঃ আবু বকর (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); ঝিনাইদহ-৩ : মতিয়ার রহমান (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা); ঝিনাইদহ-৪ : মাওলানা আবু তালিব (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা)।

মাগুরা-১ : মনোয়ার হোসেন খান (বিএনপি-ধানের শীষ); আসন নং ৯২ : মাগুরা-২ : নিতাই রায় চৌধুরী (বিএনপি-ধানের শীষ); নড়াইল-১ : বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম (বিএনপি-ধানের শীষ); নড়াইল-২ : মোঃ আতাউর রহমান (জামায়াতে ইসলামী-দাঁড়িপাল্লা)।