ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে দেশজুড়ে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরা। গতকাল সোমবার সকাল থেকেই বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় তিনশ আসনে উৎসবমুখর পরিবেশে কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে নিয়ে প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন। এ সময় প্রার্থী ও তাদের সমর্থকদের অনেকেই সুষ্ঠু, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন। নির্বাচন কমিশন থেকে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী তিনশ আসনে ২৫২৮জন প্রার্থী তাদের মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন বলে জানা গেছে। এদিকে আজ থেকে মনোনয়ন পত্র বাছাই শুরু হবে চলবে ৪ জানুয়ারী পর্যন্ত। ২১ জানুয়ারী প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেয়া হবে।

গতকাল সোমবার শেষ দিনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলের প্রধানরা মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন। বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া তিনটি আসনে মনোনয়ন পত্র দাখিল করেছেন। বগুড়া-৭, দিনাজপুর-৩ ও ফেনী-১, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান এর পক্ষে ঢাকা-১৫ আসনে মনোনয়ন পত্র জমা দিয়েছেন। ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। ঢাকা-১১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহবায়ক নাহিদ ইসলাম, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, খুলনা-৫ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশন থেকে জানা গেছে, সারাদেশে তিনশ আসনে ২৫৮২টি মনোনয়ন পত্র দাখিল করা হয়েছে। তার মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৪১টি আসনে ৪৪৪টি, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৩টি আসনে ১৯৪টি, সিলেট বিভাগে ১৯টি আসনে ১৪৫টি, খুলনা বিভাগে ৩৬ আসনে ২৭৬টি, রাজশাহী বিভাগে ৩৯টি আসনে ২৭৬, রংপুরে ৩৩টি আসনে ২৭৮টি, ময়মনসিংহ বিভাগে ২৪টি আসনে ১৭৬টি, ফরিদপুর অঞ্চলে ১৫টি আসনে ১৪২টি, বরিশাল বিভাগে ২১টি আসনে ১৬২টি ও কুমিল্লা অঞ্চলে ৩৫টি আসনে ৩৬৫টি মনোনয়ন দাখিল করা হয়েছে।

এবারের সংসদ নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টিসহ (এনসিপি) নিবন্ধিত মোট ৫৮টি রাজনৈতিক দল অংশ নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তবে নিবন্ধন স্থগিত থাকায় আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না।

বেগম খালেদা জিয়া: বগুড়া-৭, দিনাজপুর-৩ ও ফেনী-১ মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার। তিনি এভারকেয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকায় এবার প্রথমবারের মতো মনোনয়নপত্রে স্বাক্ষরের পরিবর্তে আঙুলের ছাপ ব্যবহার করা হয়েছে। একই সঙ্গে সবকটি আসনে বিকল্প প্রার্থী রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

তারেক রহমান (ঢাকা-১৭): ঢাকা-১৭ আসনে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পক্ষে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। তাঁর পক্ষে নির্বাচন পরিচালনা কমিটির সমন্বয়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম মনোনয়নপত্র জমা দেন। এসময় তারেক রহমানের প্রস্তাবক ছিলেন ডা. ফরহাদ হালিম ডোনার এবং সমর্থক ছিলেন অ্যাডভোকেট আলমগীর হোসেন।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর (ঠাকুরগাঁও-১): ঠাকুরগাঁও-১ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি দলীয় প্রধান খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে ভোট প্রার্থনা করেন।

জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ: খুলনা-৫ আসনে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এছাড়া খুলনার আরও তিনটি আসনে যথাক্রমে কৃষ্ণ নন্দী (খুলনা-১), অ্যাডভোকেট হেলাল হোসেন (খুলনা-২), জনপ্রিয় ইসলামী বক্তা মুফতি আমির হামজা কুষ্টিয়া-৩ (সদর) ও মাওলানা আবুল কালাম আজাদ (খুলনা-৬) মনোনয়নপত্র জমা দেন। ঢাকা-১৩ আসনে মাওলানা মামুনুল হক, ঢাকা-১৪ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ব্যারিস্টার আরমান বিন কাশেম আত্মবিশ্বাসের সাথে জয়ের আশা ব্যক্ত করেছেন।

