বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, অতীতে যারা দেশ শাসন করেছে তারা একদিকে লুটপাট ও দুর্নীতিতে লিপ্ত ছিল, অন্যদিকে ধর্ম ও বর্ণের ভিত্তিতে জাতিকে বিভক্ত করেছে। তারা জাতিকে টুকরো টুকরো করে রেখেছিল। আমাদের ১১ দলীয় ঐক্যের মূল অর্থ হলো- একটি ঐক্যবদ্ধ বাংলাদেশ। এই দেশ ও জাতিকে আর বিভক্ত হতে দেওয়া হবে না।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে সোমবার (২৬ জানুয়ারি) দুপুর ১২টায় মেহেরপুর হাইস্কুল মাঠে জেলা আমীর মাওলানা তাজ উদ্দিন খানের সভাপতিত্বে আয়োজিত ১১ দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
তিনি আরও বলেন, অতীতে যারা ক্ষমতায় ছিল তারা বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবে না যে তাদের সময় ব্যাংক লুট হয়নি, মা-বোনদের ইজ্জত হানি হয়নি। তারা যুবসমাজের হাতে কাজ তুলে দিতে পারেনি কিংবা শিশুদের ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করতেও পারেনি। এই ব্যর্থতার কুফলই হচ্ছে বিগত ৫৪ বছরের শাসন। আপনারা কি চান সেই পুরোনো, বস্তাপচা ব্যবস্থা আবারও বহাল থাকুক? আমাদের সঙ্গে রয়েছে এ দেশের বঞ্চিত কৃষক, শ্রমিক ও আপামর জনসাধারণ।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, আপনারা কি আবার দুর্নীতি ফিরে আসুক চান? ফ্যাসিবাদ আবার ফিরে আসুক চান? জনতার সমস্বরে জবাব আসে- না। তাই যদি হয়- দেশের সাড়ে ১২ কোটি ভোটারকে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি- ন্যায়, সাম্য ও ফ্যাসিবাদবিরোধী আদর্শের পক্ষে ১১ দলীয় ঐক্যকে জনগণ সমর্থন দেবে। আল্লাহর কসম, আপনারা যদি আমাদের ওপর পবিত্র আমানত অর্পণ করেন, আমরা জনগণের সম্পদে হাত দেব না। কাউন্সিলর থেকে জাতীয় পরিষদের সদস্য-সবাইকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে হবে। পাঁচ বছর পর নয়, প্রতি বছর হিসাব দিতে হবে।
তিনি দেশের নদ-নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, আমাদের নদীগুলোকে হত্যা করা হয়েছে। পদ্মা নদীর ওপর ভয়াবহ জুলুম করা হয়েছে। আমরা দায়িত্ব পেলে পদ্মাসহ সব নদী খনন করা হবে। নদী খনন হলে মাটি বাঁচবে, মাটি বাঁচলে আমার মা বাঁচবে।
তিনি বলেন, আমরা ক্ষমতায় গেলে অতীতের মতো লুটপাট করব না-এর প্রমাণও রয়েছে। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমাদের দুইজন মন্ত্রী ছিলেন। তাঁদের বিরুদ্ধে এক পয়সা দুর্নীতির প্রমাণও পাওয়া যায়নি। তাঁরা দক্ষতা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন। আগামীতেও এ ধরনের যোগ্য ও সৎ মানুষ দিয়েই মন্ত্রণালয় পরিচালিত হবে।
নারী সমাজের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে তিনি বলেন, যে জাতি তার মা-বোনদের সম্মান দেয়, আল্লাহ তায়ালা সেই জাতিকে সম্মানিত করেন। আমরা মা-বোনদের ইজ্জত ও নিরাপত্তার পূর্ণ হেফাজত করব। ঘর, রাস্তা ও কর্মস্থলে তারা শতভাগ সম্মান, মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিয়ে চলাফেরা করবে। বিগত ৫৪ বছরে আমাদের বিরুদ্ধে এ ধরনের কোনো বদনাম নেই।
তিনি বলেন, আমরা সবাই একসময় মজলুম ছিলাম। কিন্তু ৫ আগস্টের পর একটি পক্ষ নিজেদের ভাগ্যোন্নয়নে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। মেহেরপুর একটি ছোট ও শিক্ষিত জেলা- এখানেও কি চাঁদাবাজি হয়? দুঃখজনক হলেও সত্য, এখানেও চাঁদাবাজি চলছে। আমরা আর এই চাঁদাবাজি চলতে দেব না। বরং যারা এতে জড়িত, তাদের সম্মানজনক কাজের সুযোগ করে দেওয়া হবে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চাঁদাবাজি নয়—বিনা খরচে দক্ষতা উন্নয়ন করে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে।
তিনি আরও বলেন, আমরা শিশুদের জন্য পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত বিনা খরচে শিক্ষা নিশ্চিত করব। ৬৫ বছর বয়সের পর রাষ্ট্র নাগরিকদের চিকিৎসা ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নেবে। যারা বলবেন তাদের প্রয়োজন নেই- তাদের আমরা সম্মান জানাব।
দেশবাসীর প্রতি প্রতিশ্রুতি দিয়ে তিনি বলেন, রাজনীতিবিদদের সম্পদ পাঁচ বছর আগের পরিমাণের চেয়ে বাড়তে দেওয়া হবে না। জনপ্রতিনিধিরা জনগণের সম্পদ বৃদ্ধিতে কাজ করবেন। যারা এই দায়িত্ব পালন করতে পারবেন, তারাই জনপ্রতিনিধি হবেন। জনগণের সম্পদ ভোগকারী লুটেরা প্রতিনিধির প্রয়োজন নেই। আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের সহকর্মীরা মামলা বাণিজ্য, দখল বাণিজ্য ও চাঁদাবাজি থেকে মুক্ত।
তিনি বলেন, আপনাদের দোয়া ও ভালোবাসা নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে চাই। মেহেরপুরের দুটি আসন আমাদের উপহার দেবেন। একবার সুযোগ দিয়ে দেখুন- আমরা আপনাদের পাশে থাকি কি না। অতীতে এখানকার উপজেলা ও ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে আমাদের প্রতিনিধিরা আপনাদের সেবা করেছেন।
মেহেরপুরবাসীকে আশ্বস্ত করে তিনি বলেন, আপনারা যদি আমাদের ঋণী করেন, ইনশাআল্লাহ আগামী পাঁচ বছর জানপ্রাণ দিয়ে সেই ঋণ শোধ করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আপনাদের সব সমস্যা অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে সমাধান করা হবে। কোনটি আগে, কোনটি পরে- তা আপনাদের সঙ্গে পরামর্শ করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। উপর থেকে কিছু চাপিয়ে দেওয়া হবে না। অতীতে যারা চাপিয়ে দিয়েছে, তারা আগে নিজেদের ভাগ বুঝে নিয়েছে।