# ঝিনাইগাতি ইউএনও ও ওসিকে প্রত্যাহার
# আচরণবিধি লঙ্ঘনে এগিয়ে ময়মনসিংহের প্রার্থীরা
দিন যতই যাচ্ছে নির্বাচনী মাঠ ততই উত্তপ্ত হচ্ছে। একের পর এক ঘটছে আচরণবিধি লংঘনের ঘটনা। ঘটছে সংঘাত, সহিংসতা। রক্ত ঝরছে নির্বাচনী মাঠে। মামলা ও জরিমানা করেও পরিস্থিতি সামলাতে পারছে না নির্বাচন কমিশন। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের তফসিল ঘোষণার পরদিনই দুর্বৃত্তের গুলীতে শহীদ হন ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্য স্বতন্ত্র প্রার্থী ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি। তারপর আরো একাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত বুধবার শেরপুরে নির্বাচনি ইশতেহার অনুষ্ঠানে বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলায় নিহত হন শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম। এর আগে নির্বাচনী মাঠে সহিংসতা ও আচরণবিধি লংঘনের বিষয়ে বিভিন্ন অভিযোগ করে আসছিল জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচনের সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার দাবি জানানো হলেও ইসির পক্ষ থেকে তা করা হয়নি। যার পরিণতিতে মাঠে হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটছে। নির্বাচনি মাঠে এমন উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভোটের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
গত বুধবার শেরপুরে নির্বাচনি ইশতেহার অনুষ্ঠানে বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলায় নিহত হন শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম। একইদিন রাজধানীর কদমতলীতে নির্বাচনী গণসংযোগ চলাকালে জামায়াতে ইসলামীর নারী নেত্রী কাজী মারিয়া ইসলাম বেবিকে (৫২) রামদা দিয়ে কুপিয়ে নৃশংসভাবে জখম করে যুবদলের নেতাকর্মীরা। কদমতলীর ৫২ নম্বর ওয়ার্ডের ডিপটির গলি এলাকায় এই বর্বরোচিত হামলার ঘটনা ঘটে। আহত মারিয়া ইসলাম বেবি জামায়াতের রুকন ও স্থানীয় মহিলা নেত্রী।
এর আগের দিন মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে ঢাকা-৮ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও তার লোকজনের ওপর হামলা করা হয়।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা-১৮ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের ওপরও হামলা চালানো হয়। স্থানীয় ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি দিদার মোল্লার নেতৃত্বে এ হামলা করা হয় বলে এনসিপি অভিযোগ করেছে। ওই সময় আদীব ওই এলাকায় গণসংযোগ করছিলেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিএনপি।
এছাড়া বাগেরহাট-১, ২ ও ৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী (ঘোড়া প্রতীক) এম এ এইচ সেলিমের এক কর্মীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।
একই দিন নাটোর ও নড়াইলে বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের নির্বাচনি সরঞ্জাম পোড়ানোর অভিযোগ পাওয়া যায়। ভোলা, লালমনিরহাট ও চুয়াডাঙ্গায় নির্বাচনী প্রচারণায় সংঘর্ষে ঘটনাও ঘটেছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আসছে। এসব অভিযোগে শোকজ ও জরিমানার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে। প্লাস্টিক লেমিনেটেড রঙিন পোস্টার ব্যবহার, দুপুর ২টার আগে ও রাত ৮টার পর উচ্চশব্দে মাইক বাজানো, মোটর শোভাযাত্রা ও ট্রাক মিছিলের মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শনের মতো ঘটনা ঘটছে, যা সরাসরি নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন। তফসিল ঘোষণার পর প্রচার শুরুর আগেও একই চিত্র দেখা গেছে।
সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘গত কয়েক দিনে বিভিন্ন জায়গায় আচরণবিধি লঙ্ঘন ও হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।’ তিনি নারী কর্মীদের হেনস্তা ও হামলার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এদিকে দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে এনসিপির কুমিল্লা-৪ আসনের প্রার্থী ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘ঢাকা-১৮ আসনে যেভাবে আমাদের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের ওপর হামলা হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে আজই প্র্যাকটিস ম্যাচ শুরু হলো। বিএনপি যদি শুরুতেই এভাবে বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা করে, তাহলে পুরো নির্বাচনের জন্যই এটি নেতিবাচক বার্তা।’
নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম বলেছেন, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক নয়। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ভোটারদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের মাঠ পর্যায়ে প্রত্যেক আসনে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি ও বিচারক কমিটি আছে। আমাদের যুগ্ম জেলা জজ পর্যায়ের বিচারক আছেন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো আমলে নিচ্ছেন। তারা বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। মোবাইল কোর্ট প্রতিদিনই তারা পরিচালনা করছেন এবং প্রতিদিনই আমরা রিপোর্ট পাচ্ছি যে মিনিমাম ৫০-৬০টি কেস রুজু হচ্ছে। কোথাও জরিমানা হচ্ছে, কোথাও সাজা হচ্ছে। মানে কার্যক্রম জোরেশোরে চলছে।’
নির্বাচনে আচরণ বিধি ভঙ্গ: ১১৯ মামলা, জরিমানা সোয়া ১২ লাখ টাকা
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের গত ৮ জানুয়ারি থেকে ২১ দিনে আচরণ বিধি ভঙ্গের অভিযোগে ১১৯ মামলা ও ১২ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। গতকাল বৃহস্পতিবার গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কেন্দ্রীয় সমন্বয় কমিটির সদস্য সচিব ও এনআইডি অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন) মো. সাইফুল ইসলাম এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, প্রতিদিন নির্বাচনে মাঠ পর্যায়ের পরিবেশ সুষ্ঠু রাখতে নানা কার্যক্রম এর মধ্যে মামলা ও জরিমানা করা হচ্ছে যাতে সবাই আচরণ বিধিমালা ভঙ্গ না করে।
গত ৮ জানুয়ারি থেকে ২৮ জানুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন উপলক্ষে বিজ্ঞ এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেটগণ কর্তৃক নির্বাচনি আচরণ বিধি প্রতিপালন/অভিযোগ বিষয়ে গৃহীত ব্যবস্থা (জেল/জরিমানা) সম্পর্কিত প্রতিবেদনে জানা যায়, ১৭৬ টি নির্বাচনি এলাকায় ১৯২ টি আচরণ বিধি ভঙ্গের ঘটনা ঘটেছে। এতে মোট জরিমানা করা হয়েছে ১২ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ টাকা। আর মামলা করা হয়েছে ১১৯টি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২ হাজারের কাছাকাছি প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে। আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭ টা পর্যন্ত প্রচারণা চালতে পারবেন এসব প্রার্থীরা আর ভোটগ্রহণ আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে সাতটা থেকে বিকাল সাড়ে ৪ টা পর্যন্ত।
ভোটে আচরণবিধি লঙ্ঘনে এগিয়ে ময়মনসিংহের প্রার্থীরা, কম লঙ্ঘন ঢাকায়
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে নির্বাচনি প্রচার-প্রচারণা করছেন প্রার্থীরা। কোথাও কোথাও আচরণবিধি লঙ্ঘন ও অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটছে। এরই মধ্যে ১৭৬ আসনে আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে ১৯২টি। সবচেয়ে বেশি আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে, কম হয়েছে ঢাকায়। গতকাল বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশনের জনসংযোগ শাখা এ তথ্য জানিয়েছে। বিধি ভঙ্গের কারণে এরই মধ্যে প্রার্থীদের কাছ থেকে ১২ লাখ ২৪ হাজার ৩০০ টাকা জরিমানা আদায় করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।
ইসির জনসংযোগ শাখা জানায়, গত ১০ জানুয়ারি দেশব্যাপী মাত্র দুটি নির্বাচনি এলাকায় আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছিল। তবে ২৮ জানুয়ারি ২৯টি নির্বাচনি এলাকায় আচরণবিধি লঙ্ঘন হয়েছে। এতে জরিমানা করা হয় প্রায় দুই লাখ টাকা। এছাড়া ১২ জানুয়ারি মাত্র সাতটি আচরণবিধি লঙ্ঘন হয় নির্বাচনি মাঠে। ২৭ জানুয়ারি দেশব্যাপী ১৯ জায়গায় নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করেন প্রার্থীরা। এ ঘটনায় এক লাখ ২৭ হাজার টাকা জরিমানাসহ ১১টি মামলা করেছে ইসি।
ইসি জানায়, সারাদেশে ১৭৬টি নির্বাচনি এলাকায় আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় ১১৯টি মামলা দায়ের করেছে ইসি। আচরণবিধি বেশি লঙ্ঘন হয়েছে ময়মনসিংহ বিভাগে, কম হয়েছে ঢাকায়।
শেরপুরে জামায়াত নেতা হত্যার ঘটনায় ইউএনও ও ওসিকে প্রত্যাহার
শেরপুরে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা মাওলানা রেজাউল করিম হত্যাকা-ের ঘটনায় ঝিনাইগাতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রত্যাহার করা হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে আলাপকালে এ তথ্য জানিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ।
তিনি জানান, শেরপুরের ঘটনায় ইউএনও এবং ওসিকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রার্থীদের বিরুদ্ধে জুডিশিয়াল ইনকোয়ারি কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পর ব্যবস্থা নেবে কমিশন।
এক প্রশ্নের জবাবে আখতার আহমেদ জানান, আগামী ৮ ফেব্রুয়ারির পর আদালতের নির্দেশে কেউ প্রার্থিতা ফিরে পেলে পোস্টাল ব্যালটে তাদের নাম ও প্রতীক থাকবে না।