ববি হাজ্জাজ (ঢাকা-১৩): ঢাকা-১৩ আসনে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়তে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন ববি হাজ্জাজ। তিনি শান্তিপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ঢাকা জেলার পাঁচ আসনে ৪৪ প্রার্থীর মনোনয়নপত্র জমা: ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে ঢাকা জেলার পাঁচটি আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছেন ৪৪ জন। মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় শেষে সোমবার সন্ধ্যায় ঢাকা জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মো. রেজাউল করিম এ তথ্য তুলে ধরেছেন। সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ঢাকা-১ আসনে আটজন, ঢাকা-২ আসনে তিনজন, ঢাকা- ৩ আসনে ১৬ জন, ঢাকা-১৯ আসনে ১১ জন ও ঢাকা-১৯ আসনে ছয়জন মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এ পাঁচটি আসনে আরও ২১ জন মনোনয়নপত্র নিলেও জমা দেননি।

জামায়াতের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গতকাল সোমবার বেলা দেড়টায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমীর ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষে সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আবদুল হালিমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল আগারওগাঁওয়ের ইটিআই ভবনে আঞ্চলিক নির্বাচনী কর্মকর্তা ইউনুস আলীর নিকট মনোনয়নপত্র দাখিল করেন। প্রতিনিধি দলের অপর সদস্যগণ হলেন সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য জনাব মোবারক হোসাইন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য, ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমীর জনাব আবদুর রহমান মুসা। এ সময় কয়েকটি শহীদ পরিবারের সদস্য, জুলাইয়ের আহত যোদ্ধা এবং সংগঠনের বহু নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

মাওলানা আবদুল হালিম বলেন, “আমরা কিছুক্ষণ আগে মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্নদ্রষ্টা জননেতা ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষে ঢাকা-১৫ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছি। শহীদ হাদীসহ চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন তাদের রক্তের বিনিময়ে আমরা যে নতুন বাংলাদেশ পেয়েছি সেই বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নদ্রষ্টা হলেন আমীরে জামায়াত ডা. শফিকুর রহমান। আমীরে জামায়াতের জন্য আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই। দল-মত, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে ইনক্লুসিভ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়ার যে প্রত্যয় ডা. শফিকুর রহমান ব্যক্ত করেছেন, আমরা ঢাকা-১৫ আসনে তাঁকে বিজয়ী করে তা বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।”

এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, “ডা: শফিকুর রহমানের পক্ষ থেকে আপনাদেরকে ও দেশবাসীকে সালাম এবং শুভেচ্ছা। আপনাদের মাধ্যমে দেশবাসীর কাছে দোয়া চাই- যেন জাতি একটি সুষ্ঠু, সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন জাতি উপহার দিতে পারে। শহীদ আবরার ফাহাদ থেকে আবু সাঈদ পর্যন্ত সর্বশেষ শরীফ ওসমান হাদীসহ দেশে প্রায় দেড় হাজারের উপরে শহীদ হয়েছেন। ত্রিশ হাজারের উপরে আহত হয়েছেন। বহু মানুষ পঙ্গু হয়েছেন ও চোখ হারিয়েছেন। জুলাই যোদ্ধাসহ সকল শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে বলতে চাই আগামীর বাংলাদেশ গড়ার জন্য সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, রোববার সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে আপনারা দেখেছেন ৮ দলের পক্ষ থেকে আমরা ছিলাম সেখানে। আরও ২টি দল যোগদান করেছেন এনসিপি ও এলডিপি। এই ১০ দলের পক্ষ থেকে আগামী নির্বাচনে আসন সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছি। আমরা আশা করব অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, নির্বাচন কমিশন সবাই মিলে আমরা যেন লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করি। সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্যে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার থেকে আরম্ভ করে চিহ্নিত সন্ত্রাসীকে গ্রেফতার এবং নির্বাচনের জন্যে সার্বিকভাবে একটি সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা বারবার দাবি জানিয়েছি। সামনে আমাদের হাতে প্রায় দেড় মাস সময় আছে। এই সময়ের মধ্যে অবাধ, সুষ্ঠু ও সুন্দর নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্যে আমরা সরকার এবং নির্বাচন কমিশনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।”

তফসিল অনুযায়ী, আজ মঙ্গলবার থেকে ২০২৬ সালের ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত সংগৃহীত মনোনয়নপত্রগুলো যাচাই-বাছাই করবেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা। এরপর কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল হলে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারির মধ্যে তারা নির্বাচন কমিশনে আপিল করতে পারবেন, যা নিষ্পত্তি হবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ জানুয়ারি এবং ২১ জানুয়ারি প্রার্থীদের প্রতীক বরাদ্দ দেওয়া হবে। প্রতীক পাওয়ার পর ২২ জানুয়ারি থেকে প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু করতে পারবেন যা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। সবশেষে ১২ ফেব্রুয়ারি বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।